-
সীমানা পেরিয়ে
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ)অধ্যায় ২৫
পাথরের ফাঁকটার ভেতর দিয়ে নিচে নামার সময় প্রথমেই মারদেকার মনে হয়েছিল, পৃথিবী যেন হঠাৎ তার পায়ের নিচ থেকে সরে গেছে। ওপরে গিরিখাতের মুখে তখনও গুলির শব্দ প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।মারদেকা নিচের দিকে তাকিয়ে কিছুই দেখতে পাচ্ছিল না। অন্ধকার এত গভীর ছিল যে মনে হচ্ছিল পাহাড়ের ভেতর একটা কালো কুয়ো মুখ খুলে আছে। কিন্তু তার কান ধীরে ধীরে অন্য শব্দ ধরতে শুরু করল। কোথাও জল পড়ছে, খুব ধীরে, নিয়মিত বিরতিতে। নিচে এলিয়াসের বুট যখন কোনো ধাপে পড়ছে, তখন পাথরের ভেতর থেকে একটা ভারী প্রতিধ্বনি উঠে আসছে।
কিছুক্ষণ পর এলিয়াস থামল। “এখান থেকে সাবধানে নামো। আর মাত্র কয়েক ধাপ।”
মারদেকা পাথরের দেয়াল ধরে শরীর নামাল। তার ডান পা প্রথমে শূন্যে ঝুলে রইল, তারপর একটা শক্ত জায়গায় গিয়ে ঠেকল। সে শরীরের ভার সেখানে দিল। আরেক ধাপ। তারপর আরেকটা। হঠাৎ তার পা সমতল মাটিতে পড়ল।
একটু দূরে এলিয়াস দাঁড়িয়ে আছে। তার হাতে ছোট্ট একটা লণ্ঠন। কখন সেটি জ্বালাল, মারদেকা বুঝতে পারেনি। হলদে আলো জ্বলে উঠতেই সে জায়গাটা দেখতে পেল। এটা কোনো সুড়ঙ্গ নয়। পাহাড়ের ভেতরে লুকিয়ে থাকা একটা পুরোনো আশ্রয়স্থল।
পাথরের স্বাভাবিক গুহাটাকে বহু বছর আগে মানুষের হাত বদলে দিয়েছে। দেয়ালের কয়েকটি জায়গা সমান করে কাটা, মেঝে থেকে বড় পাথর সরিয়ে ফেলা হয়েছে, এক পাশে শুকনো কাঠের ভাঙা তাক এখনও দেয়ালে গেঁথে আছে। অন্য পাশে একটা পাথরের চৌকির মতো উঁচু জায়গা। মেঝের এক কোণে মরচে ধরা টিনের পাত্র, আরেক পাশে ভেঙে পড়া কাঠের বাক্সের কয়েকটি অংশ। বাতাসে স্যাঁতসেঁতে পাথরের গন্ধ, যা কোনো পরিত্যক্ত ঘরে ঢুকলেই বোঝা যায়।
এলিয়াস লণ্ঠনটা একটু উঁচু করে ধরল। লারসেন তখন নিচে নেমে এসেছে। তার আহত হাতের কাপড়ে শুকনো রক্ত কালো হয়ে আছে। সে চারপাশে তাকাল, কিন্তু তার চোখে বিস্ময় দেখা গেল না। সে ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে গেল। মারদেকা তাকে অনুসরণ করল।
এক পাশে দেয়ালের গায়ে কয়েকটি লোহার হুক এখনও বসানো আছে। সেগুলো এতটাই মরচে পড়েছে যে প্রথম দেখায় পাথরের অংশ বলেই মনে হয়। আরেক পাশে শুকনো কাঠের ভাঙা দরজার মতো কিছু ছিল, সম্ভবত কোনো ছোট কুঠুরি বা খাদ্য রাখার জায়গা। মেঝেতে ছাইয়ের পুরোনো দাগ। লারসেন হাঁটু গেড়ে বসে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, “শেষবার এখানে এসেছিলাম প্রায় তেরো বছর আগে।”
মারদেকা লারসেনের দিকে তাকাল। তেরো বছর শব্দটা তার মনে কেমন যেন ধাক্কা দিল। তার জীবনের পুরো সময়টা যেন এমন এক অতীতের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে, যার শুরু হয়েছিল তার জন্মেরও অনেক আগে।
এলিয়াস দেয়ালের পাশে গিয়ে লণ্ঠনটা একটা পাথরের ওপর রাখল। “তুমি তো তাও দল থেকে পালিয়ে বেঁচে গিয়েছিলে। কিন্তু, আমাকে দলের সাথে থেকেও শেষমেশ নিজের জীবন বাঁচাতে এদ্দিন পালিয়ে থাকতে হয়েছে।”
মারদেকা ধীরে ধীরে ঘরের মাঝখানে এসে দাঁড়াল। তার মনে তখন একটাই প্রশ্ন। “তাহলে আমরা এখানে কেন এসেছি?” বললো সে।
লারসেন এবার তার দিকে তাকাল। কয়েক মুহূর্ত কেউ কথা বলল না। দূরে কোথাও জল পড়ার শব্দ হচ্ছে। টুপ। তারপর বিরতি। আবার টুপ।
এলিয়াস ধীরে ধীরে বলল, “কারণ তোমার বাবার সঙ্গে এই জায়গাটার সম্পর্ক ছিল।” তারপর যোগ করল, “তোমরা এখানে না এলে আমার সাথে কখনোই দেখা হতো না। যদিও আমি জানতাম, একদিন লারসেন আসবেই।” কথাটা সে লারসেনের দিকে ফিরে শেষ করলো।
মারদেকা স্থির হয়ে গেল। লারসেনের মুখের দিকে তাকিয়ে সে তাকে বুঝতে চেষ্টা করল, “তারমানে আপনি আমার বাবাকে চিনতেন?”
লারসেন কিছুক্ষণ উত্তর দিল না। তারপর ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে বলল, “চিনতাম।”
এই একটি শব্দের পর আশ্রয়স্থলটা যেন আরও নীরব হয়ে গেল।
মারদেকা এতদিন নিজের বাবাকে নিয়ে খুব কম জানত। পাহাড়ের সেই গ্রামে তার মায়ের গোষ্ঠীর লোকেরা তাকে কখনও পুরোপুরি আপন করে নেয়নি। কেউ সরাসরি কিছু বলত না, কিন্তু সে ছোটবেলা থেকেই বুঝেছিল, তার মধ্যে এমন কিছু আছে যা অন্যদের থেকে তাকে আলাদা করে। তার গায়ের রং, মুখের গঠন, চোখের দৃষ্টি, সবকিছুই ছিল ভিন্ন।
সে জানত তার বাবা একজন শ্বেতাঙ্গ মানুষ ছিল। তাকে নিয়ে একদিন শিকারে গিয়েছিল, তারপর আর ফিরে আসেনি। সে একাই তার মায়ের কাছে ফিরেছিল। এখন লারসেন বলছে, সে বাবাকে চিনত। অথচ বছর খানেক আগে সে নিজেই এই মানুষটাকে চিনেছে। মারদেকার গলা শুকিয়ে এল। “তিনি কেমন মানুষ ছিলেন?”
লারসেন ধীরে ধীরে পাথরের চৌকির কাছে গিয়ে দাঁড়াল। তারপর দেয়ালে হাত রাখল। মনে হলো, সে কথাগুলো নিজের ভেতর থেকে টেনে বের করছে। “ভালো স্কাউট ছিল। যে জায়গায় অন্য মানুষ শুধু পাথর দেখত, সে সেখানে পথ দেখত। যেখানে কেউ পুরোনো খুরের দাগ দেখে কিছু বুঝত না, সে বলতে পারত কতক্ষণ আগে ঘোড়া গেছে, কতগুলো ঘোড়া, আর তারা তাড়াহুড়ো করছিল কি না।”
লারসেন একবার মারদেকার দিকে তাকাল। “তোমার এই ক্ষমতাগুলোর কিছু হয়তো তার কাছ থেকেই এসেছে।”
মারদেকা চুপ করে রইল। তার ভেতর একটা অদ্ভুত অনুভূতি জন্ম নিল। এতদিন তার দক্ষতাগুলো ছিল শুধু তার নিজের। সে পাহাড়ে চলতে জানে, শব্দ শুনে মানুষ আর পশুর মধ্যে পার্থক্য করতে পারে, মাটির দাগ থেকে পথ বুঝতে পারে, অন্ধকারে চোখের চেয়ে কানকে বেশি বিশ্বাস করতে জানে। এগুলো সে শিখেছে প্রায় পুরোটাই লারসেনের কাছ থেকে। এখন সে প্রথমবার ভাবল, তার রক্তের মধ্যেও হয়তো এই শিক্ষার বীজ লুকিয়ে ছিল।
এলিয়াস পাথরের দেয়ালের দিকে তাকিয়ে বলল, “তোমার বাবা শুধু শিকারি ছিল না।”
লারসেন এবার তাকে থামাল না।
“আমরা তখন কয়েকজন মানুষ একসঙ্গে কাজ করতাম। আমাদের কোনো অফিস ছিল না, কোনো পতাকা ছিল না, নিজেদের পরিচয় দেওয়ার মতো কোনো নামও ছিল না। সীমান্তের এই অংশটা তখন এমন সব মানুষের হাতে ছিল, যারা আইনকে নিজেদের সুবিধামতো ব্যবহার করত। যারা টাকা দিয়ে মানুষ কিনত, অস্ত্র চালাত, মানুষকে সীমান্ত পার করাত, আবার প্রয়োজন হলে সেই মানুষকেই মরুভূমিতে ফেলে রেখে চলে যেত।”
মারদেকা স্থির চোখে শুনছিল।
এলিয়াস আবার বলল, “সবাই অপরাধী ছিল না যারা সীমান্ত পার হতো। কেউ পালিয়ে যেত হত্যার ভয় থেকে, কেউ পরিবারকে বাঁচাতে, কেউ এমন জায়গায় পৌঁছাতে চাইত যেখানে তাকে আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। আমরা কিছু মানুষকে নিরাপদে পথ দেখাতাম। আবার যারা এই পথ ব্যবহার করে খারাপ কাজ করত, তাদের খবরও জোগাড় করতাম।”
“আর আমার বাবা?”
“সে আমাদের সঙ্গে ছিল।” এবার লারসেন উত্তর দিল। “তবে সবসময় নয়। সে স্বাধীন মানুষ ছিল। কোনো জায়গায় বেশি দিন থাকত না। কিন্তু কঠিন পথ, বিপজ্জনক কাজ, আর এমন জায়গা যেখানে ভালো স্কাউট দরকার হতো, সেখানে তাকে পাওয়া যেত।”
মারদেকা নিচের দিকে তাকাল। তার মনে হলো, সে যেন নিজের বাবাকে চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছে, যদিও সেই মুখ সে মনে করতে পারে না। সে যে এতদিন কল্পনা করেছে, এবার সেটা বুঝতে পারছে। “তিনি মারা গিয়েছিলেন কীভাবে?”
প্রশ্নটা বেরিয়ে আসার পর কেউ সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল না। লণ্ঠনের আলোয় এলিয়াসের মুখটা আরও বয়স্ক দেখাল। তার গালের কাটা দাগ, চোখের নিচের গভীর ছায়া, সবকিছু যেন হঠাৎ অনেক বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠল।
লারসেন ধীরে ধীরে পাথরের দেয়াল থেকে হাত সরিয়ে নিল। তারপর সে নিজের কোটের ভেতরে হাত ঢুকিয়ে কালো ধাতব চাকতি দুটির একটি বের করল। ওটা লণ্ঠনের আলোয় মেলে ধরল। কালো ধাতুর ওপর বহু বছরের আঁচড়। মাঝখানে ক্ষয়ে যাওয়া একটা চিহ্ন। “এগুলো ছিল পরিচয়ের চিহ্ন।” বলল সে।
এলিয়াস ধীরে ধীরে তার পাশে এসে দাঁড়াল। “আমাদের দলে সবাই এগুলো পেত না। যারা কিছু নির্দিষ্ট পথ চিনত, যাদের ওপর কিছু নির্দিষ্ট দায়িত্ব ছিল, তাদের কাছে থাকত।”
লারসেন দ্বিতীয় চাকতিটাও বের করল। সে একটি চাকতি উল্টে দেখাল। পেছনে ক্ষীণ কিছু খোদাই আছে। সময়ের সঙ্গে অনেকটাই মুছে গেছে। “প্রত্যেকটার সঙ্গে একটা নাম আর একটা নির্দিষ্ট পথের সম্পর্ক ছিল।”
মারদেকা তাকিয়ে রইল। এতদিন ধরে এই চাকতিগুলো তার কাছে ছিল একটা রহস্য। কোথা থেকে এসেছে, কেন মানুষ এগুলোর জন্য মরতে বা মারতে প্রস্তুত, লারসেন কেন এগুলো এত সাবধানে রাখে, সে জানত না। সে ধীরে বলল, “তাহলে এগুলো কি প্রমাণ করে?”
এবার লারসেনের কণ্ঠ আরও নিচু হয়ে গেল। “এটাই প্রমাণ করে যে কিছু মানুষ একসময় আমাদের সঙ্গে ছিল। যদিও পরে আমি ভুল বুঝতে পেরে তাদের সঙ্গ ত্যাগ করি। কিন্তু তোমার বাবা দলের সঙ্গে ঠিকই থেকে যায়।”
আশ্রয়স্থলের ভেতর হঠাৎ ঠান্ডা আরও বেড়ে গেছে বলে মনে হলো। মারদেকা চোখ সরাল না। “আমার বাবা কি তবে খুন হয়ে ছিল?”
লারসেন এবার কোনো উত্তর দিল না। তার বদলে এলিয়াস বলল, “তোমার বাবা এমন কিছু জানতে পেরেছিল, যা তার জানা উচিত ছিল না।”
“কী?” মারদেকার কন্ঠ উচ্চকিত।
এলিয়াস কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর পাথরের চৌকির ওপর বসে পড়ল। তার আহত পা একটু সামনে ছড়িয়ে দিল। সে ক্লান্ত। কিন্তু ক্লান্তির চেয়েও বেশি, যেন এতদিন ধরে বয়ে বেড়ানো একটা বোঝা নামানোর আগে মানুষ যেমন স্থির হয়ে বসে, তার মধ্যে সেই ভাব। সে বলল, “আমাদের মধ্যে একজন ছিল। সে অন্যদের চেয়ে বেশি টাকা চাইত। ক্ষমতাও চাইত। প্রথমে কেউ বুঝতে পারেনি। কারণ সে খুব ভালোভাবে নিজের কাজ করত।”
“তারপর?” মারদেকার গলা চাপা।
“তারপর কিছু পথ ভুল মানুষের হাতে পৌঁছে যেতে লাগল।” এলিয়াসের চোখে লণ্ঠনের আলো কাঁপল। “যে মানুষগুলোকে আমরা নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতাম, তাদের কেউ কেউ পথে আক্রমণের মুখে পড়ত। কিছু চালান অদৃশ্য হয়ে যেত। যারা বিপজ্জনক অপরাধীদের বিরুদ্ধে খবর জোগাড় করত, তাদের মধ্যে কয়েকজন আর ফিরে আসত না।”
লারসেন পাথরের মত দাঁড়িয়ে সব শুনছিল।
“আমরা ভাবতাম আমাদের কেউ অনুসরণ করছে।” এলিয়াস তখনও বলে চলেছে। “পরে বুঝলাম, অনুসরণ করার দরকার ছিল না। খবর আমাদের ভেতর থেকেই বের হচ্ছিল।”
মারদেকা অনুভব করল, তার বুকের ভেতর ধীরে ধীরে একটা ভারী পাথর জমছে। “আমার বাবা সেটা জানতে পেরেছিলেন?”
এলিয়াস মাথা নেড়ে বলল, “হ্যাঁ।” তারপর কিছুক্ষণ শুধু জল পড়ার শব্দ শোনা গেল। “তোমার বাবা একটা ভুল করেছিল।”
মারদেকা চোখ তুলল।
“সে লারসেনের মত পালিয়ে যায়নি।” এলিয়াসের কণ্ঠে অনুশোচনা ছিল। “সে দলের সাথে থেকে প্রমাণ জোগাড় করতে চেয়েছিল।”
লারসেন ধীরে ধীরে হাঁটতে শুরু করল। ছোট আশ্রয়স্থলের মধ্যে তার বুটের শব্দ খুব পরিষ্কার শোনা যাচ্ছিল। “আমাদের কাউকে বিশ্বাস করবে কি না, সে জানত না। হয়তো ঠিকই করেছিল। কারণ বিশ্বাসঘাতক লোকটা এমন একজন ছিল, যাকে আমরা সবাই বিশ্বাস করতাম।” তাকে খুব অস্থির দেখালো, ” আমি ঠিকই তাকে চিনতে পেরেছিলাম। কিন্তু প্রমাণের অভাবে কিছু করতে পারছিলাম না। আমি জানতাম, দলের কেউ আমার কথা বিশ্বাস করবেনা। তাই নিজেই দল ছেড়ে পালালাম। সংগে নিয়ে গেলাম বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র।”
“সেই লোকটার নাম কী?” মারদেকা প্রশ্ন করল।
এলিয়াস এবার সরাসরি তার দিকে তাকাল। ঠিক সেই মুহূর্তে ওপরে কোথাও একটা শব্দ হলো। তিনজনই স্থির হয়ে গেল। এটা গুলির শব্দ নয়। পাথরের ওপর বুটের শব্দও নয়। মনে হলো, ভারী কোনো জিনিস টেনে সরানো হয়েছে।
লারসেনের হাত সঙ্গে সঙ্গে পিস্তলের দিকে গেল। লণ্ঠনের আলো কাঁপছে।
এলিয়াস ধীরে উঠে দাঁড়াল। “ওরা ফাঁকটা খুঁজে পেয়েছে।”
মারদেকা কিছু বলল না। সে মাথা সামান্য কাত করে শুনতে লাগল। কয়েক মুহূর্ত পর তার কানেও শব্দটা এল। খুব মৃদু। তারপর আরেকটা। একাধিক মানুষের পা। তারা ওপরে দাঁড়িয়ে আছে, সম্ভবত ফাঁকটার মুখ পরীক্ষা করছে।
লারসেন লণ্ঠনের দিকে তাকাল। “এটা নিভিয়ে দাও।”
এলিয়াস এক ঝটকায় আলো নিভিয়ে দিল। আশ্রয়স্থল আবার অন্ধকারে ডুবে গেল। এবার অন্ধকারের ওপাশে মানুষ আছে। সশস্ত্র মানুষ। তারা জানে, লারসেন এখানে। আর এলিয়াস বেঁচে আছে। হয়তো তারা এটাও জানে, মারদেকাও তাদের নাগালের মধ্যে।
কিছুক্ষণ কেউ কথা বলল না। অন্ধকারে মারদেকা শুধু অনুভব করছিল লারসেন কোথায় দাঁড়িয়ে আছে, এলিয়াস কোন দিকে। তার নিজের নিঃশ্বাস এখন অনেক ধীর। ভয়ের সময় সে আগে যেমন করত, তেমন করে চারপাশের শব্দ আলাদা করতে শুরু করল। উপরে দুজন। না, তিনজন। একজন একটু দূরে। তারপর আরেকটি শব্দ। লোহার কিছু পাথরে ঠেকল। মারদেকা নিচু গলায় বলল, “চারজন।”
লারসেন কোনো উত্তর দিল না। কিন্তু কয়েক মুহূর্ত পর সে ফিসফিস করে বলল, “আমি তিনজন শুনেছি।”
“চতুর্থজন পেছনে।” মারদেকা বলল। “তার পা টেনে হাঁটার শব্দ হচ্ছে।”
তারপর ওপরে একটি কণ্ঠ শোনা গেল। শব্দগুলো স্পষ্ট নয়। পাথর আর দূরত্বের কারণে ভেঙে আসছে। কিন্তু একজন মানুষ অন্যদের নির্দেশ দিচ্ছে, সেটা বোঝা গেল।
লারসেন মারদেকার কাঁধে হাত রাখল। “এখান থেকে আরেকটা পথ আছে?”
মারদেকা জানত, প্রশ্নটা এলিয়াসের জন্য। কিছুক্ষণ নীরবতা।
“আছে।” এলিয়াসের উত্তর আসতে একটু সময় লাগল। “কিন্তু, পথটা এখন আর আগের মতো নেই।”
লারসেনের কণ্ঠ কঠিন হলো। “তাহলে আমরা ওদিকেই যাব।”
এলিয়াস যেন কিছু বলতে চেয়েও থেমে গেল। তারপর বলল, “আগে একটা কথা তোমাদের জানতে হবে।”
লারসেনের কণ্ঠে এবার চাপা রাগ ফিরে এল। “এলিয়াস, আমরা এখন পাথরের নিচে দাঁড়িয়ে আছি। ওপরে চারজন লোক আমাদের বের হওয়ার অপেক্ষা করছে। তোমার গল্প শোনার জন্য আমার আর সময় নেই।”
এলিয়াস অন্ধকারে দাঁড়িয়ে ছিল। তার মুখ দেখা যাচ্ছিল না। “এই কথাটা তোমাদের শোনা দরকার। কারণ যে লোকটা বাইরে দাঁড়িয়ে আছে, সে মারদেকার খুঁজে এসেছে, শুধু চাকতির জন্য নয়।”
মারদেকার বুকের ভেতর ধীরে ধীরে ঠান্ডা একটা অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ল। সে স্থির হয়ে গেল। ওপরে আবার পাথর সরানোর শব্দ হলো। এইবার আরও কাছে।
লারসেন পিস্তল বের করল। অন্ধকারে তার কণ্ঠ শোনা গেল। “তার নাম বলো।”
এলিয়াস এবার আর চুপ করে রইল না। “তার নাম ভিক্টর কেইন।”
কিছুক্ষণ নীরবতা। নামটা মারদেকার কাছে অপরিচিত।
নামটা শুনে লারসেন থমকে গেল। কেননা সে এই মানুষটকেই সন্দেহ করেছিল। তার কারণেই একদিন দল ছেড়ে ছিল। “কিন্তু, কেইন তো মারা গেছে।” লারসেনের কণ্ঠ এবার বদলে গেছে।
এলিয়াস বলল, “আমরাও তাই ভেবেছিলাম।”
ওপরে আচমকা একটা গুলির শব্দ হলো। পাথরের ফাঁকের মুখে গুলি লেগে ভেতরে ধুলো ঝরে পড়ল।
মারদেকা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিচু হয়ে গেল।
এলিয়াস দ্রুত বলল, “সে মারা যায়নি। আর এত বছর পর সে জানতে পেরেছে যার বাবাকে সে মেরেছিল, এমনকি তার ছেলেটাকেও মারতে চেয়েছিলে, সেই ছেলেটা তুমি যে এখনও বেঁচে আছ।” মারদেকার দিকে ফিরে কথাটা শেষ করলো।
মারদেকা অন্ধকারে দাঁড়িয়ে রইল। তার নিজের অতীত, বাবার মৃত্যু, সেই পুরোনো দলের বিশ্বাসঘাতকতা, কালো চাকতি, সবকিছু এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো রহস্য বলে মনে হচ্ছিল না। ধীরে ধীরে সেগুলো এক জায়গায় এসে মিলছে।
আর সেই জায়গার ওপাশে একজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। একজন জীবিত শত্রু। ভিক্টর কেইন।
আর পাহাড়ের ওপরে আবার বুটের শব্দ শোনা গেল। এইবার তারা আর পথ খুঁজছে না। তারা জানে, নিচে কেউ আছে। উপরে আবার একটা পাথর গড়িয়ে পড়ল। ছোট্ট শব্দ, কিন্তু আশ্রয়স্থলের ভেতর সেটা অনেক বড় হয়ে উঠল। তারপর কারও বুটের তলায় শুকনো পাথর চূর্ণ হওয়ার শব্দ।
লারসেন খুব নিচু গলায় বলল, “পেছনের পথ দেখাও।”
এলিয়াস আর কথা বাড়াল না। সে অন্ধকারে হাত বাড়িয়ে দেয়ালের একটা অংশে চাপ দিল। সেখানে ডান পাশে ছিল একটা সরু ফাটল, বহু বছরের পাহাড়ি ধসের ফলে যার মুখ অর্ধেক বন্ধ হয়ে গেছে। সে হাত দিয়ে কয়েকটা ছোট পাথর সরাল। তারপর কাঁধ ঘুরিয়ে নিজের শরীর পাশ করে ভেতরে ঢুকে গেল। “এটা পুরোনো বের হওয়ার পথ।”
লারসেন বলল, “এখনও বের হওয়া যায়?”
“হাঁটু গেড়ে গেলে যায়।”
মারদেকা প্রথমে ঢুকল। জায়গাটা এত সরু যে তাকে শরীর নিচু করে প্রায় হামাগুড়ি দিতে হলো। পাথরের সঙ্গে কাঁধ ঘষা খাচ্ছে, কোথাও কোথাও মাটির ওপর শুকনো ধুলো জমে আছে। বাতাস ভারী, কিন্তু সম্পূর্ণ বন্ধ নয়। সামনের দিক থেকে ঠান্ডা হাওয়া আসছে। তার মানে পথের অন্য প্রান্ত কোথাও বাইরে গিয়ে খুলেছে।
তার পেছনে এলিয়াস, আর সবার শেষে লারসেন। কিছুদূর এগোনোর পর পথটা একটু নিচে নেমে গেছে। মারদেকা হাত বাড়িয়ে মাটি পরীক্ষা করল। শুকনো। কোথাও নতুন পায়ের দাগ নেই। এই পথ দিয়ে বহু বছর কেউ চলেনি।
তারপর হঠাৎ পেছনে গুলির শব্দ হলো। একটা গুলি আশ্রয়স্থলের পাথরে আঘাত করে প্রতিধ্বনি তুলল। তারপর আরেকটা।
লারসেন দাঁত চেপে বলল, “ওরা ঢুকে পড়েছে।”
মারদেকা আর সময় নষ্ট করল না। সে সামনে এগিয়ে গেল। পাথরের সরু পথটা প্রায় পনেরো গজ যাওয়ার পর হঠাৎ শেষ হয়ে গেল একটা নিচু মুখে। পাহাড়ের ঢাল নেমে গেছে নিচের দিকে। বাইরে রাত। আকাশ এখানে অনেকটা খোলা। মেঘ সরে গিয়ে কয়েকটি তারা বেরিয়েছে।
মারদেকা বাইরে এসে দাঁড়াল না। সে প্রথমেই মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসল। কিছুক্ষণ মাটির দিকে তাকিয়ে থাকল। শুকনো ধুলো, কয়েকটি ছোট পাথর, একটা ভাঙা ঝোপের ডাল। একটু দূরে খুরের দাগ। পুরোনো নয়। সে ধীরে মাথা তুলল। “এই পথে ঘোড়া গেছে।”
লারসেন বেরিয়ে এসে তার পাশে বসল। “কতক্ষণ আগে?”
“খুব বেশি নয়।” মারদেকা নিচু গলায় বলল।
“তিনটা ঘোড়া। হয়তো চারটা। কিন্তু দাগ পরিষ্কার নেই।”
এলিয়াস বেরিয়ে এসে তাদের পেছনে দাঁড়াল। তার আহত পা এবার তাকে কষ্ট দিচ্ছে, সেটা বোঝা যাচ্ছে। সে কয়েক মুহূর্ত চারপাশে তাকিয়ে রইল। “ওরা নিচের পথটাও নজরে রেখেছে।”
লারসেন তাকাল। “তুমি নিশ্চিত?”
“কেইন হলে নিশ্চিত।”
ভিক্টর কেইনের নামটা আবার শুনে মারদেকা লারসেনের দিকে তাকাল। লারসেনের মুখ অন্ধকারে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল না, কিন্তু তার চোয়াল শক্ত হয়ে আছে।
তারা ঢাল বেয়ে নিচে নামতে শুরু করল। জায়গাটা বিপজ্জনক নয়, কিন্তু পাথর আলগা। সামান্য ভুলে নিচে গড়িয়ে পড়া সম্ভব। মারদেকা সামনে, কারণ সে এখন পথ পরীক্ষা করছে। লারসেন তাকে পেছনে যেতে বলেনি। হয়তো এই প্রথমবার সে নিজেই বুঝতে পারছে, এই পাহাড়ে মারদেকার চোখ আর কান তাদের কাজে লাগছে।
নিচে নামার সময় মারদেকার মনে আবার বাবার কথা এল। কিন্তু এবার কোনো ভাঙা দৃশ্য নয়, কোনো কণ্ঠস্বর নয়। সে শুধু জানে, তার বাবা এই পাহাড়ে চলেছে, হয়তো এই পথের আশেপাশে, বহু বছর আগে। তার বাবা মানুষকে পথ দেখাত। আর সেই মানুষটাই কোনো এক রাতে বিশ্বাসঘাতকের কারণে মারা গেছে।
একটা সময় এলিয়াস বলল, “তোমার বাবার নাম ছিল ড্যানিয়েল রিড।”
মারদেকা থেমে গেল। সে ঘুরে তাকাল। “লারসেনও জানত?”
লারসেন এবার নিজেই উত্তর দিল। “জানতাম।”
মারদেকা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তার মধ্যে রাগ হওয়া উচিত ছিল। এতদিন তার জীবনের সবচেয়ে বড় সত্য দুজন মানুষ জানত, অথচ তাদের একজন সারাক্ষণ তার পাশে থাকলেও বলেনি। কিন্তু সে একই সঙ্গে এটাও বুঝতে পারছিল, লারসেন নিজেও সবকিছু জানত না। তার মুখে যে অনুশোচনা আছে, সেটা অভিনয় নয়।
“তোমরা আমাকে বলোনি কেন?”
কয়েক মুহূর্ত পর লারসেন বলল, “কারণ আমি নিশ্চিত ছিলাম না তুমি কে।”
মারদেকার চোখ সরু হয়ে এল। “কেন?”
”তোমাকে আমার র্যাঞ্চে নিয়ে যাবার পর খোঁজ-খবর করে তোমার অতীত সম্পর্কে জানলাম “ লারসেন কিছুক্ষণ থামল। “আমি সন্দেহ করতাম তুমিই সেই ছেলে। তবে প্রমাণ ছিল না।”
এলিয়াস বলল, “প্রমাণটা আমি অনেক পরে পেয়েছি।”
এলিয়াস কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর সে কোটের পকেটের ভেতর হাত ঢুকিয়ে সেই পুরোনো চামড়ার থলেটা বের করল। এবার সে থলেটা লুকিয়ে রাখল না। ধীরে ধীরে মুখ খুলল। ভেতর থেকে একটা কালচে ধাতব বস্তু বেরিয়ে এল।
এটা চাকতি নয়। আবার পুরোপুরি অন্য কিছুও নয়। ছোট, ভাঙা, অসম্পূর্ণ একটি ধাতব অংশ। এলিয়াস সেটাকে হাতের ওপর রেখে বলল, “এগুলো একসময় তোমার বাবার সঙ্গে ছিল।”
মারদেকার বুকের ভেতর যেন কেউ শক্ত করে আঘাত করল। মারদেকা ধীরে বুকের কাছে হাত নিয়ে গেল। এইবার আর লুকিয়ে রাখার কোনো অর্থ নেই বুঝে মারদেকা জামার ভেতর থেকে ধাতব টুকরোটা বের করল। এতদিন ধরে সে এটাকে নিজের জীবনের স্বাভাবিক অংশ বলে জেনে এসেছে। ছোটবেলায় কার কাছ থেকে পেয়েছিল, সে জানে না। তার গ্রামের মানুষও এ বিষয়ে তাকে কখনও স্পষ্ট কিছু বলেনি। কেউ বলেছিল এটা তার মায়ের জিনিস। কেউ বলেছিল তার বাবার কাছ থেকে এসেছে। কেউ আবার বলেছিল, তাকে যে রাতে পাওয়া গিয়েছিল, তার গলায় তখনই এটা ছিল।
আজ প্রথমবার টুকরোটার দিকে তাকিয়ে তার মনে হলো, হয়তো তার জীবন সম্পর্কে কেউই পুরো সত্য জানত না।
এলিয়াস বলল, “তোমার বাবার কোট থেকে পড়ে গিয়েছিল।”
“তুমি পেয়েছিলে কোথায়?”
“যেখানে তাকে শেষবার দেখেছিলাম।”
এইবার চারপাশের পাহাড় যেন আরও নিস্তব্ধ হয়ে গেল। মারদেকা ধীরে জিজ্ঞেস করল, “তুমি কি দেখেছিলে তাকে মরতে?”
এলিয়াসের উত্তর আসতে সময় লাগল। “পুরোটা না।” তার কণ্ঠ বদলে গেছে। “আমি দূরে ছিলাম। আমরা তখন আলাদা পথে চলছিলাম। আগুনের আলো দেখেছিলাম। গুলির শব্দ শুনেছিলাম। তারপর ঘোড়ার ছুটে যাওয়ার শব্দ।” সে চোখ বন্ধ করল না, কিন্তু তার দৃষ্টি যেন বহু বছর পেছনে চলে গেল। “আমি কাছে পৌঁছানোর আগেই সব শেষ।”
মারদেকার ঠোঁট শক্ত হয়ে গেল। “আর আমি?”
“তোমাকে দেখেছিলাম।” এইবার এলিয়াসের কথায় কোনো দ্বিধা ছিল না। “তুমি পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নিচে দৌড়াচ্ছিলে। তোমার পেছনে আগুন ছিল, ধোঁয়া ওড়ছিল। তুমি বারবার পড়ে যাচ্ছিলে, আবার উঠছিলে।”
মারদেকা স্থির হয়ে রইল। তার বুকের ভেতর কোথাও একটা পুরোনো অনুভূতি নড়ে উঠল, কিন্তু এবার সেটা কোনো অস্পষ্ট স্মৃতি নয়। একটা বাস্তব ছবির সঙ্গে বাস্তব কথার মিল। সে হয়তো আগুন দেখেছিল। গুলির শব্দ শুনেছিল। কেউ তাকে বলেছিল দৌড়াতে। আর সে দৌড়েছিল।
এলিয়াস বলল, “আমি তোমাকে ডাকিনি।”
মারদেকা তাকাল। “কেন?”
এলিয়াসের কণ্ঠ ভারী হয়ে গেল। “কারণ তোমার পেছনে লোক ছিল। আমি যদি তোমাকে ডাকতাম, তারা আমাকে দেখত। আর তোমাকেও।”
মারদেকা আবার হাঁটা শুরু করল। তার হাতে এখনও সেই কালচে ধাতব বস্তু । সে সেটাকে শক্ত করে ধরে আছে। এতদিন তার অতীত ছিল কুয়াশার মতো। এখন কুয়াশা পুরোপুরি সরে যায়নি, কিন্তু তার মধ্যে একটা পথ দেখা যাচ্ছে।
ড্যানিয়েল রিড। তার বাবা। তারপর সেই রাত। তারপর আগুন। তারপর একটি শব্দ। দৌড়াও।
তারা যখন শুকনো জলধারার কাছে পৌঁছাল, তখন পূর্ব দিগন্তের অন্ধকার সামান্য ফিকে হতে শুরু করেছে। রাত শেষ হতে এখনও সময় আছে, কিন্তু পাহাড়ের ওপর আকাশের রং বদলানোর প্রথম লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।
মারদেকা হঠাৎ থেমে গেল। সে হাত তুলে দুজনকে থামতে বলল। তারপর নিচু হয়ে বসে পড়ল। কিছুদূরে একটা পাথরের পাশে মাটি একটু নরম। সেখানে বুটের দাগ। চারজনের। একজনের বুটের গোড়ালির অংশ ভাঙা। সেই দাগের দিকে তাকিয়ে সে বলল, “ওরা এখান দিয়ে গেছে।”
এলিয়াস ধীরে তার পাশে এসে দাঁড়াল। “কোন দিকে?”
মারদেকা ডান দিকের ঢালের দিকে তাকাল। “আমাদের সামনে।”
লারসেন চারপাশে তাকাল। এটা খোলা জায়গা। বাঁ পাশে জলধারা, ডান দিকে পাথরের ঢাল, সামনে কিছু শুকনো গাছ।
হঠাৎ দূরে একটা কণ্ঠ ভেসে এল। “লারসেন!”
তিনজনই স্থির। কণ্ঠটা খুব জোরে বলা হয়নি। কিন্তু পাহাড়ের খোলা জায়গায় স্পষ্ট শোনা গেল।
লারসেনের মুখের পেশি শক্ত হয়ে উঠল। “ভিক্টর।” সে খুব নিচু স্বরে বলল।
দূর থেকে একটা হাসির শব্দ এল। তারপর সেই একই কণ্ঠ আবার শোনা গেল। “তুমি আমাকে এখনও চিনতে পারো, এটা জেনে ভালো লাগছে।”
মারদেকা পাথরের আড়ালে সরে গেল। লারসেন তার বিপরীত পাশে। এলিয়াস নিচু হয়ে জলধারার কিনারায় বসে পড়েছে। কণ্ঠটা কোথা থেকে আসছে, বোঝা কঠিন। পাহাড়ে শব্দ ঘুরে যায়।
লারসেন বলল, “তুমি তো মৃত ছিলে।”
দূর থেকে উত্তর এল। “মৃত মানুষকে খুঁজে পাওয়া কঠিন। এই সুবিধাটা আমার কাজে লেগেছে।” তারপর নীরবতা। কিছুক্ষণ পর আবার শোনা গেল। “তোমার সঙ্গে একটা পুরোনো হিসেব আছে, লারসেন। কিন্তু আজ আমি তোমার জন্য আসিনি।”
লারসেনের হাত পিস্তলের ওপর। “আমি জানি।”
দূরে আবার সেই হাসি। “ছেলেটা কোথায়?”
মারদেকার শরীরের ভেতর ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল। কিন্তু সে নড়ল না।
এলিয়াস উত্তর দিল না। ভিক্টরের কণ্ঠ আবার এল। “আমি তাকে একবার দেখতে চাই।”
লারসেনের উত্তর এবার পরিষ্কার। “তোমার চোখ দিয়ে নয়।”
তারপরই গুলিটা এলো। মারদেকা শুধু দেখল, তার মাথার ওপরের পাথরের একটা অংশ ভেঙে ধুলো হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে। লারসেন সঙ্গে সঙ্গে পাল্টা গুলি করল। তারপর চারদিক থেকে বন্দুকের শব্দ শুরু হলো।
মারদেকা পাথরের আড়ালে শরীর চেপে রাখল। যদিও এই মুহুর্তে তার কিছুই করার নেই। তার কোমরে ছুরি। চোখ আর কানই এখন তার সবচেয়ে বড় অস্ত্র।
একটা গুলি বাম দিক থেকে এসেছে। আরেকটা সামনে থেকে। মারদেকা চোখ বন্ধ না করেও হিসেব করতে লাগল। হঠাৎ সে লারসেনের দিকে ঝুঁকে বলল, “ডান দিকে একজন।”
লারসেন তাকাল। আরেকটা গুলি হলো। মারদেকা বলল, “অন্যজন নিচ দিয়ে ঘুরছে।”
লারসেন আর প্রশ্ন করল না। সে সঙ্গে সঙ্গে এলিয়াসের দিকে তাকাল। “ওদিকে যাও।”
এলিয়াস আহত পা নিয়ে নিচু হয়ে এগোল।
মারদেকা পাথরের আড়াল বদলাল। কয়েক মুহূর্ত আগে যে লোকটা নিচ দিয়ে ঘুরছিল, তার চলার শব্দ এবার স্পষ্ট। সে খুব সাবধানে এগোচ্ছে।
মারদেকা তাকে দেখতে পেল না। কিন্তু শুনতে পেল। একবার পাথর। তারপর বুট। তারপর কাপড়ের সঙ্গে ধাতব কিছুর ঠোকাঠুকি। সে নিচু হয়ে অপেক্ষা করল।
লোকটা আরেকটু কাছে আসতেই মারদেকা পাথরের ওপর থেকে একটা ছোট পাথর তুলে বিপরীত দিকে ছুড়ে দিল। পাথরটা গিয়ে লাগল শুকনো ঝোপে। লোকটা সঙ্গে সঙ্গে সেই দিকে ঘুরল।
ঠিক তখন মারদেকা অন্য পাশ দিয়ে বেরিয়ে এল। তার হাতে ছুরি। সে লোকটার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল না। লারসেন তাকে শিখিয়েছে, লড়াইয়ে শক্তি নষ্ট করা বোকামি। সে লোকটার পেছনে গিয়ে তার হাঁটুর পেছনে লাথি মারল। লোকটা নিচু হয়ে গেল। মারদেকা তার কাঁধে ধাক্কা দিল।
লোকটা পড়ে যাওয়ার আগেই হাত ঘুরিয়ে তাকে ধরতে চাইল। কিন্তু মারদেকা তার নাগালের বাইরে সরে গেল। তারপর ছুরির হাতল দিয়ে লোকটার কানের নিচে আঘাত করল। লোকটা মাটিতে পড়ে গেল।
তার রাইফেল একপাশে। মারদেকা সেটি তুলে নিল না। সে জানত না কীভাবে অস্ত্রটা ব্যবহার করতে হয়, তা নয়। কিন্তু এই মুহূর্তে তার হাতের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য জিনিস তার ছুরি।
দূরে আবার গুলি হলো। লারসেন পাথরের আড়াল থেকে বেরিয়ে পাল্টা গুলি করল, তারপর সঙ্গে সঙ্গে নিচু হয়ে গেল। ঠিক সেই মুহূর্তে ওপরের পাথরে রাইফেলের গুলি লেগে ধুলো উড়িয়ে দিল।
মারদেকা বুঝতে পারল, ভিক্টর কেইন নিজে এখনও গুলি চালায়নি, অথবা সে এমন জায়গায় আছে যেখান থেকে অন্যদের নির্দেশ দিচ্ছে।
হঠাৎ এলিয়াস একটা গুলির শব্দের সঙ্গে সঙ্গে কেঁপে উঠল। সে মাটিতে পড়ে গেল।
মারদেকা উঠে দাঁড়াতে যাচ্ছিল। লারসেন তাকে ধরে টেনে নিচে বসিয়ে দিল।
এলিয়াস নড়ছে। সে মৃত নয়। কিন্তু তার কাঁধের কাছে রক্ত ছড়িয়ে পড়ছে।
লারসেন দাঁত চেপে বলল, “ওকে এখান থেকে বের করতে হবে।”
মারদেকা চারপাশে তাকাল। সামনে খোলা জায়গা। পেছনে পাথর। বাঁ দিকে শুকনো জলধারা আরও নিচে নেমে গেছে। সে হাত তুলে দেখাল। জলধারার পাথরের নিচে একটা সরু অংশ। বর্ষার পানিতে কেটে তৈরি হওয়া গর্তের মতো জায়গা। মানুষ নিচু হয়ে যেতে পারবে। বাইরে থেকে সহজে দেখা যাবে না। “ওটা দিয়ে গেলে আমরা পেছনের ঢালে উঠতে পারব।”
লারসেন এক মুহূর্ত মারদেকার চোখের দিকে তাকাল। তারপর মাথা নেড়ে বলল, “এগিয়ে যাও।”
মারদেকা নিচু হয়ে জলধারার দিকে দৌড় দিল। তার পেছনে লারসেন। লারসেন একবার পেছনে গুলি করে শত্রুদের মাথা নিচু রাখতে বাধ্য করল। তারপর এলিয়াসের কাছে পৌঁছে তাকে কাঁধে তুলতে চেষ্টা করল।
মারদেকা এসে এলিয়াসের অন্য হাত নিজের কাঁধে নিল। তার শরীর ছোট, কিন্তু সে ভারসাম্য ধরে হাঁটতে জানে। তিনজন নিচের সরু জায়গা ধরে এগিয়ে গেল।
তাদের মাথার ওপর দিয়ে আবার গুলি গেল। তারপর আরও কয়েকটি।
মারদেকা সামনে এগিয়ে পথ দেখাচ্ছে। কোথাও পাথর উঁচু, কোথাও পানি জমে আছে। এলিয়াসের রক্ত মাটিতে পড়ছে, কিন্তু খুব বেশি নয়। তার কাঁধে গুলি লেগেছে, ভেতরে ঢুকেছে কি না বোঝা যাচ্ছে না।
কিছুদূর যাওয়ার পর গুলির শব্দ কমে এল। তারা পেছনের ঢালে উঠে পড়েছে। সেখান থেকে অনেক দূরে, পূর্ব আকাশে প্রথম আলো দেখা যাচ্ছে। পাহাড়ের চূড়াগুলো কালো থেকে ধূসর হয়ে উঠছে। রাতের শেষ প্রহর। কিন্তু তাদের পেছনে এখনও শত্রু আছে।
লারসেন এলিয়াসকে একটা পাথরের পাশে বসাল। নিজের কোট ছিঁড়ে তার ক্ষত শক্ত করে বেঁধে দিল।
মারদেকা একটু দূরে দাঁড়িয়ে চারপাশ শুনছিল। এই সময় এলিয়াস তার দিকে তাকাল। “এখন তোমার সবটা জানা দরকার।”
লারসেন হাতের কাজ থামাল না। মারদেকা এগিয়ে এল।
এলিয়াস ধীরে বলল, “ড্যানিয়েল রিড জানত ভিক্টর কেইন বিশ্বাসঘাতক। সে শুধু পথ বিক্রি করেনি। যারা আমাদের সাহায্য চাইত, তাদের তথ্যও বিক্রি করত। কয়েকজন মানুষ মারা যায় তার কারণে।”
তারপর সে কষ্ট করে শ্বাস নিল। “ড্যানিয়েল প্রমাণ জোগাড় করেছিল। এই চাকতিগুলোর সঙ্গে সেই প্রমাণের সম্পর্ক ছিল। কিছু পথ, কিছু নাম, আর এমন কিছু লোকের পরিচয়, যাদের কেইন তার নিজের লোক বলে ব্যবহার করত।”
লারসেন এবার কথা বলল। “ড্যানিয়েল আমাকে সব জানাতে পারেনি। কারণ তার আগেই কেইন খবর পেয়ে যায়। আমি তাকে সাবধান করেছিলাম। কিন্তু সে শুনেনি। তারপর আমি নিজের পথ বেছে নিলাম।”
এলিয়াস বলল। “অনেক বছর পর সেই রাতে আগুন জ্বলে উঠে। তোমার বাবা মারা যায়। আর তুমি পালিয়ে যাও।” সে নিচের দিকে তাকাল। “আমি এতদিন ভেবেছিলাম তুমি মারা গেছ। এখন কেইন জানে তুমি বেঁচে আছ।” তার চোখে ক্লান্তির সঙ্গে একটা অদ্ভুত কঠোরতা দেখা গেল।
দূর থেকে ঘোড়ার শব্দ ভেসে এল। তিনজনই মাথা তুলল। ঘোড়াগুলো দূরে। সম্ভবত শত্রুরা নিচের পথে ঘুরে গেছে। পাহাড় থেকে বের হওয়ার আরও একটা রাস্তা আছে, এবং তারা জানে লারসেনরা কোন দিকে যেতে পারে।
লারসেন উঠে দাঁড়াল। তার নিজের হাতের ক্ষত আবার খুলে রক্ত বেরিয়েছে, কিন্তু সে সেদিকে তাকাল না। “আমাদের এখান থেকে বের হতে হবে।”
মারদেকা বলল, “ওরা আমাদের পেছনে আসবে।”
লারসেন উত্তর দিল। “আর আমরা পাহাড় থেকে বের হব।”
এলিয়াস ধীরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করল। মারদেকা তাকে সাহায্য করল।
তারা যখন আবার চলতে শুরু করল, তখন পাহাড়ের ওপর সূর্যের প্রথম আলো পড়েছে। রাতের অন্ধকারে যে জায়গাগুলো এতক্ষণ শুধু ছায়া ছিল, এখন সেগুলো পাথর, গাছ আর খাদের বাস্তব রূপ নিয়ে সামনে দেখা যাচ্ছে।
পাহাড়ের শেষ ঢালে পৌঁছে মারদেকা একবার পেছনে তাকাল। দূরের উঁচু পাথরের ওপর কয়েকটি ঘোড়সওয়ারের অবয়ব দেখা গেল। তারা এত দূরে যে মুখ চেনা যায় না। কিন্তু তাদের মধ্যে একজন অন্যদের থেকে সামান্য সামনে। সে স্থির হয়ে বসে আছে।
মারদেকা জানত না, সে ভিক্টর কেইন কি না। কিন্তু তার মনে হলো, সেই মানুষটাও নিচের দিকে তাকিয়ে আছে। তার দিকে।
লারসেন মারদেকার কাঁধে হাত রাখল। “চলো।”
মারদেকা আর পেছনে তাকাল না। সে সামনে হাঁটা শুরু করল। পাহাড়ের পথ এবার নিচের দিকে নেমে গেছে। অনেক দূরে, সেই পাহাড়ের পেছনে অপেক্ষা করছে খোলা প্রান্তর, রাস্তা, ঘোড়া, আর লারসেনের র্যাঞ্চ।
কিন্তু এখন সে জানে, র্যাঞ্চে ফিরে যাওয়া মানে নিরাপদ জায়গায় ফিরে যাওয়া নয়। শত্রু তাদের পথ চিনে ফেলেছে।
ভিক্টর কেইন বেঁচে আছে। সে জানে ড্যানিয়েল রিডের ছেলে বেঁচে আছে।
প্রায় ছয় বছর আগে যে সাত বছরের ছেলেটি আগুন আর গুলির শব্দের মধ্যে পাহাড়ের অন্ধকার পথে দৌড়ে পালিয়েছিল, সে আজ আবার সেই পাহাড় ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এবার সে পালাচ্ছে না। এবার সে জানে, কে তার শত্রু।
(চলবে)7 Comments -
আমি মানুষের ভীড়ে মানুষ খোঁজে ফিরি

বিষণ্ন সুমন
ডিজাইনার
স্কুল বয়েস থেকেই লিখালিখা করি। যদিও পড়ি তার আগে থেকেই। আমি বিশ্বাস করি, ভালো লিখতে হলে আগে ভালো পড়তে জানতে হবে। তাই এখন পর্যন্ত নিজেকে লেখক না ভেবে ভালো পাঠক হিসেবেই পরিচয় দিতে সাচ্ছন্দ্য বোধ করি। প্রথম প্রকাশিত বই সেই ১৯৯৬ সালের গ্রন্থমেলায় “কে বলে তুমি নেই” রোমান্টিক উপন্যাস এবং সম্পূর্ণ মৌলিক ওয়েস্টার্ণ “লোন রাইডার”। পরবর্তীতে ২০১২ সালের বই মেলায় অন্যপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত গল্প সংকলন। মাঝে banglanews24.com এর সাহিত্যপাতায় নিয়োমিত লিখেছি। আসলে আমি লেখায় কখনোই অনর্গল নই। মাঝেমাঝেই বন্ধাত্ব্য এসে আমায় থামিয়ে রাখে। একটা শব্দও লিখতে পারিনা। তখন আমার পুরনো লিখাগুলো নিজেই পাঠক হয়ে পড়ি আর ভাবি, এ গুলো কি সত্যিই আমি লিখেছিলাম(?)। এই ৫৪ বছর বয়সে এসেও এই একটাই প্রশ্ন নিজেকে করে যাচ্ছি প্রতিনিয়ত।
Friends
মেহেদী মারুফ
@maruf1
Redowan Hussain
@redowanhussain
ডা.এম.এইচ.রহমান খান
@drmhrahmankhan
Hashem Molla
@hashemmolla
Nusrat jahan
@shuha
রুবেল দে
@alexrubel630
Afra Anjum
@afraanjum
Sk Sagor
@sksagor
, মিঠুন কুমার ঘোষ
@mkghosh


‘তার নাম ছিল ড্যানিয়েল রিড’ — অবশেষে মারদেকার বাবার নাম জানা গেলো!