Profile Photo

Israt Jahan IqraOffline

  • isratjahaniqra
  • Profile picture of Israt Jahan Iqra

    Israt Jahan Iqra

    • 1 month, 2 weeks ago

    আরও একটা দিন

    রাত সাড়ে এগারোটা।

    ঢাকার রাস্তাগুলো তখনও পুরোপুরি ঘুমোয়নি। কোথাও গাড়ির হর্ন, কোথাও দোকানের শেষ শাটার নামার শব্দ, কোথাও দূরের কোনো বাসের আলো অন্ধকার কেটে চলে যাচ্ছে।

    এই শহরটা কাউকে নিয়ে থেমে থাকে না।

    তবু সেই রাতে রাফির মনে হচ্ছিল, তার জন্যই যেন পৃথিবীটা থেমে গেছে।

    রাফির বয়স ছাব্বিশ।

    খুব সাধারণ একটা ছেলে।

    অতিরিক্ত মেধাবী নয়, আবার অমনোযোগীও নয়। খুব বেশি কথা বলে না, কিন্তু কাছের মানুষদের সঙ্গে বসলে হাসতে হাসতে সময় পার করে দিতে পারে।

    ছোটবেলায় তার একটা অভ্যাস ছিল—বৃষ্টি নামলেই বারান্দায় দাঁড়িয়ে বৃষ্টির গন্ধ নিত।

    মা প্রায়ই বলতেন,

    —“এই ছেলে, ভিজবি না কিন্তু!”

    রাফি হাসত।

    —“আমি ভিজছি না মা, শুধু বৃষ্টি দেখছি।”

    তার জীবনটাও তেমনই ছিল।

    খুব বড় কিছু নয়।

    কিন্তু তার নিজের।

    বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করার পর একটা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি পেয়েছিল। বেতন খুব বেশি নয়, কিন্তু নিজের পায়ে দাঁড়ানোর আনন্দ ছিল।

    প্রথম বেতন হাতে পেয়ে মায়ের জন্য একটা শাড়ি কিনেছিল।

    মা শাড়িটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ কিছু বলতে পারেননি।

    শুধু বলেছিলেন,

    —“নিজের জন্য কিছু কিনিসনি?”

    রাফি হেসে বলেছিল,

    —“আমার তো তুমি আছ।”

    বাবা পাশ থেকে বলেছিলেন,

    —“বেশি বড় হয়ে যাস না আবার।”

    রাফি হেসেছিল।

    তাদের ছোট পরিবার।

    বাবা, মা, রাফি আর তার ছোট বোন মিতু।

    মিতু বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ত।

    রাফির সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল বন্ধুর মতো।

    মাঝে মাঝে ঝগড়া—চকলেট নিয়ে, রিমোট নিয়ে, কে আগে বাথরুমে যাবে সেটা নিয়েও।

    কিন্তু রাতে মিতু পড়তে বসলে রাফিই চুপচাপ তার জন্য চা বানিয়ে দিত।

    বন্ধুদের মধ্যেও রাফি ছিল পরিচিত মুখ।

    তিনজনের একটা দল ছিল—রাফি, নিলয় আর সাকিব।

    তাদের আড্ডার সবচেয়ে বড় বিষয় ছিল কোনো বিষয়ই গুরুত্বপূর্ণ নয়।

    কে কোথায় খেয়েছে।

    কে কার সঙ্গে ঝগড়া করেছে।

    কে চাকরি বদলাবে।

    কে বিয়ে করবে।

    আর মাঝেমধ্যে ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় বড় স্বপ্ন।

    নিলয় একদিন বলেছিল,

    —“দেখিস, আমরা তিনজন একসঙ্গে একটা ব্যবসা করব।”

    রাফি হেসে বলেছিল,

    —“তুই আগে নিজের মাসের খরচ চালা।”

    সবাই হেসেছিল।

    আর ছিল মায়া।

    রাফির জীবনে মায়ার জায়গাটা একটু আলাদা ছিল।

    তাদের সম্পর্কটা খুব নাটকীয় ছিল না।

    মায়া রাফিকে প্রতিদিন “ভালোবাসি” বলত না।

    রাফিও না।

    কিন্তু মায়া জানত, রাফি দেরি করে বাসায় ফিরলে সে চিন্তা করে।

    রাফি জানত, মায়া রাগ করলে আসলে সে কষ্ট পেয়েছে।

    তাদের ভবিষ্যৎ নিয়েও কথা হয়েছিল।

    একদিন মায়া বলেছিল,

    —“সবকিছু ঠিকঠাক হলে আমরা একটা ছোট বাসা নেব।”

    রাফি বলেছিল,

    —“ছোট কেন?”

    —“কারণ বড় বাসার টাকা কোথায় পাব?”

    —“তাহলে ছোট বাসাই নেব।”

    মায়া হেসেছিল।

    সেই সময় তাদের কাছে ভবিষ্যৎটা খুব দূরের কোনো ব্যাপার মনে হয়নি।

    কিন্তু জীবন সবসময় মানুষের পরিকল্পনা অনুযায়ী চলে না।

    —

    প্রথমে রাফির অফিসে সমস্যা শুরু হলো।

    কোম্পানিতে লোক কমানো হচ্ছিল।

    একদিন বস তাকে ডেকে বললেন,

    —“পরিস্থিতি ভালো না। তোমাকে অন্য চাকরির জন্যও চেষ্টা করতে বলছি।”

    রাফি কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল।

    তারপর শুধু বলল,

    —“বুঝেছি, স্যার।”

    সেদিন অফিস থেকে বেরিয়ে অনেকক্ষণ রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিল সে।

    কয়েক দিনের মধ্যেই কথাটা সত্যি হলো।

    রাফির চাকরিটা চলে গেল।

    চাকরি যাওয়ার ঠিক এক সপ্তাহ পর সে আবার সেই অফিসের সামনে দাঁড়িয়েছিল।

    ভেতরে ঢোকার সাহস তার ছিল না।

    তবু দূর থেকে কাচের দরজার ওপাশে তাকিয়ে সে দেখল—

    তার পুরোনো ডেস্কে একজন নতুন ছেলে বসে আছে।

    একই চেয়ার।

    একই কম্পিউটার।

    একই জায়গা।

    শুধু মানুষটা অন্য।

    রাফি কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল।

    তার মনে হলো, মাত্র এক সপ্তাহেই যেন তার জীবনের একটা অধ্যায় অন্য কারও নামে লিখে ফেলা হয়েছে।

    সে ফিরে এল।

    কিন্তু অফিসের দরজা বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জীবনের অন্য দরজাগুলোও যেন একে একে বন্ধ হতে শুরু করল।

    বাবার ব্যবসায় ক্ষতি হলো।

    বাড়ির খরচ বাড়তে লাগল।

    মায়ের ওষুধ।

    মিতুর পড়াশোনার খরচ।

    বাড়ির ঋণ।

    সবকিছু মিলিয়ে রাফির মাথার ভেতর যেন প্রতিদিন নতুন একটা হিসাব খুলে বসত।

    তারপর মায়ার সঙ্গেও দূরত্ব তৈরি হলো।

    একদিন মায়া বলল,

    —“তুমি আগের মতো কথা বলো না।”

    রাফি বলল,

    —“অনেক চাপ যাচ্ছে।”

    —“আমার সঙ্গেও তো বলতে পারো।”

    রাফি চুপ করে থাকল।

    কারণ সে জানত না কীভাবে বলতে হয়—

    “আমি নিজেই জানি না কীভাবে সামলাব।”

    একদিন মায়া বলল,

    —“তুমি আমাকে তোমার জীবনের বাইরে করে দিচ্ছ।”

    রাফি কোনো উত্তর দিতে পারেনি।

    কিছুদিন পর তাদের কথা বলা কমে গেল।

    তারপর প্রায় বন্ধ।

    —

    এক রাতে মা জিজ্ঞেস করলেন,

    —“কী হয়েছে বাবা? তুই এত চুপচাপ কেন?”

    রাফি হাসল।

    —“কিছু হয়নি।”

    মা বললেন,

    —“মায়ের কাছে কিছু হয়নি বলে পার পাবি?”

    রাফি মায়ের দিকে তাকিয়ে শুধু বলল,

    —“ঘুমাও মা।”

    সেই রাতে সে অনেকক্ষণ জেগে ছিল।

    পরদিনও স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করল।

    বন্ধুর ফোন ধরল না।

    মায়ার পুরোনো মেসেজ খুলে আবার বন্ধ করল।

    অফিসের মেইল দেখল না।

    মিতুর সঙ্গেও কথা বলল না।

    তার মনে হচ্ছিল—

    “সবাইকে আমার জন্য এত কষ্ট করতে হচ্ছে কেন?”

    ভাবনাটা ধীরে ধীরে তার মাথার ভেতর জায়গা করে নিল।

    সেদিন রাতে রাফি বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল।

    কোথায় যাচ্ছে, কাউকে বলল না।

    শুধু জানত, সে এখন কারও মুখোমুখি হতে চায় না।

    ঢাকার রাস্তায় তখন রাত নেমেছে।

    মানুষ কমে এসেছে।

    দোকানের শাটার নামছে।

    দূরে কোনো বাস চলে যাচ্ছে।

    রাফি হাঁটতে হাঁটতে একটা অপেক্ষাকৃত নির্জন জায়গায় গিয়ে দাঁড়াল।

    তার মাথার ভেতর তখন একটাই অন্ধকার সিদ্ধান্ত ঘুরছিল।

    ঠিক তখনই পেছন থেকে একটা কণ্ঠ ভেসে এল—

    —“ভাই?”

    রাফি থামল না।

    —“একটু দাঁড়াবেন?”

    রাফি এবার থামল।

    পেছনে তাকিয়ে দেখল, একজন লোক দাঁড়িয়ে আছে। বয়স তিরিশের কাছাকাছি।

    লোকটা কয়েক পা এগিয়ে এসে বলল,

    —“খুব কষ্ট হচ্ছে?”

    রাফি কোনো উত্তর দিল না।

    লোকটা আবার বলল,

    —“আপনি কি সত্যিই মরতে চান, নাকি এই কষ্টটা আর সহ্য করতে পারছেন না?”

    রাফি মাথা তুলল।

    কথাটা তার ভেতরে কোথাও গিয়ে আটকে রইল।

    অনেকক্ষণ পর সে ফিসফিস করে বলল,

    —“আমি চাই… সবাই বুঝুক।”

    —“কী বুঝুক?”

    রাফির গলা কেঁপে উঠল।

    —“আমি কতটা কষ্টে ছিলাম।”

    লোকটা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

    তারপর বলল,

    —“একটা কাজ করবেন?”

    রাফি তাকাল।

    —“চোখ বন্ধ করুন।”

    রাফি কিছুক্ষণ দ্বিধা করল।

    তারপর চোখ বন্ধ করল।

    লোকটা ধীরে বলল,

    —“এবার ভাবুন, আপনি আর নেই।”

    চারপাশের শব্দ যেন ধীরে ধীরে দূরে সরে গেল।

    —“আপনার জীবনটা আপনাকে ছাড়াই এগিয়ে যাচ্ছে। আপনি শুধু দেখছেন। কিছু করতে পারবেন না। কাউকে ডাকতে পারবেন না। কাউকে ছুঁতে পারবেন না।”

    রাফির বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।

    তারপর—

    হঠাৎ চারপাশ বদলে গেল।

    রাফি দেখল তার নিজের বাড়ি।

    তার ঘর।

    সবকিছু আগের মতো।

    শুধু সে নেই।

    ভেতর থেকে মায়ের কণ্ঠ ভেসে এল—

    —“রাফি… বাবা?”

    রাফি ছুটে ঘরের দিকে গেল।

    মা তার ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে।

    বিছানাটা খালি।

    টেবিলের ওপর তার বই।

    চেয়ারে ঝোলানো জামা।

    মা ধীরে ধীরে সেই জামাটার দিকে হাত বাড়ালেন।

    কিছুক্ষণ ধরে তাকিয়ে থাকলেন।

    তারপর চুপ করে বসে পড়লেন।

    রাফি চিৎকার করে বলল,

    —“মা!”

    কিন্তু মা শুনলেন না।

    রাফি এগিয়ে গিয়ে মায়ের কাঁধে হাত রাখতে চাইল।

    পারল না।

    তার হাত যেন শূন্যতার ভেতর দিয়ে চলে গেল।

    দৃশ্য বদলে গেল।

    ডাইনিং টেবিলে বাবা একা বসে আছেন।

    সামনে খাবার।

    কিন্তু তিনি খাচ্ছেন না।

    চুপচাপ তাকিয়ে আছেন রাফির খালি চেয়ারটার দিকে।

    রাফি ধীরে বলল,

    —“বাবা…”

    বাবা শুনলেন না।

    দৃশ্য আবার বদলে গেল।

    মিতু রাফির ঘরে ঢুকেছে।

    তার হাতে রাফির একটা পুরোনো জিনিস।

    মিতু সেটার দিকে তাকিয়ে বলল,

    —“ভাইয়া, এটা আমাকে দিতে চেয়েছিলে, মনে আছে?”

    রাফি ছুটে গেল তার কাছে।

    —“মিতু…”

    মিতু তাকে দেখতে পেল না।

    দৃশ্য আবার বদলে গেল।

    একটা ক্যাফে।

    নিলয় আর সাকিব বসে আছে।

    তাদের সঙ্গে আরেকজন।

    আড্ডা চলছে।

    হাসি চলছে।

    জীবন থেমে নেই।

    রাফি একটু দূরে দাঁড়িয়ে দেখল।

    তার জায়গায় অন্য কেউ বসেছে।

    দৃশ্য বদলে গেল।

    মায়া।

    সে নিজের জীবনে এগিয়ে গেছে।

    তার মুখে হাসি।

    রাফি দূর থেকে তাকিয়ে রইল।

    তারপর নিজের চোখ নামিয়ে নিল।

    সে বুঝতে পারল—

    মানুষের জীবন থেমে থাকে না।

    কেউ তার জায়গায় অন্য কাউকে বসিয়ে নেয়।

    কেউ পুরোনো জিনিস সরিয়ে ফেলে।

    কেউ নতুন করে হাসতে শেখে।

    কিন্তু তারপর দৃশ্যটা আবার বদলে গেল।

    বহু বছর পরে।

    রাফির বাড়ি।

    মা বয়সে আরও বড় হয়েছেন।

    চুলে সাদা।

    হাতে রাফির পুরোনো একটা শার্ট।

    তিনি শার্টটা বুকের কাছে চেপে ধরে খুব আস্তে বললেন,

    —“তুই থাকলে আজ কত কথা বলতাম বাবা…”

    রাফি ছুটে গেল মায়ের দিকে।

    —“মা!”

    কোনো উত্তর নেই।

    বাবা দরজার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন।

    নীরব।

    তার চোখের দিকে তাকিয়ে রাফি বুঝতে পারল—

    কিছু শূন্যতা সময়ের সঙ্গে ছোট হয় না।

    দৃশ্যগুলো দ্রুত বদলাতে লাগল।

    তার অফিসের ডেস্কে নতুন মানুষ।

    তার পুরোনো ফোন অন্য কারও হাতে।

    তার জিনিসপত্র একটা বাক্সে।

    তার ঘর অন্যভাবে সাজানো।

    তার বন্ধুরা নিজেদের জীবনে ব্যস্ত।

    মায়া নিজের জীবনে এগিয়ে গেছে।

    সবকিছু বদলে গেছে।

    শুধু একটা জায়গায় যেন কিছুই বদলায়নি—

    তার বাবা-মায়ের ভেতরের সেই শূন্যতাটা।

    রাফির বুক ভারী হয়ে এল।

    শ্বাস দ্রুত হয়ে গেল।

    কপাল বেয়ে ঘাম নামতে লাগল।

    সে চোখ খুলতে চাইল।

    পারল না।

    আরও কয়েক মুহূর্ত—

    তারপর হঠাৎ সব অন্ধকার।

    —

    রাফি চোখ মেলে তাকাল।

    সে আবার সেই রাতের রাস্তায়।

    কপাল ঘামে ভিজে গেছে।

    শ্বাস দ্রুত চলছে।

    কিছুক্ষণ সে কোনো কথা বলতে পারল না।

    লোকটা তার সামনে বসে ছিল।

    লোকটা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

    —“এখনও সময় আছে।”

    রাফি কাঁপা গলায় বলল,

    —“আমি… আমি ওগুলো দেখতে চাই না।”

    —“তাহলে ফিরুন।”

    রাফি মাথা তুলল।

    —“কিন্তু আমার কিছুই তো ঠিক হয়নি।”

    লোকটা শান্ত গলায় বলল,

    —“আমি বলিনি ঠিক হয়ে গেছে।”

    রাফি চুপ।

    —“চাকরি গেছে?”

    —“হ্যাঁ।”

    —“মায়া দূরে চলে গেছে?”

    রাফি মাথা নিচু করল।

    —“বাড়ির সমস্যা আছে?”

    সে মাথা নাড়ল।

    লোকটা বলল,

    —“সবগুলো সত্যি।”

    কিছুক্ষণ নীরবতা।

    তারপর লোকটা বলল,

    —“কিন্তু একটা জিনিস মনে রাখবেন। এগুলো আপনার জীবনের সমস্যা। আপনার জীবন নিজে সমস্যা নয়।”

    রাফির চোখে আবার পানি এসে গেল।

    —“যদি কিছুই ঠিক না হয়?”

    লোকটা বলল,

    —“তাহলে কাল আবার ভাববেন।”

    রাফি তাকাল।

    —“আর কালও যদি ঠিক না হয়?”

    —“তাহলে পরশু।”

    রাফি কিছু বলল না।

    লোকটা ধীরে বলল,

    —“সব সমস্যার সমাধান আজ রাতেই করতে হবে—এমন কোনো নিয়ম নেই।”

    অনেকক্ষণ পর রাফি মাথা নাড়ল।

    লোকটা উঠে দাঁড়াল।

    —“চলুন। আগে বাসায় যাই।”

    রাফি এবার আর আপত্তি করল না।

    দুজন পাশাপাশি হাঁটতে শুরু করল।

    রাফি একবারও পেছনে তাকাল না।

    —

    বাড়িতে ফিরে সে চুপচাপ বসে রইল।

    মা ঘুমিয়ে পড়েছেন।

    মিতুর ঘরের দরজা বন্ধ।

    বাবার ঘর থেকেও কোনো শব্দ আসছে না।

    রাফি নিজের ঘরে গিয়ে বিছানায় বসে পড়ল।

    তার সমস্যাগুলো একই জায়গায় রয়ে গেছে।

    চাকরি নেই।

    টাকার চিন্তা আছে।

    মায়ার সঙ্গে সম্পর্ক কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে সে জানে না।

    আগামীকাল কী করবে তাও জানে না।

    কিন্তু সেদিন রাতে সে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিল না।

    শুধু নিজেকে বলল—

    “আজ না।”

    —

    পরদিন সকালে ঘুম ভাঙতেই রান্নাঘর থেকে মায়ের কণ্ঠ এল,

    —“রাফি, চা খাবি?”

    রাফি কিছুক্ষণ বিছানায় বসে রইল।

    তারপর উঠে রান্নাঘরের দরজায় গিয়ে দাঁড়াল।

    মা কাপ হাতে তাকালেন।

    —“কী হলো?”

    রাফি মৃদু হেসে বলল,

    —“চা দাও।”

    মা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন।

    —“এত সকালে তোর চা খাওয়ার শখ হলো?”

    রাফি কিছু বলল না।

    শুধু মায়ের হাত থেকে কাপটা নিল।

    সাধারণ একটা সকাল।

    সাধারণ একটা চা।

    কিন্তু রাফির কাছে সকালটা আর আগের মতো ছিল না।

    সে জানত না তার জীবন কোথায় যাবে।

    জানত না মায়া ফিরবে কি না।

    জানত না নতুন চাকরি কবে পাবে।

    জানত না বাবার ব্যবসা ঠিক হবে কি না।

    জানত না আগামী মাসের খরচ কীভাবে চলবে।

    শুধু একটা জিনিস জানত—

    সবকিছুর উত্তর আজই দিতে হবে না।

    সে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল।

    বাইরে মানুষ কাজে যাচ্ছে।

    একটা বাচ্চা স্কুলব্যাগ নিয়ে দৌড়াচ্ছে।

    একজন রিকশাওয়ালা হাসতে হাসতে কারও সঙ্গে কথা বলছে।

    একটা বাস ধোঁয়া ছেড়ে সামনে এগিয়ে গেল।

    জীবন চলছে।

    রাফি অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল।

    তারপর খুব আস্তে বলল,

    —“জানি না জীবনটা কোথায় যাবে।”

    একটু থামল সে।

    —“কিন্তু সেটা জানার জন্য আমাকে থাকতে হবে।”

    জানালার বাইরে তখন সকালটা আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠছে।

    রাফি চোখ মুছে নিল।

    তার সামনে কোনো নিশ্চয়তা ছিল না।

    কোনো অলৌকিক সমাধানও ছিল না।

    ছিল শুধু একটা নতুন দিন।

    আর সেই মুহূর্তে সেটাই যথেষ্ট ছিল।

    আরও একটা দিন।

    1 Share
    4
    6 Comments
    • আপনার লেখা এই সংবেদনশীল বিষয়টি অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী এবং প্রতিটি মানুষের জীবনের কঠিন সময়ের সাথে দারুণভাবে মিলে যায়। চরিত্রগুলোর আবেগ এবং পরিবারের প্রতি তাদের যে টান, তা আপনি খুব সুন্দর ও সাবলীল ভাষায় তুলে ধরেছেন। জীবনের জটিল মুহূর্তগুলো অতিক্রম করে নতুন করে বাঁচার এই বার্তাটি আমাদের সবার জন্য অনেক বড় অনুপ্রেরণা, তাই এমন চমৎকারভাবে লেখা চালিয়ে যাওয়ার অনুরোধ রইল।

    • “আজ না”—মাত্র দুইটা শব্দ, অথচ একটা জীবনের জন্য কত বড় সিদ্ধান্ত!

    • অন্ধকারের শেষ প্রান্তেও প্রিয়জনের টান মানুষকে ফিরিয়ে আনে জীবনের উষ্ণ আলোয়…🖤

    • Israt Jahan Iqra, লেখাটা পড়ে মনের ভেতরটা অদ্ভুত রকমের একটা শান্তিতে ভরে গেল। জীবনের কঠিন সময়ে দাঁড়িয়েও যে বেঁচে থাকার আলাদা এক সৌন্দর্য খুঁজে পাওয়া যায়, তা আপনি খুব সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। আপনার এই দারুণ লেখাটুকু আমাদের অনেককে আশা জোগাবে, তার জন্য ধন্যবাদ।

    • এই একটি মাত্র দিন আমারও দরকার যদি অলৌকিক কিছু হয় তবে কতইনা ভাল হতো গল্প খুব ভালো লাগলো ।

    • খুব সুন্দর 🥰

Friends

Skip to toolbar