-
অরণ্যের শেষ প্রহর
(অধ্যায় তিন)
পরদিন সকালটা ছিল ভারী উজ্জ্বল। বর্ষার পরের আকাশ পুরোপুরি পরিষ্কার না হলেও মেঘের ফাঁক দিয়ে রোদ নেমেছিল শহরের ওপর। ডিওএইচএস-এর পরিচিত রাস্তায় গাছের পাতায় জমে থাকা পানির ফোঁটা ঝিলমিল করছিল। গেটের কাছে নিরাপত্তারক্ষীদের নিয়মিত তৎপরতা, রাস্তা দিয়ে বেরিয়ে যাওয়া অফিসগামী গাড়ি, স্কুলের পোশাকে ছুটে চলা ছেলেমেয়ে, সব মিলিয়ে চারপাশের জীবন প্রতিদিনের মতোই স্বাভাবিক।কিন্তু রেজোয়ানের কাছে সকালটা স্বাভাবিক ছিল না। আগের দুদিনের অভিজ্ঞতা তার মাথার ভেতর একটা অংকের মতো ঘুরছিল। কোনো ঘটনা সে বিচ্ছিন্নভাবে দেখছিল না। পাহাড়ে রাস্তা কাটা, সীমানার পাথর সরানো, বাঁশের বেড়া দেওয়া, নির্মাণসামগ্রী আনা, তারপর প্রশাসনের বিভিন্ন জায়গায় তার অভিযোগের পরও অস্বাভাবিক নীরবতা, সবকিছু যেন একই ছবির আলাদা আলাদা অংশ।
সকালের নাশতা শেষ করে সে আবার স্টাডিরুমে বসেছিল। টেবিলের ওপর ফাইল খোলা। পাশে নোটবুক। আগের দিনের নোটগুলো সামনে রাখা। তার হাতের লেখা ছোট, পরিষ্কার এবং প্রয়োজনের অতিরিক্ত কোনো শব্দ নেই। কোথায় গিয়েছিল, কার সঙ্গে কথা হয়েছে, কী উত্তর পেয়েছে, কোন কাগজ দেখা হয়েছে, সব লেখা আছে।
সামরিক জীবনের একটা অভ্যাস তার মধ্যে এখনো পুরোপুরি রয়ে গেছে, কোনো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার ওপর নির্ভর করার আগে তথ্যগুলো সাজিয়ে নেওয়া। আবেগ দিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়, কিন্তু ভালো সিদ্ধান্ত নিতে হলে আবেগকে কিছুক্ষণ বাইরে রাখতে হয়।
রেজোয়ান কলমটা হাতে নিয়ে নোটবুকের পাতার ওপর কয়েকটা দাগ টানল। ভূমি অফিস। স্থানীয় প্রশাসন। থানা। তারপর প্রশ্নবোধক চিহ্ন। এবং কোম্পানি।
সে কিছুক্ষণ শেষ শব্দটার দিকে তাকিয়ে থাকল।
আগের দিন পর্যন্ত সে ধরে নিয়েছিল, প্রশাসনের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান হওয়ার একটা বাস্তব সম্ভাবনা আছে। এখন সেই বিশ্বাসটা অনেকটাই কমে গেছে। তবু সে আইনের পথ একেবারে ছেড়ে দিতে চায় না। কারণ সে জানে, কোনো লড়াই শুরু করার আগে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করে নেওয়া দরকার। পরে যদি কেউ প্রশ্ন করে, সে কী করেছে, তার উত্তর যেন একেবারে পরিষ্কার থাকে।
সাড়ে দশটার দিকে সে আবার বেরিয়ে পড়ল। প্রথমে ভূমি অফিস।
গত দিনের পরিচিত ফাইল আবার বের হলো। আজ রেজোয়ান আগের চেয়ে বেশি কিছু নির্দিষ্ট প্রশ্ন করল। সীমানা পরিবর্তনের আবেদন কোথা থেকে এসেছে, কবে জমা হয়েছে, তার সঙ্গে কোন কোন কাগজ দেওয়া হয়েছে, জমির ব্যবহার পরিবর্তনের কোনো প্রস্তাব আছে কি না, এসব জানতে চাইল।
কর্মচারী প্রথমে স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই উত্তর দিচ্ছিল। কিন্তু কয়েকটা প্রশ্নের পর তার গলার স্বর বদলে গেল। আগের দিনের তুলনায় আজ সে অনেক বেশি সাবধানী আচরণ করতে লাগলো।
রেজোয়ান সেটা লক্ষ্য করল। কাগজের ওপর চোখ রেখে জিজ্ঞেস করল, “এই আবেদনটা কে জমা দিয়েছে?”
নামটা আগেই জানা ছিল। এবার সে লোকটির পদ এবং যোগাযোগের তথ্যও জানতে চাইল। কর্মচারী কিছুক্ষণ ফাইল ঘাঁটল। তারপর নিচু গলায় বলল, “কোম্পানির লোকজনের মাধ্যমেই কাগজটা এসেছে।”
রেজোয়ান আর কিছু বলল না।
সে কাগজগুলো আবার পড়ল। কোথাও সরাসরি লেখা নেই যে জমির মালিকানা বদলে গেছে। বরং কাগজগুলো এমনভাবে সাজানো, যেন ভবিষ্যতের কোনো প্রশাসনিক কাজে এই জমিকে প্রকল্পের অংশ হিসেবে দেখানো যায়। অর্থাৎ তারা এখনো মালিকানা নিয়ে সরাসরি লড়াই করছে না। তারা শুধু বাস্তব পরিস্থিতিটাকে নিজেদের পক্ষে নিয়ে যাচ্ছে।
কাগজে রাস্তা। উন্নয়ন। প্রকল্প। আর বাস্তবে তার জমির ওপর ইতিমধ্যেই রাস্তা কাটা হচ্ছে।
রেজোয়ান ফাইল বন্ধ করল। “এটার ওপর কোনো সিদ্ধান্ত হয়েছে?”
কর্মচারী মাথা নাড়ল। “এখনো না।”
“তাহলে কাজ শুরু হলো কীভাবে?”
লোকটি এবার চুপ করে গেল।
সেই নীরবতার মধ্যে রেজোয়ান অনেক কিছুই বুঝে গেল। সে আর চাপ দিল না। ফাইলের কয়েকটা গুরুত্বপূর্ণ পাতার কপি নিল এবং বেরিয়ে এল।
বাইরে তখন রোদ বেড়েছে। পুরনো সরকারি ভবনের সামনে মানুষের ভিড়। কেউ হাতে কাগজ নিয়ে দাঁড়িয়ে, কেউ সিঁড়িতে বসে অপেক্ষা করছে, কেউ ফোনে কারও সঙ্গে তর্ক করছে। শহরের এইসব দৃশ্য রেজোয়ানের কাছে নতুন নয়। দীর্ঘ কর্মজীবনে দেশের নানা জায়গায় ঘুরেছে সে। সরকারি অফিসের গতি কেমন, ফাইল কীভাবে এক টেবিল থেকে আরেক টেবিলে যায়, একটা সিদ্ধান্তের আগে কতগুলো স্তর পেরোতে হয়, এসব তার অজানা নয়।
কিন্তু এই ঘটনায় একটা জিনিস তাকে ভাবাচ্ছিল। ফাইলের গতি ধীর হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু এখানে যেন শুধু গতি ধীর নয়, ইচ্ছেটাও বরং আরো ধীর।
সে গাড়িতে উঠে পরের গন্তব্যে রওনা দিল।
স্থানীয় প্রশাসনের দপ্তরে আবার কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো। আগের দিনের কর্মকর্তা তাকে চিনতে পেরেছেন। রেজোয়ান নতুন কিছু কাগজ সামনে রাখল এবং জানাল, বিষয়টা এখন আরও পরিষ্কার হয়েছে। জমির মূল মালিকানা তার নামে, অথচ তার অনুমতি ছাড়া প্রকল্পের কাজ চলছে।
কর্মকর্তা কাগজগুলো দেখলেন। তারপর চুপ করে বসে রইলেন। “আপনার বক্তব্য আমরা বুঝতে পারছি, কর্ণেল সাহেব।”
রেজোয়ান কিছু বলল না।
“কিন্তু বিষয়টা শুধু জমির মালিকানা দিয়ে দেখলে হবে না।”
“তাহলে?”
কর্মকর্তা একটু থেমে বললেন, “স্থানীয় কিছু ব্যাপার আছে।”
রেজোয়ান তার দিকে তাকিয়ে রইল। এইবার সে আর ব্যাখ্যা চাইল না। কারণ আগের দিনও একই রকম শুনেছিল।
স্থানীয় ব্যাপার। আজ সেই শব্দটার অর্থ তার কাছে অনেক বেশি পরিষ্কার। সে উঠে দাঁড়াল। “আপনারা লিখিতভাবে কিছু করতে পারবেন?”
কর্মকর্তা সরাসরি উত্তর দিলেন না। “আমরা বিষয়টা দেখছি।”
রেজোয়ান মাথা নেড়ে বেরিয়ে এল। গাড়িতে বসে ইঞ্জিন চালু করার আগে সে কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তারপর সামনের কাচ দিয়ে রাস্তার দিকে তাকাল।
ঢাকার দুপুরের ব্যস্ততা তখন তুঙ্গে। বাসের ধোঁয়া, প্রাইভেট গাড়ির সারি, রিকশার ভিড়, ফুটপাতে মানুষের চলাচল, দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা লোকজন, সবকিছু মিলিয়ে শহর যেন নিজের গতিতে ছুটছে। এই বিশাল শহরে তার ব্যক্তিগত জমির সমস্যাটা হয়তো কারও কাছে খুব ছোট একটা বিষয়।
কিন্তু রেজোয়ান ছোট বিষয় আর বড় বিষয়ের পার্থক্য অন্যভাবে দেখে। একটা মানুষ তার জমিতে ঢুকেছে। তারপর সীমানা বদলেছে। তারপর প্রশাসনের দরজায় গিয়েও সে কার্যকর ব্যবস্থা পায়নি।
এর মানে হলো, যে পক্ষটা জমি দখল করেছে তারা শুধু সাহসী নয়, আত্মবিশ্বাসী। না, বলা চলে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী। এর কারণটা জানতে হবে।
দুপুরের পর সে থানায় গেল। সেখানেও একই ধরনের অভিজ্ঞতা হলো। অভিযোগ নেওয়া হলো, কাগজ দেখা হলো, ছবি দেখা হলো। কিন্তু বাস্তবে ঘটনাস্থলে গিয়ে কাজ বন্ধ করা বা দখলকারীদের সরিয়ে দেওয়ার কোনো তাৎক্ষণিক উদ্যোগ দেখা গেল না।
একজন কর্মকর্তা কিছুক্ষণ কাগজ দেখে বললেন, “কোম্পানির সঙ্গে কথা বলেছেন?”
“না।”
“কথা বলে দেখুন।”
রেজোয়ান এবার আর কোনো উত্তর দিল না। থানা থেকে বেরিয়ে গাড়িতে ওঠার সময় তার মাথায় সিদ্ধান্তটা তৈরি হয়ে গেছে।
আর কোন সরকারী অফিস নয়। এবার সরাসরি কোম্পানি।
কোম্পানির নাম আগেই জানা ছিল। মেঘদূত মাউন্টেন রিসোর্ট। ঢাকায় তাদের অফিস কোথায়, সেটা খুঁজে বের করতে বেশি সময় লাগল না। বিকেলের দিকে রেজোয়ানের গাড়ি মতিঝিলের ব্যস্ত এলাকায় ঢুকল।
ঢাকার এই অংশটা খাগড়াছড়ির পাহাড় থেকে যেন সম্পূর্ণ অন্য পৃথিবী। এখানে পাহাড় নেই, অরণ্য নেই, দূরের মেঘে ঢাকা সবুজ ঢাল নেই। আছে কংক্রিটের দেয়াল, কাচের জানালা, অসংখ্য গাড়ি, মানুষের ভিড়, রাস্তার ওপর জমে থাকা ধুলো আর সারাক্ষণ বেজে চলা হর্ন। ভবনের পর ভবন দাঁড়িয়ে আছে পাশাপাশি, কোথাও পুরনো স্থাপনা, কোথাও নতুন কাচের টাওয়ার। দুপুরের রোদ কংক্রিটের দেয়ালে পড়ে গরম হয়ে উঠেছে শহর।
মেঘদূত মাউন্টেন রিসোর্টের অফিস একটা আধুনিক বাণিজ্যিক ভবনের কয়েকতলায়। রিসেপশনে বসা তরুণী রেজোয়ানের পরিচয় শুনে সঙ্গে সঙ্গে নড়েচড়ে বসলো। কয়েক মিনিট অপেক্ষা করার পর তাকে ভেতরে নিয়ে যাওয়া হলো।
অফিসের ভেতর ঢুকেই রেজোয়ানের চোখে পড়ল দেয়ালের বিশাল ছবিগুলো। খাগড়াছড়ির পাহাড়। কুয়াশায় ঢাকা সবুজ ঢাল। পাহাড়ের গায়ে কাঠের কটেজ। ঝরনার পাশে বসে থাকা পর্যটক। একটা ছবিতে বিকেলের আলোয় পাহাড়ের ওপর মেঘ ভেসে আছে।
রেজোয়ান কয়েক সেকেন্ড ছবিগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর এগিয়ে গেল।
ঘরের ভেতরের সাজসজ্জা দেখে বোঝা যায়, কোম্পানিটা ছোট নয়। বড় টেবিল, কাচের দেয়াল, নকশা করা আলো, দেয়ালে বিভিন্ন প্রকল্পের ছবি। একটা বড় বোর্ডে খাগড়াছড়ির পাহাড়ি এলাকার সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ প্রকল্পের নকশা টাঙানো।
রেজোয়ান নকশাটার দিকে একবার তাকাল। তারপর চোখ সরিয়ে নিল।
কোম্পানির মালিক উঠে দাঁড়িয়ে তাকে অভ্যর্থনা জানালেন। বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। পরিচ্ছন্ন পোশাক, পরিপাটি চুল, মুখে স্বাভাবিক হাসি। এমন হাসি, যা বহুবার ব্যবসায়িক আলোচনার টেবিলে ব্যবহার করা হয়েছে। “কর্ণেল সাহেব, আসুন। আপনাকে আসতে হলো বলে আমি দুঃখিত।”
রেজোয়ান বসে পড়ল। “কিছু কথা সামনাসামনি বলাই ভালো। তাই চলে আসতেই হলো।”
লোকটি হাসল। “অবশ্যই।”
রেজোয়ান কোনো ভূমিকা করল না। ফাইল খুলে দলিলের কপি টেবিলের ওপর রাখল। তারপর পুরনো নকশা। তারপর পাহাড়ে গিয়ে তোলা ছবিগুলো।
লোকটি একে একে সব দেখল। তার মুখে বিস্ময়ের কোনো চিহ্ন নেই। বরং মনে হলো, সে সবকিছু আগে থেকেই জানে।
রেজোয়ানের চোখ তার মুখে স্থির হলো। “জায়গাটা আমার।”
“আমরা জানি।” উত্তরটা খুব সহজভাবে এল।
রেজোয়ান কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকল। “তাহলে সেখানে কাজ করছেন কেন?”
লোকটি চেয়ারে হেলান দিল। “কারণ জায়গাটা আমাদের প্রকল্পের জন্য প্রয়োজন।”
“প্রয়োজন আর মালিকানা এক জিনিস নয়।”
“তা ঠিক।” লোকটির মুখে তখনো হাসি। “আপনার মালিকানা নিয়ে আমরা কোনো প্রশ্ন করছি না।”
রেজোয়ানের চোখ আরও সরু হলো। “তাহলে?”
লোকটি টেবিলের ওপর আঙুল টুকে টুকে ধীরে ধীরে একটা ছন্দ তৈরি করল। “আমরা অনেক টাকা বিনিয়োগ করেছি। রাস্তা তৈরি হচ্ছে, জায়গা প্রস্তুত হচ্ছে, মেশিন গেছে, শ্রমিক গেছে। প্রকল্পের পরিকল্পনা অনেক দূর এগিয়েছে। এখন সব বন্ধ করলে আমাদের বড় ক্ষতি হবে।”
রেজোয়ানের কণ্ঠ শান্ত। “ক্ষতি আপনাদের ব্যপার। কিন্তু, জমিটা তো আমার।”
লোকটি কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বলল, “কর্ণেল সাহেব, ব্যবসার জগতে সবকিছু কাগজ দিয়ে চলে না।”
রেজোয়ানের মুখে কোনো পরিবর্তন হলো না। “আমার ক্ষেত্রে চলবে।” খুব ধীর শান্তভাবে বললো সে।
ঘরে কয়েক মুহূর্ত নীরবতা নেমে এল। বাইরের কাচের দেয়ালের ওপারে ঢাকা শহর তখন ছুটছে। নিচে গাড়ির সারি, দূরে ভবনের ওপর রোদ, কোথাও নির্মাণাধীন ভবনের লোহার কাঠামো। এয়ারকন্ডিশনারের ঠান্ডা বাতাসের মধ্যে বসে থাকা দুই মানুষের কথাবার্তার সঙ্গে সেই ব্যস্ত শহরের কোনো সম্পর্ক নেই।
কোম্পানির মালিক এবার একটু সামনের দিকে ঝুঁকলেন। “আপনি চাইলে আমরা আপনাকে ভালো একটা সমাধান দিতে পারি।”
“কী সমাধান?”
“আপনি জায়গাটা আমাদের ছেড়ে দেবেন। বিনিময়ে আমরা আপনাকে ক্ষতিপূরণ দেব।”
রেজোয়ান কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল। “আমি জমি বিক্রি করতে চাই না।”
“আপনি চাইলে দাম নিয়ে কথা বলা যায়।”
“দাম নিয়ে কোন কথা বলছি না।”
“তাহলে?”
রেজোয়ান ধীরে ধীরে ফাইলটা বন্ধ করল। “জায়গাটা আমার। আমি সেটা রাখব।”
মালিক এবার প্রথমবারের মতো কিছুটা বিরক্ত দেখালেন। তবে সেটা এক মুহূর্তের জন্য। পরক্ষণেই আবার হাসি ফিরে এল। “আপনি অবসর নিয়েছেন, কর্ণেল সাহেব। এখন নিশ্চিন্তে জীবন কাটানোই ভালো। একটা জমির জন্য এত ঝামেলায় যাওয়ার প্রয়োজন আছে কি?”
রেজোয়ান উত্তর দিল না। লোকটির দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বলল, “আমার জীবনে কোন জিনিসের জন্য কতটা ঝামেলায় যেতে হয়, সেটা আমি নিজেই ঠিক করি।”
মালিকের হাসি একটু ম্লান হলো। কয়েক সেকেন্ড সে চুপ করে থাকল। তারপর খুব স্বাভাবিক গলায় বলল, “আপনি চাইলে কিছু ক্ষতিপূরণ নিতে পারেন। কিন্তু জায়গাটা আমরা ছাড়ব না।”
রেজোয়ান কোনো উত্তর দিল না। সে ধীরে ধীরে নিজের কাগজপত্র গুছিয়ে নিল। তার চোখে রাগ নেই। বরং আশ্চর্য রকম শান্ত। তাতে কোনো হুমকির ছাপও নেই।
শুধু একটা বিষয় তার কাছে এখন একেবারে পরিষ্কার। ওরা জানে জমিটা তার। ওরা এও জানে তাদের সেখানে থাকার বৈধ অধিকার নেই। তবু তারা জায়গা ছাড়বে না। কারণ তারা বিশ্বাস করে, মালিকানা আর ক্ষমতা এক জিনিস নয়।
কাগজে মালিক রেজোয়ান। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি তাদের নিয়ন্ত্রণে।
রেজোয়ান চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল। দরজার দিকে যাওয়ার আগে একবার ঘরের দেয়ালে টাঙানো খাগড়াছড়ির ছবিগুলোর দিকে তাকাল। ছবির পাহাড়গুলো নিঃশব্দ। সবুজ ঢালের ওপর মেঘ জমে আছে। দূরে একটা সরু পাহাড়ি পথ অরণ্যের মধ্যে হারিয়ে গেছে।
ছবিটা দেখে তার মনে পড়ল নিজের জমির কথা। সেই পথ। গাছ। ছড়া। আর সেই কাটা পাথর।
তারপর সে ঘর থেকে বেরিয়ে এল। লিফটের দরজা বন্ধ হলো। কয়েক সেকেন্ড পর লিফট নিচে নামতে শুরু করল। রেজোয়ান একা দাঁড়িয়ে রইল। তার হাতে নিজের ফাইল। মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই। কিন্তু মাথার ভেতর কদিন ধরে চলতে থাকা অংকটা এবার মিলে গেছে।
সে প্রশাসনের কাছে গেছে। ভূমি অফিসে গেছে। থানায় গেছে। তারপর কোম্পানির মালিকের সঙ্গেও সরাসরি কথা হয়েছে।
কেউ তার মালিকানা অস্বীকার করেনি। কেউ তাকে ভুলও বলেনি। কিন্তু কেউ তাকে তার জমি ফিরিয়েও দেয়নি।
লিফটের দরজা খুলল। রেজোয়ান বেরিয়ে এল।
বাইরে বিকেলের আলো তখন ধীরে ধীরে নরম হচ্ছে। মতিঝিলের রাস্তায় মানুষের ভিড় আরও বেড়েছে। গাড়ির হর্ন, বাসের ব্রেকের শব্দ, পথচারীদের ব্যস্ততা, ফুটপাথের দোকানদারদের ডাক, সব মিলিয়ে শহর আবার তার স্বাভাবিক বিশৃঙ্খলায় ফিরে গেছে।
রেজোয়ান গাড়িতে উঠে দরজা বন্ধ করল। ইঞ্জিন চালু করার আগে কিছুক্ষণ স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখে চুপ করে বসে থাকল। তারপর ধীরে ধীরে গাড়ি ছাড়ল।
আজ সে কাউকে ভয় দেখায়নি। আবার কাউকে হুমকিও দেয়নি। শুধু নিজে একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
আইনের দরজায় সে যথেষ্ট কড়া নেড়েছে। এবার দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোকে একটু কাছ থেকে দেখতে হবে।
কারণ সে বুঝে গেছে, এই লড়াইয়ে কাগজ তার পক্ষে থাকলেও প্রতিপক্ষ কাগজের শক্তিতে বিশ্বাস করে না। আর রেজোয়ানের সবচেয়ে বড় সুবিধাটা কাগজে লেখা নেই। সেটা আছে তার মাথার ভেতর।
গাড়ি শহরের ভিড় পেরিয়ে এগিয়ে চলল। রেজোয়ানের চোখ সামনে। মুখ শান্ত। কিন্তু সেই শান্ত মুখের আড়ালে বহু বছরের অভিজ্ঞতায় কঠোর প্রশিক্ষণে তৈরি একটা পুরনো চেহারা ধীরে ধীরে অবয়ব পাচ্ছে।
(চলবে)3 Comments-
বিষণ্ন সুমন, আপনি বেশ গুছিয়ে লিখেছেন এবং পুরো কাহিনীতে এক ধরনের টানটান উত্তেজনা কাজ করছিল। বিশেষ করে “আবেগ দিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়, কিন্তু ভালো সিদ্ধান্ত নিতে হলে আবেগকে কিছুক্ষণ বাইরে রাখতে হয়”—এই লাইনটি আমার ভীষণ ভালো লেগেছে। চরিত্রগুলোর এমন বাস্তবসম্মত উপস্থাপনা গল্পটাকে আরও অনেক বেশি জীবন্ত করে তুলেছে, পরবর্তী অংশের অপেক্ষায় রইলাম।
আমি মানুষের ভীড়ে মানুষ খোঁজে ফিরি

বিষণ্ন সুমন
ডিজাইনার
স্কুল বয়েস থেকেই লিখালিখা করি। যদিও পড়ি তার আগে থেকেই। আমি বিশ্বাস করি, ভালো লিখতে হলে আগে ভালো পড়তে জানতে হবে। তাই এখন পর্যন্ত নিজেকে লেখক না ভেবে ভালো পাঠক হিসেবেই পরিচয় দিতে সাচ্ছন্দ্য বোধ করি। প্রথম প্রকাশিত বই সেই ১৯৯৬ সালের গ্রন্থমেলায় “কে বলে তুমি নেই” রোমান্টিক উপন্যাস এবং সম্পূর্ণ মৌলিক ওয়েস্টার্ণ “লোন রাইডার”। পরবর্তীতে ২০১২ সালের বই মেলায় অন্যপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত গল্প সংকলন। মাঝে banglanews24.com এর সাহিত্যপাতায় নিয়োমিত লিখেছি। আসলে আমি লেখায় কখনোই অনর্গল নই। মাঝেমাঝেই বন্ধাত্ব্য এসে আমায় থামিয়ে রাখে। একটা শব্দও লিখতে পারিনা। তখন আমার পুরনো লিখাগুলো নিজেই পাঠক হয়ে পড়ি আর ভাবি, এ গুলো কি সত্যিই আমি লিখেছিলাম(?)। এই ৫৪ বছর বয়সে এসেও এই একটাই প্রশ্ন নিজেকে করে যাচ্ছি প্রতিনিয়ত।
Friends
মেহেদী মারুফ
@maruf1
Redowan Hussain
@redowanhussain
ডা.এম.এইচ.রহমান খান
@drmhrahmankhan
Hashem Molla
@hashemmolla
Nusrat jahan
@shuha
রুবেল দে
@alexrubel630
Afra Anjum
@afraanjum
Sk Sagor
@sksagor
, মিঠুন কুমার ঘোষ
@mkghosh

বিষণ্ন সুমন, আপনি অত্যন্ত নিপুণভাবে রেজোয়ানের মানসিক দ্বন্দ্ব এবং পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির টানাপোড়েন ফুটিয়ে তুলেছেন। বিশেষ করে, “আবেগ দিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়, কিন্তু ভালো সিদ্ধান্ত নিতে হলে আবেগকে কিছুক্ষণ বাইরে রাখতে হয়”—আপনার এই পর্যবেক্ষণটি অত্যন্ত গভীর ও তাৎপর্যপূর্ণ। আপনার লেখনীর এই পরিপক্বতা এবং চরিত্রের দৃঢ়তা প্রকাশের ধরণটি সত্যিই প্রশংসনীয়, আপনি এমন চমৎকার লেখা নিয়মিত চালিয়ে যেতে পারেন।