Profile Photo

পি.কে. সরকারOffline

  • PKSarker
  • Profile picture of পি.কে. সরকার

    পি.কে. সরকার

    • 1 month, 1 week ago

    দায়িত্বজ্ঞানহীন
    — পি কে সরকার

    মৃন্ময় দাসের বয়স চল্লিশ পেরিয়েছে অনেক আগেই। আয়নার সামনে দাঁড়ালে এখন নিজের মুখের চেয়ে দায়িত্বগুলোর ছায়াই যেন বেশি স্পষ্ট দেখা যায়।
    চোখের নিচে কালি, কপালে কয়েকটি স্থায়ী ভাঁজ, চুলে অকালপক্বতার ছাপ। অথচ এই মানুষটিই একদিন কত স্বপ্ন নিয়ে জীবন শুরু করেছিল!
    তখন তার পকেট ছিল প্রায় শূন্য, কিন্তু বুকভরা সাহস ছিল। মনে হয়েছিল—জীবন বড় হলে দায়িত্বও বড় হবে, আর দায়িত্ব পালন করতে পারলেই মানুষ বড় হয়ে ওঠে।
    সে ভুল ভাবেনি।
    কিন্তু সে জানত না, দায়িত্বের কোনো শেষ নেই।
    বাবার ওষুধ, মায়ের চিকিৎসা, ছোট ভাইয়ের পড়াশোনা, বোনের বিয়ে, সংসারের খরচ, সন্তানের স্কুলের বেতন—একটির পর একটি প্রয়োজন এসে তার দরজায় কড়া নাড়তে লাগল।
    প্রথমে সে নিজের সঞ্চয় ভাঙল।
    তারপর ধার করল।
    তারপর ব্যাংক থেকে ঋণ নিল।
    তারপর এক ঋণ শোধ করতে আরেক ঋণ।
    একসময় সে বুঝতে পারল—সে আর মাটিতে দাঁড়িয়ে নেই; সে ঋণের অথৈ সাগরে নেমে গেছে।
    তবু সে কাউকে বলেনি।
    কারণ মৃন্ময় জানত, তার কষ্টের গল্প শুনে কারও প্রয়োজন থেমে থাকবে না।
    একদিন ছোট ভাই ফোন করে বলল,
    —দাদা, তুমি আমার জন্য আর কিছুই করো না। সবাই নিজের ভাইয়ের জন্য কত কিছু করে!
    মৃন্ময় কিছুক্ষণ নীরব থেকে বলল,
    —আমি তো চেষ্টা করি রে।
    ওপাশ থেকে উত্তর এল,
    —চেষ্টা দিয়ে তো জীবন চলে না, দাদা।
    ফোন কেটে গেল।
    মৃন্ময় অনেকক্ষণ ফোনটির দিকে তাকিয়ে রইল।
    তারপর ধীরে ধীরে হাসল।
    কী অদ্ভুত!
    যে মানুষটি নিজের প্রয়োজন বাদ দিয়ে অন্যের প্রয়োজন মেটাতে মেটাতে নিঃস্ব হয়ে গেল, তারই নাকি চেষ্টা যথেষ্ট নয়।
    সেদিন রাতে স্ত্রী বলল,
    —তুমি সংসারের প্রতি আগের মতো দায়িত্বশীল নও।
    মৃন্ময় চমকে তাকাল।
    —কেন?
    —সবকিছুতেই তোমার হিসাব। এটা কিনতে পারব না, ওটা সম্ভব নয়—সব সময় শুধু টাকার কথা।
    মৃন্ময় আর কিছু বলল না।
    সে জানত, টাকার হিসাব সে করে আনন্দের জন্য নয়; বাঁচার জন্য।
    কিন্তু এই কথাটিও সে কাউকে বোঝাতে পারল না।
    পরদিন ব্যাংক থেকে ফোন এল।
    ঋণের কিস্তি বাকি।
    মৃন্ময় বলল,
    —আর কয়েকটা দিন সময় দিন।
    ফোনের ওপাশে নির্লিপ্ত কণ্ঠ—
    —স্যার, নিয়মের বাইরে আমাদের কিছু করার নেই।
    নিয়ম!
    মৃন্ময় জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ভাবল—জীবনেও কি কোনো নিয়ম নেই?
    যে মানুষটি বছরের পর বছর নিয়ম মেনে সবার পাশে দাঁড়াল, তার পাশে দাঁড়ানোর জন্য কি কোনো নিয়ম তৈরি হয়নি?
    সন্ধ্যায় মেয়েটি এসে বলল,
    —বাবা, তুমি আমার জন্মদিনে কিছু কিনবে না?
    মৃন্ময় মেয়ের মাথায় হাত রাখল।
    —কী চাই তোমার?
    —কিছু না। শুধু তুমি সেদিন আমার সঙ্গে থাকবে।
    মৃন্ময়ের বুকটা কেমন করে উঠল।
    সে বুঝল, মানুষ সব সময় অর্থ চায় না; কখনও কখনও শুধু একজন মানুষকে পাশে চায়।
    কিন্তু আশ্চর্য, সে যত বেশি দায়িত্ব পালন করেছে, তত বেশি যেন মানুষের প্রত্যাশা বেড়েছে।
    একদিন সে অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়ে রইল।
    কেউ খুব একটা খেয়াল করল না।
    সবাই ভেবেছিল—মৃন্ময় তো সামলে নেবে।
    সে তো সব সময় সামলায়।
    সেদিন প্রথমবার মৃন্ময় বুঝল, পরিবারে সবচেয়ে শক্ত মানুষটির অসুস্থ হওয়ার অধিকারও যেন নেই।
    রাতে একা ঘরে শুয়ে সে মনে মনে বলল,
    “আমি কার জন্য এতদূর এলাম?”
    কোনো উত্তর এল না।
    শুধু জানালার বাইরে দূরের অন্ধকার।
    কয়েকদিন পর এক আত্মীয়ের সঙ্গে দেখা হলো।
    আত্মীয়টি বলল,
    —মৃন্ময়, তোমার একটা সমস্যা আছে।
    —কী সমস্যা?
    —তুমি দায়িত্বশীল নও। তোমার পরিকল্পনা নেই। সংসার চালাতে জানো না।
    মৃন্ময় মৃদু হেসে বলল,
    —তাই?
    —হ্যাঁ। দেখো, অন্যরা কত সুন্দরভাবে জীবন চালাচ্ছে!
    মৃন্ময় এবারও প্রতিবাদ করল না।
    সে শুধু ভাবল—অন্যরা কি কখনও আমার মতো করে সবার বোঝা কাঁধে নিয়েছিল?
    কেউ কি দেখেছিল, রাতের অন্ধকারে ব্যাংকের কিস্তির হিসাব করতে করতে তার চোখে ঘুম আসেনি?
    কেউ কি জানত, নিজের জন্য নতুন জামা না কিনে সে সন্তানের বই কিনেছে?
    কেউ কি জানত, নিজের চিকিৎসা পিছিয়ে দিয়ে মায়ের ওষুধ কিনেছে?
    কেউ কি জানত, নিজের স্বপ্নগুলো একে একে বন্ধক রেখে সে অন্যদের স্বপ্ন বাঁচিয়ে রেখেছে?
    না।
    কারণ দায়িত্বের কোনো ছবি হয় না।
    ত্যাগের কোনো রসিদ থাকে না।
    আর নীরবে করা ভালোবাসার কোনো হিসাবখাতা নেই।
    সেদিন রাতে মৃন্ময় পুরোনো ডায়েরি খুলল।
    প্রথম পাতায় বহু বছর আগে নিজের হাতে লেখা একটি বাক্য—
    “আমি বড় হয়ে এমন একজন মানুষ হব, যার কারণে অন্য কারও জীবন একটু সহজ হবে।”
    বাক্যটির দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকল সে।
    তারপর কলম হাতে নিয়ে নিচে লিখল—
    “জীবনটা সহজ করতে গিয়ে নিজের জীবনটাই কঠিন করে ফেলেছি।”
    কলম থেমে গেল।
    কিছুক্ষণ পর আরও একটি লাইন লিখল—
    “তবু আফসোস নেই; শুধু দুঃখ এই—যাদের জন্য নিজেকে এতটা হারালাম, তাদের কাছেই আমি দায়িত্বজ্ঞানহীন।”
    বাইরে তখন গভীর রাত।
    শহর ঘুমিয়ে গেছে।
    মৃন্ময় জানালার পাশে দাঁড়িয়ে দেখল—আকাশে একটিও তারা নেই।
    তবু অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে তার মনে হলো, কোথাও না কোথাও নিশ্চয়ই আলো আছে।
    হয়তো সেই আলো মানুষের প্রশংসায় নয়।
    হয়তো সেই আলো নিজের বিবেকের কাছে।
    সে ধীরে ধীরে ডায়েরিটি বন্ধ করল।
    ঋণ তখনও আছে।
    দায়িত্বও আছে।
    অভিযোগও আছে।
    শুধু মৃন্ময়ের ভেতরের মানুষটি প্রথমবার একটু শান্ত হলো।
    কারণ সে বুঝতে পেরেছে—
    সবাইকে সন্তুষ্ট করা দায়িত্ব নয়; নিজের সামর্থ্যের শেষ সীমা পর্যন্ত সত্যভাবে দায়িত্ব পালন করাই মানুষের সবচেয়ে বড় সততা।
    আর পৃথিবী যদি সেই মানুষটিকেও “দায়িত্বজ্ঞানহীন” বলে—
    তবে সে অপবাদও কখনও কখনও মানুষের সবচেয়ে নীরব পদক হয়ে থাকে।

    2
    5 Comments
    • মৃন্ময় দাসের নিঃস্বার্থ ত্যাগ এবং তার যন্ত্রণার এই গভীর অনুভূতিগুলো খুব সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে, যা যে কোনো পাঠকের হৃদয় স্পর্শ করে। আপনার লেখনীতে প্রতিটি মুহূর্ত যেভাবে স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হয়েছে, তা বজায় রেখে সামনের দিনগুলোতে আরও এমন মননশীল কাজ উপহার দেওয়ার জন্য আপনাকে আন্তরিক অনুরোধ জানাচ্ছি।

    • ত্যাগের কোনো রসিদ থাকে না তবু নীরব দায়িত্বপালনটাই মানুষের সবচেয়ে বড় সততা…..🤍🖤

    • গল্পটা পড়ে খুব খারাপ লাগছে, আসলে মাঝবয়সী মানুষগুলোর জীবনের টানাপোড়েনগুলো খুব কাছ থেকে অনুভব করা যায় আপনার লেখায়। মৃন্ময়ের মতো মানুষরা প্রতিনিয়ত যে ত্যাগের পরীক্ষা দেয়, তা হয়তো বাইরের মানুষরা কোনোদিন বুঝবে না। এমন বাস্তবসম্মত এক গল্প শেয়ার করার জন্য অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।

পি কে সরকার

 

“পি.কে. সরকার — শব্দের ভেতর মানবতা ও সমাজের গভীরতম সত্য খুঁজে চলা এক সমকালীন বাংলা লেখক।”

Skip to toolbar