Profile Photo

অনিন্দ্য আকাশOffline

  • freaknayan
  • Profile picture of অনিন্দ্য আকাশ

    অনিন্দ্য আকাশ

    2 hours, 58 minutes ago

    ━━━━━━━━━━━━━━
    অননুকথিত
    —অনিন্দ্য আকাশ
    ━━━━━━━━━━━━━━
    কলকাতায় অবস্থানরত শ্রদ্ধেয় সঞ্জীব দত্ত মহোদয়ের জীবনকাহিনিকে অবলম্বন করে এই উপন্যাসের আখ্যান।

    অধ্যায়–০১

    ভাদ্র মাসের শেষ।

    কলকাতার আকাশটা সেদিন কেমন যেন তামাটে হয়ে ছিল। বৃষ্টি নেই, রোদও নেই, শুধু বাতাসের মধ্যে এক ধরনের স্যাঁতসেঁতে ক্লান্তি। গলির মোড়ে জমে থাকা জলের গন্ধ, পুরোনো ইটের দেয়াল থেকে খসে পড়া চুন, আর দূরে যশোর রোডের বাস-ট্রামের কর্কশ হর্ন, সব মিলিয়ে শহরটাকে সেদিন অদ্ভুত বিষণ্ণ মনে হচ্ছিল।

    নগরবাজারের মোড়ের কাছে চারতলা বিশাল একটা বাড়ির তিনতলার বারান্দায় সেগুন কাঠের কারুকাজ করা আরামকেদারায় বসে ছিলেন অনিরুদ্ধ চৌধুরী।

    বয়স সত্তর পেরিয়ে সাতাত্তরের দিকে এগোচ্ছে। মাথার চুলগুলো ধবধবে সাদা। এখনও যত্ন করে পেছনের দিকে আঁচড়ানো। কিন্তু বয়সের ছাপ চুলের চেয়েও বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে তাঁর মুখে। কপালের গভীর ভাঁজগুলো যেন জীবনের অনেক না-বলা গল্পের সাক্ষী। আর চোখের কোণে যে বিষণ্ণতা জমে আছে, তার বয়স হয়তো তাঁর চেয়েও বেশি।

    ডান হাতে ধরা কাঁচের কাপের চা অনেকক্ষণ আগেই ঠান্ডা হয়ে গেছে। অথচ সেদিকে তাঁর কোনো খেয়াল নেই।

    তিনি তাকিয়ে আছেন নিচের রাস্তার দিকে।

    মানুষের বয়স বাড়লে একটা সময় আসে, যখন বর্তমানের চেয়ে অতীতই বেশি কাছে মনে হয়। পুরোনো দিনের কথা তখন হঠাৎ হঠাৎ মনে পড়ে। কোনো একটা গন্ধ, কোনো একটা শব্দ, কিংবা রাস্তার ওপারে দেখা কোনো পরিচিত দৃশ্য—অকারণে খুলে দেয় বহু বছর আগের কোনো বন্ধ দরজা।

    অনিরুদ্ধ চৌধুরীর জীবনেও তেমন অনেক দরজা আছে।

    তবে তাঁর অতীত শুধু স্মৃতিতে ভরা নয়।

    সেখানে কিছু আনন্দ আছে, কিছু ভালোবাসা আছে, আর আছে এমন এক যন্ত্রণা, যেটা বয়সের সঙ্গে কমেনি; বরং আরও গভীরে গিয়ে বসেছে।

    গত কয়েক বছর ধরে শরীরটাও আর তাঁর কথা শুনছে না।

    ডান কানের গভীরে সারাক্ষণ একটা তীক্ষ্ণ বাঁশির মতো শব্দ বাজে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় যাকে বলে ‘টিনিটাস’। দিন-রাতের কোনো হিসাব নেই। ঘুমের মধ্যে, জেগে থাকা অবস্থায়, সবসময় একই শব্দ।

    কখনও মনে হয়, মাথার ভেতর কেউ যেন একটা সরু বাঁশি নিয়ে একটানা বাজিয়েই চলেছে।

    কত ডাক্তার দেখিয়েছেন তিনি! কত টাকা খরচ করেছেন! বেলভিউ থেকে শুরু করে কলকাতার নামী স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ, কারও কাছে যেতে বাকি রাখেননি।

    শেষ পর্যন্ত সবাই প্রায় একই কথা বলেছে, “বয়সজনিত সমস্যা, অনিরুদ্ধবাবু। এটাকে নিয়েই অভ্যস্ত হতে হবে।”

    কথাটা বলা সহজ।

    কিন্তু যে মানুষটা প্রতিদিন নিজের মাথার ভেতর একটা শব্দ নিয়ে বেঁচে থাকে, তার কাছে অভ্যস্ত হওয়াটা এত সহজ নয়।

    আর টিনিটাসের চেয়েও ভয়ংকর তাঁর ভার্টিগো।

    হঠাৎ কোনো পূর্বসংকেত ছাড়াই মাথাটা এমনভাবে ঘুরতে শুরু করে যে মনে হয়, পৃথিবীটা যেন নিজের জায়গা ছেড়ে বনবন করে ঘুরছে। কখন যে সবকিছু অন্ধকার হয়ে যাবে, কখন যে শরীরটা মাটিতে পড়ে যাবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।

    ঠিক চার দিন আগের কথাই ধরা যাক।

    সেদিন বিকেল চারটে।

    আকাশের মুখ ভার হয়ে ছিল, কিন্তু বৃষ্টি নামেনি। অনিরুদ্ধবাবু তাঁর বহু বছরের পুরোনো মোপেডটা বের করেছিলেন।

    বাড়ির গ্যারেজে দামি গাড়িটা তখনও দাঁড়িয়ে ছিল। ড্রাইভারও ছিল। কিন্তু অনিরুদ্ধবাবুর বরাবরই ওই পুরোনো মোপেডটার প্রতি আলাদা টান।

    সামান্য একটা কাজে বরানগরের দিকে যাচ্ছিলেন।

    নাগেরবাজারের ঘিঞ্জি মোড়টার কাছে পৌঁছাতেই হঠাৎ কানের ভেতরের সেই বাঁশির শব্দটা তীব্র হয়ে উঠল।

    তারপর সবকিছু যেন এক মুহূর্তে বদলে গেল।

    চোখের সামনে রাস্তা, ফুটপাতের দোকান, বাস, অটো, মানুষ সবকিছু বনবন করে ঘুরতে শুরু করল।

    মোপেডের হ্যান্ডেল থেকে হাতের মুঠো আলগা হয়ে এল।

    অনিরুদ্ধবাবু বুঝলেন, তিনি পড়ে যাচ্ছেন।

    আর ঠিক তখনই ডান দিক থেকে একটা মিনিবাস ছুটে এল।

    মৃত্যু কখনও কখনও খুব কাছে এসে দাঁড়ায়।

    এত কাছে যে তার ঠান্ডা নিঃশ্বাস পর্যন্ত টের পাওয়া যায়।

    অনিরুদ্ধবাবু সেদিন মৃত্যুকে তেমনই কাছ থেকে দেখেছিলেন।

    কিন্তু শেষ মুহূর্তে কয়েক জোড়া শক্ত হাত তাঁকে জাপটে ধরল।

    “ও অনিরুদ্ধকাকা! সামলান! কী হইলো আপনার?”

    ফুটপাতের কয়েকজন তরুণ ব্যবসায়ী আর হকার ছুটে এসেছিল। তাঁরা অনিরুদ্ধ চৌধুরীকে চিনত।

    এই এলাকার পুরোনো বংশের মানুষ। নামী ব্যবসায়ী। কোটিপতি।

    কিন্তু সেদিন তাঁদের কাছে তিনি কোটিপতি ছিলেন না।

    তিনি ছিলেন শুধু অনিরুদ্ধকাকা।

    তাঁকে রাস্তার একপাশে এনে কাঠের বেঞ্চে বসানো হলো। মাথায় জল দেওয়া হলো। পরে মোপেডটা একটা ট্রাকে তুলে তাঁকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে গেল তারা।

    বাড়িতে ফিরে ডাক্তার এলেন। ইনজেকশন দিলেন। কঠোর বিশ্রামের পরামর্শ দিলেন।

    কিন্তু বিছানায় শুয়ে অনিরুদ্ধবাবু শুধু একটা কথাই ভাবছিলেন,

    মৃত্যু এত কাছে এসেও কেন তাঁকে ছুঁয়ে গেল না?

    জীবনের শেষ হিসাবটা কি এখনও বাকি?

    নাকি কোনো একটা কাজ শেষ না করেই তাঁকে চলে যেতে হবে?

    ঘরের দেওয়ালঘড়ির পেন্ডুলাম তখন টিকটিক করে দুলছিল।

    অনিরুদ্ধবাবু চায়ের কাপটা ধীরে ধীরে টি-টেবিলের ওপর নামিয়ে রাখলেন।

    কপালে হাত দিতেই হঠাৎ তাঁর মনে পড়ল দীপকের কথা।

    দীপক।

    এককালের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। জুনিয়র বেঙ্গল বডি বিল্ডিং চ্যাম্পিয়ন।

    দীপককে দেখলে একসময় মনে হতো, মানুষ এমন শরীর নিয়েও বোধহয় পৃথিবীতে জন্মায়! পাহাড়ের মতো চওড়া বুক, লোহার মতো শক্ত বাহু, আর সেই বিশাল শরীরের সঙ্গে অদ্ভুত মানানসই একটা সরল হাসি।

    ছয় মাইল দৌড়ে অনায়াসে পার করে দিতে পারত লোকটা।

    অথচ ব্রেন ক্যানসার তাকে কয়েক মাসের মধ্যে এমনভাবে নিংড়ে দিয়েছিল যে শেষদিকে নিজের শরীরটাকেই যেন আর বহন করতে পারত না।

    নার্সিংহোমের আইসিইউতে কোমায় শুয়ে থাকা দীপককে দেখতে গিয়েছিলেন অনিরুদ্ধবাবু।

    নল লাগানো শরীর। পাংশুটে মুখ। চোখ বন্ধ। কিন্তু দীপক মারা যাওয়ার পর তার নিথর দেহটা আর দেখতে যাননি তিনি।

    যে মানুষটাকে তিনি সারাজীবন সুস্থতা আর শক্তির প্রতীক হিসেবে দেখেছেন, তাকে শ্মশানের খাটে মৃতদেহ হয়ে পড়ে থাকতে দেখার মতো মানসিক শক্তি তাঁর ছিল না।

    দীপক চলে গেছে।

    অনিরুদ্ধবাবুর বড় দুই দাদাও বহু বছর আগে চলে গেছেন। পরিবারে এখন পুরুষ বলতে তিনি একাই।

    একসময় অবশ্য এমন ছিল না।

    শূন্য পকেট নিয়ে জীবন শুরু করেছিলেন তিনি। ব্যাঙ্কের চাকরিটাও ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে হাতছাড়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি হার মানেননি। জেদ নিয়ে ব্যবসায় নেমেছিলেন।

    সুবর্ণবণিক পরিবারের রক্তে হয়তো ব্যবসার একটা সহজাত টান থাকে। অনিরুদ্ধের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল। দেখতে দেখতে ব্যবসা দাঁড়িয়ে গেল। তারপর একের পর এক সম্পত্তি। শহরে চারটে বাড়ি। ব্যাংকে মোটা অঙ্কের টাকা। সমাজে প্রতিষ্ঠা।

    এক কথায় কোটিপতি।

    কিন্তু আজ এত কিছুর মাঝখানে দাঁড়িয়েও অনিরুদ্ধ চৌধুরী নিজেকে বড় নিঃস্ব মনে করেন।

    জীবনের এই শেষ বিকেলে এসে তিনি বুঝেছেন, টাকার অঙ্কে সাফল্য মাপা যায়, কিন্তু শান্তির কোনো হিসাব হয় না।

    কোটি টাকার সম্পত্তিও কানের ভেতরের সেই যন্ত্রণাদায়ক শব্দটাকে একটুও কমাতে পারে না।

    আর বুকের ভেতর যে শূন্যতা, তার কোনো ওষুধ নেই।

    বারান্দায় বসে থাকা অনিরুদ্ধবাবুর চোখ হঠাৎ গিয়ে আটকে গেল নাগেরবাজারের সেই ফুটপাতের দিকে।

    আর তখনই,

    চুয়াল্লিশ বছর আগের একটা বিকেল যেন ধীরে ধীরে বর্তমানের ওপর এসে বসে গেল।

    তখন এই নাগেরবাজার এমন ছিল না। রাস্তাঘাট অন্যরকম। ট্রাম চলত ধীর গতিতে। মানুষের ভিড়ও ছিল অন্যরকম। আর অনিরুদ্ধের গায়ে থাকত সস্তা সুতির জামা।

    পকেটে থাকত সাকুল্যে কয়েক আনা বাসভাড়া। সেই সময়েই এই পথ দিয়ে হেঁটে যেত একটি কিশোরী। তার পায়ের শব্দ আজও অনিরুদ্ধের মনে আছে।

    কানের ভেতরের সেই একটানা বাঁশির শব্দের মধ্যেও হঠাৎ যেন বহু দূর থেকে ভেসে এল একটি কণ্ঠস্বর।

    চঞ্চল একটা মেয়ে।

    চোখে হরিণীর মতো ভয়।

    আর এমন এক ভালোবাসা, যার নাম তখনও হয়তো সে নিজেই জানত না।

    কণ্ঠস্বরটা খুব আস্তে বলল,

    “আপনাকে একদিন না দেখলে আমার কত যে খারাপ লাগে, আপনি জানেন?”

    অনিরুদ্ধ চৌধুরী চোখ বন্ধ করলেন। বৃদ্ধ হাতের শিরা ওঠা আঙুলগুলো কেঁপে উঠল। চোখের কোণ বেয়ে একটা জল গড়িয়ে পড়ল।

    জলটা গিয়ে পড়ল টি-টেবিলের ওপর রাখা কোটি টাকার সাম্রাজ্যের দলিলপত্রের ওপর। পাশেই পড়ে ছিল একগুচ্ছ চাবি। আজ এত বছর পরও অনিরুদ্ধ চৌধুরী সেই একটি কথার উত্তর খুঁজে চলেছেন।

    কিন্তু উত্তরটা তিনি কখনও পাননি। বরং বয়স যত বেড়েছে, একটা সত্য তত স্পষ্ট হয়েছে

    জীবনে কিছু প্রশ্নের উত্তর না পাওয়ার চেয়েও বড় আফসোস হলো, প্রশ্নটাই কোনোদিন করা হয়নি।

    অনিরুদ্ধ চৌধুরীর জীবনে এমনই একটি প্রশ্ন ছিল।

    যে প্রশ্নটি তিনি কোনোদিন করেননি।

    চলবে…

    2
    1 Comment

Friends

Skip to toolbar