Profile Photo

naznin shamimOffline

  • nazninshamim
  • Profile picture of naznin shamim

    naznin shamim

    • 2 weeks, 4 days ago

    ​”অক্ষরের গন্ধ”
    নাজনীন শামীম
    চট্টগ্রাম থেকে
    ২৪শে সেপ্টেম্বর ২০২৬ ইং

    ​হরেনবাবুর পুরোনো বই বাঁধাইয়ের দোকানটায় ঢুকলেই একটা অন্যরকম গন্ধ পাওয়া যায়। শুষ্ক কাগজ, গম দিয়ে তৈরি আঠা আর একটুখানি ভেজা মাটির মিশ্র গন্ধ। শহরের চশমা পরা তরুণ লেখক অর্ক প্রায়ই এসে বসে থাকে এই দোকানে। ডিজিটাল ডিসপ্লের উজ্জ্বল আলোর মাঝে এই পুরোনো বইয়ের ঘ্রাণটা তাকে এক অদ্ভুত শান্তি দেয়।
    ​একদিন দুপুরবেলা হরেনবাবু একটা পুরোনো কাঠের সিন্দুক খুলে চামড়ায় বাঁধাই করা মোটা একটা ডায়েরি বের করলেন। পাতাগুলো কালচে হলুদ হয়ে গেছে, কিছুটা ভঙ্গুর।
    ​— “এটা কী, হরেনকাকা?” অর্ক কৌতূহল সামলাতে পারল না।
    ​হরেনবাবু চশমার ওপর দিয়ে একবার অর্কের দিকে তাকালেন। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “আমার দাদুর আমলের খাতা। এতে তিনি নিজের হাতে তৈরি ‘তুলট কাগজে’ লিখতেন। এই যে দেখছ ধবধবে সাদা নয়, একটু হলদেটে ভাব, একটা আশঁ-আঁশ অনুভূতি— এটাই সত্যিকারের তুলট।”
    ​অর্ক সাবধানে পাতাগুলো স্পর্শ করল। খাতার ভেতরে কেবল একটাই বাক্য লেখা ছিল—
    ‘যা কিছু হারিয়ে যায়, তা কি সত্যিই মুছে যায়, নাকি কোনো কাগজের ভাঁজে চুপচাপ বেঁচে থাকে?’
    ​— “বাকি পাতাগুলো তো খালি, হরেনকাকা! দাদু আর কিছু লেখেননি?”
    ​হরেনবাবু মুচকি হাসলেন। “তুলট কাগজের একটা গোপন কথা আছে, অর্ক। এটা শুধু কালি দিয়ে লেখা শব্দ ধরে রাখে না, মানুষের স্পর্শ আর অনুভূতিও শুষে নেয়। যে নিজের সবটুকু আবেগ দিয়ে এতে হাত ছোঁয়াবে, সে নিজের উত্তর নিজেই দেখতে পাবে।”
    ​অর্ক ব্যাপারটা বিশ্বাস করল না। আধুনিক বিজ্ঞানমনস্ক ছেলে সে, আবেগ দিয়ে কাগজে লেখা ফোটার গল্প তার কাছে রূপকথা বলে মনে হলো। তবু কৌতুহলবশত খাতাটা সে নিজের সাথে করে বাড়ি নিয়ে এল।
    ​সেই রাতে অর্ক তার টেবিল ল্যাম্পের নিচে ডায়েরিটা রাখল। তার নিজের জীবনের অনেক না-বলা কথা ছিল— ছোটবেলায় হঠাৎ হারিয়ে যাওয়া মায়ের স্মৃতি, কোনোদিন বলতে না পারা প্রথম ভালোবাসার অনুভূতি, আর লেখক হিসেবে নিজেকে প্রকাশ করার ব্যর্থ চেষ্টা।
    ​সে তার হাতটা সেই তুলট কাগজের ফাঁকা পাতায় রাখল। চোখ দুটো বন্ধ করে মনে মনে ভেবে নিল তার শৈশবের সেই একলা দিনগুলোর কথা।
    ​হঠাৎই ঘরের বাতাসটা যেন বদলে গেল। নাকে ভেসে এলো বৃষ্টিভেজা মাটির গন্ধ। অর্ক চোখ খুলে অবাক হয়ে দেখল, কোনো কলম ছাড়াই, হলদেটে পাতার ওপর নীল কালির মতো একটা হালকা রেখা ফুটে উঠছে। ধীরে ধীরে সেখানে স্পষ্ট হয়ে উঠছে তার মায়ের হাতের লেখার আদলে লেখা কিছু শব্দ:
    ‘তুই একা নোস, অর্ক। তুই যখনই কিছু লিখিস, তোর শব্দগুলোর ভেতরে আমি থাকি।’
    ​অর্কের চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল তুলট কাগজের ওপর। সেই জলের ফোঁটা কাগজের ওপর পড়তেই লেখাগুলো মৃদু আলোর মতো জ্বলে উঠে মিলিয়ে গেল, কিন্তু তার মনের ভেতরের জমাট বাঁধা অন্ধকারটাও যেন এক নিমেষে হালকা হয়ে গেল।
    ​পরদিন সকালে অর্ক খাতাটা নিয়ে ছুটে গেল হরেনবাবুর দোকানে।
    ​— “হরেনকাকা! এই খাতা… এটা তো জাদুকরী!”
    ​হরেনবাবু বই বাঁধাইয়ের সুতোটা কাটতে কাটতে মৃদু হাসলেন। “না রে অর্ক, কোনো জাদু নেই এতে। আসলে আমরা আজকাল এত তাড়াহুড়ো করি যে নিজেদের মনের ভেতরে কী আছে তা শোনাই ছেড়ে দিয়েছি। তুলট কাগজ শুধু তোকে তোর নিজের সাথে মুখোমুখি বসিয়ে দিয়েছে। আসল লেখাটা তো তোর নিজের মনের ভেতরেই ছিল।”
    ​অর্ক ডায়েরিটা জড়িয়ে ধরে বসে রইল। সে বুঝতে পারল, তুলট কাগজ আসলে কোনো সাধারণ মাধ্যম নয়, এটা হলো মানুষের হারিয়ে যাওয়া অনুভূতির এক আয়না।
    ​সেদিন থেকেই অর্ক নতুন করে লিখতে শুরু করল। তবে এবার আর কোনো ল্যাপটপের কিবোর্ডে নয়— খসখসে তুলট কাগজের বুকজুড়ে, হৃদয়ের সবটুকু আবেগ ঢেলে।

    2
    9 Comments
    • ‘যা কিছু হারিয়ে যায়, তা কি সত্যিই মুছে যায়, নাকি কোনো কাগজের ভাঁজে চুপচাপ বেঁচে থাকে?’—এই চমৎকার লাইনটি আমার হৃদয়ে গভীর এক ভালোলাগার রেশ রেখে গেল। আপনার লেখায় পুরোনো কাগজের সেই অদ্ভুত ঘ্রাণ আর মানুষের আবেগের মিশেল খুব সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে, যা সত্যিই প্রাণ জুড়িয়ে দেয়। এমন চমৎকার সৃজনশীল কাজ নিয়মিত গ্রুপে শেয়ার করুন এবং অন্যান্য সদস্যদের লেখায় লাইক ও মন্তব্যের মাধ্যমে আমাদের এই আড্ডাকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলুন।

      • নিশ্চয়ই!!! কেনোনা আমরা এখানে লিখি বাস্তবতার রসকস মিশিয়ে, পাঠকের মন জয় করার জন্য , তোমার মন যেহেতু জয় করেছি সেহেতু সবার মনই জয় করতে পারবো বলে এতোটুকুন বিশ্বাস বন্ধু, পাশে থেকো সবসময়ই! ধন্যবাদ ♥️♥️♥️

    • গল্পটি সুন্দর হয়েছে

    • অসাধারণ লেখক ভঙ্গি ❤️❤️

    • তুলটের পাতায় কালি নয়, অর্কের হারানো অনুভূতিই মায়ের মমতার আলো হয়ে ফিরে এলো…🖤

    • পুরোনো বই আর কাগজের গন্ধের এই গল্পটা পড়ে খুব মায়া লাগল। আপনার লেখাটি পড়ার সময় আমি যেন নিজেই সেই দোকানের পরিবেশে হারিয়ে গিয়েছিলাম।

Friends

Skip to toolbar