-
সভ্য হলো নিখিল ভূবন
— এম এ রশিদ
বিশ্বের মানচিত্রে একটি দেশ বাংলাদেশ। আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ। আয়তনে অতি ক্ষুদ্র। তথাপি ক্ষুদ্র নয় এর ইতিহাস-ঐতিহ্য। বরং জগতের অনেক অনেক দেশের চেয়ে অনেক সমৃদ্ধ এর জাতিগত স্বকীয়তা। শুধু বাংলাদেশ নয়, অবিভক্ত ভারতের সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সামাজিক মূল্যবোধে মুগ্ধ হয়েছে বিশ্বের অনেক দেশের মানুষ। তাই হয়তো আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর গানে লিখেছেন,
“এই দেশেরই ধূলি মেখে এই দেশেরই আচার দেখে
সভ্য হলো নিখিল ভূবন দিব্য পরিপাটি।”
কবির এ কথায় প্রতীয়মান হয় যে, আমাদের সভ্যতা উন্নত এবং স্বকীয় সভ্যতা, যা বিশ্ববাসীর কাছে হয়েছিল সমাদৃত, এমনকি অনুসরণীয়। কিন্তু নানামুখী সমস্যার সম্মুখীন আজ আমাদের সভ্যতা-সংস্কৃতি।
আমাদের মূল্যবোধে এসেছে অভূতপূর্ব সব পরিবর্তন। অনেক আচার-আচরণ দেখে বোঝা ভার হয়ে ওঠে, আসলে আমাদের আদৌ কোনো সামাজিক মূল্যবোধ আছে কি না। বিশেষ করে যুবসমাজের মধ্যে বিরাজমান অপসংস্কৃতি আর অসভ্যতা ভাবিয়ে তোলে সুস্থ বিবেকবান যেকোনো ব্যক্তিকেই।
একজন যুবকের কথা বলি, যার নাম ক বা খ, যে আমাদেরই অতি পরিচিত কেউ। এই যুবকের জন্ম কোনো হিন্দু বা মুসলিম বাঙালি পরিবারে। অথচ বাঙালি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে তার চালচলনের বেশির ভাগই অমিল। তবে যেকোনো পরিবর্তনই কিন্তু খারাপ নয়। ইতিবাচক পরিবর্তন নিয়ে আশা করি কেউই আপত্তি তুলবে না। তাই উক্ত যুবকের মধ্যে যে সমস্ত নেতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যেতে পারে, আমরা তার কয়েকটি তুলে ধরছি।
এক, প্রকাশ্যে ধূমপান করতে এই যুবক একবারও ভাবে না কে বড় আর কে ছোট। এমনকি পিতা-মাতার সামনেও সে ধূমপান করতে কুণ্ঠাবোধ করে না। কারণ, এটি যেন তার অস্তিত্বের অংশ; জীবনের আস্বাদন; স্মার্টনেস, ইউথ আর ফ্যাশন প্রকাশের অন্যতম বাহন।
দুই, পাশ্চাত্যধাঁচের পোশাক, চুলে জেল মেখে সজারু-কাঁটার ন্যায় খাড়া করা, দাড়ির অর্ধেকটাই লম্বা কলির দখলে, নিচের ঠোঁটের মাঝ বরাবর নুকতা-আকৃতির দাড়ি, হাতে সিঙ্গেল চুড়ি (ইংরেজিতে ব্রেসলেট), কানের ভেতর সেধানো আছে ইয়ারফোন। এছাড়া তার হাতের মোবাইল ফোন নামক যোগাযোগযন্ত্রটি ব্যবহৃত হচ্ছে কোনো তরুণী বা যুবতীকে উত্যক্ত করার কাজে, নতুবা অডিও বা ভিডিও প্লেয়ার হিসেবে এবং তাতে অবিরাম চলছে পপ, রক, ব্যান্ড, হিন্দি বা ইংরেজি গান। তবে এ যন্ত্রটির বেশি সমাদর নানান অশ্লীল স্থির বা সচল ছবি দেখার কাজে।
তিন, মাদক গ্রহণও এই যুবকের রুটিন ওয়ার্কের মধ্যে পড়ে। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সে তা করে লোকচক্ষুর অন্তরালে। কারণ অবশ্য সামাজিক মূল্যবোধ নয়, বরং আইনগত জটিলতা। তথাপি আজকাল অনেক এলিট পরিবারে অল্পস্বল্প নেশা গ্রহণকে স্ট্যাটাস হিসেবে গণ্য করা হয়। আর এটি ঘটেছে মূলত তাদের পাশ্চাত্যধাঁচের প্রগতিশীল শিক্ষা এবং ফ্যামিলি হেরিটেজের কল্যাণে।
অতঃপর, স্কুল-কলেজ-পড়ুয়া ছাত্রীদের উত্যক্তকরণে এই যুবকের জুড়ি মেলা ভার। কারণ, অপজিটকে উত্যক্ত করার মধ্যেই সে খুঁজতে চায় প্রকৃত হিরোইজমের অমৃত স্বাদ। আর একে কেন্দ্র করে অ্যাসিড নিক্ষেপ, ধর্ষণ বা খুনের মতো বড় বড় অপরাধ সংঘটনেও তার বুক কাঁপে না। এমনকি তার উৎপীড়ন থেকে নিরাপদ নয় বালিকার অভিভাবকরাও।
নানান অপরাধকর্মে জড়িত এ যুবকের কাছে নেই ন্যায়-অন্যায়ের ভেদাভেদ। সে শুধু জানে ভোগ-বিলাসী অ্যান্টি-হিরো লাইফ, যেখানে সে কারও না, কেউ তার না। তার না আছে অভিভাবক, না আছে অভিভাবকত্ব। সে স্বাধীন, বন্ধু-বন্ধনহীন, স্বেচ্ছাচারী, দায়-দায়িত্বহীন। আজ আমাদের সমাজে এরূপ লাগামহীন যুবকের সংখ্যা সঠিকভাবে নিরূপণ করা সত্যিই কঠিন।
আবার ওয়েস্টার্নাইজড হওয়ার প্রতিযোগিতায় যুবকদের চেয়ে কোনো অংশে পিছিয়ে নেই যুবতীরাও। শহর-গ্রাম নির্বিশেষে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গামী ছাত্রীদের প্রায়ই দেখা যাচ্ছে আঁটসাঁট জিনসের প্যান্ট পরতে। আবার গায়ের জামাটি দৃষ্টিকটু হবার মতো যথেষ্ট টাইট আর খাটো এবং ওড়নাটিও নামমাত্র পরা। আসলে সব কিছুর আড়ালে রয়েছে পশ্চিমা ঢঙে অপজিটের চোখে পড়ার অপচেষ্টা। যদিও এদের কেউ কেউ বিলুপ্তপ্রায় ধর্মীয় সংস্কার অনুসরণে বোরকা পরে, তাদের বোরকাটিও এতই টাইট, চোখা এবং এমন কাপড়ে তৈরি যে, তাতে ধর্মের চেয়ে ফ্যাশনের উদ্দেশ্যই বেশি পূরণ হয়। এছাড়াও পুরুষালি কাটিংয়ের চুলও তাদের অবাঙালি রুচির শক্তিশালী প্রমাণ। সব মিলিয়ে অসভ্যতার ছড়াছড়ি।
শুধু যুবসমাজই নয়, আজ আমাদের আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা সকল স্তরেই এরূপ লাগামহীনতা কমবেশি লক্ষণীয়। যেমন, বিগত কয়েক বছরে এ দেশের বেশ ক’জন নিরপরাধ শিশুকে জীবন দিতে হলো মায়ের পরকীয়ার কারণে। অথচ সর্বজনবিদিত কথা এই যে, মায়ের আঁচল শিশুর স্বর্গ; সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়। আর এ ক্ষেত্রে বাঙালি মায়েদের ঐতিহ্য তুলনাবিহীন।
এমনকি আমাদের শিশুরাও মুক্ত নয় ভিনদেশি সংস্কৃতির তাণ্ডব থেকে। তাই নিজের অজান্তেই অনেক শিশু গেয়ে উঠছে পরিবেশ থেকে শেখা কোনো আবেদনময় পপ, রক, ব্যান্ড কিংবা হিন্দি অথবা ইংরেজি গানের কলি, যদিও সে জানতেই পারেনি এ গানের অর্থ কী। তাহলে এই শিশুটি যেদিন শিশু থেকে তরুণ, তরুণ থেকে যুবক এবং বৃদ্ধ হবে, সেদিন কি সংস্কৃতি ও অপসংস্কৃতির মাঝে পার্থক্য নিরূপণ করার মতো আর কেউ থাকবে?
এখন প্রশ্ন হচ্ছে যে সমাজ-সংস্কৃতিতে উপরিউক্ত ভয়ঙ্কর বিষয়গুলি বিদ্যমান, সে সমাজের আচার দেখে কীভাবে
“সভ্য হলো নিখিল ভূবন”
কবির এ দাবি সত্য হতে পারে? উত্তর এই যে, এ সমস্ত ক্ষতিকর ভাইরাসগুলি আমাদের সমাজ-সংস্কৃতিতে আদৌ ছিল না। বরং মানবিকতার হাজার গুণে মহিমান্বিত ছিল আমাদের সামাজিক আচার-বিধি। আর তাই কবি বুক ফুলিয়ে গাইতে পেরেছিলেন,
“এই দেশেরই ধূলি মেখে এই দেশেরই আচার দেখে
সভ্য হলো নিখিল ভূবন দিব্য পরিপাটি।”
তাহলে আমাদের সমাজে এসব ভাইরাস এলো কীভাবে? উত্তর কিন্তু অতি সাধারণ, সংক্ষিপ্ত—“Cultural assault”।
“Cultural assault” ইংরেজি শব্দের অর্থ “সাংস্কৃতিক আগ্রাসন”। সুদীর্ঘ ঔপনিবেশিক শাসনের কারণে আমাদের সমাজে কিছু পরিবর্তন এসেছিল সত্য, কিন্তু তার চেয়েও মারাত্মক প্রভাব বিস্তার করেছে বিশ্বায়ন এবং বিশ্বব্যাপী প্রচারিত ইলেকট্রনিক মিডিয়া। স্যাটেলাইট টেলিভিশন ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে অতি সহজেই আমাদের পরিচিতি ঘটছে বহুজাতিক সংস্কৃতির সঙ্গে। এছাড়া মোবাইল ফোনে ইন্টারনেট সংযোগ চালু হওয়ার ফলে অনেক কিছু এখন হাতের নিকটে পৌঁছে গেছে। এসবের অনেক ভালো দিক থাকা সত্ত্বেও আজকের যুবসমাজ মেতে উঠেছে এদের থেকে পাওয়া নগ্নতা আর অশ্লীল অপসংস্কৃতি নিয়ে। এতে আমাদের সংস্কৃতি দিন দিন স্তিমিত হচ্ছে এবং এরই ধারাবাহিকতায় আমরা হারাচ্ছি আমাদের অমূল্য রত্ন—সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধ; ফলে আমরা সব কিছুই নীরবে মেনে নিতে শিখছি। তাই জীবন হয়ে উঠছে লাগামহীন আর জাতি হিসেবে আমাদের ভিত্তিও ক্রমান্বয়ে দুর্বল হয়ে পড়ছে, যার অমোঘ নিয়তি পরাজয় এবং পরাধীনতা, যেমনটি বিশ্ববিখ্যাত আফ্রিকান ঔপন্যাসিক Chinua Achebe তাঁর Things Fall Apart উপন্যাসে তুলে ধরেছেন।
দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আমাদের আচার দেখে “সভ্য হলো নিখিল ভূবন”, কিন্তু বহুজাতিক আচার দেখে আমরা হয়ে যাচ্ছি অসভ্য, পরাজিত এবং পরাধীন। তাই আমাদের হৃতগৌরব ফিরিয়ে আনার জন্য সচেতনভাবে নিরলস সংগ্রাম করতে হবে সবাইকে ঠিক এ মুহূর্ত থেকেই। অন্যথায়—2 Comments
Friends
Mustafa Nazmus Sakib (Zubair)
@mustafasakib
Kazi Mahabubur Rahman
@kazimahabuburrahman
Mahdia Rashid
@mahdiarashid
mithila jannat
@mithilajannat
সাদিয়া আক্তার রিমি
@sadiaakterreme
Miftah Khan
@miftahkhan
Tiplu Hasan Tamim
@hafez
Fafimamst Begom
@fafimamstbegom
Md Najmul
@mdnajmul

নিরলস সংগ্রাম করে এ সমাজকে আবারও ঠিক করতে হবে কিন্তু তা কি সম্ভব ।