Profile Photo

Srijon MediaOffline

  • srijonmedia
  • Profile picture of Srijon Media

    Srijon Media

    • 1 month, 2 weeks ago

    ও যেন ভাল থাকে
    -এম এ রশিদ

    ওরা দুইজন, ছেলে মেয়ে দুইজন আর শাশুড়িকে নিয়ে পাঁচ জনের সংসারে প্রতিদিনের আয় পয়ত্রিশ টাকা। তাও আবার অনিয়মিত। কৃষি শ্রমিকের কাজ তো আর প্রতিদিন বয় না।

    আজ হঠাৎ তার বিধবা বউটা খোঁজে খোঁজে আমার কাছে এসেছিলো। দুঃখ পেলাম ঢের যখন জানলাম গত মাস দুই আগে সে গত হয়েছে।

    প্রতি শুক্রবারে আমার কাছে আসতো বেচারা। বাড়ির গেটে দাড়িয়ে ওস্তাদ বলে হাঁক ছাড়তো। আমি বেরিয়ে আসা মাত্রই হাসি মুখে দুষ্টুমি ভরা আব্দার –
    “ওস্তাদ সারা সপ্তার টাকা একবারে দ্যাও। যেদিন সকালে তোমার সাথে দেখা করে যাই, তুমি দুই পাঁচ টাকা দ্যাও, সেদিন আমার ব্যবসা ভাল হয়। আজকাল শুক্কুরবার ছাড়া তুমার দেখা পাইনে।”

    সবাই তাকে জানা বলে ডাকত। কিন্তু তার আসল নাম ছিল সম্ভবতঃ কাউসার। ছোটখাটো মানুষটার জামা জুতো সমেত সর্বোচ্চ ওজন ছিল বত্রিশ- তেত্রিশ কেজি। কোন মতেই তার বেশি নয়। অতিশয় দুর্বল দেহ নিয়ে কোন রকম বেঁচে থাকা। আমাদের বাড়ি থেকে এক গাঁ দূরে কমলাপুরের ঘর জামাই। সে আমাকে ওস্তাদ বলে ডাকত। তার একটা কারণ আছে।

    আমি তখনও ছাত্র ওকে একবার কাজে নিয়েছিলাম। পয়ত্রিশ টাকা হাজিরায় হলুদ তোলার জন্যে। হাতে একটা কাঁচি আর মাথায় একটা বাঁশ-বুননের মাথাল নিয়ে মন্থর গতিতে তার সেই হেটে আসা স্মৃতিতে স্থায়ী হয়ে আছে।

    একদিন তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, “তোমার সংসারে কয়জন মানুষ দাদা?” ও বলেছিল, “শাশুড়ি সহ পাঁচ জন।” আমি শুনে হতবাক হয়ে আবার জিজ্ঞেস করলাম, “পয়ত্রিশ টাকায় পাঁচ জনের চলে?” “আল্লাহ যেভাবে চালায়।” ও বলেছিল।
    বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হিসেবে ওই টাকায় তখন আমার হাত খরচই হয় না। তাই আমার বিস্ময়ের সিমা রইল না। আমি ওকে বল্লাম, “তোমার এ কাজ ছেড়ে দেয়া উচিৎ।” “তাহলে কি করে খাবো?” “আমরা তোমায় সাহায্য করতে পারি।”
    “না, আমি কারো সাহায্য নিতি রাজি না। কষ্ট করবো সমস্যা কি?”

    তারপর তার আর খোঁজ নেই। যেদিন আসল, সেদিন তার দেখার হাল নেই। চোখ দুটো গর্তের ভেতর বসে গেছে। হাটতে পারছে না ঠিকমতো। ক্ষিণ গলার স্বর বোঝা যাচ্ছে না। কয়েকদিন ধরে বেচারা অসুখে পড়েছিল। ঘরে খাবারের কোন ব্যবস্থা নেই। তাই অতি কষ্টে আমার কাছে এসেছে। সব শুনে আমি তাকে মায়ের কাছ থেকে কিছু চাউল নিয়ে ওকে দিলাম। সঙ্গে কিছু টাকাও দিলাম। এভাবে আরও দু তিন দিন আসার পর বাড়ির পাশে আমার কাজিন এর দোকান ঠিক করে দিলাম। ওখান থেকে ও আমার নামে চাউল নিয়ে যেত।

    তারপর একদিন ইচ্ছে করেই ওকে বল্লাম, “ দাদা আমি ছাত্র মানুষ, আমি একা তো এভাবে নিয়মিত দিয়ে পারব না। তুমি বরং আরও দু’একজনের কাছে চাও।” “ কার কাছে চাবো? আমার খুব লজ্জা করে।” “ লজ্জা করবে কেন? তুমি যাদের কাজ করতে, তারা সবাই তোমাকে ভালবাসে।”

    সেই থেকে শুরু। এইটুকু পরামর্শের জন্যে সে আমাকে কতবার কৃতজ্ঞতা জানিয়েছে তার ঠিক নেই। ওস্তাদ ছাড়া ডাকতনা ও আমায়।

    মাঝে মাঝে বলতো, “ওস্তাদ কাল খুব ভাল ইমকাম হইলো। দুইশ নগদ টাকা, পাঁচ ছয় কেজি চাইল” অথবা “ ওস্তাদ অমুক এলাকার একটা ছেলে বা মেয়ে আসত না তুমার কাছে পড়তি? তার সাথে দেখা হইলো। আমার চাইল দিইল, টাকা দিইল।”
    আমি আসলে চেয়েছিলাম যে, কাজ করার সামর্থ্য যার নেই, সমাজ তাকে সাহায্য করুক। ওর কথায় বুঝতাম আমার সেই ভাবনাটা ওর ক্ষেত্রে সফল হয়েছিল।
    ও আজ নেই শুনে কষ্ট হচ্ছে অনেক। ও যেন ভাল থাকে।

    3
    4 Comments
    • আপনার লেখায় ফুটে ওঠা কাউসারের আত্মমর্যাদাবোধ এবং আপনাদের মধ্যকার মানবিক সম্পর্কের টানাপোড়েন হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়ার মতো। স্বল্প আয়ের মানুষটির জীবন সংগ্রামের এই করুণ ও সুন্দর চিত্রটি ফুটিয়ে তোলার জন্য আপনার লেখাটি চালিয়ে যান, কারণ এমন গল্প আমাদের চারপাশের মানবিকতাকে পুনরায় মনে করিয়ে দেয়।

    • কাউসারের ক্ষীণ জীবনে আত্মমর্যাদা আর মানবিকতার যে আলো জ্বলেছিল, তার স্মৃতি আজও হৃদয় ভিজিয়ে দেয়…🖤

    • লেখাটা পড়ে সত্যিই খুব মন খারাপ হয়ে গেল, মানুষটার আত্মসম্মানবোধ আর বেঁচে থাকার লড়াই দেখে সত্যিই অবাক হতে হয়।

    • ভালো থাকুক ওপারে ।

Friends

Profile Photo
Kazi Mahabubur Rahman
@kazimahabuburrahman
Profile Photo
Mahdia Rashid
@mahdiarashid
Profile Photo
mithila jannat
@mithilajannat
Profile Photo
Miftah Khan
@miftahkhan
Profile Photo
Fafimamst Begom
@fafimamstbegom
Profile Photo
Md Najmul
@mdnajmul
Skip to toolbar