-
একটু রিল বানাই ?
.
.
সামিরাকে আজ রাতে পাত্রপক্ষ দেখতে আসছে বিয়ের কথা পাঁকা করার জন্য। পাত্রপক্ষের বেশ কয়েকজনই আসছে ; বিশেষত পাত্রের বড়ো বোন। তিনি আমেরিকা প্রবাসী, সেখানেই বাসা বেধে স্থায়ী হয়ে আছেন এখন। আরও আসছেন পাত্রের ফুফুরা আর খালারা।
সামিরা হিসেব করে দেখেছে, ওপক্ষের দেয়া তালিকা মতে মোট পনেরো জন হয়। কিন্তু নিশ্চয়ই এর চেয়ে বেশি আসবে তারা… ; এটা সাধারণ বিষয়। যতজন আসবে বলা হয়, তার চেয়ে বেশি আসাটাও একটা আর্ট বটে।
গত মাসে পাত্র তাকে দেখে গেছে। জনাব হাবিবের নাকি তাকে এক দেখায়ই ভালো লেগে গেছে। সামিরারও তাকে অপছন্দ হয়নি। তাছাড়া তিরিশ বছর বয়সী কোনো নারী বিয়ের বাজারে ভীষণ পিছিয়ে ; কখনো এক বাচ্চার বাপ আবার কখনো তালাকপ্রাপ্ত, এমন লোকের প্রস্তাবই সে পেয়েছে এতকাল। তাই লন্ডন প্রবাসী হাবিবের বাড়ির প্রস্তাব পেয়ে দেখাদেখির আগেই রাজি হয়ে গেছে সে মনে মনে।.
সানিয়া, তার ছোট বোন, এসে পিঁড়ি নিয়ে বসে মাছগুলো খানিকক্ষণ খুটিয়ে খুটিয়ে দেখে বলল, ” আপু, তিনটা মাছই পাঁচহাজার টাকা ?…. আরও কতকিছু কিনলি, বল ? কেমন আক্কেলহীন মানুষ এরা ; দলবেধে আসছে ! ”
” হুম, ” দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল সামিরা। ” চৌদ্দ গোষ্ঠী এসে পড়বে বলে মনে হচ্ছে রে… ”
” থাক মন খারাপ করিস না। বিয়ের আগে এটাই শেষ খরচ, ” বোনকে সমবেদনা জানালো সানিয়া।এত মন খারাপের মাঝে তার চেয়ে পাঁচ বছরের ছোট বোনের কাছ থেকে মমতামাখা কথা শুনবার পর সহসা চোখে পানি চলে এলো তার। চোখ মুছে নিয়ে সে বলল, ” আজ বাবা থাকলে এই খরচে কোনো কষ্টই হতো না রে।… কেন চলে গেল বাবা ? ”
আবারও ভিজে আসছে চোখ।
সামিরা আবারও মুছে নিয়ে বলল, ” আর আজকের খরচই তো শেষ না। বিয়ের সময় কতটা খরচ হবে, ভাব একটু– ”__________
দু’বোনে মিলে মাংস কাটাকুটি সেরে মসলা ব্লেন্ড করে নিল। চাইনিজ সবজির জন্য সবজি কেটে রাখল। মা-ও সাহায্য করলেন যথাসাধ্য ; তিনি পেঁয়াজ কুচি করা সহ আনুষাঙ্গিক ছোট ছোট কাজে হাত লাগালেন। দুই মেয়েকে সব দ্রুত গুছিয়ে ফেলার তাগাদা দিয়ে নিজে গোসল করতে চলে গেলেন।
আজান দিয়েছে বেশ অনেকক্ষণ হবে ; মা খুব অসুস্থতা ছাড়া নামাজ ছাড়েন না। আর তারা দু’বোন নামাজই পড়ে না। মায়ের এতকালের বকাঝকাতেও তাদের কোনো উন্নতি হয়নি এ ব্যাপারে। বাবাও তাদেরই মতো ছিলেন। তিনি মাঝেমধ্যে মন চাইলে জুম্মার নামাজটুকু পড়তেন। মায়ের এ নিয়ে আফসোস আর কষ্টের শেষ নেই। সামিরাও বাবার বেনামাজি থাকাবস্থার মৃত্যু নিয়ে ভাবলে মাঝে মাঝে ভীত হয়ে যায়। কিন্তু তবু আলসেমির আধিপত্য মন জুড়ে ; নামাজ আর পড়া হয় না তার। সানিয়ার ব্যাপারও তারই মতো।সামিরা মাছগুলো কেটে নিতে যাবে, এমন সময় হঠাৎ করেই এক অদ্ভুত বুদ্ধি মাথায় এলো। সাথে সাথে সানিয়ার সাথে সেটা শেয়ার করে ফেলল সে।
সানিয়াও দ্বিধা না করে মাথা নেড়ে সায় জানালো, ” হ্যাঁ, আজকাল দেখছি তো, মানুষ উইয়ার্ড ক্যাপশন দিয়ে রিলস বা ছবি ছাড়ে রিচ বাড়ানোর জন্য। দিতে পারো। ”
সামিরার একখানা ফেইসবুক পেইজ আছে। তা প্রায় আজ থেকে বছর চারেক আগে খোলা হয়েছিল। সেখানে সামিরা প্রায়ই তাদের বাসার সুন্দর অংশগুলোর ছবি তুলে এডিট করে পোস্ট করে। কখনো করে বারান্দার কি-বা বাড়ির লাগোয়া ছোট লনের বাগানের গাছগুলোর ছবি তুলে পেইজটায় ছাড়ে। কখনো বা আবার তাদের জমানো বইগুলোর ছবি ছাড়ে সেটাতে।
বাবা থাকতে তাদের পয়সাকড়ির দুশ্চিন্তা ছিল না। আপু তখন কেবল আনন্দের জন্যই পেইজটা চালাত। তবে দু’বছর আগে বাবা চলে যাওয়ার পর সমস্ত দুশ্চিন্তার ভার এসে পড়ল আপুর ঘাড়ে। সে ইপিজেডে অফিস সহকারী হিসেবে যোগ দিল। তবুও মাস শেষে কুলিয়ে উঠতে পারল না।
বোনের এ অবস্থা দেখে বাসার কাছের একটা কিন্ডারগার্টেনে শিক্ষক হিসেবে তাই এ বছর যোগ দিয়েছে সানিয়া। বেতন বেশি নয়। তাই সবমিলিয়ে আপুর সর্বদা কপাল কুঁচকে রাখার কারণ ধরতে অসুবিধা হয় না সানিয়ার। আপু তাই আজকাল তার পেইজটা নিয়ে সিরিয়াসলি ভাবতে শুরু করেছে। মা অবশ্য কিছুই জানেন না এ বিষয়ে ; পুরনো যুগের মানুষ তিনি। তাছাড়া পরহেজগারও বটে ; জানলে নির্ঘাত তাদেরকে এসব কাজে বাধা দিতেন।—-
সামিরা সাথে সাথে আঠারো সেকেন্ডের একখানা ভিডিও বানালো। এবং পোস্ট করে দিল ফেইসবুকে ভিডিওর ওপরে লিখে – বোনেরা, দেবরকে দিয়ে মাছ আনিয়েছিলাম। সে আট হাজার টাকা দিয়ে এ তিনটে মাছ এনেছে কেবল। এখন আপনারাই বলুন, কী করতে পারি। ভিডিওতে তাকে মাথায় হাত দিয়ে বসে থাকতে দেখা গেল। মাঝে দুয়েকবার প্রবল হতাশার সাথে মাথা নাড়তে দেখা গেল।
সামিরা খুশি মনে অনেক আশা নিয়ে মাছগুলো কেটে এরপর গোসলে গেল। সারাদিন আর মোবাইল দেখার ফুরসত পেল না সামিরা। সানিয়া তাকে সাহায্য করেছে, তবে ফাঁকে ফাঁকে সে মোবাইলও চালিয়ে নিয়েছে বেশ কয়েকবার। সামিরার নির্দেশে তার পেইজেও লক্ষ্য রেখেছে।সন্ধ্যা হতেই ঘটক আন্টি চলে এসেছে ; আপুকে দ্রুত সেজেগুজে নেয়ার তাগাদা দিতে। আপু তাই ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে সানিয়া আবার আপুর মোবাইল নিল নিজেরটা রেখে। আর সাথে সাথে বিস্ময়ের ধাক্কা খেল ; ভিডিওতে এর মধ্যে হঠাৎ করে ষোলো হাজার ভিউস হয়ে গেছে, রিয়েক্ট পড়েছে তিন হাজার। কমেন্ট পাঁচশ’ একত্রিশটা !
সানিয়া কাঁপতে কাঁপতে কমেন্ট পড়তে শুরু করল —
একজন মহিলা লিখেছে, মনে হয় বাকি টাকা মেরে দিয়েছে। তাকে সহমত জানিয়েছে বেশ কয়েকজন।
আরেকজন লিখেছে, যদি আপনার ভাই হতো এর জায়গায়, তবে তাকে কী করতেন ? কমেন্টকারী একজন পুরুষ। তাকে ইচ্ছেমত রোস্ট করেছে অনেকজন। আবার সহমতও জানিয়েছে বটে। .
সানিয়া সকলকে, ঠিক আছে, আপু ; ঠিক বলেছেন ভাইয়া ; রাইট – ইত্যাদি লিখে গণহারে উত্তর করতে লাগল। শেষে ক্লান্ত হয়ে মোবাইলটা রেখে দিল।_____________
.
আপুকে পাত্রপক্ষের প্রায় সবাই পছন্দ করে গিয়েছে। বলেন বিয়ের তারিখ ফেলেছে আগামী মাসের শেষ শুক্রবার।
তারা যেতেই মা তাকে ধরলেন, ” মা রে, আমার কেন যেন ভয় করছে। এত বড়োলোক বাড়ির লোক আমাদের এত পছন্দ কিসের ভিত্তিতে করছে ? কোনো ঘাপলা নেই তো ? ”
” ধুর মা, কীসব ভাবছ ! আমরা কি একেবারে স্ট্যাটাসহীন ? এই বাড়িটা আছে না আমাদের ? ”
মাকে বোঝালেও সামিরা মনে মনে তপ্ত নিশ্বাস গোপন করল। তাকে প্রথম দেখতে আসার দিনে নিরিবিলি করা বলার সময়টাতে সামিরার সরাসরি প্রশ্নের উত্তরে পাত্র স্বীকার করেছিল যে, সে নাইট ক্লাবে যেত। তবে হাবিব সাহেবের ধানাই-পানাই করতে করতে দেয়া উত্তরে সামিরার মনে সন্দেহ জেগেছে যে, তিনি হয়তো এখনও ক্লাবে যাওয়াটা জারি রেখেছেন। তবু এ নিয়ে আর কথা বাড়ায়নি সামিরা ; এর চেয়ে ভালো সম্বন্ধ আর এ বয়সে কোথায় পাবে সে ?____________
সামিরা সানিয়ার কথা শুনে মোবাইল হাত নিয়ে পেইজে ঢুকেই হতবাক হয়ে গেল। তার পেইজের ফলোয়ার সংখ্যা পঞ্চাশ থেকে এক লাফে তিন হাজার হয়ে গেছে। আর পোস্টে রিয়েক্ট সংখ্যা এখন ছাব্বিশ হাজার। সামিরা তৃপ্তির হাসি হেসে কমেন্ট পড়তে গিয়ে নিচের দিকের একটা কমেন্টে আটকে গেল।
কমেন্টকারী লিখেছে, মানুষ কী আশ্চর্য বোকা ! এরা যে মিথ্যা পোস্ট দিয়েছে, সেটা এদের রিপ্লাই দেখেও বুঝতে পারছে না।
সামিরা সাথে সাথে মাথা গরম করে ফেলল। সানিয়াকে দু’কথা শুনিয়ে দিল তৎক্ষণাৎ এমন বোকামির জন্য। রিপ্লাইগুলোও কেটে দিল যতটা সম্ভব।________
পরদিন বিকালে ভয়াবহ আঘাতটা পেল সামিরা। তার ফেইসবুক পোস্ট পাত্রপক্ষের সামনেও গেছে। সামিরা ফেইসবুক আইডিই নেই বলে তথ্য দিয়েছিল ঘটক মহিলা। এর মধ্যেই তার এ ভেলকিবাজি দেখে আর এ সম্বন্ধ এগিয়ে নিয়ে যাবার মধ্যে কোনো রকম স্বার্থকতা খুঁজে পায়নি তারা। উপরন্তু, পাত্রীর এমন হিংসাত্মক আচরণ দেখে তারা শঙ্কিতও বোধ করেছে। সামিরা ভাঙা মন নিয়ে মোবাইলটা আছড়ে ফেলে দিল। সানিয়ারও খুব কষ্ট হলো বোনের জন্য।
___________
কালকে বিয়ে ঠিক করে এলো আম্মু-আব্বু, ভাইয়ার জন্য, আর এর মধ্যে আপনি দেবর কোথার পেলেন আপু !?
– সামিরাপুর হতে পারত ছোট ননদের কমেন্ট ছিল ওটা।
সানিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলল ; এই কমেন্টই তাহলে এসবের মূলে।…
তার আপু ভাইরাল হতে চেয়েছিল। কিন্তু এভাবে ভাইরাল হবে, কে জানত ?
আপুর পেইজের ফলোয়ার কমে এক হাজারে নেমে এসেছে। তার পোস্টে মানুষের কমেন্ট বেড়েছে, তবে সেগুলো সব গালাগালিতে ভরপুর। আপুর একটামাত্র ভিডিও ভাইরাল হলো শুধু, প্রথম আর শেষ বারের জন্য।5 Comments
Friends
Md Shakhawat Hossen
@mdshakhawathossen
FAM Farhad
@fmfarhad71gmail-com
মোবারক হোসেন
@mobarakhossain
area info
@areainfo
উত্তম কুমার
@uttamkumarpaul75
গোলাম ফারুক অভি
@enterprisesikder45gmail-com
02101988
@sahedahmed
মো: আমিরবিন আনোয়ার
@writeramir
শেখ মিজানুর রহমান
@sheikhmizanurrahman66gmail-com


আবিদাতুর রাহমান, আপনার লেখা এই গল্পটির “আপুর পেইজের ফলোয়ার কমে এক হাজারে নেমে এসেছে” লাইনটি পড়ে বুঝতে পারলাম যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভার্চুয়াল জগৎটা আসলেই কতটা অনিশ্চিত এবং ক্ষণস্থায়ী হতে পারে।