-
কালাদানের শেষ ক্যানভাস
নাফ নদীর শেষ বাঁকে যখন বিকেলের আলো সোনালি থেকে রক্তিম হয়ে আসছিল, তখন সিতওয়ের সীমান্ত লাগোয়া এক মলিন হাসপাতালের এক চিলতে বারান্দায় শুয়ে ছিলেন আমিনা। তার কোলের ওপর রাখা ছিল একটি পুরনো, মোড়ক উঠে যাওয়া ডায়েরি। সেই ডায়েরির পাতায় রেখায় রেখায় আঁকা ছিল আকিয়াবের পাহাড়, কালাদান নদীর জল আর একজোড়া চেনা অক্ষরের রেখা।
তিনি দীর্ঘদিন ধরে দূরারোগ্য ব্যাধিতে ভুগছেন। ২০১৭ সালের বাস্তুচ্যুতির পর উখিয়ার শরণার্থী শিবিরের ধূসর দিনগুলো পেরিয়ে, জীবনের একদম শেষপ্রান্তে এসে চিকিৎসার তাগিদে গোপনে তাকে নিয়ে আসা হয়েছিল রাখাইনের এই সীমান্তে। ২০২৩ সালের সেই অভিশপ্ত অক্টোবরে, যখন ওপারে আর এপারে নতুন করে রক্তের হোলি খেলা আর বারুদের গন্ধে বাতাস বিষাক্ত হয়ে উঠেছিল, তখন তিনি পাশে বসে থাকা বৃদ্ধ ভাইকে বলেছিলেন, “আমার নিশ্চিত মনে হচ্ছে—যে শান্তি ও স্বদেশ আমরা হারিয়ে ফেলেছি, তা আর কোনোদিন ফিরে আসবে না।”
পাহাড়ে পাহাড়ে তখন নতুন করে যুদ্ধের দামামা। নাগরিকত্বহীনতার তকমা গায়ে জড়িয়ে এক জেনারেশন থেকে আরেক জেনারেশন ধুঁকে ধুঁকে মরছে। আমিনা রোজ খবরের কাগজের ছেঁড়া পাতায় আর রেডিওর তরঙ্গে চোখ-কান রাখতেন। কতজন নাফ নদী পার হতে গিয়ে তলিয়ে গেল, কতজনের ঘর পুড়ল—প্রতিটি পরিসংখ্যানের হিসাব তার মুখস্থ ছিল। তিনি বুঝতে পারছিলেন তার নিজের সময় ঘনিয়ে আসছে, আর চোখের সামনে ধূলিসাৎ হতে দেখছিলেন দুই পাড়ের শান্তির সমস্ত স্বপ্ন।
আশির দশকের মাঝামাঝি সিতওয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ছিল এক জটিল টানাপোড়েনের কেন্দ্রবিন্দু। একদিকে বার্মিজ সামরিক শাসনের কঠিন নজরদারি, অন্যদিকে রাখাইন ও রোহিঙ্গা শিক্ষার্থীদের মাঝে ভেতরে ভেতরে গড়ে ওঠা এক অলিখিত দেয়াল। আমিনা ছিলেন বটানি বিভাগের রোহিঙ্গা ছাত্রী। সেশনের বিরতিতে যখন বুদ্ধমূর্তির পাদদেশে অর্কিডের সুবাস ভাসত, তখন রাখাইন যুবক থান কিউ ক্যানভাসে তুলে ধরত কালাদান নদীর রূপালী জলধারা। বর্ষায় এর জল হয়ে উঠত মেঘলা ও ক্ষুব্ধ, আর হেমন্তে শান্ত, দর্পণের মতো পরিষ্কার। নদীর কূলে ফোটা বুনো কাশফুল আর সবুজ পাহাড়ের গায়ে ঝুলে থাকা কুয়াশার চাদর ক্যানভাসে ফুটিয়ে তুলে থান কিউ বলত, “আমিনা, প্রকৃতির কোনো নাগরিকত্ব লাগে না। এই নদী যেমন পাহাড় থেকে নেমে সাগরে মেশার সময় কোনো সীমারেখা বোঝে না, ভালোবাসাও তো তেমনই।”
কিন্তু সমাজ সে উদারতা মেনে নেয়নি। তাদের এই সম্পর্কের কথা জানাজানি হতেই নেমে এসেছিল ঘোর অমাবস্যা। নিজ সমাজ থেকেই থান কিউকে শুনতে হয়েছিল ‘জাতীয় গর্দভ’ ও ‘জাতির কলঙ্ক’-এর মতো অপমানজনক অপবাদ—যে নিজের ধর্মের ও জাতির স্বার্থ না বুঝে এক “মস্ত বড় বোকামি” করছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাকে বহিষ্কারের হুমকি দিয়েছিল। অন্যদিকে আমিনার রক্ষণশীল পরিবার ও সমাজও ভয় পেয়েছিল সামরিক জান্তার সম্ভাব্য প্রতিশোধের। দুজনকেই টেনে আনা হয়েছিল নিজ নিজ সামাজিক খাঁচায়।
তারপর এলো সেই নির্মম বিচ্ছিন্নতা। রাষ্ট্রের আইনি চক্রান্তে আমিনার পরিবারের ওপর নেমে এলো নাগরিকত্ব হরণের কুঠারাঘাত। ২০১৭ সালের রাতের আঁধারে গ্রামের ওপর হামলা হলে আমিনার পরিবারকে বাধ্য হয়ে ঘরছাড়তে হয়। তারা ভেসে গেলেন বাস্তুচ্যুত মানুষের ঢলে—নাফ নদী পার হয়ে বাংলাদেশের শরণার্থী শিবিরে। অন্যদিকে, জান্তা সরকারের রোষানল আর অন্ধ জাতীয়তাবাদের তাড়া খেয়ে একসময় থাইল্যান্ড সীমান্তের গহীন পাহাড়ে আত্মগোপন করতে বাধ্য হয়েছিল থান কিউ। তারপর আর কোনো খবর নেই; ক্যানভাস বাঁচানোর লড়াইয়ে সে সীমান্তের যুদ্ধের মাঝে হারিয়ে গেল, নাকি নিঃশব্দে শহীদ হলো—তা চিরতরে অজানাই রয়ে গেল।জীবনের শেষ দিনগুলোর বেশ কিছুটা সময় আমিনার কাটছিল রাখাইনের সেই সীমান্ত হাসপাতালে। এক বিকেলে হাসপাতালের সাদা করিডোরে ধীরে ধীরে চাউর হয়ে গিয়েছিল যে, সিতওয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই বিখ্যাত প্রেমকাহিনীর ‘সেই রোহিঙ্গা কন্যা’ আজ এই হাসপাতালের বেডে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছেন। হাসপাতালে কর্মরত তরুণ বার্মিজ ও রাখাইন নার্সরা বিশ্বাসই করতে পারছিল না। জাতিগত ঘৃণা, হিংসা আর আন্তর্জাতিক রাজনীতির জটিল সমীকরণের ঊর্ধ্বে উঠে, এককালে আরাকানের পাহাড়ি উপত্যকায় সাড়া জাগানো সেই রক্তমাংসের নায়িকাকে চোখের সামনে দেখে আক্ষরিক অর্থেই বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গিয়েছিল তারা।
বাইরে তখন কালাদান ও নাফ নদীর মোহনায় ভাটার টান। দুই সম্প্রদায়ের প্রথা, সীমান্ত আর রাষ্ট্র যাকে বর্জন করে গৃহহীন করেছিল—সেই মানুষটি নিজের জন্মভূমির মাটিতে দাঁড়িয়েই জীবনের শেষ নিঃশ্বাস ফেলার মুখে রেখে গেলেন এক হারিয়ে যাওয়া ভালোবাসার ইতিহাস, যা কোনো সীমান্ত বা নাগরিকত্বের সংজ্ঞায় বন্দি করা যায় না।
4 Comments
Friends
সিরাজুল ইসলাম
@sherajulislam
TOUHIDUL ISLAM
@touhidulislam
নাদিরা মোস্তারী শিখা
@nadiramostarishikha
Foyzur Khan
@foyzur-khan
সালমান সাদিক
@salmansadique
Humayra Archives
@nurhumayra
Borno
@borno1
শারমিন আক্তার
@sarmin
মোহাম্মদ নোমান
@nomankhalovi


সীমান্ত-জাতীয়তার সব দেয়াল ভেঙেও ভালোবাসা রয়ে যায় ইতিহাসের সবচেয়ে অবিনশ্বর ক্যানভাস…..🤍🖤