-
• 1 month agoSyed Farah• 1 month, 1 week ago
চির-উন্নত মম শির: ‘বিদ্রোহী’ কবিতার নন্দনতত্ত্ব ও শাশ্বত সাহিত্যমূল্য
ভূমিকা
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে কিছু সাহিত্যকর্ম কেবল কালানুক্রমিক সৃষ্টি হিসেবে টিকে থাকে না; তা হয়ে ওঠে কোনো এক অবরুদ্ধ জাতির মনন-বিপ্লবের দ্রোহদীপ্ত স্মারক। ১৯২২ সালের ৬ জানুয়ারি ‘বিজলী’ পত্রিকায় প্রকাশিত কাজী নজরুল ইসলামের ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি ঠিক তেমনই এক ধ্রুপদি বিস্ফোরণ। নজরুল বর্ষের শতবর্ষী প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে যখন আমরা এই কবিতার দিকে ফিরে তাকাই, তখন কেবল ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে এক চারণকবির হুঙ্কার পাই না; বরং সেখানে খুঁজে পাই মানুষের স্বাতন্ত্র্যবোধ, আত্মপরিচয় ও সর্বজনীন মুক্তির এক অবিনশ্বর দর্শন।প্রকাশের পটভূমি ও ‘বিদ্রোহী’ উপাধির তাৎপর্য
প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর ভারতবর্ষ যখন রাজনৈতিক অস্থিরতা, পরাধীনতার গ্লানি ও অর্থনৈতিক শোষণে জর্জরিত, তখন নজরুলের এই অগ্নিনিঃসরণ। পরাধীনতার শিকল ভাঙার আহ্বানে রচিত এই কবিতা বিজলী পত্রিকায় আত্মপ্রকাশের সাথে সাথে বাংলা সাহিত্যাঙ্গনে আলোড়ন সৃষ্টি করে। তৎকালীন প্রখ্যাত সাহিত্যিক প্রমথ চৌধুরী নজরুলকে ‘বিদ্রোহী কবি’ উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন। কিন্তু এই ‘বিদ্রোহ’ কেবল সমকালীন রাজনীতির সীমাবদ্ধ গণ্ডিতে আবদ্ধ ছিল না; তা ছিল আত্মবঞ্চনা ও মানবজাতির সার্বিক অবদমন-বিরোধী এক সর্বব্যাপী বিপ্লব।
সাহিত্য সমালোচনা ও নন্দনতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ
নজরুল-সাহিত্যের নন্দনতত্ত্ব বিচারে ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটির গঠন, ছন্দ ও রূপক ব্যবহারের স্বাতন্ত্র্য অনন্য।১. পৌরাণিক ও বিশ্ব-ঐতিহ্যের অপূর্ব সমন্বয়:
কবিতাটির সর্বপ্রধান সাহিত্যিক শক্তি হলো এর মিথ বা পৌরাণিক উপাদানের বহুমাত্রিক ব্যবহার। কবি একদিকে হিন্দু পুরাণের শিবের তাণ্ডব, কৃষ্ণের বংশীধ্বনি, পরশুরামের কুঠার, ভৃগুর পদচিহ্ন এবং অন্যদিকে ইসলামিক রূপক ও গ্রিক-রোমান ঐতিহ্যের মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন। ‘আমি পরশুরামের কঠোর কুঠার / নিঃক্ষত্রিয় করিব বিশ্ব, আনিব শান্তি শান্ত উদার!’—এই পঙক্তিতে ধ্বংসের মধ্য দিয়েই পরম শান্তির বার্তা ধ্বনিত হয়েছে।
২. ধ্বংস ও সৃষ্টির দ্বৈত সত্তা:
‘বিদ্রোহী’ কবিতার একটি সূক্ষ্ম সৌন্দর্য হলো এর বৈপরীত্যের নন্দনতত্ত্ব (Esthetic of Dualism)। কবি একই সাথে যেমন ‘মহাপ্রলয়ের নটরাজ’ ও ‘আগ্নেয়গিরি’, তেমনই তিনি ‘উচ্ছল জল-ঝর্না’, ‘পথিক কবির গভীর রাগিণী’ এবং ‘শ্যামল রূপের খেয়া’। ধ্বংস ছাড়া যে নতুন সৃষ্টি সম্ভব নয়—এই মহাজাগতিক সত্যকে কবি নিজের মনস্তাত্ত্বিক ক্যানভাসে ধারণ করেছেন।৩. মুক্তমাত্রিক ছন্দ ও ধ্বনিঝংকার:
স্বরবৃত্ত ও মাত্রাবৃত্তের প্রথাগত নিয়মে বাংলা কবিতা যখন একধরনের সমান্তরাল গতিতে হাঁটছিল, তখন নজরুলের মুক্তক ছন্দের প্রবৃত্তি ও প্রাবল্য কবিতার ছন্দে এনেছিল তড়িৎগতি। কবিতার ধ্বনিঝংকার ও ‘অহং’-এর পুনরাবৃত্তি (‘আমি’) অহংকার নয়, বরং ব্যক্তির ভেতর সুপ্ত ‘ঐশ্বরিক সত্তা’ বা ‘ব্রহ্মাণ্ডময় মানবাত্মা’র প্রকাশ ঘটিয়েছে।সর্বজনীন মানবতাবাদ ও শোষিতের জয়গান
‘বিদ্রোহী’ কবিতার শেষ পর্বে এসে কবির মূল রাজনৈতিক ও সামাজিক ইশতেহার উন্মোচিত হয়। কবি স্পষ্ট ঘোষণা করেন:
“যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না,
অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম রণ-ভূমে রণিবে না
বিদ্রোহী রণ-শ্রান্ত-
আমি সেই দিন হব শান্ত!”
এখানে কবি কেবল রাজনৈতিক স্বাধীনতা চাননি, চেয়েছেন সামাজিক বৈষম্য, শোষণ ও নিপীড়নের চিরন্তন অবসান। ফলে কবিতাটি শতবর্ষ পার হয়েও যেকোনো স্বৈরাচার, অন্যায় ও শোষণের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী বিপ্লবের জাতীয় সংগীত হয়ে বিরাজ করে।উপসংহার
নজরুল বর্ষে দাঁড়িয়ে ‘বিদ্রোহী’ কবিতার পুনর্পাঠ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, এটি কেবল একটি ঐতিহাসিক কবিতা নয়; এটি চিরন্তন মানবমুক্তির এক কালজয়ী মহাকাব্য। পৌরাণিক ঐশ্বর্য, ধ্বনিময় ছন্দ এবং শোষিত মানবের পক্ষে আপসহীন অবস্থানের কারণে বাংলা ও বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে কবিতাটির সাহিত্যমূল্য চির-উজ্জ্বল। ‘শির নেহারি’ আমারি নতিশির ওই শিখর হিমাদ্রির’—এই উদাত্ত আহ্বানে নজরুল বাংলা সাহিত্যকে যে মহিমায় উন্নীত করেছেন, তা অনাগত কাল ধরে বাঙালির আত্মপরিচয় ও সাহসের রূপরেখা হয়ে থাকবে।1 Comment
নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ আজও শোষিতের কণ্ঠে জ্বলে ওঠা মুক্তির অমর অগ্নিশিখা…🖤