-
গল্প : সিরিয়াল নং ৩
.
কামনার একটি ছেলে। মেয়েও একটি মাত্র। দুই সন্তানকে নিয়ে কামনার গর্বের শেষ নেই। স্কুলজীবনে দুইজনই ছিল তুখোড়। ছেলে মাহিব আর মেয়ে মেধার পুরো স্কুলজুড়ে ছিল খুব নামডাক। মাহিব পড়ায় ছিল অসাধারণ। প্রথম ছাড়া দ্বিতীয় সে কখনও হয়নি। সে ধারা মাহিব বজায় রেখেছে পরবর্তীতেও। ঢাকা ইউনিভার্সিটি থেকে পাস করেছে। পাসের পর চাকরি পেতে গিয়ে অবশ্য দুই বছর নষ্ট হয়েছে। সে কথা আর বলে কী হবে ? অতীত, অতীত হয়ে গেছে।
আর মেধার মেধা পড়াশোনায় ছিল না। সেটা ছিল খেলা-ধুলায়। স্কুল-কলেজ পেরিয়ে ইউনিভার্সিটিতেও সে খেলায় ভালো করে গেছে। কী দড়িলাফ, কী বালিশ খেলা, কী লংজাম্প – সব কিছুতেই সে ছিল অন্যরকম। তাকে পেছনে ফেলতে পেরেছে খুব কম ছাত্রীই।
সব মিলিয়ে বলাই যায় সন্তানদের দিয়ে তিনি সব রকম সুখই চেখে দেখতে পেরেছেন।
এখন ছেলে-মেয়েকে বিয়ে দিয়ে তিনি ঝাড়া হাত-পা। ছেলে বউ নিয়ে তাদের সাথেই থাকছে। মেয়ে আছে শ্বশুরবাড়ি। ভালোই চলে যাচ্ছে সব। টিপটপ সুখী পরিবার।
তবে গল্পের ভেতরের গল্পগুলো যেমন গভীর হয় আরও, তেমনই এক গল্প আছে কামনাদের। সেটা সম্পূর্ণ ভিন্ন…আজকালের ছেলেরা যেমন হয়, নিজেরা পছন্দ করে বিয়ে করে, কামনার ছেলের বেলায়ও তা-ই হয়েছিল। সে কলেজজীবন থেকে এক মেয়েকে পছন্দ করত। ইউনিভার্সিটি পর্যন্ত গড়ায় এ সম্পর্ক। শেষ পর্যন্ত সেই মেয়েকেই বিয়ে করে সে। কামনা আর তার স্বামীও বাধা দেননি এতে। যেমনটা দেননি মেয়ের পছন্দের বিয়েতেও। সন্তানদের স্বাধীনতায় বরাবরই তাঁরা বিশ্বাসী। কিন্তু কে জানত, ছেলের পছন্দ এমন হবে ?
বউ হয়ে যে এসেছে, সে তাদেরকে প্রথম থেকেই যথাযথ সম্মান দেয়নি। চলে নিজের মর্জিতে। দিন-রাত মোবাইলে মুখ গুঁজে রাখে। সেখানে কী দেখে কে জানে, আজকাল সে লাগামছাড়া হয়ে গেছে একেবারে। এমনকি এখন আলাদা হয়ে যাওয়ার হুমকিও দিচ্ছে হররোজ ! জবাবে কিছু বলতে গেলেই উদাহরণ দেয় তার মেয়ে মেধার। অথচ মেধা আলাদা হতে চাচ্ছে তার জঘন্য শাশুড়িটার জন্য…____________
রিয়া শাশুড়ি কুচুটে বুড়ি হিসেবে দশে দশ পাবে, যদি কোনো প্রতিযোগিতায় নাম লেখায়। নিজে সারাদিন সিরিয়াল দেখে পার করে, অথচ বউয়ের মোবাইল দেখাটা তার সহ্য হয় না। সকালে বুয়া এসে কাজ করে দিয়ে যায়। নাস্তা বানিয়ে দুপুরের জন্য তরকারি কেটে দেয় সে। দুপুর হতে না হতেই রান্না রেডি চাই বুড়ির। অথচ রিয়া সকালে সাড়ে দশটার আগে ঘুম থেকে উঠতেই পারে না। নাস্তা করেই তাই তাকে লেগে পড়তে হয় কাজে। একেবারে রাতের রান্নাও করে ফেলতে হয় তখন। বুড়ি যদিও কাজে টুকটাক সাহায্য করে, তবুও মূল কাজটা তাকেই করতে হয়। এরপর বিকেলেই বুড়ি মহিলার কফি খেতে হয় রোজ। সেটা রিয়াকেই বানাতে হয়। রিয়া নিজেও খায় অবশ্য। তবে এসব হ্যাঁপা আর পোহাতে ইচ্ছে না রিয়ার। এ নিয়ে দুয়েকদিন কিছু বলেছে কি বলেনি, শাশুড়ির গায়ে আগুন লেগে গেছে যেন। আলাদা হওয়াটা যেন মস্ত অন্যায়। অথচ তার নিজের মেয়ে ঠিকই আলাদা হতে চাইছে ; সে বেলায় যেন কোনো সমস্যাই নেই !
____________
মেধা মায়ের একমাত্র মেয়ে। দারুণ আদরে বড়ো হয়েছে সে। কখনও কোনো কাজ নিজের হাতে করতে হয়নি তাকে। আম্মু নিজে করেছে কিংবা কাজের বুয়াকে দিয়েছে বাড়ির কাজ। অথচ তার এমন পোড়া কপাল যে, এখন শ্বশুরবাড়ির প্রায় সমস্ত কাজ তাকেই করতে হয়। শাশুড়ি নামক দজ্জাল মহিলাটা টুকটাক সাহায্য ছাড়া আর কিছুই করে না। বাবার বাড়িতে বিলাসিতায় বড়ো হয়েছে সে। অথচ বিয়ে হয়েছে এ মধ্যবিত্ত ঘরে। পছন্দ করেছিল যখন তুর্জয়কে, তখন এত কিছু দেখেনি। তুর্জয়ের স্মার্টনেস, তুখোড় রেজাল্ট – এসবের ঝনঝনানিতে অন্য কিছু চোখে পড়েনি সে সময়। যদি পড়ত, তাহলে কি আর এখানে রাজি হত সে কস্মিনকালেও !
সে একটু ঘর অগোছালো করে রাখলে প্যানপ্যানানি, মোবাইল চালালে ভাষণ, সামান্য অপরিপাটি হয়ে থাকলে ঘ্যানঘ্যান – এসব আর সহ্য হয় না তার। একটা ছেলে হয়ে গেছে বলে ওর মুখ চেয়ে আছে সে এখনও এখানে, নয়তো কবেই সংসারের গায়ে ঝাঁটা মেরে চলে যেত…। সেটা করতে না পেরে, শেষ-মেশ নানান দিক ভেবে যে-ই সে আলাদা হওয়ার কথা তুলেছে সে, সাথে সাথে হুলস্থুল পড়ে গেছে একেবারে। শাশুড়ি দিন-রাত কান্নাকাটি জুড়ে দিচ্ছে এরপর থেকে নিয়ম করে সকাল-সন্ধ্যা। সে কান্না দেখে মেধার দিকে চোখ গরম তাকাচ্ছে তুর্জয় প্রায়ই।
এদিকে বাবার বাড়ি গিয়েও শান্তি নেই। ভাবি মেয়েটাও সুবিধার নয়। তার সাথে আগে ভালোই মিশত, কিন্তু আজকাল কেমন অদ্ভুত আচরণ করছে। বিশেষ করে তার আলাদা হতে চাওয়ার খবর শোনার পর থেকে সে-ও একই সুর তুলছে। অথচ এখানে কত শান্তিতেই আছে সে, মেধার তুলনায় ; বলা যায় রানীর হালতে আছে…._____________________
কামনা আর তার মেয়ে মেধা ও পুত্রবধূ রিয়া – তিনজনই খুব ব্যস্ত থাকেন আজকাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। প্রায়শই “সংসার সমাচার” নামক গ্রুপে তারা পরিচয় লুকিয়ে নিজেদের প্রতি হওয়া অনাচার নিয়ে পোস্ট দেন। পড়ে মানুষজনও তাদের স্বান্তনা দেয়। আপাতত সেসব স্বান্তনা নিয়ে কষ্ট ভুলে থাকার চেষ্টা করছেন তারা।
অন্যদিকে তাদের তিনজনই ভারতীয় সিরিয়াল আর বাংলা নাটক খুব ভালোবাসেন। সারাদিন তাদের বেশিরভাগ দেখা ভিডিওর তালিকার সিংহভাগ জুড়ে এসবের অবস্থান। কিন্তু তারা তিনজন যা জানেন না, তা হচ্ছে – সন্ধ্যার পর শুরু হওয়া ৩নং সিরিয়াল “প্রীতিলতা” তাদের তিনজনেরই সবচেয়ে পছন্দের সিরিয়াল। প্রীতিলতার মূল উপজীব্য ননদ, দেবর, ভাবি আর মায়ের মাঝের নানান দ্বন্দ আর সেসবের ফলাফল….
তাদের মতো আরও হাজারো নারীর প্রিয় এ সিরিয়াল সফলভাবে ইতিমধ্যে পাঁচ হাজার একশ’ দুই পর্ব পার করে ফেলেছে। আরও হাজারখানেক পর্বের আগে এ সিরিয়াল শেষ হওয়ার সম্ভাবনা আপাতত দেখা যাচ্ছে না।2 Comments
Friends
Md Shakhawat Hossen
@mdshakhawathossen
FAM Farhad
@fmfarhad71gmail-com
মোবারক হোসেন
@mobarakhossain
area info
@areainfo
উত্তম কুমার
@uttamkumarpaul75
গোলাম ফারুক অভি
@enterprisesikder45gmail-com
02101988
@sahedahmed
মো: আমিরবিন আনোয়ার
@writeramir
শেখ মিজানুর রহমান
@sheikhmizanurrahman66gmail-com

আবিদাতুর রাহমান, পারিবারিক সম্পর্কের জটিলতার বুনন এবং একই ছাদের নিচে থেকেও মানসিকভাবে বিচ্ছিন্ন থাকার যে বাস্তব চিত্র আপনি ফুটিয়ে তুলেছেন, তা বেশ নিপুণ ও চিন্তার খোরাক জোগানোর মতো।