-
অরণ্যের শেষ প্রহর
(অধ্যায় সাত)
রাতের পর রাত কেটে যাচ্ছিল, আর মেঘদূত মাউন্টেন রিসোর্টের লোকজন ধীরে ধীরে একটা অস্বস্তিকর অবস্থার সঙ্গে পরিচিত হয়ে উঠছিল। দিনের পাহাড় আর রাতের পাহাড় এক থাকলো না। সূর্য ওঠার পর যে ঢালটা সাধারণ একটা রাস্তা, দুপুরে যার ওপর দিয়ে শ্রমিকেরা হাসতে হাসতে ওঠানামা করে, সন্ধ্যা নামার পর সেই একই ঢাল অন্ধকারের মধ্যে নিজের চেহারাটাই বদলে ফেলে। বাঁশঝাড়ের ছায়া তখন আরও ঘন হয়। শুকনো পাতার ওপর সামান্য শব্দও অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে যায়। ভেজা মাটিতে পায়ের ছাপ বসে থাকে। আবার কোথাও পাথুরে জমি যেখানে কোনো রকম শব্দই হয় না। দিনের বেলায় যেসব গাছ কেবলি গাছ, রাতের অন্ধকারে তাদের কা-ই হয়ে ওঠে বিশাল আড়াল। সেই সব গাছের ডালপালা হয়ে ওঠে দৃষ্টির বাধা, আর পাহাড়ের ঢাল হয়ে ওঠে এমন এক গোলকধাঁধা, যেখানে যে কোনো মানুষ নিজের পূর্ব পরিচিত পথটাও চিনতে ভুল করতে পারে।রেজোয়ান এই পরিবর্তনটা বহু আগেই বুঝেছিল। সে বরং অপেক্ষা করছিল, অন্যরা কখন সেটা বুঝবে।
দিনের আলোয় তাকে প্রায় সবসময় স্বাভাবিক একজন মানুষ হিসেবেই দেখা যেত। কখনো নিজের গাড়ি নিয়ে খাগড়াছড়ি শহরে ঢুকছে, কখনো মাউন্ট ইন-এর লবিতে বসে চা খাচ্ছে, আবার কখনো পুরনো পরিচিত আবদুল করিমের বাড়ির উঠানে বসে পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে আছে। তার পোশাকেও তেমন কোনো বিশেষত্ব নেই। বেশীরভাগ সময় তাকে দেখা যেত গাঢ় রঙের প্যান্ট, সাথে ফরমাল শার্ট, আবার কখনো হালকা জ্যাকেট পরে আছে। তাকে দেখে যেন কেউ ভেবে নেয়, নিজের জমি নিয়ে ঝামেলায় পড়া একজন অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা যে কয়েকদিনের জন্যে আশপাশ এলাকায় এসে অবস্থান করছেন। যদিও এজন্য তার মুখে কোনো উত্তেজনার ছাপ নেই। চোখেও কোনো তাড়া নেই।
কিন্তু রাত নামার সঙ্গে সঙ্গে সেই মানুষটার চলাফেরার ধরন বদলে যেত। রেজোয়ান তখন আর অন্ধকারে হাঁটত না, বরং বলা চলে অন্ধকারের মধ্য দিয়েই চলত। এ দুটির মধ্যে পার্থক্য কিন্তু অনেক।
সে কখনো সোজা পথে হাঁটত না, যেহেতু এতে সুবিধা ছিল পাশ দিয়ে আড়াল ব্যবহার করে এগোনো যায়। শুকনো পাতার ওপর পা রাখার আগে চোখ নামিয়ে আগে মাটি দেখত। পাথরের ওপর পা না দিয়ে ভেজা মাটির নরম অংশ বেছে নিত। কোনো ঝোপে ঢোকার আগে হাত দিয়ে ডাল সরিয়ে আবার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দিত, যাতে ওদিক দিয়ে তার যাওয়ার কোনো চিহ্ন না থাকে। ঢাল বেয়ে নামার সময় শরীরটা সামান্য নিচু রাখত, যাতে হাঁটু ঢিলে থাকে, ওজনটা পায়ের মাঝখানে পড়ে। যার কারণে কখনো পা পিছলে গেলেও পুরো শরীর একসঙ্গে ভারসাম্য হারাবার ভয় থাকে না।
এই অভ্যাসগুলো কোনো নতুন কৌশল নয়। । বরং পুরনো সামরিক কৌশল, যা তার শরীর বহু বছর আগে থেকেই রপ্ত করে নিয়েছে।
কমান্ডো প্রশিক্ষণ মানুষের মাংসপেশিকে শুধু শক্ত করে না, তার প্রতিক্রিয়াকেও বদলে দেয়। বিপদ দেখার আগে বিপদের সম্ভাবনা দেখতে শেখায়। শব্দ শোনার আগে শব্দের উৎস আন্দাজ করতে শেখায়। সামনে কী আছে তার চেয়ে কোথা থেকে বিপদ আসতে পারে, সেটা ভাবতে শেখায়। রেজোয়ানের ক্ষেত্রে বয়স সেই অভ্যাসগুলোর কোনটাই মুছে দিতে পারেনি।
বরং বয়স তাকে আরও হিসেবি করেছে। সে জানে, পঞ্চাশ পেরোনোর পর তরুণ বয়সের মতো শক্তির ওপর ভরসা করা বোকামি। তাই সে শক্তি খরচ করে না। প্রয়োজনের আগে দৌড়ায় না। অকারণে সংঘর্ষে জড়ায় না। তার সবচেয়ে বড় অস্ত্র তার শরীর নয়, তার মাথা।
সে কারণেই সে পেরেছে পাহাড়কে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিতে।
সেই রাতটাও ছিল অন্ধকার। আকাশে চাঁদ ছিল না। পাহাড়ের মাথার ওপর মেঘ জমে থাকায় তারার আলো প্রায় দেখাই যাচ্ছিল না। রিসোর্টের নির্মাণ এলাকায় কয়েকটা বৈদ্যুতিক বাতি জ্বলছিল। আলোয় মাটি, মেশিন, বাঁশ আর শ্রমিকদের থাকার শেড পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল। কিন্তু আলো শেষ হওয়ার পরই শুরু হয়েছে অন্য জগত। সেখানে গাছের গায়ে আলো পৌঁছায় না। বাঁশঝাড়ের ভেতর কেবল কালো স্তর, আর তারও পেছনে পাহাড়ের ঢাল।
দুজন পাহারাদার সেদিকেই যাচ্ছিল। তাদের হাতে টর্চ। একজনের হাতে লাঠি।
আগের কয়েকটি ঘটনার পর তারা সতর্ক হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সতর্কতা আর অভ্যাসগত প্রশিক্ষিত সতর্কতার মধ্যে পার্থক্য আছে। তারা বারবার টর্চ ঘুরিয়ে চারপাশ দেখছিল। টর্চের আলো একবার সামনে, একবার ডানে, একবার বাঁয়ে ছুটে যাচ্ছিল। ফলে অন্ধকারের মধ্যে তারা যতটা দেখতে পাচ্ছিল, তার চেয়ে বেশি বরং দেখতে পাচ্ছিল না।
রেজোয়ান তখন তাদের প্রায় ত্রিশ গজ সামনে। একটা মোটা গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে। দুজন তাকে দেখতে পাচ্ছিল না। কিন্তু সে ঠিকই তাদের গতিবিধি দেখছিল।
প্রথম লোকটা একটু দ্রুত হাঁটছিল। দ্বিতীয়জন তার থেকে প্রায় চার হাত পিছনে। মাঝখানে কয়েক গজ খোলা জায়গা। বাঁ দিকে শুকনো পাতায় ঢাকা একটা সরু পথ। ডান দিকে একটা ঢাল নিচে নেমে গেছে।
রেজোয়ান ধীরে ধীরে পিছিয়ে গেল। তার পায়ের নিচে একটা শুকনো ডাল ছিল। পা তুলে সে ডালটা এড়িয়ে গেল। এক ইঞ্চিও শব্দ হলো না।
দুজন পাহারাদার সামনে এগিয়ে গেল। রেজোয়ান তাদের পেছনে গেল না। সে অপেক্ষা করল। কারণ সে জানে, মানুষকে ভয় দেখানোর সবচেয়ে ভালো সময় তখনই, যখন মানুষ মনে করে সে আসলে নিরাপদ।
আরও কিছুক্ষণ পর দুজন পাহারাদার রাস্তার একটা বাঁকে পৌঁছাল। সামনের লোকটা টর্চের আলো ফেলল। কিছুই দেখতে পেল না।
সে এক পা এগোল। তারপরই মাটির নিচ থেকে বেরিয়ে থাকা একটা পাতলা বাঁশের লতা তার গোড়ালির সঙ্গে জড়িয়ে গেল। লোকটা বুঝে ওঠার আগেই পা আটকে গেল। শরীর সামনে ছিটকে গেল। সে দুহাত বাড়িয়ে নিজেকে সামলাতে চাইল। কিন্তু পারল না। ধপ করে মাটিতে পড়ে গেল। তার টর্চ হাত থেকে ছিটকে গিয়ে কয়েক হাত দূরে পড়ে আলো ছড়াতে লাগল।
পেছনের লোকটা তাকে তুলতে এগিয়ে গেল।
ঠিক তখনই রেজোয়ান অন্ধকার থেকে বেরিয়ে এল। এক ঝলক। শুধু কয়েক মুহূর্তের জন্য।
পেছনের লোকটা ঘুরে দাঁড়াতেই তার চোখের সামনে একটা ছায়া। সে হাত তুলতে গেল। রেজোয়ানের ডান হাত বিদ্যুতের মতো উঠে এল। কবজি ধরে টান। লোকটার শরীর সামনে চলে এল।
পরের মুহূর্তে রেজোয়ানের বাঁ কাঁধ তার বুকের সঙ্গে ঠেকল। শরীরের ঘূর্ণনের সঙ্গে লোকটার ভারসাম্য চলে গেল। মাটিতে পড়ার আগেই রেজোয়ানের পা তার পায়ের পেছনে ঢুকে গেছে।
একটা মোচড়। লোকটা কাদার ওপর আছড়ে পড়ল। তার মুখ থেকে চাপা গোঙানি বের হলো।
রেজোয়ান তার ওপর চেপে বসল না। প্রয়োজনও নেই। এক হাত দিয়ে কবজি নিয়ন্ত্রণে রেখে নিচু গলায় বলল, “শান্ত থাক।”
লোকটা ছটফট করছিল।
রেজোয়ান তার হাত ছেড়ে দিল। তারপর উঠে দাঁড়াল। “ওকে নিয়ে ফিরে যাও।”
লোকটা তাকিয়ে রইল। তার চোখে তখন ভয়। কারণ সে প্রথমবার বুঝতে পারল, সামনে যে মানুষটা দাঁড়িয়ে আছে সে শুধু শক্তিশালী নয়, তার প্রতিটি নড়াচড়া হিসেব করা।
রেজোয়ান আহত লোকটার দিকে তাকাল। লোকটা তখনো মাটিতে পড়ে আছে। গোড়ালির কাছে লতা জড়িয়ে ছিল। রেজোয়ান সেটা কেটে ছিঁড়ে সরিয়ে দিল। তারপর লোকটাকে বসিয়ে দিল।
“হাঁটতে পারবে?”
লোকটা মাথা নাড়ল।
রেজোয়ান তার টর্চটা তুলে হাতে দিল। “তাহলে ফিরে যাও।” এর বেশি কিছু বলল না সে। তারপর ঘুরে দাঁড়াল।
দুজন পাহারাদার তখনও তাকিয়ে আছে। রেজোয়ান তিন পা এগিয়ে একটা বাঁশঝাড়ের আড়ালে ঢুকল। পরমুহূর্তে তাকে আর দেখা গেল না।
লোক দুজন টর্চের আলো এদিক-ওদিক ঘোরাতে লাগল। কেউ নেই। শুধু বাঁশপাতা সামান্য দুলছে। তারা বুঝতে পারল না, লোকটা কোনদিকে গেল।
আসলে রেজোয়ান তখন তাদের থেকে অনেক দূরে, একটা নিচু ঢালের আড়ালে চলে গেছে। শরীর নিচু করে সে কয়েক মুহূর্ত অপেক্ষা করল। পাহারাদারদের টর্চের আলো দূরে সরে গেল। তারপর সে উঠে দাঁড়িয়ে অন্য পথ ধরল।
সোজা রিসোর্টে ফিরে গেল না। আরেকটা পাহাড়ি পথ ধরে ঘুরে নিজের থাকার জায়গার দিকে চলে গেল।
পরদিন সকালে ঘটনাটা রিসোর্টে পৌঁছাল। দুজন পাহারাদারই বেঁচে ফিরেছে। একজনের গোড়ালি মচকে গেছে। অন্যজনের কাঁধে আঘাত।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, কেউ বলতে পারছে না তাদের আক্রমণ করেছিল কে।
একজন বলল, সে শুধু একটা ছায়া দেখেছে। আরেকজন বলল, লোকটা সামনে ছিল। তারপরই নেই।
কোম্পানির লোকেরা ঘটনাস্থলে গিয়ে লতা, ভাঙা ডাল আর মাটির দাগ ছাড়া কিছুই পেল না।
কেউ রেজোয়ানের নাম মুখে আনল না। যদিও নামটা সবার মাথায় ছিল।
তারপর থেকে রিসোর্টের পাহারায় নতুন নিয়ম হলো। কেউ একা বের হবে না। দুজন একসঙ্গে যাবে। সাথে টর্চের অতিরিক্ত ব্যাটারি থাকবে। সীমানার কাছে যাওয়ার আগে ম্যানেজমেন্টকে খবর দিয়ে রাখতে হবে।
কিন্তু নিয়ম যত বাড়ল, ভয়ও তত বাড়ল। কারণ পাহারাদাররা বুঝতে পারছিল, দুজন একসঙ্গে থাকলেও তাদের কেউ পাহাড়কে চেনে না। আর যে মানুষটা তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে, সে পাহাড়কে চেনে।
কয়েকদিন পর আরেক ঘটনা ঘটল। এবার একজন পাহারাদার পথ হারাল।
লোকটা আগেও ওই পথে গেছে। রাস্তার কোন বাঁকে শুকনো গাছ, কোথায় ছড়া, কোথায় বাঁশঝাড়, সবই তার পরিচিত। কিন্তু সেদিন রাতের অন্ধকারে কয়েক মিনিটের মধ্যে সে এমন জায়গায় চলে গেল যেখানে কোনো আলো নেই, কোনো পরিচিত চিহ্ন নেই।
সে ফিরে আসতে চেষ্টা করল। একটা পথ ধরে এগোল। তারপর আরেকটা। কিছুক্ষণ পর মনে হলো সে আবার ঘুরে আগের সেই জায়গাতেই এসেছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সে আসলে অরণ্যের আরও গভীরে চলে গেছে।
দুই ঘণ্টা পর তাকে পাওয়া গেল। রিসোর্ট থেকে অনেক দূরে একটা পাহাড়ি ঢালের নিচে। জামাকাপড় কাদায় ভরা। হাতের চামড়া আঁচড়ে গেছে। টর্চের ব্যাটারি শেষ। সে শুধু বলল, “আমি বারবার একই জায়গায় ঘুরছিলাম।”
কেউ তাকে বিশ্বাস করল না। কিন্তু পরদিন যখন ঘটনাস্থল দেখা হলো, তখন কেউ আর হাসল না। কারণ তার চলার পথটা মোটেও স্বাভাবিক ছিল না।
এক জায়গায় তার পায়ের ছাপ হঠাৎ শেষ হয়েছে। তারপর প্রায় ত্রিশ গজ দূরে আবার সেই ছাপ পাওয়া গেছে। মাঝখানের অংশে কোনোরকম স্পষ্ট চিহ্ন নেই, যা দেখে বলা যায় সে নিজেই হেঁটে গেছে।
সেই রাতে রেজোয়ান প্রকৃতই কোথায় ছিল, সেটা কেউ জানে না। শুধু করিম জানত। কারণে গভীর রাতে তার ঘরের দরজা তাকে একবার খুলতে হয়েছিল।
রেজোয়ান ভেতরে ঢুকে জুতো খুলে রেখেছিল। তার প্যান্টের নিচের অংশে সামান্য কাদা। হাতে একটা আঁচড়।
করিম কিছু জিজ্ঞেস করেনি। রেজোয়ানও কিছু বলেনি।
বাইরে তখন পাহাড়ি বাতাস বইছে। বাঁশঝাড়ে পাতার শব্দ। দূরের ছড়ায় পানি বয়ে যাচ্ছে।
কয়েক মিনিট পর রেজোয়ান জানালার পাশে দাঁড়াল। দূরে অন্ধকার পাহাড়। আর তারও ওপারে মেঘদূত মাউন্টেন রিসোর্ট।
রেজোয়ানের চোখে তখনও কোনো উল্লাস নেই। সে জানে, এই লড়াইয়ে তাকে যতটা সম্ভব সীমার মধ্যে থাকতে হবে। কাউকে হত্যা করা যাবে না। অপ্রয়োজনীয় রক্তপাত করা যাবে না।
শুধু তাদেরকে একটা স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে। কিন্তু এমনভাবে যাতে আইন তার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সুযোগ না পায়। সহজ কথায়, সাপও মরে, লাঠিও না ভাঙ্গে।
দিনের বেলায় কোম্পানি তাদের মেশিন, লোকবল আর টাকা নিয়ে যত খুশী পাহাড় দখল করে রাখুক। কিন্তু, রাত হলেই পাহাড় তার। এবং সেই রাতগুলোতে রেজোয়ান তাদের বুঝিয়ে দেবে, জমির কাগজ আসলেই এক দলা কাগজ নয়।
তারপর আর একদিন দুপুরে কয়েকজন শ্রমিক পাহাড়ের নিচের একটা চায়ের দোকানে বসেছিল। তাদের মাঝে কাজের ফাঁকে চা, বিস্কুট আর বিড়ি নিয়ে বেশ গল্প চলছিল। অরণ্যের দিকে তখন রোদ পড়েছে। দূরের পাহাড় নীলচে। বাতাসে শুকনো বাঁশপাতার গন্ধ।
একজন ভয় মাখানো কণ্ঠে আস্তে বলল, “রাতে আমি আর ওইদিকে যাব না।”
তার কথা শুনে আরেকজন হাসল। “তুই কর্ণেলকে ভয় পেয়েছিস?”
লোকটা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, “লোকটাকে ভয় পাই না। ভয় পাই রাতটাকে।”
কথাটা শুনে আর কেউ হাসল না। কারণ সবাই একইভাবে ভাবছিল। রেজোয়ানকে তারা অনেকেবার দেখেছে। কিন্তু সেই লোকটাই যখন রাতে আসে, তখন আর তাকে দেখা যায়না।
এখন অবধি তারা শুধু ফলাফল দেখেছে। একজন পড়ে গেছে। আর একজন পথ হারিয়েছে। তারপর আরো একজন আহত হয়েছে।
আবার একজন অন্ধকারের মধ্যে দাঁড়িয়ে ফিরে এসে বলেছে, কেউ তাকে দেখছিল।
ধীরে ধীরে রেজোয়ানকে নিয়ে গল্প তৈরি হলো। কেউ বলল, সে একা দশজনকে সামলাতে পারে। কেউ বলল, তার চোখ অন্ধকারেও দেখে। কেউ বলল, সে পাহাড়ের প্রতিটি পথ চেনে। আবার কেউ বলল, কর্ণেল সাহেব দিনে মানুষ হলেও, রাতে অশরীরি কিছু।
গল্প যত বাড়ল, ভয়ও তত বাড়ল। কিন্তু সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটা হলো শ্রমিকদের মধ্যে।
আগে তারা দিনের কাজ শেষ হলে রাতে শেডে ফিরে নিশ্চিন্তে খাওয়া-দাওয়া করত। এখন সন্ধ্যা নামার আগেই সবাই নিজের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করতে চাইত। কেউ একা বাইরে যেত না। টয়লেটে গেলেও দুজন যেত। পানি আনতে হলেও দুজন।
রাতের পাহাড়ের দিকে তাকালে তাদের চোখে অস্বস্তি দেখা যেত। কারণ দিনের আলোয় তারা জানত কোথায় কী আছে। কিন্তু, রাতে তারা চারিদিক অন্ধকার ছাড়া কিছুই দেখতে পেত না।
এক সন্ধ্যায় কাজ শেষ হওয়ার পর কয়েকজন শ্রমিক শেডের সামনে বসে ছিল। পাহাড়ের ওপর শেষ আলোটুকু তখন নিভে আসছে। দূরের ঢাল ধীরে ধীরে কালো হয়ে যাচ্ছে। বাঁশঝাড়ের মাথা বাতাসে দুলছে।
একজন নিজের ব্যাগটা গুছিয়ে নিল।
আরেকজন তাকাল। “কোথায় যাচ্ছিস?”
লোকটা ব্যাগ কাঁধে তুলল। “বাড়ি।”
“আজ?”
“আজই।”
কেউ তাকে থামাল না। কারণ তার মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছিল, সিদ্ধান্তটা সে অনেকক্ষণ আগেই ভেবে নিয়েছে।
আর তার পরের দিন আরও দুজন একই কথা বলল। তারা কাজ ছেড়ে দেবে। মজুরি কম বলে নয়। কাজ কঠিন বলে নয়। পাহাড় দুর্গম বলে নয়।
তাদের ভয় হচ্ছে রাতকে। কারণ তারা বুঝে গেছে, দিনের কাজ শেষ হলেই সব কিছু শেষ হয় না। দিনের শেষে যখন মেশিন বন্ধ হয়ে যায়, শ্রমিকেরা শেডে ফিরে যায়, আলো নিভে আসে, তখন পাহাড়ের আরেকটা পালা শুরু হয়।
সেই পালায় কোম্পানির মেশিন নেই। লোকবল নেই। কোন টাকা নেই।
আছে শুধু অন্ধকার। আর সেই অন্ধকারের মধ্যে কোথাও একজন মানুষ হাঁটে। নিঃশব্দে। ধীরে। হিসেব করে।মেঘদূত মাউন্টেন রিসোর্টের লোকেরা এখনো তাকে পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারেনি। কিন্তু একটা জিনিস তারা বুঝতে শুরু করেছে। রেজোয়ান তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করছে না। সে শুধু তাদের ভয় শেখাচ্ছে।
আর ভয় যখন একবার মানুষের মনে জায়গা করে নেয়, তখন তাকে পাহারা দিয়ে, টাকা দিয়ে, আদেশ দিয়ে কিংবা বন্দুক দেখিয়ে সবসময় সরানো যায় না।
সেদিন রাতে রেজোয়ান পাহাড়ের একটা উঁচু ঢালে দাঁড়িয়ে নিচের রিসোর্টের আলো দেখছিল। বাতাসে দূরের ছড়ার শব্দ ভেসে আসছিল। নিচে কয়েকটা আলো নড়ছে, পাহারাদাররা টহল দিচ্ছে।
রেজোয়ান স্থির দাঁড়িয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে পিছিয়ে গেল। অন্ধকার তাকে গিলে নিল।
নিচে দাঁড়িয়ে থাকা পাহারাদাররা কিছুই দেখল না। শুধু একজন হঠাৎ থেমে চারপাশে তাকাল। কেন থামল, সে নিজেও জানে না। কিছু শুনেছে কি না, তাও জানে না। কিন্তু তার বুকের ভেতর অকারণে একটা শীতল অনুভূতি ছড়িয়ে গেল।
সে টর্চটা শক্ত করে ধরল। তারপর খুব নিচু গলায় সাথের জনকে বলল, “চলো… ফিরে যাই।”
সেদিন থেকে মেঘদূত মাউন্টেন রিসোর্টে আরেকটা সমস্যা শুরু হলো।
রেজোয়ান তাদের জমি থেকে সরাতে পারেনি, কিন্তু তাদের মানুষগুলোকে সেখানে থাকতে অনিচ্ছুক করে তুলেছে।
(চলবে)6 Comments-
আপনার লেখনীতে রাতের পাহাড়ের রহস্যময় পরিবেশটি এতটাই জীবন্ত হয়ে উঠেছে যে “অন্ধকারের মধ্যে তারা যতটা দেখতে পাচ্ছিল, তার চেয়ে বেশি বরং দেখতে পাচ্ছিল না”—এই বাক্যটির মাধ্যমে আপনি ভয় ও অনিশ্চয়তার যে নিখুঁত আবহ তৈরি করেছেন তা সত্যিই অতুলনীয়। আপনার গল্পের এই টানটান উত্তেজনাময় যাত্রায় চরিত্রগুলোর মানসিক টানাপোড়েন এবং অরণ্যের প্রতি তাদের ভয়ের রূপান্তর বেশ চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন, তাই আপনার এই সৃষ্টিশীল কাজটির পরবর্তী অংশ পড়ার অপেক্ষায় রইলাম।
আমি মানুষের ভীড়ে মানুষ খোঁজে ফিরি

বিষণ্ন সুমন
ডিজাইনার
স্কুল বয়েস থেকেই লিখালিখা করি। যদিও পড়ি তার আগে থেকেই। আমি বিশ্বাস করি, ভালো লিখতে হলে আগে ভালো পড়তে জানতে হবে। তাই এখন পর্যন্ত নিজেকে লেখক না ভেবে ভালো পাঠক হিসেবেই পরিচয় দিতে সাচ্ছন্দ্য বোধ করি। প্রথম প্রকাশিত বই সেই ১৯৯৬ সালের গ্রন্থমেলায় “কে বলে তুমি নেই” রোমান্টিক উপন্যাস এবং সম্পূর্ণ মৌলিক ওয়েস্টার্ণ “লোন রাইডার”। পরবর্তীতে ২০১২ সালের বই মেলায় অন্যপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত গল্প সংকলন। মাঝে banglanews24.com এর সাহিত্যপাতায় নিয়োমিত লিখেছি। আসলে আমি লেখায় কখনোই অনর্গল নই। মাঝেমাঝেই বন্ধাত্ব্য এসে আমায় থামিয়ে রাখে। একটা শব্দও লিখতে পারিনা। তখন আমার পুরনো লিখাগুলো নিজেই পাঠক হয়ে পড়ি আর ভাবি, এ গুলো কি সত্যিই আমি লিখেছিলাম(?)। এই ৫৪ বছর বয়সে এসেও এই একটাই প্রশ্ন নিজেকে করে যাচ্ছি প্রতিনিয়ত।
Friends
মেহেদী মারুফ
@maruf1
Redowan Hussain
@redowanhussain
ডা.এম.এইচ.রহমান খান
@drmhrahmankhan
Hashem Molla
@hashemmolla
Nusrat jahan
@shuha
রুবেল দে
@alexrubel630
Afra Anjum
@afraanjum
Sk Sagor
@sksagor
, মিঠুন কুমার ঘোষ
@mkghosh



পাহাড়ের ওপর রেজোয়ান, নিচে রিসোর্টের আলো—দারুণ।