Profile Photo

বিষণ্ন সুমনOffline

  • logolabbd
  • Profile picture of বিষণ্ন সুমন

    বিষণ্ন সুমন

    • 1 month, 1 week ago

    সীমানা পেরিয়ে
    (পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ)

    অধ্যায় ২৯
    র‌্যাঞ্চের ওপর হামলা শেষ হওয়ার পরও বন্দুকের গন্ধ বাতাসে লেগে ছিল। দুপুরের সূর্য পশ্চিমে ঢলে পড়েছে, কিন্তু খোলা মাঠের ওপর ধুলো এখনও পুরোপুরি বসেনি। ভাঙা বেড়ার কয়েকটি খুঁটি মাটিতে কাত হয়ে পড়ে আছে। কোথাও কাঠের তক্তায় গুলির কালো দাগ, কোথাও ছড়িয়ে আছে ভাঙা জানালার কাচ। যে উঠোনে সকালে ঘোড়ার খুরের শব্দ আর মানুষের কাজের ব্যস্ততা ছিল, সেখানে এখন পড়ে আছে শুকনো কাঠের টুকরো, ছেঁড়া দড়ি আর ধুলোয় মাখা রক্তের দাগ।

    কয়েকটি ঘোড়া এখনও অস্থির। কেউ তাদের শান্ত করার চেষ্টা করছে, কেউ দড়ি বদলে নতুন জায়গায় বাঁধছে। গবাদি পশুগুলোকে আবার মাঠে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু তারা আগের মতো নিশ্চিন্ত নয়। বারবার মাথা তুলে চারদিকে তাকাচ্ছে। দূরের কোনো শব্দ পেলেই কান খাড়া করছে। মনে হচ্ছে, মানুষের চেয়ে পশুরাই যেন এইমাত্র ঘটে যাওয়া বিপদের গন্ধটা বেশি সময় ধরে মনে রাখবে।

    লারসেনকে বাড়ির বারান্দার কাছে একটা চেয়ারে বসানো হয়েছে। তার বাম পাশের জামা কেটে ক্ষত পরিষ্কার করা হয়েছে। গুলি শরীর ভেদ করে বেরিয়ে যায়নি, কিন্তু গভীরে ঢোকেনি বলেই মনে হচ্ছে। ইলাই বারবার কাপড় বদলে ক্ষতের ওপর চাপ দিচ্ছে। লারসেন মুখে কোনো অভিযোগ করছে না। শুধু মাঝে মাঝে চোয়াল শক্ত হয়ে উঠছে, যখন ব্যথাটা একটু বেশি বাড়ছে।

    এলিয়াস পাশের ঘরে শুয়ে। পাহাড়ের ক্ষত এখনও পুরোপুরি শুকোয়নি। আজকের বন্দুকযুদ্ধ তার শরীরকে আরও দুর্বল করে দিয়েছে। তবু সে ঘুমাচ্ছে না। দরজা খোলা থাকায় বাইরে র‌্যাঞ্চের প্রতিটি শব্দ তার কানে পৌঁছাচ্ছে।

    বাড ভাঙা বেড়ার পাশে দাঁড়িয়ে ক্ষয়ক্ষতির হিসাব করছিল। তার হাতে একটা ছোট নোটবুক। কোথায় কত কাঠ ভেঙেছে, কোন ঘোড়া হারিয়েছে, কোন অস্ত্রের কত গুলি খরচ হয়েছে, সবকিছু সে লিখে রাখছে। তার মুখে কোনো আবেগ নেই। কিন্তু চোখে সেই সতর্কতা, যা গত কয়েকদিনে আরও গভীর হয়েছে।

    ক্লে পশ্চিম দিকের বেড়ার কাছে দাঁড়িয়ে বন্দুক পরিষ্কার করছিল। তার দুই কোল্ট হাঁটুর পাশে রাখা। মাঝে মাঝে সে দূরের মাঠের দিকে তাকাচ্ছে। হ্যাঙ্ক একটু উঁচু জায়গায় বসে উইনচেস্টার কোলে নিয়ে পাহারা দিচ্ছে। মিগুয়েল আক্রমণকারীদের খুরের দাগ অনুসরণ করে অনেক দূর পর্যন্ত গিয়েছিল। এখনও ফেরেনি।

    রুবেন বাড়ির বারান্দায় বসে ছিল। তার হাতে কাগজ। ব্ল্যাক রিভারের দিকে পাঠানো লোকদের কাছে আবার খবর পাঠানোর ব্যবস্থা করছে। কেউ কেউ তাকে জিজ্ঞেস করেছে, আর কত লোক লাগবে। সে শুধু মাথা নেড়ে বলেছে, যত কম লোককে জানানো যায়, তত ভালো।

    এই সবকিছুর মাঝখানে মারদেকা একা দাঁড়িয়ে ছিল। তার কোমরে হোলস্টার। পিস্তল ভেতরে। আজ সেই অস্ত্র থেকে সে একটি গুলিও ছোড়েনি।

    কিন্তু তার মনে হচ্ছিল, যেন পুরো দিনটাই সেই একটিমাত্র প্রশ্ন তাকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে। যদি সে গুলি করত? যদি সেই মানুষটা তাকে না দেখে সরাসরি রাইফেল তুলত? যদি লারসেন সেখানে না থাকত? যদি আরেকটু দেরি হতো?

    সে জানে না। সে শুধু জানে, যখন মানুষের মুখটা তার সামনে উঠেছিল, তার হাত পিস্তলের বাঁটে পৌঁছেও থেমে গিয়েছিল।

    পাহাড়ে সে শত্রুর হাত থেকে ছুরি কেড়ে নিয়েছে। অন্ধকারে মানুষের চলার শব্দ শুনে পথ বদলেছে। গুলির মধ্যে দিয়ে আহত মানুষকে নিয়ে বেরিয়ে এসেছে। কিন্তু আজ প্রথমবার তাকে নিজের হাতে সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল, একজন মানুষ বাঁচবে, না মরবে।

    এই সিদ্ধান্তটাই তাকে ভেতর থেকে অস্বস্তি দিচ্ছিল। সে বুঝতে পারছিল না, সে দুর্বল হয়েছিল, নাকি ঠিক কাজটাই করেছিল।

    বিকেলের আলো ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসছিল। মারদেকা একসময় লারসেনের কাছে গিয়ে দাঁড়াল। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে সে বলল, “আমি গুলি করতে পারিনি।”

    লারসেন তার দিকে তাকাল। তার মুখে ব্যথার ছাপ ছিল, কিন্তু চোখ শান্ত। “জানি।”

    মারদেকা নিচের দিকে তাকাল। “আমি যদি গুলি করতাম, লোকটা মারা যেতে পারত।”

    লারসেন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ধীরে বলল, “হতে পারত।”

    মারদেকা মাথা তুলল। সে যেন অন্য উত্তর আশা করেছিল।

    লারসেন বলল, “কিন্তু বন্দুক হাতে নেওয়া আর মানুষ হত্যার জন্য প্রস্তুত হওয়া এক জিনিস নয়।”

    মারদেকা কিছু বলল না।

    “তুমি আজ গুলি করোনি বলে তুমি দুর্বল নও।” লারসেন বলল। “তুমি শুধু এখনও জানো না, কখন গুলি করা দরকার।”

    এই কথাটা মারদেকার মনে গেঁথে গেল।

    সূর্য ডুবে যাওয়ার পর র‌্যাঞ্চে রাতের প্রস্তুতি শুরু হলো। ভাঙা বেড়ার জায়গাগুলো সাময়িকভাবে বন্ধ করা হলো। পাহারার জায়গা বদলানো হলো। হ্যাঙ্ক উত্তর দিকে গেল, ক্লে পশ্চিমে। বাড দক্ষিণের পথটা পরীক্ষা করল। রুবেন আবার দুজন লোককে খবর নিয়ে বের করে দিল।

    মিগুয়েল অনেক রাতে ফিরল। তার ঘোড়ার শরীর ঘামে ভেজা। সে নামার পর সরাসরি লারসেনের কাছে গেল। বেশি কথা বলল না। শুধু জানাল, শত্রুরা র‌্যাঞ্চ থেকে অনেক দূরে গিয়ে উত্তর-পশ্চিমে ঘুরেছে। সেখানে কয়েকটি ঘোড়ার দাগ মিলেছে অন্য দাগের সঙ্গে।

    লারসেনের চোখ সরু হলো। “কেইনের লোক?”

    মিগুয়েল কাঁধ ঝাঁকাল। “নিশ্চিত নই। কিন্তু তারা থামেনি।”

    এই খবরের পর আর কোনো আলোচনা হলো না।

    পরদিন ভোরে মারদেকা আবার লারসেনের সামনে দাঁড়াল।

    লারসেন তখনও পুরোপুরি সুস্থ হয়নি। বাম হাত নড়াতে কষ্ট হচ্ছে। তবু তার সামনে কাঠের খুঁটি, টেবিল আর হোলস্টার রাখা। পিস্তলটাও আছে।

    মারদেকা এগিয়ে এল।

    লারসেন বলল, “গতকাল তুমি কী শিখেছ?”

    মারদেকা একটু ভেবে বলল, “গুলি করার আগে ভাবতে হয়।”

    লারসেন মাথা নেড়ে বলল, “আর?”

    “পা ঠিক রাখতে হয়।”

    “আর?”

    মারদেকা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

    লারসেন বলল, “সময়।”

    মারদেকা মাথা তুলল।

    “বন্দুক দ্রুত বের করাই সবচেয়ে বড় কথা নয়। সঠিক সময়ে বের করতে জানতে হয়।”

    তারপর আবার অনুশীলন শুরু হলো। প্রথমে শুধু হাত। হোলস্টারের ওপর রাখা। সরানো। আবার রাখা।

    তারপর ধীরে অস্ত্র বের করা। কবজি সোজা রাখা। শরীরের ভার যেন সামনে না চলে যায়। পা যেন অকারণে নড়ে না ওঠে। অস্ত্র সামনে আসার আগেই চোখ যেন লক্ষ্যস্থির করে।

    প্রথম কয়েকবার মারদেকার হাত ঠিকমতো চলল না। একবার পিস্তলের বাঁট হোলস্টারের মুখে আটকে গেল। আরেকবার অস্ত্র বের করতে গিয়ে তার ডান পা অযথা পিছিয়ে গেল।

    লারসেন কোনো রাগ দেখাল না। সে শুধু ভুলটা দেখিয়ে দিল।

    মারদেকা আবার করল। তারপর আবার।

    কিছুক্ষণ পর ক্লে দূর থেকে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগল। সে বন্দুক পরিষ্কার করা থামিয়ে মারদেকার দিকে তাকিয়ে ছিল। একসময় তার মুখে হালকা হাসি ফুটল। “ছেলেটা দ্রুত নয়।”

    লারসেন তার দিকে তাকাল।

    ক্লে বলল, “কিন্তু ভুল সময়েও বন্দুক বের করছে না।”

    লারসেন কিছু বলল না। শুধু মারদেকার দিকে তাকাল।

    মারদেকা আবার হোলস্টারের ওপর হাত রাখল। এইবার তার হাত আগের চেয়ে স্থির।

    সকালের রোদ তখন ধীরে ধীরে উঠছে। দূরে ঘোড়াগুলো মাঠে ছুটছে। ভাঙা বেড়ার পাশে নতুন কাঠ বসানোর শব্দ হচ্ছে। র‌্যাঞ্চ আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চেষ্টা করছে।

    কিন্তু মারদেকার জন্য সেই সকালটা আর আগের মতো নয়। তার সামনে এখন শুধু বন্দুক শেখার শিক্ষা নয়। সামনে একটা সিদ্ধান্তও তৈরি হচ্ছে।

    সাত বছর বয়সে সে দৌড়েছিল, কারণ তার বাবা তাকে বলেছিল, দৌড়াও।”

    আজ সে তেরো বছরের। এখন তার সামনে দৌড়ে পালানোর পথ থাকলেও, সেই পথে একা চলে যাওয়ার কোনো কারণ নেই।

    এই র‌্যাঞ্চে ইলাই আছে। বাড আছে। ক্লে, হ্যাঙ্ক, মিগুয়েল, রুবেন আছে। আহত অবস্থায় লারসেন আছে। এলিয়াস আছে। এরা তার রক্তের মানুষ নয়, কিন্তু তার জীবনের মানুষ।

    মারদেকা ধীরে পিস্তলটা হোলস্টারে ফিরিয়ে দিল। এইবার তার হাত কাঁপল না।

    দূরের পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে সে বুঝতে পারল, ভিক্টর কেইন এখনও শেষ কথা বলেনি। আর এবার সে তার জন্য অপেক্ষা করবে।

    সূর্য যখন র‌্যাঞ্চের ওপর উঠে এল, তখন আগের দিনের যুদ্ধের চিহ্নগুলো এখনও মুছে যায়নি। ভাঙা বেড়ার জায়গায় নতুন কাঠ বসানো হচ্ছে, মাটিতে জমে থাকা রক্ত শুকিয়ে কালচে হয়ে গেছে, আর বাড়ির দেয়ালে গুলির দাগগুলো যেন নীরব সাক্ষীর মতো দাঁড়িয়ে আছে। দূরের মাঠে আবার গবাদি পশু চরছে, ঘোড়াগুলোও ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়েছে, কিন্তু র‌্যাঞ্চের মানুষগুলোর চোখে সেই স্বাভাবিকতা পুরোপুরি ফিরে আসেনি। প্রত্যেকেই জানে, যে লোকেরা গতকাল এসেছিল তারা পরাজিত হয়ে ফিরে যায়নি। তারা শুধু দেখে গেছে, মেপে গেছে, তারপর চলে গেছে।

    লারসেনের ক্ষত এখনও তাকে কষ্ট দিচ্ছে। সে হাঁটছে, কাজ করছে, লোকজনের সঙ্গে কথা বলছে, কিন্তু মাঝে মাঝে বাম হাতটা শরীরের কাছে একটু শক্ত করে ধরে রাখছে। ইলাই তাকে বিশ্রাম নিতে বলেছে বহুবার। লারসেন শোনেনি। তার কাছে আহত হওয়া মানে কাজ থামিয়ে দেওয়া নয়। তবে আগের মতো দ্রুত চলতে পারছে না, এটুকু সে নিজেও বুঝতে পারছে।

    মারদেকার প্রশিক্ষণও থামেনি। বরং এখন সেটাই তার দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হয়ে উঠেছে। সকালে লারসেন তাকে খোলা জায়গায় দাঁড় করায়। দুপুরে সে নিজের মতো করে অনুশীলন করে। সন্ধ্যায় ক্লে কখনও কখনও তাকে দূর থেকে দেখে। কেউ তাকে প্রশংসা করে না। কেউ বলে না যে সে অসাধারণ। ভুল হলে ভুলই বলা হয়, আবার করতে বলা হয়।

    প্রথম কয়েকদিন মারদেকা বারবার একই ভুল করল। অস্ত্র বের করার সময় তার হাত কখনও একটু নিচে চলে যায়, কখনও পা অকারণে নড়ে ওঠে। কখনও সে লক্ষ্যস্থির করার আগেই হাত শক্ত করে ফেলে। লারসেন প্রতিবার তাকে থামিয়ে দেয়। “তাড়াহুড়ো করো না।”

    মারদেকা আবার শুরু করে।

    কিছুক্ষণ পর, “পা দেখো।”

    সে নিজের পায়ের দিকে তাকায়।

    “চোখ সামনে রাখো। পা তুমি অনুভব করবে।”

    মারদেকা আবার চেষ্টা করে।

    এই শিক্ষা বাইরে থেকে দেখলে একঘেয়ে মনে হতে পারে। কিন্তু মারদেকার জন্য প্রতিটি মুহূর্ত ছিল নিজের শরীরকে নতুন করে চিনে নেওয়ার মতো। পাহাড়ে সে যে ভারসাম্য এতদিন স্বতঃস্ফূর্তভাবে ব্যবহার করেছে, এখন সেই একই ভারসাম্যকে অস্ত্রের সঙ্গে মিলিয়ে নিতে হচ্ছে। পাথরের ওপর দাঁড়িয়ে শরীরের ওজন সামলানো আর বন্দুক হাতে দাঁড়িয়ে থাকা এক জিনিস নয়। কিন্তু মূল শিক্ষা একই, শরীরকে আগে মানতে হবে, তারপর অস্ত্রকে।

    এক সকালে লারসেন কাঠের খুঁটির সামনে দাঁড়িয়ে একটা খালি বোতল ঝুলিয়ে দিল। তারপর অনেক দূরে সরে গিয়ে মারদেকাকে বলল, অস্ত্র বের না করে শুধু দাঁড়িয়ে থাকতে।

    মারদেকা অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল। “লক্ষ্য দেখো।”

    মারদেকা বোতলের দিকে তাকাল।

    “এখন চোখ বন্ধ করো।”

    সে চোখ বন্ধ করল।

    “এবার বলো, তোমার ডান পা কোথায়।”

    মারদেকা কয়েক মুহূর্ত নীরব থেকে বলল, “একটু সামনে।”

    “বাঁ পা?”

    “পেছনে।”

    “শরীরের ভার?”

    মারদেকা উত্তর দিল, “দুই পায়ে।”

    লারসেন মাথা নেড়ে বলল, “এবার চোখ খোলো।”

    মারদেকা চোখ খুলল।

    “বন্দুক হাতে নিলে এই জিনিসটাই বদলাবে না। শুধু তোমার মন বদলাবে। ভয় পেলে পা শক্ত হবে। রাগলে হাত শক্ত হবে। তাড়াহুড়ো করলে চোখ ভুল করবে। তাই আগে শরীরকে নিজের কথা শুনতে শেখাও।”

    মারদেকা কিছু বলল না।

    সেদিন প্রথমবার তাকে গুলি ছোড়ার অনুমতি দেওয়া হলো। খুব দূরের একটা কাঠের বোর্ডে ছোট একটি কালো দাগ করা হয়েছিল। লারসেন তাকে বলেছিল, গুলি করার আগে অন্তত কয়েক মুহূর্ত লক্ষ্যস্থির রাখতে। মারদেকার হাত সামান্য কাঁপছিল। গুলি ছুটল। শব্দে কাছের ঘোড়াগুলো চমকে উঠল।

    গুলি দাগের অনেকটা পাশে গিয়ে কাঠে ঢুকল। মারদেকা হতাশ হয়ে তাকিয়ে রইল।

    লারসেন শুধু বলল, “আবার।”

    দ্বিতীয় গুলি আগের চেয়ে কাছে গেল। তৃতীয়টি আরও কাছে।

    চতুর্থবার সে গুলি করার আগে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করল। তারপর ট্রিগার চাপল। গুলি বোর্ডের কালো দাগের একেবারে পাশে গিয়ে লাগল।

    ক্লে দূর থেকে সব দেখছিল। সে এগিয়ে এসে বোর্ডের দিকে তাকাল। তারপর মারদেকার দিকে। “মন্দ নয়।”

    এই দুটো শব্দই তার কাছ থেকে বড় প্রশংসা। মারদেকা কোনো উত্তর দিল না।

    সেদিন বিকেলে লারসেন তাকে একটা কথা বলল, যা তার মনে অনেক দিন থাকবে। “তুমি ভাবছ, বন্দুক তোমাকে শক্তিশালী করবে।”

    মারদেকা চুপ করে রইল। “ভুল। বন্দুক শুধু তোমার সিদ্ধান্তকে দূরে পৌঁছে দেয়।”

    এই কথার অর্থ সে পুরোপুরি বুঝতে পারেনি। কিন্তু পাহাড়ের সেই রাত, র‌্যাঞ্চের ওপরের হামলা, নিজের থেমে যাওয়া হাত, লারসেনের রক্তাক্ত শরীর, সবকিছু মনে পড়তেই কথাটা ধীরে ধীরে তার কাছে পরিষ্কার হতে লাগল।

    বন্দুকের ভয় শুধু গুলির নয়। ভয় হলো, একবার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললে সেটা আর ফিরিয়ে নেওয়া যায় না।

    দিনগুলো এভাবেই কাটতে লাগল। লারসেন ধীরে ধীরে সুস্থ হতে লাগল। এলিয়াসের কাঁধের ক্ষতও শুকোতে শুরু করেছে। সে এখনও ভারী কাজ করতে পারে না, কিন্তু প্রতিদিন বারান্দায় বসে অনেকক্ষণ বাইরে তাকিয়ে থাকে। তার চোখে মাঝে মাঝে এমন একটা দূরত্ব দেখা যায়, যেন সে বর্তমান র‌্যাঞ্চের দিকে তাকিয়েও বহু বছর আগের কোনো দৃশ্য দেখছে।

    রুবেনের খবরও একদিন এল। কেইনকে কেউ দেখেনি। কিন্তু তার লোকদের চলাফেরার খবর পাওয়া গেছে। তারা ছড়িয়ে আছে। কেউ শহরের কাছে, কেউ পাহাড়ের দিকে, কেউ আবার র‌্যাঞ্চের উত্তরের পথের আশেপাশে।

    এর অর্থ একটাই। কেইন তাড়াহুড়ো করছে না। সে অপেক্ষা করছে। কীসের জন্য, সেটা কেউ জানে না। কিন্তু লারসেন জানত, এই অপেক্ষা বেশিদিন চলবে না।

    এক সন্ধ্যায় মারদেকা অনুশীলন শেষ করে পিস্তল খুলে টেবিলের ওপর রাখছিল। তার হাত আগের চেয়ে অনেক বেশি স্বাভাবিকভাবে অস্ত্রটি ধরছে। গুলি ছোড়ার সময় তার চোখ আর বন্ধ হয় না। মানুষের দিকে তাকিয়ে গুলি করার শিক্ষা এখনও সে পায়নি, এবং লারসেন ইচ্ছা করেই তাকে সে শিক্ষা দেয়নি।

    সেদিন লারসেন তাকে থামাল। “তুমি গতবারের কথা ভাবছ?”

    মারদেকা বুঝল, সে র‌্যাঞ্চে হামলার কথা বলছে। “হ্যাঁ।”

    লারসেন কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল। “তুমি গুলি করোনি বলে নিজের ওপর রাগ করছ?”

    মারদেকা মাথা নিচু করল। “আগে ভাবতাম, বন্দুক চালাতে পারলেই ভয় থাকবে না।”

    লারসেন ধীরে বলল, “ভয় থাকবে।”

    মারদেকা তাকাল।

    “বন্দুকবাজও ভয় পায়। পার্থক্য হলো, সে ভয়কে নিজের সিদ্ধান্ত নিতে দেয় না।” কথাটা শেষ করে লারসেন আর কিছু বলল না।

    সেই রাতে মারদেকা অনেকক্ষণ ঘুমাতে পারল না। জানালার বাইরে চাঁদের আলোয় র‌্যাঞ্চের বেড়া দেখা যাচ্ছে। পাহারার জায়গায় হ্যাঙ্কের ছায়া নড়ছে। দূরে ঘোড়ার হালকা ডাক। কোথাও কাঠের দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ।

    সে ভাবল, সাত বছর বয়সে সে কী জানত? কিছুই না। সে শুধু জানত, আগুন থেকে দূরে যেতে হবে। গুলি থেকে দূরে যেতে হবে। বাবার কণ্ঠ তাকে বলেছিল, দৌড়াও। সে দৌড়েছিল।

    আজ সে জানে কেন দৌড়েছিল। আজ সে জানে, তার বাবা কেন মারা গিয়েছিল। আর এখন সে জানে, তার সামনে থাকা মানুষগুলো তার জন্য নিজেদের জীবন ঝুঁকিতে ফেলতে প্রস্তুত।

    তাই এবার দৌড়ে পালানোর অর্থ কী? পরদিন ভোরে সে নিজেই লারসেনের কাছে গেল। “আজ কী শিখব?”

    লারসেন তার দিকে তাকিয়ে সামান্য হাসল। “আজ তুমি নিজেই বলো।”

    মারদেকা হোলস্টারের ওপর হাত রাখল। “অপেক্ষা।”

    লারসেন মাথা নেড়ে বলল, “ঠিক।”

    মারদেকা ধীরে অস্ত্র বের করল। এবার তার হাত স্থির। সে গুলি চালাল না। শুধু সামনে তাকিয়ে রইল।

    দূরে সূর্য উঠছে। ভাঙা বেড়ার পাশে নতুন কাঠ বসানো হয়েছে। র‌্যাঞ্চের কাজ আবার চলছে। ইলাই রান্নাঘরে। বাড লোকজনকে নির্দেশ দিচ্ছে। হ্যাঙ্ক পাহারায়। ক্লে অস্ত্র পরিষ্কার করছে। মিগুয়েল ঘোড়ার পিঠে উঠছে। রুবেন আবার কোনো খবরের অপেক্ষায়।

    এরা কেউ জানে না, মারদেকার মনে তখন কী সিদ্ধান্ত তৈরি হচ্ছে। সে প্রতিশোধ নিতে চায় না। তার বাবাকে তো আর ফিরিয়ে আনা যাবে না। কেইনকে হত্যা করলেই সেই রাতের আগুন মুছে যাবে না।

    কিন্তু যদি শত্রুরা আবার আসে, যদি এই মানুষগুলোর দিকে বন্দুক ওঠে, তাহলে এবার সে শুধু পাথরের আড়ালে লুকিয়ে থাকবে না। সে তাদের পাশে দাঁড়াবে। মারদেকা পিস্তলটা ধীরে হোলস্টারে ফিরিয়ে দিল।

    দূরের পাহাড় তখন সকালের আলোয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সেই পাহাড়ের কোথাও তার শৈশবের ভয় পড়ে আছে। কোথাও পড়ে আছে ড্যানিয়েল রিডের শেষ রাতের স্মৃতি। আর তারও ওপারে, অদৃশ্য কোনো পথে, ভিক্টর কেইন অপেক্ষা করছে।

    র‌্যাঞ্চের ওপর বাতাস বয়ে গেল। মারদেকা এবার পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে রইল না। সে তাকাল নিজের চারপাশে। তারপর ধীরে ঘুরে র‌্যাঞ্চের ভেতরের দিকে হাঁটতে শুরু করল।

    সে আর পালাবে না। এবার তার হাতে বন্দুক থাকবে, কিন্তু বন্দুকের জন্য নয়। তার মানুষগুলোর জন্য।

    আর দূরের কোথাও, অদৃশ্য শত্রুও হয়তো তার সেই সিদ্ধান্তের অপেক্ষাতেই ছিল।
    (চলবে)

    2
    4 Comments
    • ঘটনার ঘনঘটায় ভরপুর এই সুন্দর রচনার প্রতিটি বাঁক খুব যত্নের সাথে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, বিশেষ করে আপনার এই লাইনটি—”বন্দুকবাজও ভয় পায়, পার্থক্য হলো, সে ভয়কে নিজের সিদ্ধান্ত নিতে দেয় না”—খুবই গভীর এবং হৃদয়স্পর্শী।

    • মারদেকার চরিত্রটা আস্তে আস্তে বদলে যাচ্ছে—এটাই সম্ভবত গল্পের সবচেয়ে সুন্দর দিক

    • ভয়কে জয় করার শিক্ষাই আসলে সিদ্ধান্তকে সঠিক সময়ে দাঁড় করানোর শিক্ষা দৌড়ে পালানোর বদলে এবার সে নিজের মানুষদের পাশেই দাঁড়াতে শেখে।…..🤍🖤

    • গল্পটা দারুণ সাবলীল ভঙ্গিতে লিখেছেন, পড়ার সময় চোখের সামনে পুরো দৃশ্যপট ভেসে উঠছিল। মারদেকার মানসিক দ্বন্দ আর লারসেনের শিক্ষাগুলো খুব সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন আপনি। পরের পর্বের জন্য অপেক্ষা রইল, অনেক ভালো লেগেছে আপনার লেখাটা।

আমি মানুষের ভীড়ে মানুষ খোঁজে ফিরি

বিষণ্ন সুমন

ডিজাইনার

স্কুল বয়েস থেকেই লিখালিখা করি। যদিও পড়ি তার আগে থেকেই। আমি বিশ্বাস করি, ভালো লিখতে হলে আগে ভালো পড়তে জানতে হবে। তাই এখন পর্যন্ত নিজেকে লেখক না ভেবে ভালো পাঠক হিসেবেই পরিচয় দিতে সাচ্ছন্দ্য বোধ করি। প্রথম প্রকাশিত বই সেই ১৯৯৬ সালের গ্রন্থমেলায় “কে বলে তুমি নেই” রোমান্টিক উপন্যাস এবং সম্পূর্ণ মৌলিক ওয়েস্টার্ণ “লোন রাইডার”। পরবর্তীতে ২০১২ সালের বই মেলায় অন্যপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত গল্প সংকলন। মাঝে banglanews24.com এর সাহিত্যপাতায় নিয়োমিত লিখেছি। আসলে আমি লেখায় কখনোই অনর্গল নই। মাঝেমাঝেই বন্ধাত্ব্য এসে আমায় থামিয়ে রাখে। একটা শব্দও লিখতে পারিনা। তখন আমার পুরনো লিখাগুলো নিজেই পাঠক হয়ে পড়ি আর ভাবি, এ গুলো কি সত্যিই আমি লিখেছিলাম(?)। এই ৫৪ বছর বয়সে এসেও এই একটাই প্রশ্ন নিজেকে করে যাচ্ছি প্রতিনিয়ত।

Skip to toolbar