-
ঠিক, বেঠিক
—এম এ রশিদ
১৯.০৯.২০২৬বাংলা, ইংরেজি, আরবি কিংবা যেকোনো ভাষার বিচার-বিশ্লেষণ ও বৈজ্ঞানিক অধ্যয়ন-পদ্ধতিকে বলা হয় Linguistics বা ভাষাতত্ত্ব। Cambridge Advanced Learner’s Dictionary-তে Linguistics-এর সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে—“the systematic study of the structure and development of language in general or of particular languages”। অর্থাৎ ভাষার গঠন, বিকাশ ও বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের পদ্ধতিগত অধ্যয়নই ভাষাতত্ত্বের বিষয়।
তাই বলে ব্যাকরণ আর ভাষাতত্ত্বকে এক মনে করা ঠিক হবে না। এ দুয়ের পার্থক্য মূলত পরিধির। ভাষাতত্ত্বের আলোচ্য বিষয় ভাষার প্রায় সব দিক; অপরদিকে ব্যাকরণে ভাষার নির্দিষ্ট কিছু কাঠামোগত ও ব্যবহারিক দিক নিয়ে আলোচনা করা হয়। সে অর্থে ব্যাকরণ ভাষাতত্ত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বানান ও উচ্চারণ ভাষার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুটি বিষয়। মানবসভ্যতার ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, মানুষ লিখতে শেখার অনেক আগেই কথা বলতে শিখেছিল। ফলে ভাষার প্রাথমিক রূপে উচ্চারণই ছিল মুখ্য। পরবর্তীকালে মানুষ যখন ভাষাকে লিখিত রূপ দিতে শুরু করল, তখন বানানের প্রয়োজন দেখা দিল। উচ্চারিত শব্দকে লিখিতভাবে প্রকাশ করার জন্যই গড়ে উঠল বানানব্যবস্থা। তবে বানান সব সময় সম্পূর্ণরূপে উচ্চারণের ওপর নির্ভরশীল নয়; ভাষার ইতিহাস, প্রচলন, ব্যুৎপত্তি ও লিখনরীতিও বানান নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবু উচ্চারণ ও বানানের সম্পর্ক যে গভীর, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই।
আরবিতে বানান বা হরফের সামান্য পরিবর্তনেই শব্দের অর্থ সম্পূর্ণ বদলে যেতে পারে। যেমন قلب শব্দের অর্থ ‘অন্তর’ বা ‘হৃদয়’; আর كَلْب অর্থ ‘কুকুর’। কী সাংঘাতিক ব্যাপার! বলতে গেলাম, ‘তুমি আমার অন্তর’; অথচ বানান বা হরফের ভুলে হয়ে গেল—‘তুমি আমার কুকুর!’
আবার قُلْ অর্থ ‘বল’, আর كُلْ অর্থ ‘খাও’। বলতে গেলাম, ‘আমি তোমাকে বলব’; কিন্তু ভুল লিখে ফেললে অর্থ দাঁড়াতে পারে—‘আমি তোমাকে খাব!’ হায়রে কপাল! এখন তো সম্পর্ক টেকানোই দায়! অতএব, বানানের ব্যাপারে সাবধান হতেই হবে।
ইংরেজিতেও বানানের ভুল অনেক সময় বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারে। যেমন heart মানে হৃদয়, আর hearth মানে অগ্নিকুণ্ড বা চুলার স্থান। কাউকে বলতে গেলাম, ‘তুমি আমার হৃদয়ে আছো’; লিখলাম—You are in my hearth. কী হলো বলুন তো? ‘তুমি আমার চুলায় আছো!’ ব্যস, এটুকুই যথেষ্ট!
আবার bird মানে পাখি, আর bard মানে কবি। Thank অর্থ ধন্যবাদ, আর tank অর্থ ট্যাংক বা জলাধার। Hair অর্থ চুল, heir অর্থ উত্তরাধিকারী এবং hare অর্থ খরগোশ। তাহলে বোঝাই যাচ্ছে, বানানের সামান্য ভুলও কখনো কখনো অর্থকে একেবারে অন্যদিকে নিয়ে যেতে পারে।
এমনকি ইংরেজি শব্দের বানানের সামান্য পরিবর্তনের কারণে শব্দের word class বা পদ-পরিচয়ও বদলে যেতে পারে। যেমন cloth noun, কিন্তু clothe verb; bath noun, আর bathe verb। ফলে বাক্যে যেখানে যে শব্দের প্রয়োজন, সেখানে সঠিক বানান ও সঠিক শব্দটি ব্যবহার করতেই হবে। অন্যথায় বাক্যের অর্থ কিংবা ব্যাকরণ—দুটিই বিঘ্নিত হতে পারে।
এবার আসি বাংলার প্রসঙ্গে।
বাংলা ভাষায় একই বা কাছাকাছি উচ্চারণের অনেক শব্দ রয়েছে, যাদের বানান ও অর্থ ভিন্ন। যেমন কাল শব্দের অর্থ ‘সময়’, আবার কালো অর্থ কালো রঙের। ভাল শব্দটি আবার ভিন্ন প্রসঙ্গে ‘কপাল’ অর্থেও ব্যবহৃত হতে পারে, যদিও আধুনিক প্রমিত বাংলায় ‘ভাল’ সাধারণত ‘উত্তম’ অর্থেই ব্যবহৃত হয়। ফলে একই বা কাছাকাছি উচ্চারণের শব্দের ক্ষেত্রে বানানের প্রতি সতর্ক না হয়ে উপায় নেই।
তবে কিছু শব্দ আছে, যাদের বানানে সামান্য এদিক-সেদিক হলেও অর্থের খুব বড় পরিবর্তন নাও ঘটতে পারে; কখনো আবার বানানটি প্রমিত রীতির বাইরে চলে যায়। যেমন ঘি—এখানে ‘ঘী’ লেখার প্রয়োজন নেই। কেউ তো ‘ঘি’ শব্দটি দীর্ঘ ‘ঈ’ ধ্বনি দিয়ে উচ্চারণ করেন না! একইভাবে ঊষা, দূর, দীর্ঘ ইত্যাদি শব্দে ই-ঈ বা উ-ঊ ব্যবহারের বিষয়টি কেবল উচ্চারণ দিয়ে নির্ধারণ করা যায় না। এখানে প্রচলিত বানানরীতি, শব্দের ইতিহাস ও প্রমিত বানানবিধিই মুখ্য।
অর্থাৎ, ই, ঈ, উ, ঊ-এর এই বিড়ম্বনা আমরা যুগ যুগ ধরে পোহাচ্ছি কেন—এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে ভাষার ইতিহাস ও বানানরীতির দিকেও তাকাতে হবে।
আর চন্দ্রবিন্দু? সেখানেও আমাদের মজার এক জগৎ আছে।
যখন আমরা নাসিক্য উচ্চারণ করছি না বা করার প্রয়োজন নেই, তখনও কোথাও কোথাও চন্দ্রবিন্দু ব্যবহারের প্রশ্ন ওঠে। যেমন হাঁস একটি প্রাণী, আর হাস হলো ‘হাসা’ ক্রিয়ার রূপ। এখানে বেচারা চন্দ্রবিন্দুর বেশ একটা উদ্দেশ্য আছে বৈকি!
কিন্তু চাঁদ শব্দটি উচ্চারণের সময় নাসিক্যতার মাত্রা নিয়ে আমরা যতই তর্ক করি না কেন, চন্দ্রবিন্দু বাদ দিলে কি অর্থের কোনো মহামারি বা করোনার মতো অতিমারি দেখা দেবে? আর গোঁফের কথাই বা কী বলব! পুরুষের মুখের ওপর গোঁফ নিজেই তো একটা চন্দ্রবিন্দুর মতো—শুধু একটু উল্টো হয়ে থাকে, এই যা!
তারপরও চন্দ্রবিন্দুকে আমার বেশ ভালোই লাগে। কারণ, এটি দিলে যেন শব্দটাকে গয়না পরানো হয়। চাঁদের ওপরে আরেকটা চাঁদ! দেখতে দারুণ লাগে। মাঝে মাঝে আক্ষেপ হয়—যদি ইচ্ছেমতো যথেচ্ছভাবে চন্দ্রবিন্দু লাগানো যেত!
অনেকদিন আগে বাংলা ভাষার অভিভাবকসুলভ প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমির একটি বিজ্ঞপ্তি আমার চোখে পড়েছিল। সেখানে বলা হয়েছিল, সম্প্রতি দেখা যাচ্ছে লেখকেরা অমুক অমুক শব্দের বানান অমুকভাবে লিখছেন; তাই প্রচলিত বানানের পরিবর্তে নির্দিষ্ট বানানগুলো গ্রহণ করা হলো। এমন পরিবর্তন দেখে সত্যিই মনে হয়—ই, ঈ, উ, ঊ-এর জটিলতায় যেতে মন আর সাড়া দিতে চায় না!
তবে ভাষা তো স্থির কোনো বস্তু নয়। মানুষের মুখে মুখে, লেখায় লেখায়, প্রয়োজনে ও ব্যবহারে ভাষা প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত ও বিকশিত হয়। বানানরীতিও সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে। তাই ভাষাকে জীবন্ত রাখতে হলে একদিকে যেমন প্রমিত বানান ও ব্যাকরণ সম্পর্কে সচেতন হতে হবে, অন্যদিকে তেমনি অপ্রয়োজনীয় জটিলতা কমিয়ে ভাষাকে সহজ, স্বাভাবিক ও ব্যবহারবান্ধব করার কথাও ভাবতে হবে।
পরিশেষে বলতে চাই, প্রাণের বাংলা ভাষাকে আরও সুন্দর, সমৃদ্ধ ও জনপ্রিয় করতে হলে তাকে মানুষের জন্য সহজ ও স্বাভাবিক করে তোলা প্রয়োজন। কিন্তু কে নেবে এই গুরুদায়িত্ব?
নজরুলের ভাষায় বলেই শেষ করি—
“আমরা যদি না জাগি মা,
কেমনে সকাল হবে?”3 Comments-
Srijon Media, ‘চন্দ্রবিন্দুকে আমার বেশ ভালোই লাগে’—আপনার এই চমৎকার পর্যবেক্ষণটি ভাষার প্রতি আপনার গভীর ভালোবাসা ও মননশীলতারই পরিচয় বহন করে। ভাষা নিয়ে আপনার এই সুচিন্তিত ও তথ্যবহুল বিশ্লেষণটি বেশ উপভোগ করেছি, যেখানে আপনি চাইলে বানানের গুরুত্ব বোঝাতে আরও কিছু বাস্তব উদাহরণ যোগ করে লেখাটিকে আরও সমৃদ্ধ করার কথা ভেবে দেখতে পারেন। আপনি চমৎকার লিখছেন, আপনার এই চর্চা অব্যাহত থাকুক।
Friends
Mustafa Nazmus Sakib (Zubair)
@mustafasakib
Kazi Mahabubur Rahman
@kazimahabuburrahman
Mahdia Rashid
@mahdiarashid
mithila jannat
@mithilajannat
সাদিয়া আক্তার রিমি
@sadiaakterreme
Miftah Khan
@miftahkhan
Tiplu Hasan Tamim
@hafez
Fafimamst Begom
@fafimamstbegom
Md Najmul
@mdnajmul


আপনার লেখাটি পড়ে অনেক কিছু নতুন করে ভাবার সুযোগ পেলাম, বিশেষ করে বানানের মারপ্যাঁচে অর্থের যে বড় ধরনের পরিবর্তন হতে পারে, তা সত্যিই খুব চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন আপনি।