Profile Photo

বিষণ্ন সুমনOffline

  • logolabbd
  • অরণ্যের শেষ প্রহর

    (অধ্যায় এগারো)
    বিকেলের শেষ দিকে মেঘদূত মাউন্টেন রিসোর্টের নতুন কাটা রাস্তা দিয়ে একটার পর একটা গাড়ি উঠতে দেখে শ্রমিকদের অনেকেই কাজ থামিয়ে তাকিয়েছিল। প্রথমে একটা কালো মাইক্রোবাস, তার পেছনে দুটো পিকআপ, সবশেষে আরেকটা জিপ। গাড়িগুলোর গায়ে কোনো প্রতিষ্ঠানের নাম নেই, ভেতরে বসে থাকা লোকগুলোকেও নির্মাণকাজের মানুষ বলে মনে হলো না। বেশিরভাগের বয়স তিরিশ থেকে চল্লিশের মধ্যে, শরীর শক্তপোক্ত, পোশাক সাধারণ, কিন্তু চোখের চাহনি এবং গাড়ি থেকে নেমেই চারপাশ দেখার ধরন আলাদা। কারও হাতে মোটা বাঁশের লাঠি, কারও কোমরে শক্ত টর্চ, কয়েকজনের পিঠে ছোট ব্যাগ। তারা এসেছে কাজ করতে নয়, সেটা বুঝতে কারও অসুবিধা হলো না। খবরটা শ্রমিকদের শেডে পৌঁছাতে সময় লাগল না। কোম্পানি এবার বাইরে থেকে লোক এনেছে। উদ্দেশ্য একটাই, রাতের পাহাড়ে যে মানুষটা তাদের প্রকল্পকে ধীরে ধীরে অচল করে দিচ্ছে, তাকে খুঁজে বের করা।

    রিসোর্টের মালিক শেষ পর্যন্ত হিসাবের খাতার কাছে হার মেনেছেন। প্রথম দিকে ব্যাপারটা তার কাছে একজন জমির মালিকের জেদ ছাড়া আর কিছু ছিল না। তারপর কয়েকজন পাহারাদার আহত হলো, শ্রমিক চলে গেল, নতুন শ্রমিক আনতে হলো, নিরাপত্তা খরচ বাড়ল, মেশিন দিনের পর দিন অলস দাঁড়িয়ে রইল। এখন প্রতিটি নষ্ট দিন মানে টাকা। অনেক টাকা। তাই তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, আর ভয় দেখিয়ে বা অপেক্ষা করে লাভ নেই। রেজোয়ানকে খুঁজে বের করতে হবে, ধরে সামনে আনতে হবে, তারপর এমনভাবে বুঝিয়ে দিতে হবে যেন এই পাহাড়ের আশপাশে সে আর না আসে।

    তারা আসলে ভুল করেছিল। তারা জানলই না যাকে খুঁজতে এতগুলো মানুষ পাহাড়ে এসেছে, সেই মানুষটি তখন তাদের চেয়ে অনেক ওপরে দাঁড়িয়ে আছে।

    রেজোয়ান আসলে তাদেরই দেখছিল। সে ছিল পশ্চিমের একটা ঢালে, যেখানে কয়েক বছর আগে জুমচাষ হয়েছিল। এখন জায়গাটা আবার ঝোপ আর বুনো ঘাসে ঢেকে গেছে। সামনে ছড়িয়ে থাকা খাগড়াছড়ির পাহাড়গুলো বিকেলের নরম আলোয় একটার পেছনে আরেকটা ভিন্ন ভিন্ন স্তরের মতো দেখা যাচ্ছে। কাছের পাহাড় গাঢ় সবুজ, তার পরেরটা একটু নীলচে। আরও দূরের পাহাড় ধোঁয়ার মতো ফিকে। নিচে বাঁশঝাড়ের মাথা বাতাসে দুলছে। একটা সরু ছড়া পাহাড়ের গা ঘেঁষে নেমে গেছে। পানির শব্দ এত ওপর থেকেও শোনা যায়। দূরে কোথাও ছোট পাহাড়ি পাড়ার কয়েকটা টিনের চাল রোদের শেষ আলোয় চকচক করছে। বাতাসে দিনের গরম কমে এসেছে। ভেজা মাটি আর কচি বাঁশপাতার গন্ধের সঙ্গে কোথা থেকে রান্নার ধোঁয়ার হালকা গন্ধ ভেসে আসছে।

    রেজোয়ান নিচের গাড়িগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল। একবার। দুবার। বেশ ক’বার। তারপর আর তাকানোর প্রয়োজন মনে করলো না।

    সতেরোজন। গাড়িচালক বাদ দিলে মাঠে নামতে পারে চৌদ্দ থেকে পনেরোজন। তার ঠোঁটের কোণে খুব সামান্য একটা হাসির রেখা ঝিলিক দিয়ে আবার মিলিয়ে গেল।

    বহু বছর আগে এ ধরনের সংখ্যা দেখলে তার মাথায় প্রথম যে প্রশ্নটা আসত, আজও সেটাই এল। ওরা কতজন, সেটা আসল ব্যপার নয়। ওরা কীভাবে ভাগ হয়ে ছড়িয়ে যাবে, সেটাই আসল।

    রেজোয়ানের চোখ আবার নিচে নামল।

    লোকগুলোকে একজন নির্দেশ দিচ্ছে। বাকিরা শুনছে। অর্থাৎ দলনেতা একজন। দুজন এলাকার লোক, বোঝা যায় তাদের চলাফেরায়, তারা বারবার পাহাড়ের বিভিন্ন দিক দেখিয়ে কিছু বোঝাচ্ছে। বাকিরা জায়গাটা চেনে না।

    এটাই প্রথম সুবিধা। দ্বিতীয় সুবিধা, রাত নামছে। তৃতীয় সুবিধা, তারা জানে শিকার একজন।

    রেজোয়ান ধীরে ধীরে পেছনে সরে গেল। তার চলার মধ্যে কোনো তাড়াহুড়ো নেই। পঞ্চাশ পেরিয়ে যাওয়া শরীর, কিন্তু এখনও তাকে দেখলে বয়স অনুমান করা কঠিন। ছয় ফুটের কাছাকাছি দীর্ঘ দেহ, চওড়া কাঁধ, মেদহীন কোমর, ধূসর হয়ে আসা ছোট চুল। দিনের আলোয় মুখে বয়সের রেখাগুলো স্পষ্ট বোঝা যায়, কিন্তু শরীরের চলনে বয়সের সেই হিসাব মেলে না। দীর্ঘ সামরিক জীবন তার শরীরে শুধু শক্তি তৈরি করেনি, তৈরি করেছে নিয়ন্ত্রণ করার প্রবল ইচ্ছে শক্তি। কোথায় পা ফেলতে হবে, কতটা নিচু হতে হবে, কখন শরীরের ওজন সামনের পায়ে নিতে হবে, কখন থেমে যেতে হবে, এসব তাকে এখন আর ভেবে করতে হয় না।

    অভিজ্ঞতা আর শরীরের গভীরে ঢুকে যাওয়া বহু বছরের অভ্যাস। আর রাতের অন্ধকারে সে ছিল সবসময়ই সেরা। সে কারণেই এই দক্ষতার জন্যই সহযোদ্ধাদের মধ্যে তার একটা নাম ছড়িয়ে পড়েছিল। নাইট উলফ, যে কিনা অন্ধকারে শত্রুকে খুঁজে বেড়ায় না। ধৈর্য্য ধরে অপেক্ষা করে। এক সময় শত্রুই তার কাছে আসে। আজ অনেক বছর পর সেই পুরনো নামটাই আবার তার ভেতর মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে।

    সূর্য ডুবে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর প্রথম দলটা বের হলো। তারা পাঁচজন।

    সামনে একজন স্থানীয় লোক। তার হাতে বড় টর্চ। বাকিরা পেছনে। তাদের ধারণা, রেজোয়ান রিসোর্টের উত্তর পাশের অরণ্য ব্যবহার করে এদিকে আসে। গত কয়েকটা ঘটনার অবস্থান মিলিয়ে তারা একটা সম্ভাব্য পথও ঠাহর করেছে।

    কিন্তু তারা জানতো না, রেজোয়ান কখনো একই পথ দুবার ব্যবহার করে না।

    পাঁচজন অরণ্যের ভেতর ঢুকে যাওয়ার প্রায় দশ মিনিট পর আরেকটা দল দক্ষিণের ঢাল ধরে এগোল। তৃতীয় দলটা অপেক্ষা করল নির্মাণস্থলের কাছে। তাদের কাজ, অন্য দুই দল কাউকে তাড়িয়ে আনলে তার পথ আটকে দেওয়া।

    পরিকল্পনাটা খারাপ নয়। কিন্তু সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য অরন্যঘেরা পাহাড় মোটেও সহজ জায়গা নয়। কেননা, এটা তো আর কোনো থ্রীলার উপন্যাস নয় যে, লেখক যে ভাবে চাইবে গল্পটা সেভাবেই এগোবে।

    রাত আটটার পর খাগড়াছড়ির সেই গভীর পাহাড়ের চেহারা পুরোপুরি বদলে গেল। আকাশে মেঘ জমেছে। চাঁদ থাকলেও দেখা যাচ্ছে না। পাহাড়ের ঢালগুলো একটার সঙ্গে আরেকটা মিশে বিশাল কালো দেয়ালের মতো দাঁড়িয়ে আছে। নিচের ছড়ার পানি পাথরে ধাক্কা খেয়ে অবিরাম শব্দ করছে। ঝোপের মধ্যে অদৃশ্য পোকামাকড় ডাকছে, মাঝে মাঝে বাঁশঝাড়ের ভেতর বাতাস ঢুকে শুকনো বাঁশের গায়ে বাঁশ ঘষে কর্কশ আওয়াজ তুলছে। দিনের আলোয় যে পথটাকে সহজ মনে হয়েছিল, এখন সেখানে টর্চ ছাড়া দুই পা’ও এগোনো যায় না। স্বাভাবিক ভাবেই কেউ টর্চ জ্বালালেই ধরে নেয় সে নিজেকে পথ দেখাচ্ছে, যদিও বাস্তবতা হলো সে আসলে দূরে থাকা কারো কাছে নিজের অবস্থানই জানিয়ে দিচ্ছে।

    রেজোয়ান অন্ধকারে বসে পাঁচটা আলো এগিয়ে আসতে দেখল। একই সরল রেখায়। তার মনে পড়ল বহু বছর আগের অভিজ্ঞতার কথা। রাতের অরণ্যে কাউকে দেখার জন্য শরীর দেখতে হয় না। তার হাতে থাকা আলো দেখলেই চলে।

    সে অপেক্ষা করল।

    পাঁচটা আলো বাঁশঝাড়ের কাছে এসে থামল। সামনের লোকটা পথ দেখাচ্ছে।

    রেজোয়ান তখন তাদের বাঁ দিকে মাত্র ত্রিশ গজ দূরে। কেউ জানে না। একটা ছোট পাথর তুলে সে ডান দিকের ঝোপের দিকে ছুড়ে দিল।

    খসখস শব্দ শুনে সবগুলো টর্চ একসঙ্গে সেদিকে ঘুরে গেল।

    “ওদিকে!”

    দুজন এগিয়ে গেল। বাকি তিনজন কয়েক সেকেন্ড অপেক্ষা করে তাদের অনুসরণ করল।

    রেজোয়ান নড়ল না। লোকগুলো তার সামনে দিয়েই চলে গেল। মাত্র কয়েক গজ দূর দিয়ে।

    অন্ধকারের মধ্যে একটা মোটা গাছের গুঁড়ির সঙ্গে শরীর মিলিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল সে। কালচে পোশাক, মুখের উজ্জ্বল অংশে ছায়া। লোকগুলোর টর্চ সামনে, তাই পাশে কী আছে কেউ দেখল না।

    শেষ লোকটা পেরিয়ে যাওয়ার পরও রেজোয়ান অপেক্ষা করল। পাঁচ সেকেন্ড। দশ সেকেন্ড। তারপর তাদের পেছনে চলতে শুরু করল।

    শিকারি দল জানলই না, কখন শিকার তাদের পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে।

    প্রায় পনেরো মিনিট পর সামনের দুজন বুঝল পথটা ভুল। সামনে ঘন বাঁশঝাড়। তার ভেতর দিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।

    “ফিরতে হবে।” দলটা ঘুরল। কিন্তু ফেরার সময় একটা সমস্যা দেখা দিল। তারা যে সরু পথ ধরে এসেছিল, অন্ধকারে সেটা আর খুঁজে পাচ্ছে না।

    টর্চের আলো এদিক ওদিক ঘুরতে লাগল। একজন বিরক্ত হয়ে গালি দিল। ঠিক তখন বাঁ পাশের অন্ধকারে একটা ছায়া নড়ল।

    শেষে থাকা লোকটা ঘুরে দাঁড়াল। “কে?”

    কোনো উত্তর নেই। সে টর্চ ফেলল। কিছু নেই।

    পরের মুহূর্তে তার পেছনে রেজোয়ান। লোকটা বুঝে ওঠার আগেই একটা হাত তার মুখ চেপে ধরল, অন্য হাত কনুইয়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ নিল। শরীরটা সামান্য ঘুরল। লোকটার ভারসাম্য চলে গেল এক মুহূর্তে। চিৎকার করার সুযোগ পেল না। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে সে মাটিতে, রেজোয়ানের হাঁটু তার দুই কাঁধের মাঝামাঝি, হাতটা পেছনে নিয়ন্ত্রিত।

    রেজোয়ান তার কানের কাছে নিচু স্বরে বলল, “চুপচাপ শুয়ে থাক।”

    লোকটা শরীর ঘোরানোর চেষ্টা করল। ভুল করল।

    রেজোয়ানের চাপ সামান্য বাড়তেই তার মুখ থেকে চাপা গোঙানি বের হলো। তারপর চাপটা চলে গেল।

    লোকটা মাথা তুলল। কেউ নেই। মাত্র কয়েক সেকেন্ড।

    সামনের চারজন তখনও বুঝতে পারেনি তাদের একজন পেছনে পড়ে গেছে।

    রেজোয়ান ইতিমধ্যে বাঁশঝাড়ের অন্ধকারে মিশে গেছে।

    কিছুক্ষণ পর লোকটার চিৎকার শুনে বাকিরা ফিরে এল। তাকে মাটিতে বসে থাকতে দেখে প্রশ্নের পর প্রশ্ন শুরু হলো।

    “কী হয়েছে?”

    লোকটা হাঁপাচ্ছে। “ও এখানে ছিল।”

    “কে?”

    “কর্ণেল।”

    চারটা টর্চ একসঙ্গে চারদিকে ঘুরল। কোথাও কেউ নেই।

    এদিকে দক্ষিণের দলটাও ভালো অবস্থায় নেই। তারা একটা শুকনো পাহাড়ি নালার ভেতর ঢুকে পড়েছে। দিনের আলোয় জায়গাটা সহজ পথ মনে হয়, কিন্তু বর্ষার শেষের ভেজা পাথর রাতের অন্ধকারে বিপজ্জনক। একজন পিছলে পড়ে হাঁটুতে আঘাত পেয়েছে। আরেকজন তাকে তুলতে গিয়ে নিজেই পড়ে গেছে।

    রেজোয়ান তাদের কাছে যায়নি। যাওয়ার প্রয়োজনও নেই। তার সাজানো ট্র্যাপই তার হয়ে কাজটা করে দিয়েছে।

    রাত যত গভীর হলো, তিনটা দলের মধ্যে যোগাযোগ তত দুর্বল হয়ে গেল। মোবাইল নেটওয়ার্ক কোথাও আছে, কোথাও নেই। ওয়াকিটকির সিগনাল পাহাড়ের আড়ালে দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। ফলে একজনের কথা অন্যজন পুরোপুরি বুঝতে পারছে না। কেউ উত্তর দিচ্ছে, কেউ দিচ্ছে না।

    তারপর দ্বিতীয় মুখোমুখি সংঘর্ষটা ঘটল। এবার তিনজন একসঙ্গে ছিল। তারা একটা সরু ঢাল ধরে ওপরে উঠছিল। সামনের লোকটার টর্চ হঠাৎ একটা মানুষের ওপর গিয়ে পড়ল। লোকটা থেমে গেল।

    রেজোয়ান। মাত্র পনেরো গজ সামনে দাঁড়িয়ে।

    “ওই যে!”

    তিনজন একসঙ্গে ছুটল।

    রেজোয়ান ঘুরে দৌড় দিল।

    বয়স যেন মুহূর্তে তার শরীর থেকে ঝরে গেল। ঢালু পাহাড়ি পথে তার পা পড়ছে ছোট ছোট মাপা ধাপে। কোথায় পাথর, কোথায় শিকড়, কোথায় মাটি নরম, সব যেন আগে থেকেই জানা। পেছনের তিনজন দ্রুত দৌড়াচ্ছে, কিন্তু তাদের টর্চের আলো লাফাচ্ছে। শ্বাস ভারী হয়ে উঠছে।

    হঠাৎ রেজোয়ান থামল। ঘুরে দাঁড়াল।

    প্রথম লোকটা এত দ্রুত আসছিল যে থামার সুযোগ পেল না। রেজোয়ানের শরীর সামান্য পাশ ফিরে দাঁড়িয়ে গেল। লোকটার ছুটে আসা শরীর সহসা শূন্যে উঠে গেল। একই সঙ্গে রেজোয়ানের ডান হাতটা ঝলসে উঠল। ছোট, শক্ত একটা আঘাত এসে লাগল লোকটার বুকের ওপর। মনে হলো ছুটে আসা শরীরটা যেন অদৃশ্য কোনো দেয়ালে ধাক্কা খেল। তার পা মাটি ছেড়ে গেল না, কিন্তু সমস্ত গতি থেমে গেল। পরমুহূর্তেই রেজোয়ানের পা তার গোড়ালির পেছনে ঢুকে শরীরের ভারসাম্য কেড়ে নিল।

    ধপাস করে লোকটা পিঠের ওপর পড়ল।

    দ্বিতীয়জন ঘুষি চালাল। রেজোয়ানের মাথা কয়েক ইঞ্চি সরে গেল। ছুটে আসা ঘুষিটা বাতাস কাটল। পরমুহূর্তে তার বাঁ হাত প্রতিপক্ষের কবজি সরিয়ে দিল, ডান হাতের তালুর গোড়া এসে আঘাত করল চোয়ালের পাশে। লোকটার মাথা ঝাঁকুনি খেল। চোখের সামনে যেন একসঙ্গে কয়েকটা আলো জ্বলে উঠল। সে টলতে না টলতেই রেজোয়ান তার জামার সামনের অংশ ধরে নিজের দিকে টেনে শরীর ঘুরিয়ে দিল। লোকটা গিয়ে পড়ল ভেজা ঘাসের ওপর।

    তৃতীয়জন এবার থেমে গেছে। তার সামনে পঞ্চাশোর্ধ্ব কোনো অবসরপ্রাপ্ত মানুষ নেই। তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে অন্য কেউ।

    রেজোয়ান তাকাল তার দিকে।

    লোকটা আর এগোল না। মাত্র দুই সেকেন্ড।

    তারপর পাশের অন্ধকারে ঢুকে গেল রেজোয়ান।

    লোকটা টর্চ তুলল। আলো ছুটল গাছ থেকে গাছে। এবারো কোথাও কেউ নেই। বেমালুম হাওয়া হয়ে গেছে।

    রাত প্রায় তিনটার দিকে অনুসন্ধান কার্যত ভেঙে পড়ল। যে দল রেজোয়ানকে ধরতে এসেছিল, এখন তাদের প্রধান কাজ হয়ে গেল নিজেদের লোকজনকে খুঁজে বের করা। একজন হাঁটতে পারছে না। দুজন পথ হারিয়েছে। আর একজনকে পাওয়া যাচ্ছে না। অবশ্য যারা রেজোয়ানকে দেখেছে, তারা এখন আর তাকে খুঁজতে খুব একটা আগ্রহী নয়।

    ভোরের আগেই দলটা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত হলো। একজন একজন করে সবাই নির্মাণস্থলে ফিরতে শুরু করল।

    দেখা গেল কারও জামা কাদায় ভরা। আবার কারও হাঁটু ছড়ে গেছে। একজন অন্যজনের কাঁধে ভর দিয়ে হাঁটছে। কারও টর্চ হারিয়েছে। সবার মুখে ক্লান্তি, বিরক্তি আর তার চেয়েও বেশি এমন একটা অপমান, যার কথা কেউ উচ্চস্বরে বলতেও চাইছে না।

    সতেরোজন মানুষ এসেছিল একজনকে ধরতে। লোকটাকে তারা দেখেছে। তারপরেও ধরতে পারেনি।

    যদিও কখনো সে তাদের সামনে ছিল, আবার কখনো পেছনে। কখনো এতই কাছে যে হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যায়, অথচ পরমুহূর্তেই নেই হয়ে গেছে।

    পূর্বের পাহাড়ের মাথায় তখন আলো ফুটতে শুরু করেছে। কালো আকাশ ধীরে ধীরে ছাই রঙের হচ্ছে। বাঁশপাতার ডগায় রাতের শিশির। নিচের উপত্যকার ওপর পাতলা কুয়াশা জমেছে। দূরে কোনো পাহাড়ি বাড়ি থেকে মোরগের ডাক ভেসে এল।

    ক্লান্ত দলটা নির্মাণস্থলের সামনে এসে থামল। তারপর সবাই একসঙ্গে চুপ হয়ে গেল। সামনে একটা কাঠের খুঁটি। গতকাল পর্যন্ত সেখানে ছোট একটা ফলক লাগানো ছিল। সেটা ছিল মেঘদূত মাউন্টেন রিসোর্টের নির্মাণ প্রকল্পের নাম লেখা ফলক। এখন সেটা নেই। স্রেফ খালি খুঁটিটা দাঁড়িয়ে তাদের যেন উপহাস করছে।

    তারপরেও কেউ কিছু বলল না।

    দলনেতা ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে খুঁটিটার সামনে দাঁড়াল। তার চোখ চারপাশে ঘুরল। রাতে তারা সবাই অরণ্যের ভেতর রেজোয়ানকে খুঁজেছে। আর সেই সময় সে ঠিকই এখানে ফিরে এসেছিল। এতদিন তাদের চোখের সামনে থাকা ফলকটা আজ সরিয়ে নিয়ে গেছে।

    দলনেতার মুখ শক্ত হয়ে গেল। কারণ এবার বার্তাটা ভয় দেখানোর চেয়েও অপমানজনক।

    যখন তারা পুরো পাহাড়জুড়ে রেজোয়ানকে খুঁজছিল, রেজোয়ান তখন তাদের ফাঁকা পড়ে থাকা ঘাঁটির একেবারে ভেতর পর্যন্ত চলে আসতে পেরেছিল।

    আর ভোরের আলোয় খালি কাঠের খুঁটিটার দিকে তাকিয়ে প্রথমবার তাদের একজনের মাথায় প্রশ্নটা এল। তারা কি সত্যিই রেজোয়ানকে সারারাত তাড়া করেছে?
    নাকি রেজোয়ানই সারারাত তার ইচ্ছেমত তাদের যেখানে চেয়েছে, সেখানেই নিয়ে গেছে?
    (চলবে)

    3 Comments
    • বিষণ্ন সুমন, রহস্যময় পরিবেশ ও অভিজ্ঞ মানুষের নিপুণ কৌশলের বর্ণনা আপনার লেখায় দারুণ ফুটে উঠেছে, যা আমাকে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত গল্পের গভীরে ধরে রেখেছে। আপনার লেখনীতে অরণ্যের ভয়ের আমেজ আর টানটান উত্তেজনা সত্যিই মুগ্ধ করার মতো, আপনি আপনার এই সৃজনশীল যাত্রা চালিয়ে যান।

      আপনি যদি সময় করে এই প্ল্যাটফর্মের অন্যান্য লেখকদের কাজেও নিয়মিত ইতিবাচক মন্তব্য ও প্রতিক্রিয়া জানান, তবে আমাদের এই লেখকগোষ্ঠী অনেক বেশি প্রাণবন্ত ও উৎসাহব্যঞ্জক হয়ে উঠবে।

    • অরণ্যের অন্ধকারে রেজোয়ান যেন নীরব ছায়াশিকারি, যার প্রতিটি পদক্ষেপে শিকারিরাই পথ হারায়…🖤

    • বিষণ্ন সুমন, রেজোয়ানের এই পাহাড়ী অভিজ্ঞতার পুরো বিষয়টি আপনি যেভাবে তুলে ধরেছেন তা পড়তে পড়তে একদম অন্যরকম এক শিহরণ অনুভব করছিলাম!

আমি মানুষের ভীড়ে মানুষ খোঁজে ফিরি

বিষণ্ন সুমন

ডিজাইনার

স্কুল বয়েস থেকেই লিখালিখা করি। যদিও পড়ি তার আগে থেকেই। আমি বিশ্বাস করি, ভালো লিখতে হলে আগে ভালো পড়তে জানতে হবে। তাই এখন পর্যন্ত নিজেকে লেখক না ভেবে ভালো পাঠক হিসেবেই পরিচয় দিতে সাচ্ছন্দ্য বোধ করি। প্রথম প্রকাশিত বই সেই ১৯৯৬ সালের গ্রন্থমেলায় “কে বলে তুমি নেই” রোমান্টিক উপন্যাস এবং সম্পূর্ণ মৌলিক ওয়েস্টার্ণ “লোন রাইডার”। পরবর্তীতে ২০১২ সালের বই মেলায় অন্যপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত গল্প সংকলন। মাঝে banglanews24.com এর সাহিত্যপাতায় নিয়োমিত লিখেছি। আসলে আমি লেখায় কখনোই অনর্গল নই। মাঝেমাঝেই বন্ধাত্ব্য এসে আমায় থামিয়ে রাখে। একটা শব্দও লিখতে পারিনা। তখন আমার পুরনো লিখাগুলো নিজেই পাঠক হয়ে পড়ি আর ভাবি, এ গুলো কি সত্যিই আমি লিখেছিলাম(?)। এই ৫৪ বছর বয়সে এসেও এই একটাই প্রশ্ন নিজেকে করে যাচ্ছি প্রতিনিয়ত।

Skip to toolbar