Profile Photo

বিষণ্ন সুমনOffline

  • logolabbd
  • Profile picture of বিষণ্ন সুমন

    বিষণ্ন সুমন

    • 1 month, 1 week ago

    সীমানা পেরিয়ে
    (পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ)

    অধ্যায় ৩০
    র‌্যাঞ্চের ওপর সকাল নেমেছিল, কিন্তু সেই সকাল আর অন্য দিনের মতো ছিল না। সূর্য উঠেছিল যথারীতি, ঘাসের ডগায় আলো পড়েছিল, আস্তাবলের সামনে ঘোড়াগুলোকে পানি দেওয়া হচ্ছিল, দূরের মাঠে গবাদি পশু ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছিল, তবু পুরো জায়গাটার ওপর যেন অদৃশ্য একটা চাপ জমে ছিল। ভাঙা বেড়ার জায়গায় নতুন কাঠ বসানো হয়েছে, বাড়ির দেয়ালের গুলির দাগ মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে, কিন্তু কিছু দাগ এমন থাকে যেগুলো কাঠ থেকে মুছে ফেলা গেলেও মানুষের মন থেকে মুছে যায় না। পাহাড়ের দিকে তাকালেই সবাই জানত, বিপদ চলে যায়নি। ভিক্টর কেইন এখনও কোথাও আছে।

    লারসেনের ক্ষত শুকিয়ে আসছিল। হাঁটতে তার আর আগের মতো কষ্ট হচ্ছিল না, কিন্তু বাম কাঁধের কাছে শক্ত ব্যথা রয়ে গেছে। এলিয়াসও ধীরে ধীরে সুস্থ হচ্ছে। কয়েকদিন আগের দুর্বলতার জায়গায় এখন তার চোখে আবার পুরোনো দৃঢ়তা ফিরেছে। তবু সে ভারী কাজ করে না। বারান্দায় বসে থাকে, দূরের পথ দেখে, মানুষের কথাবার্তা শোনে। যেন এই র‌্যাঞ্চের প্রতিটি শব্দের মধ্য থেকে সে এমন কিছু খুঁজছে, যা অন্যদের কানে পৌঁছায় না।

    বাড হিগিন্স আগের মতোই কাজের হিসাব নিয়ে ব্যস্ত। কিন্তু এখন তার অভ্যাস হয়েছে কাজের মাঝেও একবার চারপাশ দেখে নেওয়া। ক্লে মরগান দিনের আলোয়ও কোমরের কোল্ট থেকে হাত খুব দূরে রাখে না। হ্যাঙ্ক ডসন র‌্যাঞ্চের উঁচু জায়গাগুলো বদলে বদলে পাহারা দেয়। মিগুয়েল প্রায় প্রতিদিন ঘোড়ায় চড়ে দূরের পথ দেখে আসে। রুবেন কোলের লোকেরা ব্ল্যাক রিভার, উত্তরের পথ আর পাহাড়ের নিচের বসতিগুলো থেকে খবর নিয়ে আসে। কেউ কেইনের দেখা পায়নি, কিন্তু সবাই জানে, কোনো খবর না পাওয়া মানেই সে নেই, এমন নয়।

    মারদেকার দিন কাটছিল অন্যরকমভাবে। সকালবেলা লারসেনের সঙ্গে অনুশীলন, তারপর র‌্যাঞ্চের কাজ, আবার বিকেলে অস্ত্রের অনুশীলন। তার পিস্তল এখন কোমরের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে থাকে। হাঁটার সময় তার হাত আর অকারণে হোলস্টারের কাছে যায় না। অস্ত্র বের করার সময় শরীরের ভারসাম্য নষ্ট হয় না। কয়েক সপ্তাহ আগেও যে পিস্তল তার কাছে ছিল নতুন কোনো পৃথিবীর দরজা, এখন সেটাই ধীরে ধীরে তার শরীরের সঙ্গে মানিয়ে যাচ্ছে।

    কিন্তু তার মনে একটা প্রশ্ন ছিল। কেইন কেন অপেক্ষা করছে? উত্তরটা এক সকালে এসে পৌঁছাল।

    রুবেনের পাঠানো এক লোক ঘোড়া ছুটিয়ে র‌্যাঞ্চে ঢুকেছিল। লোকটা ক্লান্ত, ঘোড়াটা ঘামে ভেজা। সে কিছুক্ষণ রুবেনের সঙ্গে নিচু গলায় কথা বলল। রুবেনের মুখের ভাব বদলে গেল। তারপর সে সরাসরি লারসেনের কাছে গেল। কথাটা শুনে লারসেন কিছুক্ষণ নীরব রইল।

    খবরটা ছিল অল্প, কিন্তু যথেষ্ট। কেইনের লোকেরা আবার নড়াচড়া শুরু করেছে। এবার তাদের কথাবার্তায় বারবার একটা জিনিসের উল্লেখ এসেছে, পুরনো নথিপত্র।

    সেদিন সন্ধ্যার আগে মারদেকা লক্ষ্য করল, লারসেন তাকে বারবার দেখছে। শেষ পর্যন্ত রাত নামার পর সে মারদেকাকে বাড়ির পেছনের ঘরে ডাকল। ঘরটা ছোট, জানালার বাইরে অন্ধকার উঠোন। টেবিলের ওপর একটা পুরোনো লণ্ঠন জ্বলছে। আলো খুব বেশি নয়। কাঠের দেয়ালে দুজনের ছায়া স্থির হয়ে আছে।

    লারসেন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “তোমার কাছে আমার একটা কথা বলা দরকার।”

    মারদেকা অপেক্ষা করল।

    লারসেন টেবিলের নিচের একটা পুরোনো কাঠের বাক্স বের করল। বাক্সটা দেখতে সাধারণ। কিন্তু তার তালার ওপর বহু বছরের ব্যবহারের চিহ্ন। লারসেন চাবি ঘুরিয়ে ঢাকনা তুলল।

    ভেতরে কাপড়ে মোড়া কয়েকটি পুরোনো কাগজের প্যাকেট।

    মারদেকা এগিয়ে তাকাল।

    লারসেন বলল, “তেরো বছর আগে আমি দল ছেড়ে আসার সময় এগুলো সঙ্গে এনেছিলাম।”

    মারদেকা কিছু বলল না।

    “এগুলো শুধু পুরোনো কাগজ নয়। এখানে সেই দলের হিসাব আছে। কারা ছিল, কোথায় টাকা গেছে, কোন কাজ কে করেছে, অনেক কিছু।”

    লারসেন একটা প্যাকেটের ওপর হাত রাখল। “কেইনের বিরুদ্ধে প্রমাণও আছে।”

    ঘরের বাতাস যেন হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল। মারদেকা এতদিন জানত, লারসেন অতীত থেকে কিছু একটা নিয়ে পালিয়ে এসেছিল। জানত, ড্যানিয়েল রিড কোনো এক সময় সেই পুরোনো ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিল। কিন্তু এতদিন সে ভাবেনি, সেই অতীত এখনও কাগজের কয়েকটি পাতার মধ্যে বেঁচে আছে।

    লারসেন ধীরে ঢাকনা বন্ধ করল। “ড্যানিয়েল এই নথির কিছু অংশের কথা জানতে পেরেছিল। সে বুঝেছিল, কেইনের বিরুদ্ধে শুধু গল্প নয়, প্রমাণও আছে।”

    মারদেকার চোখ নিচু হয়ে গেল। ড্যানিয়েল কেন মারা গিয়েছিল, সেই প্রশ্নের শেষ উত্তরটাও যেন এবার সম্পূর্ণ হলো। তার বাবা কোনো অজানা কারণে মারা যায়নি। সে এমন কিছুর কাছে পৌঁছে গিয়েছিল, যা ভিক্টর কেইনের সাম্রাজ্যকে ধ্বংস করতে পারত। আর সেই প্রমাণ এখনও লারসেনের কাছে।

    বাইরে বাতাস উঠেছিল। জানালার ফাঁক দিয়ে শুকনো ঘাসের গন্ধ আসছিল। মারদেকা ধীরে বলল, “কেইন এগুলো নিতে চায়।”

    লারসেন মাথা তুলল। “হ্যাঁ।”

    কিছুক্ষণ দুজনের মধ্যে আর কোনো কথা হলো না। তারপর লারসেন বাক্সটা আবার সরিয়ে রাখল। “সে শুধু তোমাকে মারতে চায় না। সে চায়, তার বিরুদ্ধে থাকা শেষ প্রমাণটাও যেন পৃথিবীতে না থাকে।”

    মারদেকা জানালার বাইরে তাকাল। অন্ধকার মাঠের ওপারে পাহাড়ের কালো রেখা দেখা যাচ্ছে। সে বুঝতে পারল, কেইনের সঙ্গে এই লড়াই শুধু তার বাবার জন্য নয়। এটা সেইসব মানুষের জন্যও, যাদের নাম হয়তো এই কাগজগুলোর পাতায় লেখা আছে।

    পরদিন ভোর থেকেই র‌্যাঞ্চের পরিবেশ বদলে গেল। বাডকে সব জানানো হলো। ক্লে, হ্যাঙ্ক, মিগুয়েল এবং রুবেনও জানতে পারল নথির কথা। কেউ কাগজগুলো দেখতে চাইল না। প্রয়োজনও নেই। তারা শুধু বুঝল, কেইনের শেষ আঘাত এবার আরও বড় হতে পারে।

    লারসেন নথিগুলো অন্য কোথাও সরিয়ে রাখার কথা বলেছিল। কিন্তু মারদেকা জানত, জায়গা বদল করলেই সমস্যা শেষ হবে না। কেইন জানে নথি আছে। সে জানে লারসেনের কাছে আছে। সে জানে র‌্যাঞ্চ কোথায়।

    দুপুরের দিকে খবর এল, উত্তরের পুরোনো পথের পাশে কেউ একটা বার্তা রেখে গেছে। বাড গিয়ে সেটা নিয়ে এল। কাগজের টুকরো। মাত্র কয়েকটি কথা। নথি দাও। নইলে আগুন আবার জ্বলবে।

    কাগজটা পড়ার পর ঘরে কোনো শব্দ রইল না।

    ইলাইও সেখানে ছিল। সে কাগজটার দিকে তাকিয়ে রইল, তারপর মারদেকার দিকে। তার মুখে ভয় ছিল না, কিন্তু চোখে উদ্বেগ স্পষ্ট।

    বাড বলল, “ওরা চায় আমরা ভয় পাই।”

    লারসেন কাগজটা ভাঁজ করল। “ওরা জানে, ভয় দেখালে কীভাবে মানুষকে ভুল করানো যায়।”

    মারদেকা তখন জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। সে বাইরে তাকিয়ে রইল। তার চোখে র‌্যাঞ্চের প্রতিটি পরিচিত জায়গা ভেসে উঠল। আস্তাবল। রান্নাঘর। গবাদি পশুর ঘের। বাডের কাজের জায়গা। ক্লের পাহারার পথ। হ্যাঙ্কের উঁচু অবস্থান। মিগুয়েলের ঘোড়া। রুবেনের বারান্দা। আর সেই ঘর, যেখানে ইলাই তাকে অসুস্থ হলে খাবার খাইয়ে দিয়েছে।

    কেইন যদি এখানে আসে, গুলি শুধু তাকে লক্ষ্য করে আসবে না। সে ধীরে লারসেনের দিকে ফিরল। “আমি বাইরে যাব।”

    ঘরে থাকা সবাই তার দিকে তাকাল।

    লারসেন সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়ল। “না।”

    মারদেকা চুপ করে রইল।

    লারসেন বলল, “এটা তোমার একার লড়াই নয়।”

    মারদেকা এবার শান্ত গলায় বলল, “এই জন্যই যেতে চাই।”

    লারসেনের চোখে কঠিন দৃষ্টি ফুটে উঠল।

    মারদেকা জানত, সে কী বলতে চাইছে। সাত বছর বয়সে সে পালিয়েছিল। তখন তার সামনে ছিল শুধু আগুন, গুলি আর বাবার শেষ নির্দেশ। আজ তার সামনে অন্য কিছু আছে। তার পেছনে মানুষ আছে। এই মানুষগুলোকে সে বিপদের মধ্যে রেখে নিজে ঘরের আড়ালে বসে থাকতে পারবে না।

    এলিয়াস এতক্ষণ চুপ করে ছিল। সে ধীরে বলল, “ও ঠিক বলছে।”

    লারসেন তার দিকে তাকাল। “কেইন ছেলেটাকে চাইছে। নথিও চাইছে। যদি মারদেকা বাইরে যায়, হয়তো সে র‌্যাঞ্চের ওপর সরাসরি আঘাত করবে না।”

    ক্লে তখন দরজার পাশে দাঁড়িয়ে। সে ধীরে মাথা নেড়ে বলল, “খোলা মাঠে ওদের সুবিধা কম।”

    বাড কিছু বলল না। কিন্তু তার মুখ দেখে বোঝা গেল, সে হিসাব করছে।

    লারসেন দীর্ঘক্ষণ মারদেকার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর জানালার বাইরে তাকাল। খোলা মাঠের ওপারে পাহাড়। সেই পাহাড়ের দিকেই তাকিয়ে থাকতে থাকতে তার মুখের কঠোরতা ধীরে বদলে গেল।

    শেষ পর্যন্ত সে বুঝল, ছেলেটাকে আর আটকে রাখা যাবে না। তবে সে একা যাবে না।

    সন্ধ্যার আগে প্রস্তুতি শুরু হলো। বেশি লোক নয়। দূর থেকে পাহারা থাকবে। লারসেন, এলিয়াস, বাড, ক্লে, হ্যাঙ্ক, মিগুয়েল এবং রুবেন নির্দিষ্ট দূরত্বে থাকবে। তারা মারদেকার খুব কাছে যাবে না। কারণ শেষ মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নিতে হবে মারদেকাকেই।

    লারসেন তার পিস্তল পরীক্ষা করল। তারপর মারদেকার হোলস্টারের দিকে তাকাল। “ভয় পাচ্ছ?”

    মারদেকা সত্যি কথাই বলল। “হ্যাঁ।”

    লারসেন মাথা নেড়ে বলল, “ভালো।”

    মারদেকা তার দিকে তাকাল।

    “ভয় না থাকলে মানুষ বোকা হয়। ভয় থাকুক। শুধু তাকে তোমার হাত চালাতে দিও না।”

    রাত নামার আগে মারদেকা নিজের ঘরে গিয়ে কিছুক্ষণ একা বসে রইল। জানালার বাইরে অন্ধকার। বিছানার পাশে তার ছুরি। কোমরের পিস্তলটা খুলে টেবিলের ওপর রাখা। সে হাত বাড়িয়ে অস্ত্রটা তুলল, ওজন অনুভব করল।

    এটাই সেই অস্ত্র, যার দিকে তাকিয়ে কয়েক সপ্তাহ আগে তার হাত থেমে গিয়েছিল। একজন মানুষকে লক্ষ্য করে সে গুলি করতে পারেনি। আজ তাকে হয়তো আবার সেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

    কিন্তু এবার তার মনে প্রতিশোধের আগুন নেই। শুধু একটা পরিষ্কার অনুভূতি। সে কাউকে খুঁজে বের করতে যাচ্ছে না। সে অপেক্ষা করবে। কেইন আসবে।

    আর যে মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় আসবে, সে তখন নিজের সিদ্ধান্ত নিজেই নেবে।

    পরদিন ভোরে র‌্যাঞ্চের ওপর কুয়াশা ছিল সামান্য। সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে সেটা মিলিয়ে গেল। ঘোড়াগুলো প্রস্তুত করা হলো। দূরের মাঠে বাতাসে শুকনো ঘাস দুলছে। র‌্যাঞ্চের কাঠের বাড়িটা পেছনে রেখে মারদেকা ঘোড়ায় উঠল।

    একবার সে পেছনে তাকাল। ইলাই দরজার কাছে দাঁড়িয়ে। বাড ঘোড়ার পাশে। ক্লে নীরবে অস্ত্র পরীক্ষা করছে। হ্যাঙ্ক দূরের উঁচু জায়গায়। মিগুয়েল পথের দিকে তাকিয়ে। রুবেন তার পাশে। এলিয়াস আহত শরীর নিয়েও বেরিয়ে এসেছে। আর লারসেন দাঁড়িয়ে আছে সবার সামনে।

    মারদেকার মনে হলো, সে যেন নিজের ঘরটাকে পেছনে রেখে যাচ্ছে না। বরং নিজের ঘরকেই রক্ষা করতে বেরিয়ে যাচ্ছে। ঘোড়াগুলো ধীরে ধীরে র‌্যাঞ্চ ছাড়ল।

    কিছু দূর যাওয়ার পর খোলা প্রান্তর আরও বিস্তৃত হয়ে উঠল। শুকনো ঘাস কোমর পর্যন্ত উঠেছে কোথাও কোথাও। বাতাসে ধুলো। দূরের পাহাড় নীলচে ধোঁয়ার মতো। আকাশ বিশাল, মেঘহীন।

    মারদেকা সামনে তাকিয়ে রইল। তার ডান পাশে পিস্তল। বাম পাশে ছুরি। আর বুকের ভেতর সেই পুরোনো শব্দ নেই। দৌড়াও। আজ কেউ তাকে দৌড়াতে বলছে না। আজ সে নিজেই এগিয়ে যাচ্ছে।

    দূরে হঠাৎ একটা কালো বিন্দু দেখা গেল। তারপর আরেকটা।

    মিগুয়েল ঘোড়া থামাল। হ্যাঙ্ক দূরের উঁচু জায়গা থেকে হাত তুলল। সবাই থেমে গেল।

    খোলা প্রান্তরের ওপারে ধুলোর সরু রেখা উঠছে। কেউ আসছে।

    মারদেকার হাত হোলস্টারের কাছে গেল না। সে শুধু তাকিয়ে রইল। ধুলো ক্রমে ঘন হলো। ঘোড়ার খুরের শব্দ বাতাসে ভেসে এল।

    লারসেন দূর থেকে তাকে দেখছিল। আর তারপর ধুলোর ভেতর থেকে একটি মানুষ ধীরে ধীরে বেরিয়ে এল। কালো টুপি। কালো কোট। কোমরে পিস্তল। ঘোড়ার লাগাম এক হাতে। ভিক্টর কেইন।

    সে ঘোড়া থামিয়ে কিছু দূরে দাঁড়াল। তার পেছনে আরও কয়েকজন লোক ছিল, কিন্তু তারা অনেক দূরে থেমে গেল। যেন সবাই জানে, সামনে যে জায়গাটা, সেখানে আর অন্য কারও প্রয়োজন নেই।

    কেইনের চোখ সরাসরি মারদেকার ওপর স্থির হলো। তার ঠোঁটে ক্ষীণ হাসি ফুটল। “তুমি ড্যানিয়েল রিডের ছেলে।”

    মারদেকা কোনো উত্তর দিল না।

    কেইন ধীরে ঘোড়া থেকে নামল। তার চোখ একবার লারসেনের দিকে গেল, তারপর আবার মারদেকার দিকে ফিরল। “তেরো বছর ধরে অনেক কিছু বদলেছে,” সে বলল। “কিন্তু কিছু হিসাব বদলায়নি।”

    লারসেন দূর থেকে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

    কেইন তার দিকে তাকিয়ে বলল, “নথিগুলো কোথায়?”

    লারসেন কোনো উত্তর দিল না। কেইনের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।

    মারদেকা তখন প্রথমবার বুঝল, এই মানুষটির সবচেয়ে বড় ভয় মৃত্যু নয়। প্রমাণ। তার বিরুদ্ধে থাকা সত্য। আর সেই সত্য এখনও জীবিত।

    কেইন ধীরে মারদেকার দিকে এগিয়ে এল। খোলা প্রান্তরে বাতাস বইছে। শুকনো ঘাস দুলছে। ঘোড়াগুলো পেছনে দাঁড়িয়ে অস্থিরভাবে নড়ছে। দূরের পাহাড় নীরব সাক্ষীর মতো দাঁড়িয়ে আছে।

    মারদেকা আস্তে করে ঘোড়া থেকে নেমে দাঁড়ালো। ডানে পাশে কয়েক কদম সরে কেইনের মুখোমুখি অবস্থানে স্থির হলো। পায়ের ভর ঠিক করল। কেইনের চোখ নেমে গেল তার কোমরের পিস্তলের দিকে। তারপর আবার চোখ উঠল। দুজনের মধ্যে এখন কয়েক গজের বেশি দূরত্ব নেই।

    লারসেনের শিক্ষা মারদেকার মনে ফিরে এল। দ্রুত হওয়া নয়। সঠিক হওয়া।

    কেইনের ডান হাত ধীরে ধীরে কোমরের দিকে নামল।

    মারদেকা নড়ল না। তার বুকের ভেতর হৃদস্পন্দন দ্রুত হচ্ছে। ভয় আছে। কিন্তু ভয় এবার তার পা নিয়ন্ত্রণ করছে না।

    কেইনের আঙুল পিস্তলের বাঁট ছুঁল।

    মারদেকার চোখ স্থির হয়ে গেল তার হাতের ওপর।

    আর সেই মুহূর্তে পুরো প্রান্তর যেন নিঃশ্বাস বন্ধ করে অপেক্ষা করতে লাগল।

    কেইনের আঙুল ধীরে ধীরে পিস্তলের বাঁটের দিকে এগিয়ে গেল।

    মারদেকা তা দেখছিল। তার চোখে কোনো তাড়াহুড়ো নেই। পায়ের নিচে শুকনো মাটি, চারপাশে হলদে ঘাস, দূরে পাহাড়ের নীলচে রেখা। বাতাস কখনও ডান দিক থেকে এসে ঘাসগুলোকে একসঙ্গে নুইয়ে দিচ্ছে, আবার কখনও হঠাৎ থেমে যাচ্ছে।

    সেই থেমে যাওয়া বাতাসের মধ্যেই দুজন মানুষ দাঁড়িয়ে ছিল, একজন বহু বছরের অভিজ্ঞ বন্দুকবাজ, অন্যজন মাত্র তেরো বছরের এক ছেলে।

    কিন্তু এই মুহূর্তে বয়সের কোনো অর্থ ছিল না। কেইনের চোখ মারদেকার মুখে। মারদেকার চোখ কেইনের হাতে।

    লারসেন, এলিয়াস, বাড, ক্লে, হ্যাঙ্ক, মিগুয়েল আর রুবেন দূরে দাঁড়িয়ে। কেউ অস্ত্র তুলছে না। তারা জানে, এই লড়াইয়ে কেউ মারদেকার হয়ে গুলি চালাতে পারবে না। এতদিন যে ছেলেটা তাদের চোখের সামনে বড় হয়েছে, আজ তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে তার নিজের অতীত।

    কেইনের ঠোঁটে ধীরে একটা হাসি ফুটল। “তুমি অপেক্ষা করছ কেন, ছেলে?”

    মারদেকা উত্তর দিল না।

    কেইনের হাত আরও একটু নামল। তার চোখে আত্মবিশ্বাস।

    সে এই মুহূর্ত বহুবার দেখেছে। বহু মানুষকে দেখেছে তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে। কেউ ভয় পেয়ে আগে অস্ত্র তুলেছে, কেউ হাতের দিকে তাকিয়ে ভুল করেছে, কেউ শেষ মুহূর্তে পিছিয়ে গেছে। কেইনের কাছে বন্দুকযুদ্ধ ছিল অভ্যাসের ব্যাপার। তার কাছে কয়েকটি হৃদস্পন্দনের ব্যবধানই জীবন আর মৃত্যুর মধ্যে পার্থক্য তৈরি করে।

    কিন্তু মারদেকা জানত, লারসেন তাকে কী শিখিয়েছে। বন্দুক দ্রুত বের করাই সবচেয়ে বড় কথা নয়। সঠিক সময়ে বের করতে জানতে হয়।

    মারদেকার ডান হাত এখনও নিচে। তার আঙুল পিস্তলের বাঁট ছোঁয়নি।

    কেইনের চোখে এক মুহূর্তের জন্য বিস্ময় দেখা গেল। তারপর সে সিদ্ধান্ত নিল। তার কাঁধ সামান্য ঝুঁকল। হাত ছুটে গেল কোমরের দিকে। পিস্তলের বাঁট আকড়ে ধরলো।

    সেই মুহূর্তে মারদেকা নড়ল। এত দ্রুত যে দূর থেকে মনে হলো, ছেলেটার হাত যেন হঠাৎ তার শরীরের পাশ থেকে জন্ম নিয়েছে। হোলস্টারের চামড়ায় ধাতব ঘর্ষণের ক্ষীণ শব্দ।

    কেইনের পিস্তল এখনও পুরোপুরি বেরোয়নি। মারদেকার অস্ত্র ইতিমধ্যে তার হাতে। একটি আগুনের ঝলক। একটি মাত্র গুলি।

    শব্দটা খোলা প্রান্তরের ওপর বিস্ফোরিত হলো। দূরের পাহাড়ে গিয়ে ধাক্কা খেল, তারপর ক্ষীণ প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে এল।

    কেইনের শরীর থেমে গেল। তার চোখ বড় হয়ে উঠল। পিস্তলটা তার হাত থেকে ছিটকে পড়ল। সে যেন কয়েক মুহূর্ত বুঝতেই পারল না কী ঘটেছে। তারপর এক পা পিছিয়ে গেল। হাঁটু ভেঙে মাটিতে নেমে এল। শরীরটা ধীরে ধীরে শুকনো ঘাসের ওপর কাত হয়ে পড়ল। তারপর নিস্তব্ধতা।

    মারদেকার পিস্তলের মুখ থেকে ধোঁয়ার সরু রেখা উঠছিল। সে নড়ল না। তার বুকের ভেতর হৃদস্পন্দন এখনও দ্রুত। হাতের তালুতে ঘাম। কানে নিজের রক্তের শব্দ। অথচ মুখ শান্ত।

    সে কেইনের দিকে তাকিয়ে রইল। এই মানুষটার জন্যই তার শৈশব আগুনে পুড়েছিল। এই মানুষটার কারণেই ড্যানিয়েল রিড আর ফিরে আসেনি।

    এই মানুষটার জন্যই লারসেন তেরো বছর নিজের অতীতকে কবর দিয়ে বেঁচে ছিল। আর আজ সেই মানুষটা মাটিতে পড়ে আছে।

    মারদেকার মনে কোনো আনন্দ এল না।

    সে ভেবেছিল, হয়তো বাবার হত্যাকারীকে মেরে ফেললে বুকের ভেতর জমে থাকা আগুন নিভে যাবে। কিন্তু আগুন নিভল না। বরং মনে হলো, এত বছর ধরে যে প্রশ্নটা তার সঙ্গে ছিল, তার একটা দরজা শুধু বন্ধ হয়ে গেল।

    দূর থেকে লারসেন এগিয়ে এল। তার আহত কাঁধ এখনও পুরোপুরি শক্ত হয়নি। হাঁটার সময় শরীরের এক পাশ সামান্য শক্ত হয়ে থাকছে। তবু তার মুখে সেই পুরোনো স্থিরতা।

    সে কেইনের মৃতদেহের কাছে গিয়ে থামল। মাটিতে পড়ে থাকা পিস্তলের দিকে একবার তাকাল। তারপর মারদেকার দিকে।

    কিছুক্ষণ কেউ কথা বলল না।

    শেষ পর্যন্ত লারসেন এগিয়ে এসে তার কাঁধে হাত রেখে একটা চাপ দিল।

    মারদেকা ধীরে পিস্তলটা নামিয়ে আনল। মুখ ঘুরিয়ে লারসেনকে এক নজর দেখলো। তারপর সেটা আবার হোলস্টারে ফেরত পাঠালো।

    লারসেন তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “এবার তুমি বন্দুক চালাতে শিখেছ।”

    মারদেকা কোনো উত্তর দিল না। এবার তার চোখ চলে গেল দূরের পাহাড়ের দিকে।

    তেরো বছর ধরে লারসেন যে অতীত থেকে পালিয়েছে, আজ সেই অতীত তার সামনে পড়ে আছে। এলিয়াসও এসে দাঁড়াল। তার মুখে ক্লান্তি, কিন্তু চোখে এমন এক স্বস্তি, যেন বহুদিনের একটা ভার নামতে শুরু করেছে।

    কেইন মারা গেছে। কিন্তু লারসেন জানত, এখনও একটি কাজ বাকি।

    র‌্যাঞ্চে ফিরে সে অনেক বছর ধরে লুকিয়ে রাখা পুরোনো কাঠের বাক্সটি বের করল। বাক্সটির কাঠ কালচে হয়ে গেছে। লোহার বন্ধনিতে মরচে। কেউ দেখলে ভাবত, এর ভেতরে হয়তো পুরোনো কোনো সরঞ্জাম ছাড়া আর কিছু নেই।

    লারসেন ঢাকনা খুলল। ভেতরে কাপড়ে মোড়া কাগজ। তেরো বছরের পুরোনো নথিপত্র।

    দলের সদস্যদের নাম। হিসাবের খাতা। টাকা লেনদেনের বিবরণ। বিভিন্ন জায়গায় সংঘটিত হত্যাকা-ের উল্লেখ। আদেশের চিহ্ন। সাক্ষীদের নাম। আর এমন সব তথ্য, যা ভিক্টর কেইনের বিরুদ্ধে শুধু অভিযোগ নয়, প্রমাণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

    এই নথির জন্যই কেইন এত বছর লারসেনকে খুঁজেছে। এই নথির কারণেই ড্যানিয়েল রিড সত্যের কাছে পৌঁছেছিল। এই নথিই ছিল কেইনের সবচেয়ে বড় ভয়।

    লারসেন কাগজগুলো অনেকক্ষণ হাতে ধরে রাখল। তারপর সেগুলো আবার গুছিয়ে বাঁধল। এবার আর বাক্সে লুকিয়ে রাখার জন্য নয়। ব্ল্যাক রিভারের মার্শাল এলি ব্রুকস এর হাতে তুলে দেবার জন্য।

    কেইন মারা গেছে, কিন্তু তার অপরাধ যেন তার সঙ্গে মরে না যায়। যারা তার হয়ে কাজ করেছে, যারা তার আদেশ পালন করেছে, যারা মানুষের জীবনকে অর্থের হিসাবের মতো ব্যবহার করেছে, তাদের নাম যেন অন্ধকারে হারিয়ে না যায়।

    সেদিন সন্ধ্যায় র‌্যাঞ্চে অদ্ভুত শান্তি নেমে এল। কেউ বন্দুকের কথা বলল না। কেউ কেইনের নাম উচ্চারণ করল না।

    হ্যাঙ্ক অভ্যাসবশত একবার উত্তর দিকের বেড়া ঘুরে এল। ক্লে আস্তাবল দেখে নিল। বাড ভাঙা জায়গাগুলো পরীক্ষা করল। মিগুয়েল ঘোড়াগুলোকে পানি দিল। এলিয়াস বারান্দায় বসে পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে রইল।

    আর ইলাই রান্নাঘরে খাবার তৈরি করছিল।

    মারদেকা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ছিল।

    ইলাই তার দিকে তাকিয়ে বলল, “খাবার ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।”

    মারদেকা ভেতরে গেল।

    সেই রাতের খাবার ছিল সাধারণ। কিন্তু বহুদিন পর সেই টেবিলে বসা মানুষগুলোর মনে কোনো অদৃশ্য ভয় ছিল না।

    পরের কয়েক দিন র‌্যাঞ্চ ধীরে ধীরে আগের জীবনে ফিরে গেল।

    নতুন কাঠ দিয়ে বেড়া মেরামত হলো। গুলির দাগগুলো কিছু জায়গায় থেকে গেল। জানালার নতুন কাচ বসানো হলো। গবাদি পশু আবার মাঠে গেল। ঘোড়াগুলো আবার সকালবেলার কাজে বেরোল।

    লারসেনের গুলিটা বের করা হয়েছে। সেই ক্ষতও শুকাতে শুরু করল। এলিয়াসও ধীরে ধীরে শক্তি ফিরে পেল।

    মারদেকা আবার কাজ করতে লাগল। কিন্তু সে আর আগের মারদেকা নয়। তার কোমরের পিস্তল এখন শুধু একটি অস্ত্র নয়। সে জানে, সেটার সঙ্গে সিদ্ধান্তের ভারও থাকে।

    এক সন্ধ্যায় সূর্য পাহাড়ের পেছনে নামছিল। আকাশের নিচে লালচে আলো ছড়িয়ে ছিল। লারসেন বারান্দা থেকে মারদেকাকে ডাকল।

    ছেলেটা এসে দাঁড়াল। লারসেন কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, “তোমার মায়ের কথা কখনও ভেবেছ?”

    মারদেকা যেন হঠাৎ অনেক দূরের কোনো দরজা খুলতে শুনল। মা। শব্দটা তার ভেতরে অদ্ভুতভাবে প্রতিধ্বনিত হলো।

    বাবার মুখ সে এখন জানে। বাবার মৃত্যুর সত্য জানে। কিন্তু তার জন্মদাত্রী মাকে সেই যে কবে পাহাড়ের ওপারে ইন্ডিয়ান গ্রামে রেখে এসেছে, সে কেমন আছে কিংবা আদৌ বেঁচে আছে কি না, তার কিছুই জানে না।

    এতদিন সে নিজের অতীতের একটা অংশকে অন্ধকারেই রেখে দিয়েছিল। এবার সে সেটার দিকে তাকাতে চাইল। “আমি তাকে দেখতে যেতে চাই।”

    লারসেন মাথা নেড়ে বলল, “তাহলে দেখে এসো।”

    কয়েক দিন পর ভোরে মারদেকা ঘোড়ায় চড়ল। বাঁ পাশে খাপসহ ছুরি। ডান পাশে পিস্তল। পিঠে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র।

    র‌্যাঞ্চের সবাই তাকে বিদায় জানাতে বেরিয়ে এল। ইলাই খাবারের পুঁটলি গুঁজে দিল। বাড ঘোড়ার পা দেখে নিল। মিগুয়েল পাহাড়ের ওপারের পুরোনো পথের কথা বলল। হ্যাঙ্ক শুধু মাথা নেড়ে সতর্ক থাকতে বলল। ক্লে কিছুক্ষণ তার কোমরের পিস্তলের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।

    লারসেন শেষে এগিয়ে এল। “আবার ফিরে এসো। এটা তোমারই ঘর।”

    মারদেকা মাথা নেড়ে ঘোড়ার লাগাম টানল। র‌্যাঞ্চ পেছনে পড়ে গেল। আগে সে ব্ল্যাক রিভারের কাছে পৌঁছাল। শহরটাকে অনেকদিন পর দেখেও তার মনে হলো, যেন জায়গাটা ছোট হয়ে গেছে।

    এক বছর আগে এই শহরের রাস্তায় হাঁটার সময় সে ছিল অচেনা এক ছেলে। আজ তার হাঁটার ভঙ্গি বদলে গেছে। কোমরের অস্ত্রের ভার সে আর অনুভব করছে না। অস্ত্র যেন তার শরীরেরই অংশ।

    রকডাস্ট সেলুনের সামনে এসে তার ঘোড়া ধীর হয়ে গেল। ভেতর থেকে হাসির শব্দ। গ্লাসের ঠোকাঠুকি। পিয়ানোর পুরোনো সুর। মারদেকা কিছুক্ষণ দরজার দিকে তাকিয়ে থাকল। তারপর ঘোড়া থেকে নামল।

    দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই ঘরের কয়েকটি কণ্ঠ থেমে গেল। ধোঁয়ায় ভরা ঘর। কাউন্টারের পাশে কয়েকজন। দেয়ালের কাছে কয়েকটি টেবিল। আর কোণের একটা টেবিলে বসে থাকা একজন মানুষ।

    লোকটির নাম জ্যাক “সানডাউন” ম্যাক্রি। ব্ল্যাক রিভার থেকে আরও পশ্চিমে তার নাম সবাই জানত।

    দ্রুত বন্দুক বের করার জন্য সে ইতিমধ্যেই কয়েকজনের মৃত্যু ঘটিয়েছে। বলা হতো, তার হাত অস্ত্রের বাঁট ছোঁয়ার আগেই মানুষ বুঝে যেত না যে তাদের শেষ মুহূর্ত এসে গেছে। কেউ বলত, সানডাউন ম্যাক্রির ড্র পশ্চিমের দ্রুততম। কেউ বলত, তার সামনে দাঁড়ালে মানুষ আগে চোখ বন্ধ করে, তারপর গুলি শোনে।

    ম্যাক্রির বয়স ত্রিশের কাছাকাছি। মুখে পুরোনো দাগ। চোখে ঠান্ডা আত্মবিশ্বাস। তার পিস্তলটা কোমরের পাশে এমনভাবে রাখা, যেন প্রয়োজনে এক মুহূর্তেই হাতে চলে আসবে।

    মারদেকা তাকে চিনত না।

    ম্যাক্রি মারদেকাকে দেখছিল। বিশেষ করে তার কোমরের দিকে। তারপর ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটল। “বাচ্চা ছেলের কোমরে পিস্তল!” কন্ঠে বিদ্রপ ঢেলে বললো সে। তার বলার ভঙ্গীতে কয়েকজন হেসে উঠল।

    মারদেকা শুনেও না শোনার ভান করল। সে কাউন্টারের দিকে এগিয়ে গেল।

    ম্যাক্রির হাসি মিলিয়ে গেল। লোকটা চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল। ধীরে। কোনো তাড়াহুড়ো নেই।

    ঘরের মানুষগুলো বুঝতে পারল, এখন ব্যাপারটা আর মজা নেই।

    ম্যাক্রি কয়েক পা এগিয়ে এসে মারদেকার সামনে দাঁড়াল। “তুমি জানো এটা বড়দের জায়গা?”

    মারদেকা তার দিকে তাকাল না।

    ম্যাক্রির মুখ শক্ত হয়ে উঠল। সে একবার পিস্তলের দিকে তাকাল। তারপর মারদেকার চোখে।

    “ওটা খুলে রাখো।”

    মারদেকা এবার তার দিকে তাকাল। শুধু এক মুহূর্ত। তারপর আবার মুখ ফিরিয়ে নিল। ঘরের ভেতর কেউ আর হাসল না।

    ম্যাক্রির ডান হাত ধীরে কোমরের দিকে নামল।

    মারদেকা নড়ল না।

    একজন লোক টেবিলের ওপরের গ্লাস সরিয়ে নিল। কেউ চেয়ার থেকে উঠল না। পুরো সেলুন যেন অপেক্ষা করতে লাগল।

    ম্যাক্রির আঙুল সহসা পিস্তলের বাঁট ছুঁল।

    মারদেকার ডান হাত তখনও নিচে।

    ম্যাক্রির চোখে আত্মবিশ্বাস ফিরে এল।

    এই দৃশ্য সে বহুবার দেখেছে। আর এটাতো একটা বাচ্চা ছেলে। ভীত চোখ। কোমরে নতুন পিস্তল। উঠাতে তো দূরে থাক, ওজন নিতে পারবে কিনা সন্দেহ।

    আর তার সামনে দাঁড়িয়ে সানডাউন ম্যাক্রি। পশ্চিমের দ্রুততম বন্দুকবাজদের একজন। ম্যাক্রি অস্ত্র টানল।

    কিন্তু তার পিস্তল হোলস্টারের মুখ ছাড়ার আগেই মারদেকার হাত নড়েছে। এক ঝলক। ধাতব শব্দ। আগুন। গুলির শব্দ।

    ম্যাক্রির শরীর পেছনে হেলে গেল। তার চোখে অবিশ্বাস। তারপর সে মেঝেতে পড়ে গেল।

    সেলুনের ভেতর কেউ কথা বলল না। পিস্তলের ধোঁয়া ধীরে ধীরে ছড়িয়ে গেল।

    মারদেকা কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে রইল। তার মুখে কোনো গর্ব নেই। সে পিস্তলটা ধীরে হোলস্টারে ঢুকিয়ে দিল। তারপর দরজার দিকে এগিয়ে গেল। কেউ তাকে আটকানোর সাহস করল না।

    দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে সে ঘোড়ায় উঠল। একবারও পেছনে তাকাল না। তার ঘোড়া ধুলো উড়িয়ে ব্ল্যাক রিভারের রাস্তা ধরে এগিয়ে গেল।

    সেলুনের ভেতর তখন ধীরে ধীরে মানুষের কণ্ঠ ফিরে আসছে। কেউ ম্যাক্রির মৃতদেহের দিকে তাকিয়ে আছে। কেউ দরজার দিকে। কেউ এখনও বিশ্বাস করতে পারছে না কী দেখেছে।

    একজন ধীরে বলল, “এটা ওই হাফ ব্রীড ছেলেটা?”

    কেউ উত্তর দিল না। আরেকজন বলল, “মারদেকা।”

    নামটা ঘরের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ল।

    তারপর আরেকজন বলল, “ওই মারদেকা!”

    কেউ জানত না নামটা ঠিক কীভাবে উচ্চারণ করতে হয়।

    কেউ বলল, সে লারসেনের লোক।

    কেউ বলল, পাহাড় থেকে এসেছে।

    কেউ বলল, সে নাকি ভিক্টর কেইনকেও মেরেছে।

    সত্য আর গল্পের মধ্যে ব্যবধান পশ্চিমে কখনও বেশি দিন থাকে না। সেই দিন থেকেই গল্প ছড়াতে শুরু করল। এক শহর থেকে আরেক শহর। এক সেলুন থেকে আরেক সেলুন। এক র‌্যাঞ্চ থেকে অন্য র‌্যাঞ্চে।

    মানুষ বলতে লাগল, তেরো বছরের এক ছেলে সানডাউন ম্যাক্রিকে ড্র-তে হারিয়েছে।

    কেউ বলল, ছেলেটা বন্দুক বের করার আগেই ম্যাক্রির হাত নাকি থেমে গিয়েছিল।

    কেউ বলল, না, তার হাত দেখা যায়নি। শুধু গুলির শব্দ শোনা গিয়েছিল।

    আর তারপর একদিন কেউ নামটা বদলে দিল। মারদেকা হয়ে গেল মারদেগা। যার মানে দাঁড়ালো, মেরে দেবে। নামটা তখনো সত্যি ছিল না। কিন্তু পশ্চিমে ছড়াবার জন্য সত্যি নাম সবসময় দরকার হয় না। নামটা মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে কিংবদন্তি হয়ে গেল।

    সবাই জানে পশ্চিম একদিন তাকে মনে রাখবে তার দ্রুত হাতের জন্য। কেউ বলবে, সে ছিল পশ্চিমের সর্বকনিষ্ঠ বন্দুকবাজ।

    মারদেকা এসবের কিছ্ইু জানলো না। এখন আর সে আর দৌড়াচ্ছে না। তার ঘোড়াটা ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছে। সামনে খোলা পথ। দূরে নীল পাহাড়। তার ডান কোমরে পিস্তল। বাঁ পাশে ছুরি। সে পাহাড়ের ওপারের পথ ধরে এগিয়ে চলেছে। লক্ষ্য তার মায়ের গ্রাম। পেছনে র‌্যাঞ্চ।

    হয়তো আরেকটি অজানা পথ। হয়তো আরও অনেক ঘটনা।

    একটি ছেলে সত্যি সীমানা পেরিয়েছিল। ভয়ের সীমানা। অতীতের সীমানা। আর শেষ পর্যন্ত নিজের ভাগ্যের সীমানাও।
    (সমাপ্ত।)

    3
    5 Comments
    • দীর্ঘ এই শব্দের মিছিলে মন হারালেও, ভাবনার গভীরতা চমৎকার। এই আঙিনায় আপনার অক্ষরের আলো ছড়িয়ে পড়ুক প্রতিনিয়ত। অন্তহীন শুভেচ্ছা!

    • দারুণ সমাপ্তি। কিন্তু এতোদিন ধরে পড়ছিলাম, কেমন যেন খালি খালি লাগছে। এমন লেখা আরো চাই

      • হয়তো আরো অনেক পরে অন্য কোন গল্পে একজন কিংবদন্তি বন্দুকবাজ হিসেবেই ফিরিয়ে আনবো তাকে। সেবা প্রকাশনীর পেজেও অনেকের অনুভুতিও আপনার মতই ছিল। ওখানে কিন্তু এখন আমার একশন থ্রীলার চলমান। পারলে ঢু মেরে আসবেন।

    • মারদেকার চরিত্রটা সত্যিই ভালো লেগেছে😊😊

আমি মানুষের ভীড়ে মানুষ খোঁজে ফিরি

বিষণ্ন সুমন

ডিজাইনার

স্কুল বয়েস থেকেই লিখালিখা করি। যদিও পড়ি তার আগে থেকেই। আমি বিশ্বাস করি, ভালো লিখতে হলে আগে ভালো পড়তে জানতে হবে। তাই এখন পর্যন্ত নিজেকে লেখক না ভেবে ভালো পাঠক হিসেবেই পরিচয় দিতে সাচ্ছন্দ্য বোধ করি। প্রথম প্রকাশিত বই সেই ১৯৯৬ সালের গ্রন্থমেলায় “কে বলে তুমি নেই” রোমান্টিক উপন্যাস এবং সম্পূর্ণ মৌলিক ওয়েস্টার্ণ “লোন রাইডার”। পরবর্তীতে ২০১২ সালের বই মেলায় অন্যপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত গল্প সংকলন। মাঝে banglanews24.com এর সাহিত্যপাতায় নিয়োমিত লিখেছি। আসলে আমি লেখায় কখনোই অনর্গল নই। মাঝেমাঝেই বন্ধাত্ব্য এসে আমায় থামিয়ে রাখে। একটা শব্দও লিখতে পারিনা। তখন আমার পুরনো লিখাগুলো নিজেই পাঠক হয়ে পড়ি আর ভাবি, এ গুলো কি সত্যিই আমি লিখেছিলাম(?)। এই ৫৪ বছর বয়সে এসেও এই একটাই প্রশ্ন নিজেকে করে যাচ্ছি প্রতিনিয়ত।

Skip to toolbar