Profile Photo

Zaman. comOffline

  • zaman.com
  • Profile picture of Zaman. com

    Zaman. com

    • 1 month, 2 weeks ago

    লোহার খাটে ঘুন ধরে না
    ​ঘটনাটি অনেক বছর আগের। সামিউলের বয়স তখন খুব বেশি হলে ছয় বা সাত। মধ্যবিত্ত সংসারে বাবার জমানো টাকায় ঘরে এসেছিল চমৎকার এক কাঠের খাট। পলিশ করা কাঠে রোদের আলো পড়লে সামিউলের মনটা আনন্দে ভরে উঠত। কিন্তু সেই আনন্দ বেশিদিন টেকেনি। বছরখানেক যেতে না যেতেই দেখা গেল খাটের নিচে মেঝেজুড়ে কাঠের গুঁড়ো। ঘুনপোকা ভেতরে ঢুকে খাটটাকে নিঃশব্দে ফাঁপা করে ফেলেছে। একদিন সামান্য ওজনেই মটমট করে ভেঙে পড়ল খাটের একটা কোণা।
    ​সেদিন সামিউলের মন খারাপ দেখে বাবা তাকে কাছে টেনে নিয়ে বলেছিলেন, “মন খারাপ করিস না বাপ। এবার তোকে এমন এক খাট কিনে দেব, যাতে কখনো ঘুন ধরে না! লোহা দিয়ে বানানো খাট… আয়ু তার হাজার বছর!”
    ​কয়েকদিনের মধ্যেই ঘরে এলো একটা শক্তপোক্ত কালো লোহার খাট। ছোট্ট সামিউল বাবার সেই কথাটা মন-প্রাণ দিয়ে বিশ্বাস করে নিল—‘লোহার খাটে ঘুন ধরে না’।
    ​সময় তার নিজস্ব নিয়মে বয়ে চলল। দিন গেল, মাস গেল, বছর পার হলো। ছোট সামিউল একসময় বড় হলো, আর মাথার ওপর ছায়া হয়ে থাকা বাবাও একদিন পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে নিঃশব্দে হারিয়ে গেলেন। কিন্তু বাবার বলে যাওয়া সেই একটা বাক্য সামিউলের মনের ভেতর একদম অমলিন রয়ে গেল।
    ​এই বিশ্বাসটা সামিউলের ভেতরে এমন এক অন্ধ ধারণার জন্ম দিয়েছিল যে, ঘুন ধরে না মানে এই খাট আর কোনোদিনও নষ্ট হতে পারে না! এটা চিরস্থায়ী।
    ​বহু বছর ধরে নিশ্চিন্ত মনে সেই খাটে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে বয়স পার করে দিল সামিউল। খাটটির দিকে বাড়তি খেয়াল রাখার বা রক্ষণাবেক্ষণ করার প্রয়োজন সে কখনো অনুভব করেনি। কারণ তার মনে তো চিরদিনের জন্য ছাপা হয়ে গেছে—লোহার খাট কোনোদিন নষ্ট হয় না!
    ​কিন্তু সামিউলের সরল আর অন্ধ মাথার ভেতর কখনো এই সাধারণ হিসাবটা আসেনি যে—লোহার খাটে ঘুন ধরে না ঠিকই, কিন্তু জং তো ধরতে পারে!
    ​সামিউলের অজান্তেই, বহুকাল ধরে ভেতরে ভেতরে জং ধরে ধরে খাটটির লোহা ক্ষয়ে একবারে শেষ পর্যায়ে চলে এসেছিল। বাইরে থেকে দেখতে কালো রঙের প্রলেপ থাকলেও ভেতরটা হয়ে গিয়েছিল ভঙ্গুর ও মরণাপন্ন।
    ​একদিন রাতে নিশ্চিন্ত মনে সামিউল যেই না খাটে শুতে গেল, অমনি মড়মড় শব্দে পুরো খাট ভেঙে গুঁড়ো হয়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল!
    ​হুট করে নিচে আছড়ে পড়ে অন্ধকার ঘরের ধুলোবালির মধ্যে স্তব্ধ হয়ে বসে রইল সামিউল। আঘাতের চেয়েও বড় ধাক্কা লাগল তার মনে। মাথায় এতদিনে হুশ ফিরে এলো! মনে মনে চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে হলো, “বাবা তো বলেছিল লোহার খাটে কখনো ঘুন ধরে না… কিন্তু লোহার খাটে যে জং ধরে, এ কথা তো বাবা আমাকে কখনো বলেনি!”
    ​আসলে এই পৃথিবীর বেশিরভাগ মানুষই বড্ড সরল। তারা কোনো কথার উপরিভাগটুকু দেখে সিদ্ধান্ত নেয়, গভীরে লুকিয়ে থাকা পূর্ণাঙ্গ সত্যটা বিচার করে দেখতে শেখে না। বিশেষ করে যেখানে আবেগ, অন্ধবিশ্বাস আর কুসংস্কারের সূক্ষ্ম সীমান্তরেখা এসে মিশে যায়, সেখানে মানুষের যুক্তি ও চিন্তাশক্তি পুরোপুরি অচল হয়ে পড়ে।
    ​বাস্তব জীবনে এই একই মানুষ বাজারে গিয়ে মাত্র পাঁচ টাকার একটা বিস্কুট কেনার সময়েও কত সতর্ক! বিস্কুটের প্যাকেটের গায়ে মেয়াদের তারিখ আছে কি না, প্যাকেটটা বাতাস ঢুকে নরম হয়ে গেছে কি না—কত শত উপায়ে যাচাই-বাছাই করে নেয়। কিন্তু জীবনের পরম সত্য, ধর্মীয় চেতনা কিংবা মানসিক শান্তির জায়গায় পৌঁছালে এই মানুষগুলোই নিজেদের যুক্তি বুদ্ধি বন্ধ করে দেয়। কোনো এক পানি পড়া, ভণ্ড পীরের ফু, জাদু-তাবিজ কিংবা বংশপরম্পরায় চলে আসা কাল্পনিক প্রথার পেছনে অকাতরে হাজার হাজার টাকা আর অমূল্য সময় ঢেলে দেয়।
    ​কেন তারা এটা করে? কারণ ‘কেউ একজন বলেছে’, কিংবা ‘কারো মুখে শুনেছে’। ওই যে ছোটবেলায় শোনা “লোহার খাটে ঘুন ধরে না”—ঠিক তেমনই একেকটা আংশিক সত্য বা কাল্পনিক প্রথাকে মানুষ জীবনের চরম সত্য বলে ধরে নেয়। কেউ তাদের শিখিয়ে দেয়নি যে, কোনো একটি নির্দিষ্ট বিপদের পথ বন্ধ হওয়ার অর্থই বিপদ চিরতরে শেষ হয়ে যাওয়া নয়। ঘুনপোকার হাত থেকে বাঁচলেও জং ধরে যে অস্তিত্ব বিলীন হতে পারে—এই সহজ সত্যটুকু বোঝার জন্য যে সচেতনতা আর বুদ্ধি প্রয়োজন, অন্ধবিশ্বাস মানুষকে সেই বুদ্ধি খাটাতে দেয় না।
    ​অন্ধ অনুকরণ আর সত্য অনুসন্ধানের অভাবই মানুষকে অন্ধবিশ্বাসের ফাঁদে ফেলে। বাহ্যিক কিছু রূপক আর আশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে মানুষ যখন নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়ে, ঠিক তখনই তার অজান্তে ভেতরে জমে উঠতে থাকে অসচেতনতার জং। বিশ্বাস সুন্দর, কিন্তু বিবেক ও যুক্তিহীন অন্ধবিশ্বাস একটা বড় অভিশাপ। যতক্ষণ না মানুষ নিজে থেকে প্রশ্ন করতে শিখবে, যতক্ষণ না অন্যের মুখে শোনা সত্যকে নিজের বোধশক্তি দিয়ে পরখ করে নেবে—ততক্ষণ পর্যন্ত এই সমাজের অসংখ্য সামিউলকে ভুল বিশ্বাসের ওপর ভর দিয়ে বাঁচতে হবে এবং একদিন হঠাৎ অন্ধবিশ্বাসের সেই ভাঙা খাটের ওপরেই আছড়ে পড়ে চরম মাশুল গুনতে হবে।

    2
    5 Comments
    • চোখ খুলে দেওয়ার মতো একটি সুন্দর ও বাস্তবমুখী লেখা!

    • কোনো কিছুই চিরস্থাই না 🙂‍↕️

    • Zaman, আপনার লেখাটা পড়ে অনেক কিছু ভাবার আছে, কারণ আমরা অনেকেই তো জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রশ্নহীনভাবে বিশ্বাস করে নিয়ে অজান্তেই বড়সড় কোনো জং ধরার অপেক্ষায় থাকি।

    • আপনার লেখাটির মধ্য দিয়ে জীবনের গভীর এক সত্য খুব সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে, বিশেষ করে বাবার দেওয়া সেই খাটের উদাহরণটি হৃদয়ে দাগ কাটার মতো। আপনি যদি পুরো লেখার শেষে পাঠককে নিজস্ব যুক্তিবোধ দিয়ে জগত দেখার বিষয়ে আরও একটি সরাসরি আহ্বান জানান, তবে বিষয়টি আরও জোরালো হতে পারে। আপনার লেখনশৈলী অত্যন্ত চমৎকার এবং এমন অর্থবহ লেখা নিয়মিত চালিয়ে যাওয়ার জন্য আপনার প্রতি অনেক শুভকামনা রইল।

Friends

Profile Photo
Urmee Islam
@urmeeislam
Profile Photo
shilpi,Ranisankail
@shilpiranisankail
Profile Photo
Sumaiya Ashraf
@ali-ashraf-m1960gmail-com
Profile Photo
EMON
@emon1
Profile Photo
শাহরিয়ার সাওম
@shahriarsaum760gmail-com
Profile Photo
Mahdia Rashid
@mahdiarashid
Profile Photo
mithila jannat
@mithilajannat
Profile Photo
Ayesha akter Shilpi
@ayeshaaktershilpi
Skip to toolbar