-
নীরব দেয়াল( প্রথম খণ্ড) – পর্ব 4
পর্ব ৩: সুতোর টান ও বিষাক্ত চমকরাতের শেষ প্রহরে জানালার গ্রিল ধরে বর্ষা কতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল, তার হিসাব তার নিজের কাছেও নেই।
বাইরে বটগাছের নিচের সেই কালো ছায়াটা একসময় গাঢ় অন্ধকারে মিলিয়ে গিয়েছিল, কিন্তু শাদমান এজাজের সেই বুক কাঁপানো ভয়েসটা বর্ষার কানের ভেতর একটানা বাজছিল—\”কাল সকালে তোমার বাপের ওই থানের দোকানে এক চমক অপেক্ষা করছে। দেখতে আসবে না?\”
সকাল আটটা।
রোদটা কেবল ধানঝুরি গ্রামের ওপর কাঁচা সোনার মতো ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে। ঘরে কাল রাতের সেই উত্তপ্ত পরিবেশের একটুও হেরফের হয়নি।
রহমান সাহেব মুখে এক চিমটি তামাক পুরে জুতোর ফিতে বাঁধছিলেন। উনি আজ বর্ষার দিকে একবারের জন্যও তাকাননি। দাদী দাওয়ায় বসে তামাকের কুঁচি চিবোতে চিবোতে আর রিনা বেগম বাচ্চার মুখে দুধের বোতল চেপে ধরে অলিখিত একটা জয়োৎসব উদযাপন করছিলেন। কারণ আজ থেকে বর্ষাকে ঘরের বাইরে যাওয়া নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
\”বর্ষা!\” দাদী চিল্লায়ে উঠলেন। \”বাপের দোকানে যাওয়ার খাসলত ছাড়ে। ঘরে বসে থালা-বাসন মাজার ব্যবস্থা কর।\”
বর্ষা দাওয়ার এক কোণে দাঁড়িয়েছিল। সে কোনো রাগ দেখাল না, গলার আওয়াজ চড়ালো না। তার চেহারায় সেই অচেনা, গা-ছাড়া শান্ত রূপ।
সে ধীরপায়ে বাপের পেছনে গিয়ে দাঁড়াল। \”আব্বা, রিনা বেগমের শাড়ির আঁচলে কিন্তু কাপড়ের দোকানের একটা চাবি পেঁচানো আছে। তুমি কি ভুল করে ওকে চাবি দিয়েছিলে?\”
রহমান সাহেব থমকে গেলেন। পকেটে হাত দিয়ে দেখলেন—সত্যিই দোকানের একটা স্পেয়ার চাবি গায়েব!
রিনা বেগম চমকে উঠে দাঁড়িয়ে পড়লেন। \”কী হাবিজাবি বলছিস তুই? আমি তোর বাপের চাবি নিতে যাব কেন?\”
\”তুমি নাওনি?\” বর্ষা বড় বড় দুটো চোখ মেলে নিষ্পাপ ভঙ্গিতে তাকাল। \”তাহলে কাল রাত একটা নাগাদ যখন বাথরুমের বাহানায় বাইরে গেলে, তখন তোমার হাতে ওই চকচকে লোহার জিনিসটা কী ছিল রিনা বেগম?\”
কথাটা শোনার সাথে সাথে রহমান সাহেবের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। উনার মনের ভেতরের সন্দেহ আর ইনসিকিউরিটির বিষ বাষ্পটা এক নিমেষে জ্বলে উঠল। উনি রিনা বেগমের দিকে এমনভাবে তাকালেন যেন রিনা বেগম চোর।
\”রিনা! চাবি কোথায়?\” রহমান সাহেব হুঙ্কার দিয়ে উঠলেন।
\”আমি নেইনি! শপথ করে বলছি আমি নেইনি! এই কালনাগিনী মেয়ে মিথ্যা কথা বানাই বলছে!\” রিনা বেগম উন্মাদের মতো চিল্লাতে লাগলেন। কিন্তু উনার কাঁপা গলার আওয়াজ আর চোরের মতো চেহারা দেখে রহমান সাহেব আর উনাকে বিশ্বাস করলেন না।
বর্ষা উনাদের ঝগড়ার দিকে তাকিয়ে ঠোঁটের কোণে হালকা একটু হাসল।
সাইকোলজিক্যাল পক্ষাঘাত ঠিক এটাই। বর্ষা কোনো প্রমাণ রাখেনি, কিন্তু একটা সস্তা সন্দেহের বীজ তাদের দাম্পত্য জীবনের মূল শেকড়টাতে বসিয়ে দিয়েছে। এখন রিনা বেগম যতই সত্যি বলুন না কেন, রহমান সাহেবের মনে আজীবনের মতো দাগ পড়ে গেল।
রহমান সাহেব রাগ আর অপমানে গজগজ করতে করতে একাই হনহন করে দোকানের দিকে হেঁটে চলে গেলেন।
সকাল দশটা।
বর্ষা ঘরের নিষিদ্ধ দেয়াল টপকে ধীরপায়ে ধানঝুরি বাজারের দিকে রওনা দিল। বন্ধুদের সাথে ও যখন চলে, তখন চঞ্চল থাকে; কিন্তু আজ সে একা। তার পরনে একটা সাধারণ সুতির জামা, কিন্তু তার হাঁটার মধ্যে কোনো ভয় বা অপরাধবোধ নেই।
বাজারের মোড়ে পৌঁছাতেই বর্ষা থমকে গেল।
\’রহমান ক্লথ স্টোর\’-এর সামনে বিশ-ত্রিশজন মানুষের জটলা। সবাই বলাবলি করছে, \”মাগো মা! এত বড় কাণ্ড কীভাবে ঘটে গেল!\”
বর্ষা ভিড় ঠেলে সামনে এগোলো।
দোকানের কাঠের ঝাপটা অর্ধেকের বেশি ভাঙা। ভেতরে কাপড়ের থানগুলো সব এলোমেলো হয়ে মেঝের ধুলোয় পড়ে আছে। কিন্তু আসল চমকটা সেখানে ছিল না!
দোকানের মূল ক্যাশ বাক্সের ঠিক ওপরের মেহগনি কাঠের বোর্ডে লাল রঙের গাঢ় পেইন্ট দিয়ে বিশাল আকারে একটা বার্তা লেখা—
\”যে সুতো দিয়ে নিজের মেয়ের আত্মাকে বাঁধতে চাও, রহমান সাহেব… সেই সুতোতেই কিন্তু তোমার পুরো পরিবার গলায় ফাঁস দেবে।\”
পুরো বাজার স্তব্ধ!
রহমান সাহেব মেঝের ওপর হাঁটু গেড়ে বসে আছেন। উনার মুখ ছাইয়ের মতো সাদা, চোখ দুটো ভয়ে কোটর থেকে বের হয়ে আসছে। উনি কাঁপতে কাঁপতে সেই বার্তার দিকে তাকিয়ে আছেন।
\”কার কাজ এটা? কার এত বড় সাহস?\” বাজারে মাতব্বরা চিল্লাচিল্লি করছে। \”রহমান ভাই, আপনি কি কারও কাছে দেনা ছিলেন? নাকি কোনো শত্রু আছে?\”
রহমান সাহেব কোনো জবাব দিতে পারলেন না। উনার মনে পড়ে গেল কাল রাতে রিনা বেগমের সাথে উনার ঝগড়া, আর আজ সকালে বর্ষার সেই বিষাক্ত ইঙ্গিত—রিনা বেগমের কাছে চাবি আছে!
উনার পুরো ব্রেন রিনা বেগমকে দোষী ভাবতে শুরু করল! উনি মনে করলেন, উনার এই নতুন স্ত্রী-ই হয়তো উনাকে ধ্বংস করার জন্য এই কাজ করিয়েছে!
ভিড়ের ঠিক উল্টোপাশে, একটা বন্ধ মিষ্টির দোকানের ছায়ায় দাঁড়িয়ে ছিলেন শাদমান এজাজ।
আজ উনার পরনে গাঢ় ধূসর রঙের একটা ফর্মাল শার্ট, হাতা দুটো নিখুঁতভাবে কনুই পর্যন্ত গোটানো। হাতের কব্জিতে জ্বলজ্বল করছে দামি রোলেক্স ঘড়ি। উনার ৬ ফুট ২ ইঞ্চির দীর্ঘদেহী শরীরটার থেকে যেন এক বিষাক্ত আভিজাত্য ঠিকরে বের হচ্ছে। উনার এক হাতে একটা দামি ডুপন্ট লাইটার, যা উনি নিজের আঙুলের খাঁজে ছন্দের মতো ঘোরাচ্ছেন। লিক… ফ্লিক…
বর্ষা ভিড় কাটিয়ে ধীরপায়ে শাদমানের দিকে এগিয়ে গেল।
উনার গায়ের সেই দামী চন্দন আর সিগ্রেটের মিশ্র গন্ধটা বর্ষার নাকে এলো। শাদমান কিন্তু বর্ষার দিকে না তাকিয়েই সিগ্রেটের এক দীর্ঘ টান দিলেন।
\”চমকটা পছন্দ হয়েছে, বর্ষা?\” শাদমানের নিচু, গভীর রোমাঞ্চকর কণ্ঠটা বাতাসের বুক চিরে বর্ষার কানে পৌঁছাল।
বর্ষা দোকানের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল, \”আপনি নিজের হাতে দোকানে গিয়ে ওই লেখাটা লিখে এসেছেন?\”
শাদমান এজাজ এবার ধীরপায়ে বর্ষার একদম মুখোমুখি এসে দাঁড়ালেন। উনার দীর্ঘ ছায়াটা বর্ষার ওপর এসে পড়ল। উনার সেই কুচকুচে কালো চোখের দৃষ্টিতে এক অদ্ভুত শয়তানি আকর্ষণ।
\”আমি কোনো কাজ নিজের হাতে করি না, ছোট মেয়ে,\” শাদমান একটু নিচু হয়ে বর্ষার কানের কাছে মুখ আনলেন। উনার তপ্ত নিঃশ্বাস বর্ষার গালে গিয়ে বিঁধল। \”আমি শুধু মানুষের মনের ভয়টাকে একটু উসকে দিই। বাকি কাজটা তারা নিজের হাতে করে ফেলে। তোমার বাপ কিন্তু এখন তার
3 Comments
Friends
saburahmed akil
@saburahmedakil
বি.কে.হাজারী
@bkhazarigmail-com
আন নাজমুস সাকিব
@muhammadshofiqulislam
কামরুজ্জামান লিটু
@litujhe
বিধান চন্দ্র খান
@bidhanchandrakhan
মো.এনামুল হক
@enam3626
সেনা মুরসালিন
@shenamursalin
তুহিন-উল-ইসলাম
@sarothi
Fatema-Kasem
@fatema-kasem


বর্ষার প্রতিশোধের খেলায় শাদমান কোন ভূমিকায়—এটাই এখন বড় প্রশ্ন।