Profile Photo

বিষণ্ন সুমনOffline

  • logolabbd
  • Profile picture of বিষণ্ন সুমন

    বিষণ্ন সুমন

    1 day, 7 hours ago

    সীমানা পেরিয়ে
    (পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ)

    অধ্যায় ২৭
    পাহাড়ের শেষ ঢালটা পেছনে ফেলে খোলা প্রান্তরের দিকে নামতে নামতে মারদেকার মনে হলো, অনেক দিন পর সে আবার আকাশকে পুরোটা দেখতে পাচ্ছে। গত কয়েকদিন ধরে পাহাড়ের মধ্যে আকাশ যেন সবসময় কোনো না কোনো পাথরের কিনারা, খাড়া দেয়াল কিংবা কালো চূড়ার আড়ালে কেটে গেছে। কোথাও সরু গিরিখাতের ওপরে একফালি নীল দেখা গেছে, কোথাও রাতের আকাশ এত কাছাকাছি মনে হয়েছে যেন হাত বাড়ালেই তারাগুলো ছুঁয়ে ফেলা যাবে। কিন্তু এখানে এসে সেই বন্ধ অনুভূতিটা হঠাৎ মিলিয়ে গেল। সামনে যতদূর চোখ যায়, ঘাসে ঢাকা প্রান্তর ছড়িয়ে আছে।

    তাদের পেছনে পাহাড় দাঁড়িয়ে আছে। সূর্যের আলো এখনও পুরোপুরি তার ঢালে পৌঁছায়নি। চূড়াগুলো গাঢ় ধূসর, নিচের গিরিখাতগুলো কালো। সেই পাহাড়ের ভেতরে তারা রেখে এসেছে বহু বছরের পুরোনো আশ্রয়স্থল, আগুনের স্মৃতি, গুলির শব্দ, কালো ধাতব চাকতি, বিশ্বাসঘাতকতা এবং এমন এক রাতের সত্য, যার কথা মারদেকা এতদিন জানত না।

    এখন সে জানে। তার বাবার নাম ছিল ড্যানিয়েল রিড। সে জানে, তার বাবা একজন পথচেনা মানুষ ছিল। তার বাবা এমন এক সত্য জেনে ফেলেছিল, যে সত্য জানার মূল্য তাকে জীবন দিয়ে দিতে হয়েছিল। বহু বছর আগে আগুন আর গুলির শব্দের মধ্যে তার বাবা তাকে এই কথাটাই বলেছিল। দৌড়াও। সে দৌড়েছিল। তারপর ড্যানিয়েল রিড মারা গিয়েছিল।

    মারদেকা মুখ তুলে একবার পাহাড়ের দিকে তাকাল। দূর থেকে পাহাড়কে এখন শান্ত দেখাচ্ছে। সেখানে কোনো গুলির শব্দ নেই, কোনো মানুষকে দেখা যাচ্ছে না, কোনো ঘোড়ার ছুটে চলার আওয়াজও নেই। তার সামনে তখন প্রান্তর। আর প্রান্তরের ওপারে তার নতুন ঘর।

    লারসেন ধীরে ধীরে হাঁটছিল তার পেছনে। পাহাড় থেকে বেরিয়ে আসার পর তার হাঁটার মধ্যে ক্লান্তি স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল, যদিও সে তা প্রকাশ করার চেষ্টা করছিল না। ডান হাতের ক্ষত শুকিয়ে আবার শক্ত হয়ে গেছে, কিন্তু কাপড়ের ওপর কালচে রক্তের দাগ দেখা যাচ্ছে। তার মুখ ধুলোয় ঢাকা, চোখের নিচে ক্লান্তির ছায়া। তবু তার দুই চোখ এখনও আগের মতোই সতর্ক।

    এলিয়াস আরও ধীরে চলছিল। তার কাঁধের ক্ষত থেকে আর খুব বেশি রক্ত বেরোচ্ছিল না। পাহাড়ের শেষ ঢালে বসে লারসেন যে বাঁধন দিয়েছিল, সেটা এখনও শক্ত আছে। কিন্তু তার মুখের রং ফ্যাকাশে। কয়েকবার সে থেমেছে, তারপর আবার হাঁটা শুরু করেছে। মারদেকা তার পাশে যেতে চাইলে সে হাত তুলে তাকে থামিয়েছে।

    একটা সময় প্রান্তরের ওপর দিয়ে বাতাস বয়ে গেল। শুকনো ঘাস একসঙ্গে দুলে উঠল। দূরে কোথাও গবাদি পশুর ঘণ্টার শব্দ ভেসে এল।

    মারদেকা থেমে গেল। তার চোখ সরু হয়ে এল। অনেক দূরে, সকালের আলোয় একটা সরু রেখা দেখা যাচ্ছে। প্রথমে মনে হলো, মাটির ওপর সূর্যের আলো পড়েছে। তারপর ধীরে ধীরে রেখাটা স্পষ্ট হলো। কাঠের বেড়া। তারও ওপারে কিছু গাছ। আর আরও দূরে কয়েকটি কাঠের ঘরের ছাদ।

    মারদেকার বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা অনুভূতি জেগে উঠল। সে এই দৃশ্য বহুবার দেখেছে। সকালে ঘুম থেকে উঠে আস্তাবলের সামনে দাঁড়িয়ে। সন্ধ্যায় কাজ শেষে। কিন্তু আজ দৃশ্যটা অন্যরকম। এতদিন সে এই জায়গাটাকে লারসেনের র‌্যাঞ্চ বলে চিনত। আজ প্রথমবার তার মনে হলো, জায়গাটা শুধু লারসেনের নয়। এখানে তারও কিছু আছে।

    কাঠের সেই বাড়ি, যেখানে ইলাই খাবার নিয়ে বকাঝকা করে। আস্তাবলের সামনে যেখানে বাড কাজ করতে করতে কাউকে না তাকিয়েই চিনে ফেলে। খোলা জায়গা যেখানে ক্লে মরগান কখনও কখনও ঘোড়ার লাগাম হাতে দাঁড়িয়ে থাকে, মুখে এমন ভাব যেন পৃথিবীর কোনো মানুষই তাকে সন্তুষ্ট করতে পারে না। হ্যাঙ্কের ভারী পায়ের শব্দ। মিগুয়েলের হাসি। রুবেন কোলের চোখ, যে হাসতে হাসতে এমন কথা বলে বসে, যার অর্থ পরে গিয়ে বোঝা যায়। এসব মানুষ তার জন্মের সঙ্গে যুক্ত নয়। কেউ তার রক্তের সম্পর্কের নয়।

    তবু পাহাড় থেকে ফিরে আসার পর দূরে র‌্যাঞ্চের ছাদগুলো দেখে তার মনে হলো, সে বাড়ি ফিরছে। ঠিক সেই মুহূর্তে দূরের কাঠের বেড়ার কাছে একটা নড়াচড়া দেখা গেল।

    কেউ পাহারা দিচ্ছিল। লোকটা প্রথমে তিনজনকে দেখে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর সে দ্রুত ঘুরে দৌড় দিল। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে র‌্যাঞ্চের ভেতরে নড়াচড়া শুরু হলো। কেউ আস্তাবল থেকে বেরিয়ে এল। তারপর কাঠের বাড়ির সামনের দরজা খুলে গেল।

    প্রথম যে মানুষটা তাদের দিকে এগিয়ে এল, তাকে দেখে মারদেকার মনে হলো, সে হয়তো সবসময়ই এভাবেই হাঁটে, দ্রুত কিন্তু অযথা দৌড়ায় না। বাড হিগিন্স। তার মাথায় পুরোনো টুপি, গায়ে ধুলো মাখা কাজের জামা। সে কয়েক মুহূর্ত দূর থেকেই তিনজনকে দেখল। তারপর তার চোখ প্রথমে গিয়ে থামল লারসেনের হাতে। তারপর এলিয়াসের কাঁধে। তারপর মারদেকার মুখে। সে এগিয়ে এসে প্রথমে লারসেনের দিকে তাকাল। “আপনাদের দেখে মনে হচ্ছে পাহাড়ের বেড়ানোটা তেমন উপভোগ্য হয়নি।”

    লারসেনের ঠোঁটের কোণে ক্লান্ত একটা হাসি দেখা গেল। “জায়গাটা মোটেও ভালো নয়।”

    বাড এবার এলিয়াসের দিকে তাকাল। তার মুখের ভাব বদলে গেল। “এ লোকটা কে?”

    “পুরোনো বন্ধু।” লারসেন বলল।

    বাড আর কোনো প্রশ্ন করল না। তার চোখ একবার এলিয়াসের ক্ষতের ওপর গেল। তারপর সে পেছনের দিকে তাকিয়ে গলা তুলল। “দুজন লোক নিয়ে এসো। আর ইলাইকে বলো, গরম পানি আর পরিষ্কার কাপড় লাগবে।”

    তারপর সে মারদেকার দিকে তাকাল। কয়েক মুহূর্তের জন্য দুজনের চোখ মিলল। বাড সম্ভবত বুঝতে পারছিল না পাহাড়ে কী ঘটেছে। কিন্তু সে এটুকু বুঝতে পারছিল, যে ছেলেটাকে সে কয়েকদিন আগে পাহাড়ের পথে যেতে দেখেছিল, সে আর আগের মতো নেই। “তুমি ঠিক আছ?”

    মারদেকা উত্তর দেওয়ার আগে একটু সময় নিল। “আছি।”

    বাড মাথা নেড়ে বলল, “ভালো।”

    ঠিক তখনই কাঠের বাড়ির দিক থেকে একটা পরিচিত কণ্ঠ ভেসে এল। “মারদেকা!”

    ছেলেটা মাথা ঘুরিয়ে তাকাল। ইলাই প্রায় দৌড়ে আসছে। তার বয়স হয়েছে, হাঁটার সময় মাঝে মাঝে কোমর একটু ঝুঁকে যায়, কিন্তু এখন সেসবের কোনো লক্ষণ নেই। সে দ্রুত এগিয়ে এসে মারদেকার সামনে থামল। কয়েক মুহূর্ত যেন কিছু বলতে পারল না। তার চোখে প্রথমে রাগ দেখা গেল। তারপর স্বস্তি। “তোমাকে কি বলেছিলাম পাহাড়ে গিয়ে পাথরের সঙ্গে মারামারি করতে?”

    মারদেকা কিছু বলল না।

    ইলাই তার জামার ধুলো দেখল, মুখের ছোট আঁচড় দেখল, তারপর মাথা নাড়ল। “আমি যে খাবার দিয়েছিলাম। খেয়েছ?”

    এই প্রশ্ন শুনে মারদেকা কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তার মনে হলো, বুকের ভেতর কোথাও জমে থাকা শক্ত কিছু সামান্য নরম হয়ে গেল। সে মাথা নেড়ে বলল, “খেয়েছি।”

    ইলাই সন্দেহের চোখে তাকাল। “মিথ্যা বলছ।” তারপর সে নিজেই বলল, “ভেতরে যাও। পরে কথা হবে।”

    এলিয়াসকে দুইজন লোক ধরে বাড়ির দিকে নিয়ে গেল। লারসেন তার সঙ্গে হাঁটছিল।

    মারদেকা কিছুক্ষণ উঠোনে দাঁড়িয়ে রইল। চারপাশের পরিচিত দৃশ্যগুলো সে নতুন করে দেখতে লাগল। আস্তাবলের সামনে বাঁধা কয়েকটি ঘোড়া কান খাড়া করে তাদের দিকে তাকিয়ে আছে। দূরে গবাদি পশুর ঘেরের পাশে দুজন মানুষ কাজ করছে। কাঠের বেড়ার ওপর সকালের রোদ পড়েছে। বাতাসে শুকনো ঘাস, পশু আর ভেজা মাটির মিশ্র গন্ধ।

    তবু মারদেকা জানত, এই র‌্যাঞ্চ আর আগের মতো নেই। পাহাড়ের ছায়া তাদের সঙ্গে ফিরে এসেছে।

    কিছুক্ষণ পর ক্লে মরগান ঘোড়ার ঘেরের দিক থেকে এগিয়ে এল। আগের মতোই তার কোমরে দুটি কোল্ট। মুখে সেই কঠিন ভাব। সে লারসেনকে একবার দেখে নিল, তারপর এলিয়াসকে বাড়ির দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে দেখে ভ্রু কুঁচকাল। তারপর মারদেকার দিকে তাকাল। “তুমি তো বলেছিলে পাহাড়ে যাচ্ছ।”

    মারদেকা বলল, “গিয়েছিলাম।”

    ক্লে কিছুক্ষণ তাকে দেখে বললো। “পরেরবার যাওয়ার আগে আমাকে বলবে।” তারপর নিজেই ঘুরে চলে গেল।

    মারদেকা তাকে চলে যেতে দেখল। এই মানুষটার কথাগুলো এখন আর আগের মতো শীতল মনে হয় না।

    একটু পর হ্যাঙ্ক ডসনকে দেখা গেল বাড়ির ছাদের পাশে উঠে দাঁড়াতে। বিশালদেহী মানুষটা কাঁধে উইনচেস্টার নিয়ে দূরের পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে আছে। সে লারসেনকে ফিরে আসতে দেখেছে, আহত অবস্থাও দেখেছে। এতটুকুই তার জন্য যথেষ্ট। তারপর থেকে পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে থাকা তার কাজ।

    মিগুয়েলও বেশি সময় র‌্যাঞ্চে দাঁড়িয়ে রইল না। সে প্রথমে সেই পথের দিকে গেল যেদিক দিয়ে লারসেনরা এসেছে। তারপর হাঁটু গেড়ে বসে মাটির দাগ পরীক্ষা করতে লাগল।

    রুবেন কোল বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে সব দেখছিল। তার চোখে আগের মতো হাসির আভাস আছে, কিন্তু মুখের ভাব এবার অনেক বেশি চিন্তিত।

    লারসেন তাকে দেখেই বলল, “ব্ল্যাক রিভারের খবর কি?”

    রুবেন মাথা নেড়ে বলল, “ভেতরে গিয়ে বলব।”

    বাড়ির ভেতরে ঢুকতেই মারদেকা পরিচিত কাঠের গন্ধ পেল। দেয়াল, মেঝে, পুরোনো আসবাব, রান্নাঘরের দিক থেকে আসা ধোঁয়ার গন্ধ, সবকিছুই তার চেনা। সে কয়েক মুহূর্ত দরজার পাশে দাঁড়িয়ে রইল।

    ইলাই তাকে বসতে বলল। তারপর কোনো সুযোগ না দিয়েই সামনে একটা বড় মগে গরম পানীয় রেখে দিল। “ধীরে খাবে।”

    মারদেকা মগটার দিকে তাকিয়ে রইল।

    ইলাই এবার তার সামনে একটা প্লেট রাখল। “এটাও খাবে।”

    মারদেকা বলল, “আমার ক্ষুধা নেই।”

    ইলাই তার দিকে এমনভাবে তাকাল, যেন এই কথার কোনো মূল্য নেই। “খাবে বলেছি।”

    মারদেকা আর তর্ক করল না। খেতে শুরু করার পর সে বুঝতে পারল, সত্যিই তার ক্ষুধা ছিল। শরীরের ক্লান্তি এতক্ষণ যেন তাকে ক্ষুধার কথা বুঝতেই দেয়নি।

    লারসেন কিছুক্ষণ পর ঘরে এল। তার হাতের ক্ষত নতুন করে পরিষ্কার করা হয়েছে। বাড জোর করেছিল, আর লারসেন শেষ পর্যন্ত রাজি হয়েছে। কিন্তু সে বসে বিশ্রাম নেওয়ার মানুষ নয়। এলিয়াসকে পাশের ঘরে শুইয়ে দেওয়া হয়েছে। কাঁধের ক্ষত পরীক্ষা করার জন্য ইলাই তার পুরোনো বাক্স থেকে কাপড়, সুঁই, অ্যালকোহল সব বের করেছে।

    এলিয়াসের ক্ষত গভীর। কিন্তু গুলিটা প্রাণঘাতী জায়গায় লাগেনি। গুলিটি বের করা যাবে কি না, সেটা নিয়ে কিছুক্ষণ আলোচনা হলো। শেষ পর্যন্ত লারসেন বলল, কাছের শহর থেকে ডাক্তার আনতে হবে। কিন্তু ততক্ষণ এলিয়াসকে বিশ্রামে থাকতে হবে।

    বিকেলের দিকে সূর্য যখন পশ্চিমে ঢলতে শুরু করেছে, তখন র‌্যাঞ্চের পরিবেশে আবার স্বাভাবিক কাজকর্মের ছবি ফিরে এল। কিন্তু স্বাভাবিকতা শুধু বাইরে। ভেতরে সবাই জানে, কিছু একটা বদলে গেছে।

    হ্যাঙ্ক পাহারা থেকে নামেনি। ক্লে দুবার র‌্যাঞ্চের চারপাশ ঘুরে এসেছে। মিগুয়েল এখনও ফেরেনি। আর লারসেন বারবার বাড়ির সামনের পথটার দিকে তাকাচ্ছে।

    সন্ধ্যার আগে প্রধান ঘরের দরজা বন্ধ করে লারসেন সবাইকে ডাকল। বাড হিগিন্স প্রথমে এল। তারপর ক্লে। হ্যাঙ্ক ছাদ থেকে নেমে এসে রাইফেলটা দেয়ালের পাশে রাখল, কিন্তু খুব দূরে রাখল না। রুবেন কোল চুপচাপ একপাশে দাঁড়াল। ইলাইও ঘরের কোণে ছিল, যদিও তাকে কেউ ডাকেনি। সে সম্ভবত বুঝেছিল, আজকের কথা শোনার অধিকার তার আছে। মারদেকা জানালার পাশে দাঁড়িয়েছিল।

    লারসেন ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর ধীরে বলল, “পাহাড়ে আমরা এমন একজনের মুখোমুখি হয়েছি, যাকে আমি বহু বছর আগে মৃত ভেবেছিলাম।”

    ঘরের ভেতর কেউ কথা বলল না।

    লারসেন বলল, “তার নাম ভিক্টর কেইন।”

    বাড নামটা আগে শোনেনি। কিন্তু লারসেনের মুখের ভাব দেখে সে বুঝল, নামটা মনে রাখার মতো।

    লারসেন খুব বেশি পুরোনো গল্পে গেল না। পাহাড়ের আশ্রয়স্থল, চাকতি, বহু বছরের পথঘাটের ইতিহাস, সবকিছু আবার নতুন করে বলার প্রয়োজন নেই। সে শুধু এতটুকু বলল, কেইন একসময় তাদের বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে তাদের শত্রু হয়েছিল। কিছু মানুষের মৃত্যু হয়েছিল তার কারণে। ড্যানিয়েল রিড তার বিরুদ্ধে প্রমাণ জোগাড় করেছিল। তারপর ড্যানিয়েল মারা যায়।

    মারদেকার চোখ জানালার বাইরে স্থির হয়ে রইল। সে শুনছিল।

    বাড ধীরে মাথা তুলল। “ছেলেটা?”

    লারসেন এবার সরাসরি মারদেকার দিকে তাকাল। “ড্যানিয়েল রিডের ছেলে।”

    ঘরের নীরবতা বদলে গেল। ক্লে কিছুক্ষণ মারদেকার দিকে তাকিয়ে রইল। রুবেনের মুখের হাসি পুরোপুরি মিলিয়ে গেছে। হ্যাঙ্ক শুধু একবার নিচু গলায় বলল, “তাহলে কেইন জানে।”

    “জানে।” লারসেনের উত্তর। “সে জানে মারদেকা বেঁচে আছে।”

    কয়েক মুহূর্ত কেউ কিছু বলল না। তারপর বাড জানালার দিকে তাকাল।
    “তাহলে, ওরা এখানে আসবে।”

    লারসেন বলল, “সম্ভব।”

    এই কথার পর আর বিশেষ আলোচনা হলো না। কারণ প্রত্যেকেই বুঝে গেছে, এখন থেকে র‌্যাঞ্চের প্রতিটি দিন বদলে যাবে।

    রাতে খাবার শেষে মারদেকা একা বাইরে বেরিয়ে এল। আকাশ পরিষ্কার। তারাগুলো ধীরে ধীরে উজ্জ্বল হয়ে উঠছে। আস্তাবলের ভেতর থেকে ঘোড়ার নড়াচড়ার শব্দ আসছে। দূরে পাহারায় থাকা কারও বুটের শব্দ। বাতাসে ঠান্ডা বাড়ছে। সে বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে রইল। হঠাৎ তার মনে হলো, পাহাড়ে যাওয়ার তার কোনো অতীত ছিল না। অথবা ছিল, কিন্তু সে জানত না। এখন অতীতের একটা দরজা খুলে গেছে। সে জানে তার বাবা কে ছিল। জানে, তার বাবা শেষ মুহূর্তে তাকে বাঁচাতে চেয়েছিল। জানে, সে দৌড়েছিল বলে বেঁচে গিয়েছিল। কিন্তু সে এটাও জানে, এই মানুষগুলো, এই র‌্যাঞ্চ, এই ঘর, এই খোলা মাঠ এখন শুধু লারসেনের সম্পত্তি নয়। এটাই তার ঘর।

    পেছনে দরজা খোলার শব্দ হলো। লারসেন বেরিয়ে এল। তার হাতে একটা পিস্তল।

    মারদেকা সেটার দিকে তাকাল।

    লারসেন কিছুক্ষণ চুপ করে তার পাশে দাঁড়িয়ে রইল। দূরের অন্ধকার প্রান্তরের দিকে তাকিয়ে আছে সে। তারপর ধীরে বলল, “তোমাকে প্রথম দিন কী শিখিয়েছিলাম মনে আছে?”

    মারদেকা মাথা নেড়ে বলল, “পায়ের ভারসাম্য।”

    লারসেনের মুখে সামান্য হাসি ফুটল। “তারও আগে?”

    মারদেকা ভাবল। “পা কোথায় রাখতে হয়।”

    “ঠিক।” লারসেন পিস্তলটা তার দিকে বাড়িয়ে দিল।

    মারদেকা এবার ধীরে হাত বাড়িয়ে অস্ত্রটা নিল। পিস্তলটা তার হাতে ঠান্ডা আর ভারী লাগল। এতদিন সে লারসেনের কোমরে এই অস্ত্র দেখেছে। ক্লের কোমরে দেখেছে। র‌্যাঞ্চের অন্যদের হাতেও দেখেছে। বন্দুক তার কাছে নতুন কোনো বস্তু নয়।

    কিন্তু আজ প্রথমবার সে বুঝতে পারল, নিজের হাতে অস্ত্র নেওয়া আর দূর থেকে অস্ত্র দেখা এক জিনিস নয়।

    “এটা খালি।” লারসেন বলল। “তুমি পিস্তল চালানো আজ শুরু করছ।” তারপর সে মারদেকার পায়ের দিকে তাকাল। “কিন্তু তোমার শিক্ষা শুরু হয়েছিল অনেক আগে।”

    মারদেকা চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।

    লারসেন তার সামনে এসে দাঁড়াল। “প্রথমে বন্দুক নয়।” সে বলল। “প্রথমে তুমি।”

    মারদেকা পিস্তলটা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার পা মাটির ওপর স্থির। দুই পায়ের দূরত্ব, শরীরের ভার, কাঁধের অবস্থান, সবকিছু যেন হঠাৎ নতুন অর্থ পেল।

    লারসেন তার হাতের দিকে তাকিয়ে বলল, “ট্রিগারের ওপর আঙুল রাখবে না। যতক্ষণ না গুলি করার সিদ্ধান্ত নিচ্ছ।”

    মারদেকা আঙুল সরিয়ে নিল।

    লারসেন এবার তার কোমরের দিকে ইঙ্গিত করল। “আগামীকাল থেকে শিখবে, কীভাবে এটাকে কোমর থেকে বের করতে হয়।”

    মারদেকা পিস্তলটার দিকে তাকাল। তার মনে হলো, এই ধাতব বস্তুটা শুধু একটা অস্ত্র নয়। এটা একটা পথ। যে পথ তাকে নিয়ে যাবে এমন জায়গায়, যেখানে হয়তো একদিন তাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, সে আবার দৌড়াবে, নাকি দাঁড়িয়ে থাকবে।

    ঠিক তখন দূর থেকে ঘোড়ার খুরের শব্দ ভেসে এল। লারসেন সঙ্গে সঙ্গে মাথা তুলল। মারদেকাও শুনতে পেল। শব্দটা দ্রুত এগিয়ে আসছে। র‌্যাঞ্চের বাইরের পথ থেকে। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে অন্ধকারের ভেতর একটা ঘোড়ার অবয়ব দেখা গেল।

    হ্যাঙ্ক পাহারার জায়গা থেকে নিচু গলায় ডাকল। “কে?”

    উত্তর এল। “মিগুয়েল।”

    কিছুক্ষণের মধ্যে মিগুয়েল ঘোড়াটা নিয়ে উঠোনে ঢুকল। তার ঘোড়ার গায়ে ঘাম। নিজের মুখেও ধুলো জমে আছে। সে নামার পর প্রথমে চারপাশে তাকাল, তারপর সরাসরি লারসেনের দিকে এগিয়ে এল। তার স্বাভাবিক হাসিটা নেই।

    লারসেন বলল, “কী পেয়েছ?”

    মিগুয়েল কয়েক মুহূর্ত কথা বলল না। তারপর সে পাহাড়ের দিকের অন্ধকারের দিকে তাকাল। “ওরা আমাদের পেছন পর্যন্ত আসেনি।”

    লারসেনের চোখ সরু হলো। “তার মানে?”

    মিগুয়েল এবার ধীরে বলল, ‘তার মানে, ওরা আরও দূর থেকে দেখছিল।”

    মারদেকার হাতের পিস্তলটা সামান্য শক্ত হয়ে উঠল।

    মিগুয়েল বলল, “পাহাড়ের দিকের উঁচু জায়গায় তিনজনের দাগ পেয়েছি। ঘোড়াগুলো অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল।”

    লারসেন নীরব।

    “আর একটা জিনিস।” মিগুয়েল বলল। “তাদের একজন আজ র‌্যাঞ্চের পথ পর্যন্ত নেমে এসেছিল।”

    মিগুয়েলের কথার পর কয়েক মুহূর্ত কেউ আর কথা বলল না। উঠোনের ওপর রাত নেমে এসেছে পুরোপুরি। কয়েক ঘণ্টা আগেও মনে হতে পারত, রাতটা আর পাঁচটা রাতের মতোই। কিন্তু এখন র‌্যাঞ্চের চারপাশের অন্ধকারের দিকে তাকালে মনে হচ্ছিল, সেই অন্ধকারেরও চোখ আছে। কেউ তাদের দেখছে।

    লারসেন কিছুক্ষণ পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে রইল। তার মুখে রাগের কোনো প্রকাশ নেই। বরং সেই স্থিরতা আরও বিপজ্জনক।

    বাড ধীরে এগিয়ে এল। তার হাতে তখনও কাজের দস্তানা “কতজন?”

    মিগুয়েল মাথা নাড়ল। “নিশ্চিত নই। তিনজনের ঘোড়ার দাগ পেয়েছি উঁচু জায়গায়। কিন্তু নিচে যে নেমে এসেছিল, সে একাই ছিল।”

    ক্লে মরগান কখন যে বাড়ির পাশ থেকে বেরিয়ে এসেছে, কেউ খেয়াল করেনি। সে কিছুক্ষণ চুপ করে মিগুয়েলের কথা শুনল। তারপর দূরের অন্ধকারে চোখ রেখে বলল, “ওরা জায়গাটা দেখছে।”

    মিগুয়েল তার দিকে তাকাল। “হ্যাঁ।”

    ক্লে কোমরের কোল্ট দুটির একটায় হাত রাখল। “তাহলে পরেরবার দেখতে আসবে না।”

    লারসেন এবার তার দিকে তাকাল। “এখনই কেউ কোথাও যাবে না।”

    ক্লে মুখ ঘুরিয়ে লারসেনের দিকে তাকাল, কিন্তু কিছু বলল না।

    লারসেন আবার মিগুয়েলের দিকে ফিরল। “দাগগুলো কোথায় শেষ হয়েছে?”

    “পাহাড়ের নিচের শুকনো খালের কাছে।” মিগুয়েল বলল। “তারপর ওরা আবার উত্তর দিকে গেছে। অন্তত ঘোড়ার দাগ সেদিকেই।”

    “ফিরে গেছে?” বাড জিজ্ঞেস করল।

    মিগুয়েল কাঁধ ঝাঁকাল। “ফিরে গেছে কি না, সেটা অন্ধকারে বলা কঠিন। কিন্তু একটা কথা নিশ্চিত, ওরা আমাদের পথ জানে।”

    এই কথাটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক। শত্রু কোথাও আছে, সেটা জানা একরকম। কিন্তু শত্রু যদি তোমার বাড়ির পথ জেনে যায়, তোমার আস্তাবল কোথায় জানে, কোন দিক দিয়ে ঘোড়া বের হয় জানে, পাহারার জায়গাগুলো দূর থেকে দেখে নেয়, তাহলে বিপদ আর দূরের থাকে না।

    মারদেকা এখনও পিস্তলটা হাতে ধরে ছিল। সে খেয়াল করেনি কখন তার আঙুল শক্ত হয়ে গেছে।

    লারসেন একবার তার হাতের দিকে তাকাল। তারপর শান্তভাবে বলল, “এটা আমাকে দাও।”

    মারদেকা পিস্তলটা তার হাতে দিল।

    লারসেন অস্ত্রটা নিজের কোমরে রেখে দিল। তারপর তার দিকে তাকাল। “আজকের জন্য যথেষ্ট।”

    মারদেকা কিছু বলল না। তার চোখ তখনও পাহাড়ের অন্ধকার দিকে। সেখানেই কোথাও ভিক্টর কেইন থাকতে পারে। হয়তো সে নিজে নেই। হয়তো তার লোকেরা আছে। কিন্তু তারা জানে, সে এখানে। এই কথাটা ভাবতেই তার বুকের ভেতর অস্বস্তি হলো। পাহাড়ে থাকলে বিপদ ছিল সামনে। পাথরের আড়ালে শত্রু ছিল, গুলির শব্দ ছিল, কোথা থেকে আক্রমণ আসছে তা বোঝার চেষ্টা ছিল। সেখানে প্রতিটি মুহূর্তে শরীর আর মন ব্যস্ত থাকত।

    কিন্তু র‌্যাঞ্চে ফিরে বিপদটা যেন অন্যরকম হয়ে গেছে। এখানে ইলাই আছে। বাড আছে। ক্লে আছে। হ্যাঙ্ক আছে। রুবেন আছে। মিগুয়েল আছে। এলিয়াস আহত অবস্থায় ঘরের ভেতরে শুয়ে আছে। আর এদের প্রত্যেকের জন্য এখন তার মনে একটা আলাদা ভয় জন্মেছে। যদি শত্রুরা আসে? যদি গুলি শুধু তাকে লক্ষ্য করে না আসে? এই প্রশ্নের উত্তর সে জানে না।

    রাতের খাবারের পর র‌্যাঞ্চের স্বাভাবিক নিয়ম বদলে গেল। সাধারণত রাত নামার পর সবাই নিজের নিজের কাজ শেষ করে। কেউ আস্তাবল দেখে, কেউ পশুর ঘের পরীক্ষা করে, কেউ ঘরের ভেতরে বসে তামাক খায়। পাহারার দায়িত্ব থাকে নির্দিষ্ট কয়েকজনের ওপর। কিন্তু আজ বাড কাউকে কিছু বলতে হয়নি। সবাই নিজে থেকেই বুঝে গেছে।

    ক্লে বাড়ির পশ্চিম দিকটা পরীক্ষা করল। হ্যাঙ্ক উত্তর দিকের বেড়ার পাশে পাহারার জায়গা বদলে দিল। মিগুয়েল আবার ঘোড়ার দাগগুলো দেখে আসার জন্য গেল, যদিও এবার র‌্যাঞ্চ থেকে খুব দূরে গেল না।

    রুবেন কোল রাতের অন্ধকারে বারান্দায় বসে ছিল। তার হাতে একটা পুরোনো নোটবুক। মাঝে মাঝে সে কিছু লিখছে, তারপর থেমে যাচ্ছে। ব্ল্যাক রিভারের দিকে পাঠানো লোকদের কাছ থেকে সে খবর আশা করছে, কিন্তু খবর আসতে সময় লাগবে।

    ইলাই এসবের মধ্যে সবচেয়ে বিরক্ত ছিল। কারণ তার ধারণা, মানুষ যখন ভয় পায়, তখন ঠিকমতো খাওয়া বন্ধ করে দেয়। মারদেকাকে দ্বিতীয়বার খাবার দিতে গিয়ে সে বলেছিল, “আগামীকাল থেকে যত খুশি বন্দুক নিয়ে ঘুরবে। আজ খাও।”

    মারদেকা প্রতিবাদ করার চেষ্টা করেনি। ইলাইয়ের সঙ্গে তর্ক করে লাভ নেই।

    রাত আরও গভীর হলে মারদেকা নিজের ঘরে গেল। কাঠের ছোট ঘরটা তার পরিচিত। বিছানা, জানালার পাশে ছোট টেবিল, দেয়ালে ঝোলানো তার কিছু জিনিস। এতদিন এই জায়গাটাকে সে শুধু থাকার জায়গা বলে চিনত। আজ বিছানায় বসে চারপাশে তাকিয়ে তার মনে হলো, পাহাড় থেকে ফিরে আসার পর ঘরটাও বদলে গেছে।

    আসলে ঘর বদলায়নি। সে বদলেছে। সে ধীরে জামার ভেতর হাত দিল। সেই পুরোনো ধাতব টুকরোটা এখনও তার কাছে আছে। এলিয়াস যে টুকরো দেখিয়েছিল, তার সঙ্গে মিলিয়ে দেখার পর এখন আর সন্দেহ নেই। এই জিনিসের সঙ্গে তার বাবার সম্পর্ক ছিল। এতদিন ধরে সে এটাকে নিজের জীবনের অংশ বলে বয়ে বেড়িয়েছে, অথচ জানত না কেন।

    এতদিন সে এই শব্দ শুনে ভয় পেত। মনে হতো, কেউ যেন তাকে কোথাও থেকে ডাকছে। এখন সে জানে, কেউ তাকে ডাকছিল, তিনি ছিলেন তার বাবা। এই সত্যটা জানার পরও তার বুকের ভেতর কষ্ট হলো। কারণ সে বেঁচে গিয়েছিল। কিন্তু তার বাবা বাঁচেনি।

    সে জানালার বাইরে তাকাল। দূরে একটা লণ্ঠনের আলো নড়ছে। সম্ভবত পাহারার লোক জায়গা বদলাচ্ছে। সবকিছু শান্ত। অনেক রাত পর্যন্ত জেগে রইল। তারপর কখন ঘুমিয়ে পড়েছে, সে নিজেও জানে না।

    পরদিন সকালে র‌্যাঞ্চের ওপর সূর্যের আলো উঠতেই আবার পরিচিত কাজ শুরু হলো। কিন্তু আগের দিনের মতো কোনো অলসতা নেই। প্রত্যেক মানুষ কাজের ফাঁকে একবার না একবার দূরের দিকে তাকাচ্ছে।

    মারদেকা সকালবেলা ঘর থেকে বেরিয়ে প্রথমেই লারসেনকে দেখতে পেল। সে বাড়ির পেছনের খোলা জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। তার সামনে একটা কাঠের খুঁটি। আর খুঁটির পাশে ছোট একটা টেবিল। কাছে যেতেই সে দেখল, টেবিলের ওপর একটা হোলস্টার রাখা। পাশে সেই পিস্তল। আজও খালি।

    লারসেন তার দিকে তাকাল। “এসো।”

    মারদেকা এগিয়ে গেল। সকালের বাতাস এখনও ঠান্ডা। সূর্যের আলো পুরোপুরি গরম হয়নি। দূরে ঘোড়ার নিঃশ্বাসের সঙ্গে সাদা বাষ্প বের হচ্ছে।

    লারসেন প্রথমে পিস্তলটা হাতে নিল। “অস্ত্র হাতে নেওয়ার আগে কী দেখবে?”

    মারদেকা উত্তর দিল, “অস্ত্র খালি কি না।”

    লারসেন মাথা নেড়ে বলল, “দেখাও।”

    মারদেকা পিস্তলটা নিল। লারসেন আগের রাতে যেভাবে দেখিয়েছিল, সেভাবেই পরীক্ষা করল। তারপর আবার তাকে দেখালো।

    “এবার ধরো।”

    মারদেকা পিস্তল ধরল।

    “হলো না।” লারসেন বলল। “হাত শক্ত করে ধরছ।”

    মারদেকা একটু ঢিলে করল।

    “অতিরিক্ত শক্ত করলে হাত শক্ত হয়ে যাবে। অস্ত্রকে নিয়ন্ত্রণ করবে, অস্ত্রকে চেপে ধরবে না।” লারসেন বললো, তারপর সে মারদেকার পায়ের দিকে তাকাল। “এখন দাঁড়াও।”

    মারদেকা দাঁড়াল। দুই পায়ের দূরত্ব ঠিক করল। এক পা সামান্য এগিয়ে।শরীরের ভার সমানভাবে ছড়িয়ে দিল।

    লারসেন কিছুক্ষণ মারদেকার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বলল, “দেখেছ, তোমার নতুন কিছু শেখার দরকার হয়নি।” এবার সে দুই তার পায়ের দিকে তাকাল। “তুমি বন্দুক চালাতে শেখোনি। কিন্তু দাঁড়াতে শিখেছ।” সে একটু থামল। “পা ভুল জায়গায় থাকলে হাত যত দ্রুতই চলুক, গুলি ঠিক জায়গায় যাবে না।”

    মারদেকা আবার নিজের অবস্থান ঠিক করল।

    লারসেন এবার হোলস্টারটা তার কোমরে বাঁধতে সাহায্য করল। চামড়ার পুরোনো গন্ধ। কোমরে নতুন ওজন। মারদেকা নিচের দিকে তাকাল। এতদিন তার কোমরে ছুরি ছিল। ছুরির সঙ্গে তার সম্পর্ক আলাদা। ছুরি হাতে নিলে তাকে কাছে যেতে হয়। প্রতিপক্ষের চোখ দেখতে হয়। তার শরীরের নড়াচড়া বুঝতে হয়। কিন্তু বন্দুক দূরত্ব বদলে দেয়। এই জিনিসটা হাতের ভুলের জন্য ক্ষমা করে না।

    লারসেন বলল, “এখন বের করবে না।”

    মারদেকা তার দিকে তাকাল। “তাহলে?”

    “শুধু হাত রাখবে।”

    মারদেকা হাত রাখল।

    “আবার।”

    সে হাত সরাল। আবার রাখল। এভাবে কয়েকবার। কোনো নাটক নেই। কোনো দ্রুততা নেই। শুধু হাতের অবস্থান।

    লারসেন তাকে থামাল। “তুমি দ্রুত হতে চাও?”

    মারদেকা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “জানি না।”

    লারসেন এবার তার দিকে তাকাল। “ভালো উত্তর।” তারপর সে ধীরে বলল, “কারণ দ্রুত হওয়া আর বেঁচে থাকা এক জিনিস নয়।”

    মারদেকা আবার হোলস্টারের ওপর হাত রাখল।

    সকালের সূর্য একটু একটু করে ওপরে উঠছে। দূরে র‌্যাঞ্চের কাজ চলছে। কেউ হাতুড়ি দিয়ে কাঠে আঘাত করছে। কোথাও ঘোড়ার খুরের শব্দ। এই সব পরিচিত শব্দের মাঝেই মারদেকার নতুন শিক্ষা শুরু হলো। সে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বন্দুক বের করেনি।

    শুধু হাত রেখেছে। সরিয়েছে। আবার রেখেছে। তারপর পিস্তল ধরেছে। আবার হোলস্টারে ফিরিয়ে দিয়েছে।

    লারসেন বারবার তার কাঁধ ঠিক করেছে। কবজি সোজা করেছে। শরীরের ভঙ্গি বদলেছে।

    একসময় মারদেকার কপালে ঘাম জমল। সে অবাক হলো।দৌড়ানো নয়। লড়াই নয়। তবু এই সাধারণ কাজটাও কঠিন।

    লারসেন বলল, “ক্লান্ত?”

    মারদেকা বলল, “না।”

    লারসেন তার হাতের দিকে তাকাল। “মিথ্যা।”

    মারদেকা চুপ করে রইল।

    লারসেনের ঠোঁটের কোণে সামান্য হাসি দেখা গেল। “ভালো। ক্লান্তি বুঝতে পারাও শিক্ষার অংশ।”

    দুপুরের আগে অনুশীলন থামল। মারদেকা পিস্তলটা খুলে টেবিলের ওপর রাখল। তার মনে হচ্ছিল, সে খুব কম কিছু শিখেছে। কিন্তু শরীর বলছে, সে অনেকক্ষণ ধরে নতুন কিছু করছে।

    লারসেন টেবিলের উপর হাত রাখলো। “আগামীকাল আবার।”

    মারদেকা জিজ্ঞেস করল, “কবে গুলি করব?”

    লারসেন তার দিকে তাকাল। “যখন বন্দুক বের করা তোমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় থাকবে না।”

    এই উত্তর শুনে মারদেকা কিছু বুঝল না। কিন্তু সে আর প্রশ্ন করল না।

    দুপুরের দিকে এলিয়াসের ঘরে গেল সে। এলিয়াস তখন জেগে আছে। তার কাঁধের ক্ষত নতুন করে বাঁধা হয়েছে। মুখ এখনও দুর্বল, কিন্তু আগের দিনের চেয়ে রং ফিরেছে। মারদেকা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে রইল।

    এলিয়াস তাকে দেখে বলল, “বন্দুক শিখছ?”

    মারদেকা অবাক হলো। “কীভাবে জানলে?”

    এলিয়াসের ঠোঁটে হালকা হাসি ফুটল। “লারসেন যখন কাউকে প্রতিদিন সকালে একই জায়গায় দাঁড় করায়, তখন সাধারণত দুটো জিনিস শেখায়। ধৈর্য, অথবা বন্দুক।”

    মারদেকা ভেতরে এসে বসল। কিছুক্ষণ কেউ কথা বলল না। তারপর সে বলল, “আমি কি বন্দুক চালাতে পারব?”

    এলিয়াস সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল না। জানালা দিয়ে দুপুরের আলো ভেতরে পড়েছে। কাঠের দেয়ালে আলো আর ছায়ার রেখা তৈরি হয়েছে। তারপর সে বলল, “তুমি পাহাড়ে বেঁচে থাকতে শিখেছ। অন্যদের শেখানো ছাড়া কিছু জিনিস তুমি নিজেই শিখেছ। বন্দুকও শিখবে।” সে একটু থামল। “কিন্তু একটা কথা মনে রাখবে। বন্দুক শিখলেই মানুষ বন্দুকবাজ হয় না।”

    মারদেকা মাথা নেড়ে বলল।

    এলিয়াস জানালার বাইরে তাকাল। “আর আশা করি, তোমাকে খুব তাড়াতাড়ি সেটা প্রমাণ করতে হবে না।”

    সন্ধ্যার আগে রুবেন কোলের লোক ফিরে এল। সে ধুলোয় ঢাকা ঘোড়া নিয়ে র‌্যাঞ্চে ঢুকল। খবর খুব বেশি নয়। ব্ল্যাক রিভারের আশেপাশে কয়েকজন অচেনা লোককে দেখা গেছে। তারা কোথা থেকে এসেছে, কেউ জানে না। তারা শহরে বেশি সময় থাকেনি। সরাইখানায় খেয়েছে, ঘোড়াগুলোকে বিশ্রাম দিয়েছে, তারপর আবার বেরিয়ে গেছে।

    রুবেন খবর শুনে চুপ করে রইল। তারপর বলল, যারা ওই লোকদের দেখেছে, তাদের আবার জিজ্ঞেস করতে হবে।

    বাড এসে লারসেনের সঙ্গে কথা বলল। হ্যাঙ্ক পাহারার জায়গা আরও দূরে সরানোর প্রস্তাব দিল। ক্লে বলল, র‌্যাঞ্চের সব ঘোড়া যেন রাতে আস্তাবলের ভেতরে না রাখা হয়। যদি হঠাৎ আক্রমণ হয়, একটা জায়গায় সব ঘোড়া থাকলে বিপদ বাড়বে।

    লারসেন সবার কথা শুনল। তারপর খুব অল্প কথায় নির্দেশ দিল।

    সেই রাত থেকে র‌্যাঞ্চ বদলে গেল। পশ্চিম দিকের বেড়ার কাছে অতিরিক্ত পাহারা বসানো হলো। দক্ষিণের খোলা পথ নজরে রাখা হলো। রাতে লণ্ঠনের আলো কমিয়ে দেওয়া হলো। প্রতিটি ঘরে অস্ত্র প্রস্তুত রাখা হলো।

    মারদেকা এসব দেখছিল। তার মনে হচ্ছিল, একটা ঝড় আসার আগে যেমন বাতাস বদলে যায়, র‌্যাঞ্চের পরিবেশও তেমন বদলে গেছে।

    সন্ধ্যার পর লারসেন আবার তাকে খোলা জায়গায় ডাকল। আজও খালি পিস্তল। আজও গুলি নয়। কিন্তু আগের দিনের চেয়ে তার ধরন বদলেছে। সে হোলস্টারের ওপর হাত রাখল। সরাল। আবার রাখল।

    লারসেন একসময় বলল, “এবার ধীরে বের করো।”

    মারদেকা অস্ত্র বের করল। তার চলন দ্রুত নয়। কিন্তু আগের দিনের চেয়ে কম অস্বস্তিকর।

    লারসেন বলল, “আবার।”

    মারদেকা তাই করলো। এভাবে চলতেই থাকলো। একসময় তার হাত ক্লান্ত।

    আকাশের রং বদলাতে শুরু করেছে। সূর্য পশ্চিমে নেমে গেছে। ঘাসের ওপর লম্বা ছায়া।

    হঠাৎ দূর থেকে ঘোড়ার খুরের শব্দ এলো। দুজনেই থেমে গেল।এইবার শব্দটা পাহাড়ের দিক থেকে নয়। উত্তরের পথ থেকে। কিছুক্ষণ পর দেখা গেল, মিগুয়েল দ্রুত ঘোড়া ছুটিয়ে আসছে। তার মুখের ভাব দেখে বোঝা গেল, সে শুধু র‌্যাঞ্চের চারপাশ পরীক্ষা করে ফিরে আসেনি। সে কিছু পেয়েছে।

    ঘোড়ার পিঠ থেকে নামার আগেই সে বলল, “লারসেন।”

    লারসেন এগিয়ে গেল। “কী হয়েছে?”

    মিগুয়েল একবার মারদেকার দিকে তাকাল। তারপর নিচু গলায় বলল, “ওরা আজ আবার এসেছে।”

    চারপাশ যেন নিস্তব্ধ হয়ে গেল। দূরে শুধু একটা ঘোড়ার হালকা ডাক। লারসেনের চোখ সরু হলো। “কত দূর?”

    “এবার খুব বেশি দূরে নয়।” মিগুয়েল বলল। “পাহাড়ের নিচের রিজ থেকে র‌্যাঞ্চ দেখা যায়।”

    মারদেকা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

    মিগুয়েল এবার আরও ধীরে বলল, “সেখানে তিনজন ছিল।”

    লারসেনের মুখের কোনো পরিবর্তন হলো না। ‘কেইন?”

    মিগুয়েল মাথা নাড়ল। “দূর থেকে মুখ দেখিনি।” তারপর সে ঘোড়ার লাগাম শক্ত করে ধরল। “কিন্তু তাদের একজন অনেকক্ষণ ধরে শুধু এই বাড়িটার দিকে তাকিয়ে ছিল।”

    মারদেকার হাত এখনও পিস্তলের ওপর। লারসেন ধীরে তার দিকে তাকাল। তারপর অস্ত্রটা হোলস্টারে ফিরিয়ে দিতে বলল। মারদেকা সেটাই করল। পিস্তলটা কোমরে ফিরে গেল। কিন্তু এবার তার মনে হলো, সে শুধু একটা অস্ত্র ফিরিয়ে রাখল না। সে একটা সিদ্ধান্তকে সাময়িকভাবে অপেক্ষা করতে দিল।

    দূরে সূর্যের শেষ আলো মিলিয়ে যাচ্ছে। পাহাড় আবার অন্ধকার হয়ে আসছে। সেই অন্ধকারের ওপারে শত্রুরা আছে। তারা র‌্যাঞ্চকে দেখেছে। তারা পথ চিনেছে। আর এখন র‌্যাঞ্চের মানুষগুলোও জানে, অপেক্ষার সময় খুব বেশি নেই।

    মারদেকা ধীরে মুখ তুলে পাহাড়ের দিকে তাকাল। ছয় বছর আগে, সেই পাহাড়ের কোনো এক অন্ধকার পথে সে দৌড়েছিল। আজ সে আবার পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে আছে। কিন্তু এবার তার কোমরে হোলস্টার। তার পায়ের নিচে শক্ত মাটি।

    চারপাশে নিজের মানুষগুলো। আর সামনে যে পথ আসছে, সেখান থেকে পালিয়ে যাওয়ার কথা তার মনে একবারও এল না।
    (চলবে)

    4
    5 Comments
    • আপনার কলম এগিয়ে চলুক!আরও লেখার অপেক্ষায় রইলাম।

    • গল্পের এই ধীর ও টানটান পরিবেশই ইঙ্গিত দিচ্ছে সামনে কত বড় ঝড় আসছে!

    • বাবার মৃত্যুর সত্য জানার পর অস্ত্র হাতে দাঁড়ানো ছেলেটার মনে ভয় নয় শুধু নিজের মানুষদের রক্ষা করার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা জেগে ওঠে…..🤍

    • তাড়াহুড়া নাই ধৈর্য শেখানোটাই যেন আসল শিক্ষা😄

    • আশা করি আপনার নিয়মিত সাহিত্যচর্চায় এই ফোরামটি আরও সমৃদ্ধি লাভ করবে। আপনার জন্য শুভকামনা।

আমি মানুষের ভীড়ে মানুষ খোঁজে ফিরি

বিষণ্ন সুমন

ডিজাইনার

স্কুল বয়েস থেকেই লিখালিখা করি। যদিও পড়ি তার আগে থেকেই। আমি বিশ্বাস করি, ভালো লিখতে হলে আগে ভালো পড়তে জানতে হবে। তাই এখন পর্যন্ত নিজেকে লেখক না ভেবে ভালো পাঠক হিসেবেই পরিচয় দিতে সাচ্ছন্দ্য বোধ করি। প্রথম প্রকাশিত বই সেই ১৯৯৬ সালের গ্রন্থমেলায় “কে বলে তুমি নেই” রোমান্টিক উপন্যাস এবং সম্পূর্ণ মৌলিক ওয়েস্টার্ণ “লোন রাইডার”। পরবর্তীতে ২০১২ সালের বই মেলায় অন্যপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত গল্প সংকলন। মাঝে banglanews24.com এর সাহিত্যপাতায় নিয়োমিত লিখেছি। আসলে আমি লেখায় কখনোই অনর্গল নই। মাঝেমাঝেই বন্ধাত্ব্য এসে আমায় থামিয়ে রাখে। একটা শব্দও লিখতে পারিনা। তখন আমার পুরনো লিখাগুলো নিজেই পাঠক হয়ে পড়ি আর ভাবি, এ গুলো কি সত্যিই আমি লিখেছিলাম(?)। এই ৫৪ বছর বয়সে এসেও এই একটাই প্রশ্ন নিজেকে করে যাচ্ছি প্রতিনিয়ত।

Skip to toolbar