Profile Photo

Syed Touhidul IslamOffline

  • syedtouhidulislam
  • Profile picture of Syed Touhidul Islam

    Syed Touhidul Islam

    1 hour, 39 minutes ago

    ঝরা দু’টি ফুল
    – সৈয়দ তৌহিদুল

    সেই ছবিখানি দেখলে আজ কত কথা মনে পড়ে,
    পুরোনো দিনের রৌদ্দু আসে চুপটি করে ঘরে।
    কেউ দাঁড়ায়ে, কেউ বা বসে, কেউ কোলে শিশু ধরে,
    কত মুখের কত যে কথা নীরব ভাঁজে পড়ে।
    পেছন-পানে পুরোনো বাড়ি, সামনে আপনজন,
    ছবির মাঝে থমকে আছে কত বছরের ক্ষণ।
    কোন মুখখানি কারবা আপন— সব কথা কি জানা?
    কোন চোখের জল লুকানো ছিল, কোন হাসি ছিল মানা?
    ছবি শুধু ছবি নয় গো, ছবি স্মৃতির ঘর,
    একটি ফ্রেমে থেমে থাকে যেন হারানো সে প্রহর।
    আজও যবে তব দেখি, মনে পড়ে সেই দিন—
    বকুলতলায় ফুল কুড়ানোর সাদা রঙিনের ঋণ।
    মনে পড়ে কি আজ হতে বছর পঞ্চাশ আগের দিনে,
    মাটির গন্ধ, নদীর হাওয়া, ফেলে আসা সেই ঋণে।
    তারিখ ছিল সাতই মে, সাল উনিশশো ঊনআশি,
    সেদিন ইলিশ সস্তা ছিল— বাজারজুড়ে হাসি।
    বাবার সাথে গিয়েছিলাম কাঁচা ইলিশ কিনতে,
    বাবা গেলেন মাছের হাটে, আমি যাই তব চিনতে।
    কাছে ছিল এক বকুলগাছ, ফুলে ফুলে ভরা ডাল,
    ধরা ঝরা ফুলের গন্ধে সন্ধ্যায় মাতত পথের কাল।
    আমার বয়স তিন কি চার, তোমারও তেমনি বয়স,
    তোমরা তিনজনে ফুল কুড়াও না বকুলতলায় রোজ।
    তোমার হাতে বকুলফুল, চোখে শিশুর আলো,
    কী যে মধুর সে বয়সটি—কেউ কি রাখে ভালো?
    ফুল কুড়িয়ে মালা গাঁথবে, সুতো নিয়ে কথা,
    জীবন কেমনে জোড়া লাগে তা শিশুমনের ব্যথা।
    আমি তখন জানলাম তুমি খুঁজছো নতুন বর,
    ঘরের পাশে ঘর, আমি কি তোমার পর?
    তুমি তখন নামহীনা, নাম লেখা হয়নি খাতায়,
    কী আশ্চর্য—রইলে জুড়ে মোর হৃদয়ের পাতায়।
    বাড়ি নাকি কাছেই তোমার, একই মহল্লায়,
    হুমকি দিলো তোমার সাথীরা ফেলে দিবে কল্লাই।
    আগে থেকে ভাঙা ছিল বকুলগাছের ডাল,
    আমি সেটি এনে দিতে সেটাই হলো কাল।
    হায় রে নিঠুর খেলা, রাণীরও আছে রাজা!
    রানী হলো তোমার সাথী, রাজা দিল সাজা।
    রানী দেখায় আমাকে আর রাজা বলে—“ওই!”
    তুমি আমি চেয়ে রইলাম কারে আর কি কই?
    অসুরের দেশে বিচার হলে সাক্ষী লাগে না,
    রাণী বলেছে দোষী তাই হলো দোষের ঘটনা।
    রাজা সাথে দুইটি ছেলে, দুরন্ত তাদের চোখ,
    চাটগাঁয়ের স্পেয়ার গান সাথে খুন করা লোক।
    খেলার জিনিস খেলনা নয় এ কথা কে জানে?
    একটি মুহূর্ত তারপরেতেই জীবন মরন টানে।
    হঠাৎ একটি শব্দ হলো, আগুন ঢুকল পিঠে,
    ডান কাঁধের নিচে ফলা ঢুকে রক্ত ছিটে।
    পিঠ ভেদ করে বুক দিয়ে তীর বের হয়ে সজোরে,
    শৈশব যেন ছিন্ন হলো বুকের এই পাজরে।।
    রক্ত ঝরল, ফুল ঝরল, থেমে গেল হাসি।
    নর্দমার ধারে পড়ে আমি শিশু রক্তস্রোতে ভাসি।
    বটি দিয়ে কেউ কেটে নিয়ে গেল শরীর-ভেদা ফলা,
    লাথি মেরে কেউ ফেলে দিল দেখি নর্দমারই তলা।
    বুকে রইল নাইলন সুতো— কী অদ্ভুত সেই চিহ্ন!
    শরীর পেরিয়ে স্মৃতির চাপা ফুরালো অপরাহ্ন।
    আমি তখন চিৎকার করি—কণ্ঠে শব্দ নাই,
    চোখ দুটি শুধু বলে—“ আমায় বাঁচাও ভাই!”
    দেহ আমার অচেতন, চেতনা ছিল ঠিক,
    সবই দেখি, সবই শুনি, ঠিক নাই কোনদিক।
    মা’কে দেখলাম মামার গাড়িতে চোখে তাঁদের ভয়,
    বাবাকে খুঁজি বাবাও খোঁজে— এমনি অবস্থায়।
    গাড়ি গেল দূরে সরে, আমি রইলাম পড়ে,
    জীবন তখন ক্ষীণ প্রদীপ ঝড়ের ভিতর ঝরে।
    দীর্ঘ সময় পরে এসে দেখি দুজন মানুষ এসে ধরে,
    পরিচ্ছন্নতাকর্মী তাজ্জব হলো এমন কাজের পরে,
    আমার নাম জানে না তারা, জানে না ঘরবাড়ি,
    তখনি তারা পুলিশ ডেকে মানুষ করল ভারী।
    এলো শেষে গাড়ি, সিভিল সার্জনের সেই গাড়ি—
    এ্যাম্বুলেন্সে জীবন আমার মৃত্যুর সাথে লড়ি।
    চালকের নাম নিজাম উদ্দিন, থানায় দেখে চিনলেন,
    বাবার অফিসের সহকর্মী সন্তান বলে বুঝলেন।
    ঢাকা অনেক দূর, রক্তক্ষরণে মৃত্যু যদি হয় ,
    বাাঁচাতে যদি জীবন ফুরায়—কে তাকে ফেরায়?
    ইদ্রিস মিয়া খবরে আসে সাথে বসে পরামর্শ করলেন,
    মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে যেন নতুন রাস্তা ধরলেন।
    হঠাৎ তাঁর পড়ল মনে মুজিবুল বাশার ডাক্তার,
    চিকিৎসা পেতে ছুটলো তাই যেতে জেলা কারাগার।
    গাড়ি তখন পথ বদলালো, মৃত্যু হলো দূর,
    কারাগারের দরজার কাছে জ্বললো জীবন নূর।
    জেলা কারাগারের ভিতর সেদিন অন্য আয়োজন,
    দুই দণ্ডিত মানুষের জন্য ফাঁসি দেওয়া প্রয়োজন।
    এক পাশে দড়ি, অন্য পাশে আমি—
    এক মৃত্যু আইনের রায়ে,
    আমার মৃত্যু আঘাতের ঘায়ে।
    ডাক্তার এলেন, দেখলেন ক্ষত, সময় খুবই অল্প,
    সুবিধা কম, তবু মানুষের হাতে, মানুষ বাঁচানোর গল্প।
    স্যালাইন, গজ আর ব্যান্ডেজ,ইনজেকশন, ,
    জীবন বাঁচাতে সিজর-ফরসেপ, স্যাভলন
    তিনি শুধু ক্ষত সারালেন না, রক্তপাতও বন্ধ,
    নিভে যাওয়া প্রদীপখানি দুই হাতে খোঁজে এ অন্ধ।
    গেরদা থেকে এলেন আমার কেবলাজান ক্বারী,
    জমজমের পানি হাতে, দোয়ার আলো ভারী।
    একদিকে ডাক্তারি বিদ্যা, অন্যদিকে দোয়া,
    একদিকে কেঁচি-ফরসেপ, আর আল্লাহ্-রসূলের ছায়া।
    কেউ বলে বিজ্ঞান বাঁচায়, কেউ বলে দোয়া,
    আমি বলি—দুই পথ মিলে জীবন পায় ছোঁয়া।
    আমার বুকের ক্ষীণ প্রদীপে আবার উঠল আলো,
    অন্ধকারের নদী পেরিয়ে একটু লাগলো ভালো।
    চোখ মেলিয়া দেখলাম আবার মানুষেরই মুখ,
    মৃত্যু সরে দাঁড়াল যেন—জীবন পেল সুখ।
    আজও তাই তাঁর নামটি নিলে মাথা নত হয়—
    যে হাত সেদিন জীবন দিল, তারে কি ভোলা যায়?
    গাড়ি করে তোমায় আনলো, ঘুম ভাঙা চোখ তোমার,
    জেলখানার সেই চিকিৎসা-ঘরে নিয়ে এলো ড্রাইভার।
    তোমার বাবা পাশে বসে মোর সাথে ঢাকার মুরুব্বী,
    আরও দুই-তিনজন মানুষ তারা রইল রাত জুড়ি।
    আমি তোমাকে দেখলাম আগেই তোমার চোখে জল,
    আমার চোখের জলটি তুমি দেখলে না সে কাল।
    তুমি কি বুঝেছিলে কিছু? আজও আমি তা-জানি,
    শিশুর চোখের ভাষা বুঝে শিশু বোঝে না পাষাণী।
    কথা উঠল—তোমার শিরার রক্ত নেবে তারা,
    ভেইন-টু-ভেইন সেতু বানিয়ে বাঁচবে আমার ধারা।
    তখন তুমি ভয় পেলে যে পাথর হলো চোখ,
    জল ভরা দুই নয়ন তোমার, ভয়ে অজানা শোক।
    মরতেও পারো বাঁচতেও পারো ফিফটি ফিফটি চান্স
    একইরকম আমারও হতে পারে বন্ধ হলে পালস্।
    আমি প্রতিবাদী কণ্ঠে বললাম শুধু—“না,
    ওর শরীরে একটি সূঁচও বিদ্ধ কোরো না।”
    আমি পাশ ফিরলাম নীরবে, কেন জানি না ঠিক,
    নিজের ব্যথা সহ্য করা যায়— তোমার ব্যথা অধিক।
    সেই ক্ষণে কে জানত বলো শিশুমনের এ কথা—
    ভালোবাসা কাছে আসা নয়, অসহ্ পরের ব্যথা।**
    তোমার মা ছিল না পাশে, ছিল নানা আয়োজন,
    কত মানুষ, কত পরিকল্পনা, কত পারিবারিক বন্ধন।
    তোমার বাবা চেয়ে দেখতেন মেয়ের মুখটি চুপে,
    ভালোবাসাও ছিল তাঁর বুকে গভীর নদীর রূপে।
    তিনি জানতেন—মেয়েটি ভালো, খারাপ নয় মন,
    কিন্তু চারপাশের মানুষেরা সব বদলে দেয় জীবন।
    তিনি আমাকে সান্তনা দিলেন — এই ছেলের সাথে
    ঘর বাঁধিলে ভুল হবে না আমার মেয়ের হাতে।
    ভয় ছিল শুধু চারপাশ নিয়ে, মেয়েটিকে নয়,
    পিতার চোখে ভবিষ্যতের ছায়া তখনও রয়।
    সেদিন ছিল তোমার জন্মদিন, অতিথী স্বজন,
    শতাধিক সেই অফিসার, মাতুল আত্মীয় আপন!
    সেনা, নৌ আর বিমানবাহিনী, ঘর ভরে গেল রাতে,
    গান-বাজনা, খাওয়া-দাওয়া, উপহার কত সাথে।
    হাসির ভিতর হাসি ছিল, আলোর নিচে আলো,
    তবু কোথায় পিতার মনটি— কেন মুখটি কালো?
    সন্ধ্যা পেরিয়ে গভীর রাত, উৎসব থামে না,
    তোমার বাবা এসব খুব পছন্দ করতেন না।
    তবু মেয়ের প্রতি তাঁর যে ভালোবাসা অকাট্য—
    বাপের বুকের সেই ভালোবাসা কী দিয়ে মাপতো?
    সবাই বলল—“শেষবার দেখতে তোমাকে খাস।”
    আমার দেহে জীবনের তরে করিল কি সর্বনাশ।
    কত ছোট্ট দুটি শব্দ, কত বড় তার ব্যথা,
    কত বছরের না-বলা কথা লুকানো ভাঙ্গা ছাতা।
    তুমি গেলে কাঁদতে কাঁদতে, বাবার হাতটি ধরে,
    আমি রইলাম শুয়ে একা জীবন-মৃত্যুর ঘোরে।
    বাইরে তখন গাড়ির মেলা— ট্রাক মাইক্রো জীপ
    প্রাইভেট কার সারি সারি আর হরণের পিপ পিপ।
    অতিথিরা ভেবেছিল নাকি জেলে তোমরা বন্দী,
    গেট ভেঙে গেল হট্টগোলে—কী বিচিত্র সে সন্ধি!
    এত মানুষের ভিড়ের মাঝে আমি শুধু শুনি তাজে—
    তোমার মনের কথাগুলি মোর কানের কাছে বাঁজে।
    ইদ্রিস মিয়া কোলে তুলে বেডে দিলেন শুইয়ে,
    নিজাম গাড়ি চালিয়ে গেলেন ভিড়ের পথটি ছুঁয়ে।
    গাড়িতে দেখি এক রাশভারী মানুষ বসে পাশে,
    ব্যান্ডেজ-ঢাকা আমার বুকটি দেখে আর মৃদু কাশে।
    অল্প কথায় জানলেন তিনি আমার সবই কথা,
    নাম জানালো মুহাম্মদ ইউনূস, ভিয়েনা তাঁর পথটা।
    ডক্টরেটের স্বপ্ন নিয়ে ঢাকার বিমানপথে,
    আমি তখন মৃত্যুর থেকে ফিরছি জীবনের রথে।
    একই গাড়ি—দুই পথিক, দুই মানুষের ধারা,
    একজন যায় জ্ঞান খুঁজিতে, একজন জীবন সারা।
    কেউ কি জানে সেই রাতটির অদ্ভুত সেই খেলা?
    এক গাড়িতে ভবিষ্যৎ দুই দিক দিয়ে চলা।
    হরিসভা পেরিয়ে গাড়ি দাড়ালো ছোট্ট সেতুর পাছে,
    ভাঙা কালভার্ট থামিয়ে দিল ভোরের আলোর কাছে।
    তোমাদের বাড়ি কাছে তখন, উত্তর পাশের ঘর,
    খাবার টেবিল খালি করে বানানো হলো সে বাসর।
    কিন্তু তখনও ব্যান্ডেজ ছিল, ক্ষত ছিল বুক-পিঠে,
    আবার গাড়ি, আবার খুলল ক্ষত রক্ত চিটচিটে।
    দুটি ছোট ক্রস-স্ট্রিপ রেখে ব্যান্ডেজ হলো শেষ,
    তারপর পরিষ্কার খাটের বিছানা— নতুন আশ্রয় বেশ।
    খাবার কে দেবে?
    **তুমি।**
    ওষুধ কে দেখবে?
    **তুমি।**
    রাতের নিরাপত্তা?
    **তুমি।**
    বকুলতলার সেই নামহীন
    শিশুটিই তুমি।
    যে হাতে সেদিন ফুল ছিল, সেই হাত হলো সেবা,
    যে চোখে ছিল শিশুর ভয়, সেই চোখ দিলো প্রহরা।
    রাতে তুমি অচেনা ছিলে, ভোরো আপন হলে,
    নিয়তি যেন নিঃশব্দে এসে দুটি প্রাণকে ছুঁলে।
    আমার ঘরে জানল কেবল আমি আর আমার বাবা,
    তোমাদের ঘরে জানল শুধু তুমি আর তোমার বাবা।
    অন্যরা জানল অল্প কিছু, কেউ বা জানল না,
    কেউ শুনেছে রক্তের কথা, কেউ জানে কেবল ব্যথা।
    কিন্তু সম্পূর্ণ ঘটনাখানি জানা ছিল অনেক প্রাণে,
    সেই গোপন ইতিহাস যেন অজস্র হৃদয় জানে।
    তখন মনে হলো— যারা জানে পুরো কথা,
    তারা আপন, একান্ত আপন, তাঁরা নয় অযথা।
    যারা জানে না, তাদের সাথে এই গল্পের যোগ কোথা?
    নিয়তি তখন অদৃশ্য হাতে বুনল নতুন সুতোটা।
    একটি ফুল ছিল তোমার হাতে, একটি ফুল ছিল আমার,
    একটির গায়ে শিশির জমে, অন্যটির গায়ে রক্তধার।
    সুতো ছিল না কারও হাতে, তবু মালা হলো,
    কেউ দেখল না—কোন অদৃশ্য কারিগরটি এলো।
    নাইলনের যে সুতোটি সেদিন শরীরের ক্ষত রাখে,
    তার চেয়েও সূক্ষ্ম সুতো দুটি জীবন বাঁধে।
    সে সুতো কি রক্তের ছিল? না।
    সে সুতো কি মাটির? না।
    সে সুতো কি মানুষের হাতে বোনা কোনো জাল?
    না।
    সে ছিল— **অদৃশ্য নিয়তির সুতো।**
    হে বকুলগাছ, সাক্ষী থেকো, যেদিন নাম জানিনি,
    ঝরা ফুলের গন্ধে শুধু দুজন পাশাপাশি ছিলাম ক্ষণিকই।
    সাক্ষী থেকো, সেদিন তুমি রক্তের ধারা দেখেছ,
    একটি শিশুর বুকের ভিতর মৃত্যুর ছায়া রেখেছ।
    সাক্ষী থেকো, পরিচ্ছন্নতার দুজন মানুষ এসে
    অচেনা শিশুর প্রাণটি বাঁচায় মানুষ হয়ে হেসে।
    সাক্ষী থেকো নিজাম যখন পথ বদলে দিল,
    ডাক্তার যখন মৃত্যুর মুখে জীবন ফিরিয়ে দিল।
    সাক্ষী থেকো ক্বারী সাহেব দোয়া পড়ে কাঁদেন,
    বিজ্ঞানের পাশে বিশ্বাস রেখে জীবন হাতে বাঁধেন।
    সাক্ষী থেকো— তোমারই তলায়
    যে মেয়েটি ফুল কুড়াত, সেই মেয়েটিই একদিন এসে
    আমার প্রহরী দাঁড়ায়।
    আজ এই পুরোনো ছবিখানি যখন চোখে পড়ে,
    মনে হয় সব মানুষগুলো দাঁড়িয়ে আছে ঘরে।
    কেউ হয়তো নেই আজ পাশে, কেউ গেছে বহুদূর,
    কেউ হারিয়েছে সময়ের ভাঁজে শৈশবের সেই নূর।
    তবু ছবির মানুষগুলো নীরব ভাষায় কয়—
    “যা হারিয়েছে, সব হারায় না, স্মৃতির ঘরে রয়।”
    একটি ছবি ধরে রাখে হাজার দিনের ছায়া,
    একটি মুখে লুকিয়ে থাকে একটি জীবনের মায়া।
    তাই ছবিটি শুধু ছবি নয়— এটি সময়ের দরজা,
    যে দরজা খুললেই দেখি বকুলতলার সোঁদা সুরটা।
    বকুলফুল তো ঝরে যায়, ডালও একদিন শুকায়,
    শৈশব যায়, মানুষ যায়, সময় পেছন ফিরে না চায়।
    শরীরের ক্ষত শুকিয়ে যায়, দাগটি থেকে যায়,
    চোখের জল শুকিয়ে গেলেও স্মৃতি শুকায় না হায়।
    নামহীন যে শিশুটি ছিল বকুলতলার ছায়ায়,
    সে-ই হলো জীবনের এক দীর্ঘতম মায়ায়।
    তুমি ছিলে ঝরা ফুলের সাদা ভোরের হাসি,
    আমি ছিলাম রক্তে ভেজা অন্ধকারের বাঁশি।
    তুমি ছিলে ফুল কুড়ানো, আমি ছিলাম ক্ষত,
    তবু কোথায় মিলল দুজন— কে লিখেছিল পথ?
    কোনো কাগজে লেখা ছিল না, ছিল না কোনো চুক্তি,
    কোনো সাক্ষী, কোনো শপথ নয়— ছিল না কোনো যুক্তি।
    তবু একদিন বুঝলাম শেষে, সব হিসাবের পরে—
    মানুষ সুতো দিয়ে মালা গাঁথে, নিয়তি গাঁথে হৃদয় ধরে।
    তাই আজও বকুলগাছের ছায়ার নিচে দাঁড়িয়ে
    মনে হয়— সেদিনের সেই তিন শিশু কোথায় গেল হারিয়ে?
    ঝরা ফুলের গন্ধ এখনো বাতাস বেয়ে আসে,
    নামহীন সেই ছোট্ট মেয়েটি আজও যেন পাশে।
    আজ নীরবে বলি- তুমি বকুলতলার ফুল,
    নিয়তির হাতে আমি, হয়েছি পথের ধূল;
    একই মালায় উঠল দু’টি কুঁড়ি।”**
    তবু সুতো ছিঁড়েনি হলাম বুড়া-বুড়ি।
    ফুল শুকিয়েছে, বছর পেরিয়েছে,
    ছবির কাগজ মলিন হয়েছে—
    সে সুতো নাইলনের নয় অস্থির,
    সে সুতো শুধু সময়, স্মৃতি আর ভরা নিয়তির।
    আজ সে অদৃশ্য মালায় আজও মোরা পাশাপাশি—
    তুমি আর আমি, বিনিসুঁতায় গাঁথা একই দুঃখ হাসি
    মালা হতে খসে পড়া যেন দু্ইটি ঝরা ফুল
    বিশেষ কারণে আজও কাঁদে প্রাণ করে হুলস্থূল।

Skip to toolbar