-
অবহেলা নাকি ঋণ??
নাজনীন শামীম
চট্টগ্রাম থেকে
৪ঠা সেপ্টেম্বর ২৯২৬ ইং(রশিদ সাহেব মঞ্চের মাঝখানে চশমা মুছে চোখে পরেন। হাতে পুরনো ডায়েরি। সোহেল পাশে দাঁড়িয়ে ঘড়ি দেখছে।)
সোহেল: বাবা, আর কতক্ষণ? ট্যাক্সি নিচে দাঁড়িয়ে আছে। তোমার জিনিসপত্র সব নেওয়া হয়েছে তো?
রশিদ সাহেব: হ্যাঁ রে বাবা, সব নিয়েছি। শুধু… তুই যে ক্লাস ফাইভে ফার্স্ট হয়ে যে খেলনা গাড়িটা পেয়েছিলি, সেটা ডায়েরির খাঁজে রেখেছিলাম, ওটা পাই না রে।
সোহেল: ওসব জঞ্জাল নিয়ে লাভ কী? যেখানে যাচ্ছ, সেখানে ওসব রাখার জায়গা নেই। আর কতবার বলব, রিমা আর আমি দুজনেই জব করি। বাচ্চাটার স্কুল, আমাদের অফিস… তোমাকে দেখার মতো সময় কারো নেই। ‘শান্তিনিকেতন বৃদ্ধাশ্রম’ কিন্তু অনেক ভালো জায়গা, কত তোমার বয়সী মানুষ আছে সেখানে!
রশিদ সাহেব: আমি কি কিছু বলেছি বাবা? তুই এত ব্যতিব্যস্ত হচ্ছিস কেন? তোদের তো কষ্ট দিতে চাইনি কখনো। তোর মায়ের মৃত্যুর পর এই বাড়িটা বড় একা লাগত। সেখানে গেলে যদি চারটে কথা বলার মানুষ পাই, সে তো ভালোই।
(সোহেল দূরে সরে গিয়ে ফোনে কথা বলতে শুরু করে। রশিদ সাহেব ধীরপায়ে দর্শকের দিকে এগিয়ে আসেন।)
রশিদ সাহেব: আজ থেকে ত্রিশ বছর আগে… ঠিক এইরকম একটা বৃষ্টির দিনে সোহেলের খুব তেজ জ্বর হয়েছিল। ডাক্তারের ফি দেওয়ার মতো টাকা আমার পকেটে ছিল না। নিজের একমাত্র শীতের কোটটা বিক্রি করে ওষুধ কিনে এনেছিলাম। সেদিন ওর গায়ে হাত দিয়ে রাতে ঘুমাতে পারিনি, ভাবতাম—আমার ছেলেটার যদি কিছু হয়ে যায়, আমি বাঁচব কীভাবে?
(একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলেন)
আজ সেই ছেলে বড় হয়েছে। অনেক বড়। এত বড় হয়েছে যে, তার বিশাল ফ্ল্যাটে আমার এই বুড়ো শরীরটার জন্য কয়েক স্কয়ার ফিট জায়গা আর কুলোচ্ছে না।
সোহেল: বাবা! চলো, দেরি হয়ে যাচ্ছে। ড্রাইভার মিটার চালু করে দিয়েছে।
রশিদ সাহেব: চল বাবা। কিন্তু একটা কথা বলবি?
সোহেল: কী কথা? তাড়াতাড়ি বলো!
রশিদ সাহেব: তোকে যখন ছোটবেলায় হাঁটা শেখাতাম, তুই বারবার পড়ে যেতি। আমি কিন্তু কখনো তোকে ফেলে রেখে কোথাও চলে যাইনি রে। তোর হাতটা ধরে বসে থাকতাম…
সোহেল: যুগের সাথে সব পাল্টায় বাবা। চলো এখন।
(রশিদ সাহেব পকেট থেকে একটি খাম বের করে সোহেলের দিকে বাড়িয়ে দেন।)
রশিদ সাহেব: এটা নে। বৃদ্ধাশ্রমের প্রথম ছয় মাসের টাকার চেক।
সোহেল: মানে? এ টাকা তুমি কোথায় পেলে? আর তুমি কেন দিচ্ছ?
রশিদ সাহেব: তোর মা মারা যাওয়ার পর আমার পেনশনের জমানো টাকাটা তোদের না জানিয়ে একটা ফিক্সড ডিপোজিট করেছিলাম।
(সোহেল খাম খোলে, ভেতরে টাকার সাথে একটা চিরকুট দেখে।)
রশিদ সাহেব: চিরকুটে কী লিখেছি জানিস? লিখেছি— ‘বাবা সোহেল, তুই তো বলতিস আমার দায়িত্ব নিতে তোর সংসারে টান পড়ছে। তাই আমার থাকার খরচটা আমি নিজেই দিয়ে গেলাম। কিন্তু যদি কোনোদিন তোর মনে হয়, আমার সাথে পাঁচ মিনিট গল্প করবি… তার জন্য কিন্তু আমি তোকে কোনো টাকা দেব না। ওটা একদম বিনামূল্যে পাবি রে বাবা। তুই শুধু একবার এসে আমাকে ‘বাবা’ বলে ডাকিস…’
(রশিদ সাহেবের চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে। তিনি ব্যাগটা তুলে নিয়ে ধীরপায়ে অন্ধকারের দিকে হাঁটতে থাকেন।)
রশিদ সাহেব: ভালো থাকিস বাবা… তোরা সবাই খুব ভালো থাকিস…
(রশিদ সাহেব অন্ধকারে মিলিয়ে যান। সোহেল হাত থেকে খাম ফেলে দিয়ে মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে মুখ ঢেকে ফেলে।)8 Comments-
-
রশিদ সাহেবের এই আবেগঘন বয়ানটি পাঠ করার সময় প্রতিটি দৃশ্য যেন চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে ধরা দিয়েছে, বিশেষ করে বাবার নিঃস্বার্থ ভালোবাসার সেই স্মৃতিগুলো মনকে দারুণভাবে ছুঁয়ে গেছে। আপনি যদি এই প্ল্যাটফর্মের অন্যদের লেখাতেও নিয়মিত ভালোবাসা ও মতামত জানান, তবে আমাদের এই পুরো পরিবারটি অনেক বেশি প্রাণবন্ত ও সুন্দর হয়ে উঠবে।
-
-
Friends
Zahidul Jamy
@zahidul
মোঃ বায়েজীদ
@bayejid
ঈশিতা ঈরু
@eshitabiswaseru15
Shojan Maria Shoche
@shojanmaria
সিরাজুল ইসলাম
@sherajulislam
Santo Mon
@santomon
Ariba Mehzabin Yeana
@aribamehzabin
Md. Jahangir Alam
@md-jahangiralam
Nusrat jahan Sadia
@nusratjahansadia


বিনামূল্যে পাওয়া “বাবা” ডাকটাই থেকে যায় জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান প্রাপ্তি…..🤍🖤