Profile Photo

সুমাইয়া বিনতে করিমOffline

  • Sumaiya03
  • আত্মজ…(গল্প)

    দিন-১
    চোখে কি যেন এসে লাগলো, কেমন যেন গরম গরম!কি বলে এটাকে? আমি পিটপিট করে তাকানোর চেষ্টা করছি, আস্তে করে চোখ মেলেছি এখন, এহহে এত সাদা কেন চারদিক! একে কি আলো বলে? কে জানে!

    পাশ থেকে একজন চিৎকার দিয়ে উঠলো, “চোখ মেলেছে, চোখ মেলেছে কিন্তু ও কাঁদে না কেন? নিউ বর্ন না কাঁদে?” ধুর, এত জোরে কেউ চিৎকার করে? কান ঝালাপালা হয়ে গেলো।

    তার পাশ থেকে আরেকজন বলছে, ” কি জানি,কাঁদার তো কথা! দাঁড়াও ডাক্তার ডাকি!”

    আমি ইতিউতি তাকালাম, আম্মু কই কে জানে। আচ্ছা আপনারা অবাক হচ্ছেন তো! আমি মাত্র জন্মালাম,বুঝলেন!কিন্তু আম্মুকে তো দেখি না।আম্মুর কাছে কখন নিবে কে জানে, আলো পড়ছে দেখে চোখ জ্বলছে, ঘুম ঘুম লাগছে। কে যেন তোয়ালে দিয়ে পেচিয়ে দিল। ভালোই হলো, শীত লাগছিলো!

    দিন-১, রাত ১২টা

    ঘুম ভেংগে দেখি আমি একা,চারপাশে রেলিং দেওয়া কি যেন!কি বলে এটাকে? হাত-পা নড়ানোর চেষ্টা করে দেখি পারছি না। মাঝখানে একবার আম্মুর কাছে নিয়ে গিয়েছিলো, কী সুন্দর গন্ধ আম্মুর গায়ে। যখন আম্মুর ভেতরে ছিলাম তখন ঠিক এই গন্ধটাই আমি পেতাম।বেশ লাগতো,মনে হতো কোনো অদ্ভুত সুন্দর জায়গায় এসেছি! কিন্তু আমি যে কেন একা এখানে শুয়ে বুঝতে পারছি না! আম্মুর পেটের ভেতরেও একাই ছিলাম, এখনো দেখি একা, কি রে বাবা! ঘাড় উঠিয়ে যে আশপাশ দেখবো, অত শক্তি এখনো হয় নি। আজকেই তো আসলাম, কীভাবে হবে বলেন!

    আবার ঘুমিয়েই যাচ্ছিলাম, কে যেন এল! আমার দিকে উঁকি দিলো। উনি সাদা জামা পড়া, এই জায়গাটাতে কি সবাই সাদা পড়ে,আর সবই সাদা?কে জানে! সমস্যা হচ্ছে উনি এসেই কাকে যেন বললেন,” ওমা! নিউবর্ন কটে কেন?”

    ” ও তো ঘুমাবেই,থাকুক ওখানে, আমার সাথে বড়টা তো, ও আবার মন খারাপ করবে!” আম্মুর গলা!

    “কি অদ্ভুত কথা! আচ্ছা যাই হোক, এখন কট থেকে তুলে দেই,খাইয়ে দিন,আমি শুইয়ে রেখে যাবো।”

    এরপর ফুরুত করে যেন উড়ে আমি আম্মুর কাছে চলে গেলাম! ইসসস আম্মু কি সুন্দর!

    দিন ১৪ঃ

    আমার কথা মনে আছে? আমি অই যে কয়েকদিন আগে আপনাদের এই অদ্ভুত জায়গায় এলাম। আমি এখন নিজের বাড়িতে বুঝলেন। আমার একটা নাম আছে এখন, একজন বয়স্ক মতো মহিলা, উনি নাকি দাদু হয় আমার, উনি আমাকে আহনাফ ডাকে। এখানে কি সবার নাম থাকে? অবশ্য থাকাই তো উচিত।নয়তো মানুষ মানুষকে কীভাবে ডাকবে? এই যে আমাদের বাসা, এখানে আম্মু আছে, দাদু আছে, একজন লম্বা মতো লোক উনি নাকি আমার বাবা উনি আছেন, আর আছে ছোট্ট একটা বাচ্চা, সে নাকি আমার ভাই হয়। ওর সাথে এখনো আমাকে কেউ পরিচয় করিয়ে দেয় নি। ও আমার কাছেও আসে না। আসলে অবশ্য ভালো হত, একটু কথা বলা যেতো। আম্মু তো থাকে না সাথে, দাদুই যা একটু কথা বলে, তাও নিজের মনে। আমি যদি কিছু বলি সেটা বোঝেও না। কি জ্বালা! আচ্ছা, ভাই কি? আমি কয়েকবার ভাবার চেষ্টা করলাম। সমস্যা এক জায়গায়,ভাবতে গেলেই আমি ঘুমিয়ে যাই, আমার শুধু ঘুম পায়!

    দিন- ১৯ঃ

    কোথায় যেন চিৎকার হচ্ছে। পিটপিট করে তাকালাম, অই তো আম্মুকে দেখা যায়, বাবাও আছে। এত চিৎকার করছে কেন কে জানে। এরকম চিৎকার অবশ্য আমি আম্মুর পেটে শুয়ে শুয়েও বেশ কয়েকবার শুনেছি। তখন অবশ্য জানতাম না কে আমার কি হয়,আর কেনইবা চিৎকার করে। অবশ্য কিছু কথা একবার কানে এসেছিলো। কে যেন বলছিলো, “আজমাইন ই এত ছোট, এখন আবার আরেকজন? একসাথে দুইজনকে পালবো কীভাবে?খরচ কী আকাশ থেকে আসবে? তুমি তোমার বাচ্চাকে কীভাবে পালবা চিন্তা করে দেখো।” বাবারে বাবা! কী সব কঠিন কঠিন কথা, আমি তখন আম্মুর পেটে ঘুরপাক খেতে খেতে ঘুমিয়ে গেলাম, আজকেও ঘুম পাচ্ছে! এই জায়গাটাই যেন কেমন!

    দিন- ২৮ঃ

    কে যেন এসেছে, আমাকে এত আলতো করে কোলে তুললো, ভয়ে ভয়ে। আমি অবশ্য হেসে ফেললাম। আমি তো ছোট বাচ্চা না যে লাফ দিয়ে পড়ে যাবো। কোলে উঠে আরাম লাগছে। সারাদিন তো একা একা শুয়ে থাকি।আম্মু খাওয়ানোর সময় একটু উঠি আম্মুর কোলে, অন্য সময় যদি দাদু আসে তাহলে, অবশ্য এখন নানুও এসেছে, তার কোলেও উঠি। কিন্তু আমার তো সবসময় কোলে থাকতে ইচ্ছা করে।কোলে থাকলে কত কাছ থেকে কথা বলা যায়, তাই না বলেন?

    ” আম্মু দেখো, আহনাফ কি সুন্দর করে হাসে!আহনাফ,দেখো আমি ফুপি, আহারে আব্বু কতদিন পর দেখতে আসলাম তোমাকে।ফুপি তো আগেই আসতে চাইসিলাম,কেউ আমাকে নিয়ে আসে না জানো!”

    ফুপি আবার কি! কই আম্মু তো কিছু বলে নি। আমার যদিও উনার কথা বেশ লাগছে, আমাকে অন্য সব বড় মানুষের মতো ভেবে নিয়ে কথা বলছেন, সবাই তো এভাবে বলে না।আমি উনাকে দেখতে থাকলাম।

    “ আল্লাহ ভাবি, ও তো সরাসরি তাকায়, যেন সব কথা বুঝতেসে! আব্বু চল তোমাকে ফুপি নিয়ে যাই, এখানে তো কেউ তোমাকে দেখেনা, সবাই আজমাইনকে আদর করে। ফুপি তোমাকে অনেক আদর করবো, আমরা অনেক খেলবো, ঠিক আছে?”

    হায় আল্লাহ! উনি কী বলে? আমাকে নিয়ে যাবে? আমি ইতিউতি সবার মুখের দিকে তাকালাম, সবাই অবশ্য এই ফুপির কথা শুনে হাসছে। কিন্তু যদি সত্যি নিয়ে যায়! আম্মুকে কীভাবে দেখবো?

    “ হ্যা, হ্যা রুবাব, ওকে নিয়ে যাও তো, আমি তাহলে আজমাইনের টেক কেয়ার করতে পারি। বেচারা সারাদিন মন খারাপ করে ঘোরে। আহনাফকে খাওয়াতে গেলে আরো বেশি মন খারাপ করে।”

    “ কী বলো ভাবি। দুইটাই তো ছোট, তোমাকে ওদের দুইজনেরই দরকার। তোমার অবশ্য বেশ প্রেশার যাচ্ছে, একদম রেস্ট হয় না বোঝা যায়। আজমাইনই তো মাত্র দুই বছরের। আহনাফ একটু তাড়াতাড়িই হয়ে গেসে। কিন্তু কি করবা বলো! কষ্ট হলেও তো বাচ্চা তোমাদেরই। আমি তো দুষ্টামি করলাম। তবে যাই বলো ও কি শান্ত হইসে।দেখো ও খুব একটা জ্বালাবে না তোমাকে!”

    আমি কান খাড়া করে শুনলাম! এই এক কথাতেই এই ফুপিকে আমার অনেকককক পছন্দ হয়ে গেলো। আসলেই তো আমি কাউকে জ্বালাই না একদম। একটুও কাঁদি না।আম্মু আমার কাছে খুব কম আসে, তবুও কাঁদি না। কেউ কিছু বললে শান্ত হয়ে শোনার চেষ্টা করি। একা একাই হাত নিয়ে খেলি। আমি তো বুঝি সবাই ব্যস্ত। আমাকে নিজের খেয়াল নিজেরই রাখতে হবে। এই যে আজকে আজমাইন সুযোগ পেয়েই খুচিয়ে আমার ঘুম ভাংগালো, আমি কিন্তু একটুও কাঁদি নি। আমার ভালোই লাগে ও আমার কাছে আসলে। আমি নিজেই চাই ও আমার সাথে সারাক্ষণ খেলুক। আম্মু যে কেন আসতে দেয় না কে জানে।

    দিন- ৩২ঃ

    একাই শুয়ে ছিলাম, আম্মু খাওয়ানোর জন্য এখন কোলে নিলো। আস্তে আস্তে আমার মাথায় হাত বুলাচ্ছে, আরামে ঘুম চলে আসছে। হঠাৎ দেখি চোখ দিয়ে পানি গড়াচ্ছে আম্মুর। আমি একটু অবাক হলাম, চোখ দিয়ে কীভাবে পানি বের হয়? কই আমার তো হয় না। আমাকে অবাক হয়ে তাকাতে দেখে আম্মু আরো অস্থির হয়ে কাঁদতে শুরু করলো। হঠাৎ শুনি ফিসফিস করে আম্মু বলছে, ” আহনাফ লক্ষী বাবা আমার, তোমাকে তো মা কাছেই রাখতে পারি না। বাবারে, আমি আসলে সামলাতে পারছি না ঠিকমতো কিছুই।তোদের বাবা চাকরি সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে, আমি তোদের দুই ভাই কে নিয়ে।কাকে বোঝাবো কষ্ট বলতো? সবাই শুধু বলতেসে, আমি একদম ভালো মা না, সামলাতেই যদি না পারবো তাহলে বাচ্চা কেন নিলাম।আরোও কত কথা।ভালো লাগে না আমার কিছুই,কিচ্ছু ভালো লাগে না।”

    আমার খুব ইচ্ছা হচ্ছিলো হাত দিয়ে আম্মুর গাল ধরি, চোখ থেকে যে পানি বের হচ্ছে সেটা মুছিয়ে দিই। কিন্তু আমার এত ছোট হাত! সেটা তো আম্মুর গাল পর্যন্তই যায় না,দুচ্ছাই!

    আম্মুকে আমি বলতে পারলাম না,তুমি একদম কষ্ট পেয়ো না, আমি তোমাকে এক ফোঁটাও জ্বালাবো না, একটুও না। আমি বড় হবো যখন দেখো আজমাইন আর আমি তোমাকে সব কাজে হেল্প করবো।তুমি শুধু আমাদের দূরে সরিয়ে দিও না প্লিজ! আমাদের কাছে তুমি আর বাবা থাকলেই হবে। আজকে বাবা এসে যখন আমার সাথে গল্প করবে,তখন তো তুমি আজমাইনকে নিয়ে ব্যস্ত থাকবে, তখন বাবাকেও আমি এ কথা বলবো, দেখো!

    একটাই সমস্যা, আমি অনেক কথাই বলি কিন্তু কেউ বোঝেই না! কবে বুঝবে কে জানে!

    12
    17 Comments
Skip to toolbar