-
নিরাপত্তা কোথায়—প্রশ্নের শেষ কোথায়?
একজন মানুষ ঘর থেকে বের হওয়ার পর ঠিক কতগুলো বিপদের সঙ্গে চুক্তি করে যে সে সন্ধ্যায় জীবিত ফিরে আসবে?
রাস্তায় বের হলে দুর্ঘটনা হবে না—এর নিশ্চয়তা কে দেয়?
অপরাধীর সামনে পড়বে না—এর নিশ্চয়তা কোথায়?
অন্যায়ের প্রতিবাদ করলে তার পরিচয়ই তার বিরুদ্ধে ব্যবহার হবে না—এর নিশ্চয়তা কে দেবে?
আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—
আইনের কাছে গেলে আইনই তার পাশে থাকবে, সেই নিশ্চয়তা কি সত্যিই আছে?
নিরাপত্তা কোনো বিলাসিতা নয়। এটি মানুষের জীবনের ন্যূনতম নিশ্চয়তা—রাস্তায় বের হলে ফিরে আসার নিশ্চয়তা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বললে ভয় না পাওয়ার নিশ্চয়তা, বিচার চাইলে সত্য হারিয়ে না যাওয়ার নিশ্চয়তা, আর ভোট দিতে গেলে নিজের ভোটটি নিজেরই থাকার নিশ্চয়তা।
কিন্তু আজ নিরাপত্তার প্রশ্নটি কি শুধু অপরাধের প্রশ্ন?
নাকি রাষ্ট্র, সমাজ, প্রতিষ্ঠান, আইন, রাজনীতি, অর্থনীতি—সবকিছুর ভেতর দিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে এই অনিশ্চয়তা?
একজন মানুষ সকালে ঘর থেকে বের হন।
কেউ অফিসে যান, কেউ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, কেউ হাসপাতালে, কেউ বাজারে।
গন্তব্য আলাদা।
কিন্তু প্রত্যাশা একটাই—
ফিরে আসা।
সেই ফিরে আসাটুকুও যদি অনিশ্চিত হয়, তাহলে উন্নয়ন, আধুনিকতা আর নগরায়ণের হিসাব কতটা পূর্ণ?
একটি মানুষ রাস্তা দিয়ে হাঁটছে।
তার সামনে গাড়ি, বাস, ট্রাক, মোটরসাইকেল।
সে কি জানে, কোন মুহূর্তে একটি ভুল তার জীবনের গতিপথ বদলে দিতে পারে?
২০২৬ সালের জুন মাসে রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের হিসাবে দেশে ৪৭২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪৩৮ জন নিহত এবং ৫৬১ জন আহত হয়েছেন।
প্রশ্ন হলো—
একটি দুর্ঘটনার পর শুধু মৃতের সংখ্যা গোনা হয় কেন?
কতগুলো দুর্ঘটনার আগে সতর্কতা ছিল?
কতগুলো রাস্তা আগে থেকেই ঝুঁকিপূর্ণ ছিল?
কতগুলো যানবাহন নিয়ম ভেঙে চলছিল?
কতগুলো অভিযোগ আগে থেকেই জমা ছিল?
আর কতগুলো মৃত্যুর পর আবারও বলা হয়েছে—
“ব্যবস্থা নেওয়া হবে”?
কিন্তু ব্যবস্থা নেওয়ার পরও যদি একই জায়গায়, একই কারণে, একইভাবে মানুষ মারা যায়—
তাহলে সমস্যাটা কোথায়?
রাস্তার নকশায়?
আইনের প্রয়োগে?
নাকি এমন এক ব্যবস্থায়, যেখানে দুর্ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর তদন্ত শুরু হয়, কিন্তু দুর্ঘটনা ঘটার আগের সতর্কতাগুলো হারিয়ে যায়?
একজন নারী রাতে বাড়ি ফিরছেন।
তার কি শুধু অন্ধকারকে ভয় পাওয়ার কথা?
নাকি সেই সমাজকেও ভয় পাওয়ার কথা, যেখানে একজন মানুষের স্বাধীন চলাফেরার অধিকারটুকুও কখনো কখনো নিরাপত্তার প্রশ্নে আটকে যায়?
নারী ও কন্যাশিশুর ওপর সহিংসতার অসংখ্য ঘটনা আমাদের সামনে আসে।
তাহলে প্রশ্নটা কি শুধু—
অপরাধী কে?
নাকি আরও আগে প্রশ্ন করা দরকার—
একজন নারীকে কেন নিজের পোশাক, সময়, পথ, সঙ্গী, ফোনকল—সবকিছুর হিসাব করে নিরাপদ থাকার চেষ্টা করতে হবে?
একটি শিশুকে কেন ছোটবেলা থেকেই শেখানো হবে—
“সাবধানে থেকো”?
কিন্তু তাকে কি কখনো শেখানো হবে না—
“অন্যায় করলে তুমি শাস্তি পাবে”?
নিরাপত্তার দায়িত্ব কি শুধু সম্ভাব্য ভুক্তভোগীর?
নাকি সম্ভাব্য অপরাধীরও?
আর যদি সমাজ বারবার ভুক্তভোগীকেই সাবধান হতে শেখায়—
তাহলে অপরাধীর জন্য আমাদের শিক্ষা কোথায়?
ডিজিটাল জগতেও কি মানুষ নিরাপদ?
একটি অচেনা লিংক।
একটি ভুয়া ওয়েবসাইট।
একটি চাকরির বিজ্ঞাপন।
একটি ফোনকল।
একটি OTP।
একটি পরিচয়পত্রের ছবি।
একটি ভুল ক্লিক।
কত সহজে একজন মানুষের পরিচয়, টাকা, ব্যক্তিগত তথ্য কিংবা ভবিষ্যতের পরিকল্পনা অন্য কারও হাতে চলে যেতে পারে?
যে প্রযুক্তি জীবনকে সহজ করেছে—
সেই প্রযুক্তিই যদি প্রতারণার নতুন দরজা খুলে দেয়, তাহলে নিরাপত্তা কোথায়?
আর প্রতারণার শিকার হলে মানুষ কোথায় যাবে?
যে প্রতিষ্ঠান থেকে সাহায্য পাওয়ার কথা, সেখানেই যদি অভিযোগ জানাতে ভয় লাগে—
তাহলে প্রযুক্তি যত আধুনিকই হোক, মানুষ কি সত্যিই নিরাপদ?
আর সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটি কি এখানে—
অপরাধ কি সবসময় একা একজন মানুষের কাজ?
নাকি কখনো কখনো তার পেছনে থাকে অর্থ, যোগাযোগ, প্রভাব কিংবা সংগঠিত কোনো নেটওয়ার্ক?
কোনো অপরাধে কোনো এমপি, মন্ত্রী, রাজনৈতিক নেতা, প্রভাবশালী ব্যক্তি বা পুলিশ সদস্যের নাম অভিযোগ হিসেবে এলে—
সেই অভিযোগকে কি শুধু পরিচয়ের কারণে সত্য ধরে নেওয়া যায়?
অবশ্যই নয়।
অভিযোগ আর প্রমাণ এক জিনিস নয়।
সত্য নির্ধারণের জন্য প্রয়োজন স্বাধীন তদন্ত, প্রমাণ এবং আইনি প্রক্রিয়া।
কিন্তু তখনই তো আরও বড় প্রশ্ন সামনে আসে—
অভিযোগ যদি ক্ষমতাবান কারও বিরুদ্ধে হয়, তদন্ত কতটা স্বাধীন থাকবে?
অভিযোগ যদি কোনো পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে হয়, তদন্ত করবে কে?
একটি প্রতিষ্ঠান কি নিজেরই একজন সদস্যের বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে তদন্ত করতে পারে?
আর যদি কোনো রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম তদন্তে আসে—
তখন তদন্তকারীর ওপর কোনো অদৃশ্য চাপ কাজ করে কি না, সেটি যাচাই করবে কে?
প্রতিটি অপরাধের পেছনে ক্ষমতাবান কেউ থাকে—এমন দাবি করার কোনো ভিত্তি নেই।
কিন্তু কোনো অপরাধের পেছনে যদি সত্যিই ক্ষমতা, অর্থ বা প্রভাবের ছায়া থাকে—
তাহলে তদন্ত কি শুধু অপরাধীকে খুঁজবে?
নাকি খুঁজবে সেই অর্থের উৎস?
সেই যোগাযোগের পথ?
সেই আশ্রয়?
সেই প্রভাব?
সেই মানুষগুলোকে, যারা সামনে না থেকেও পেছন থেকে পুরো ঘটনাটিকে চালিয়ে যেতে পারে?
কারণ একজন অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা আর একটি অপরাধের পুরো কাঠামোকে ভেঙে দেওয়া—
দুটো কি একই বিষয়?
একটি তদন্ত কমিটি গঠিত হলো।
কখনো দুর্ঘটনায়।
কখনো অনিয়মে।
কখনো কোনো প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতায়।
কখনো কোনো অভিযোগের পর।
কখনো কোনো আন্দোলনের চাপে।
তদন্ত কমিটি কি শুধু একটি প্রতিবেদন তৈরি করার জন্য?
নাকি তার কাজ সত্য বের করা?
দায় নির্ধারণ করা?
কারণ খুঁজে বের করা?
ভবিষ্যতে একই ঘটনা যেন না ঘটে, তার পথ দেখানো?
আর প্রতিবেদন তৈরি হওয়ার পর?
সেটি কোথায় যায়?
কে পড়ে?
কী সুপারিশ করা হয়েছিল?
কতগুলো সুপারিশ বাস্তবায়িত হয়?
আর কতগুলো সুপারিশ ফাইলের ভাঁজে হারিয়ে যায়?
একটি তদন্ত প্রতিবেদন যদি প্রকাশ না হয়—
মানুষ জানবে কীভাবে কী পাওয়া গেছে?
একটি সুপারিশ যদি বাস্তবায়িত না হয়—
তদন্তের অর্থ কী?
একজন সাধারণ মানুষ অপরাধ করলে যে আইন তার ওপর প্রয়োগ হয়—
ক্ষমতাবান কেউ অভিযুক্ত হলে সেই একই মানদণ্ড কি থাকে?
আর যদি কোনো তদন্তে সত্যিই কোনো এমপি, মন্ত্রী, রাজনৈতিক নেতা, পুলিশ কর্মকর্তা কিংবা অন্য কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া যায়—
তখন কি পরিচয়টি তদন্তের গতি বদলে দিতে পারে?
আর যদি প্রমাণ না পাওয়া যায়—
তাহলে কি সেই ব্যক্তিকে শুধু অভিযোগের ভিত্তিতে দোষী বলা যায়?
না।
তাহলে প্রশ্নটা আরও গভীর—
ক্ষমতাবান হোক বা সাধারণ মানুষ—
আইনের সামনে কি দুজনের জন্য একই দরজা খোলা?
একই তদন্ত?
একই প্রমাণের মানদণ্ড?
একই জবাবদিহি?
দুর্নীতির ক্ষেত্রেও কি নিরাপত্তা হারিয়ে যায় না?
ঘুষ কি শুধু মানুষের টাকা নেয়?
নাকি তার সঙ্গে আরও কিছু নিয়ে যায়?
আস্থা?
সম্মান?
অধিকার?
একজন মানুষ যদি মনে করেন—
“টাকা না দিলে কাজ হবে না”,
তাহলে সে কি শুধু একটি সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে?
নাকি ধীরে ধীরে রাষ্ট্রের ওপর তার বিশ্বাসটুকুও হারাচ্ছে?
আর যখন অভিযোগ করার জায়গা থাকে, কিন্তু অভিযোগ করেও যদি প্রতিকার না হয়—
তখন মানুষ পরেরবার অভিযোগ করবে কেন?
ভয় কি তখন দুর্নীতির সবচেয়ে বড় সহকারী হয়ে ওঠে না?
মাদক কি শুধু একটি প্যাকেট?
নাকি তার পেছনে থাকে একটি দীর্ঘ পথ?
যে মানুষটি সীমান্ত পেরিয়ে পণ্য বহন করে—
সে কি পুরো চক্রের মূল ব্যক্তি?
নাকি তার পেছনে থাকে অর্থদাতা, সংগঠক, পরিবেশক এবং আরও বড় কোনো নেটওয়ার্ক?
শুধু বাহক ধরা পড়লে কি ব্যবসা বন্ধ হয়?
নাকি পরের দিন আরেকজন বাহক এসে সেই জায়গা পূরণ করে?
তাহলে প্রশ্ন—
আমরা কি অপরাধের মানুষটিকে ধরছি?
নাকি অপরাধের ব্যবস্থাটিকেও খুঁজছি?
একজন কিশোর কি এক সকালে ঘুম থেকে উঠে অপরাধী হয়ে যায়?
নাকি তার আগে অনেকগুলো দরজা ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যায়?
পরিবার থেকে দূরত্ব।
শিক্ষা থেকে বিচ্ছিন্নতা।
অবহেলা।
অর্থনৈতিক সংকট।
খারাপ সঙ্গ।
গ্যাংয়ের প্রলোভন।
ক্ষমতার ভুল ব্যবহার।
আর পাশে দাঁড়ানোর মতো একজন মানুষের অভাব।
তাহলে কোনো কিশোর অপরাধে জড়িয়ে পড়ার পর শুধু তাকে শাস্তি দিলেই কি প্রশ্ন শেষ?
নাকি তার আগে জানতে হবে—
কোন জায়গায় আমরা তাকে হারিয়েছিলাম?
কোন মুহূর্তে তার হাত থেকে বই সরে গিয়ে অন্য কিছু উঠেছিল?
কোন দরজাটি তখন বন্ধ ছিল?
শিক্ষা কি সত্যিই সবার জন্য সমান সুযোগ?
নাকি শিক্ষাও ধীরে ধীরে এমন এক ব্যবস্থায় পরিণত হচ্ছে, যেখানে সামর্থ্য থাকলে পথ সহজ হয়, আর সামর্থ্য না থাকলে স্বপ্নটাই কঠিন হয়ে যায়?
একজন শিক্ষার্থী বছরের পর বছর পড়াশোনা করে।
সনদ পায়।
তারপর চাকরির জন্য অপেক্ষা করে।
একটি পরীক্ষা।
আরেকটি পরীক্ষা।
আরেকটি ফলাফল।
আরেকটি অপেক্ষা।
কখনো প্রতারণামূলক চাকরির বিজ্ঞাপন।
কখনো ভুয়া নিয়োগ।
কখনো অর্থের বিনিময়ে চাকরির প্রতিশ্রুতি।
তাহলে শিক্ষা যদি ভবিষ্যতের দরজা হয়—
সেই দরজার চাবি কি যোগ্যতা?
নাকি টাকা?
আর যোগ্যতা থাকার পরও যদি একজন তরুণ বছরের পর বছর কাজ না পায়—
তার হতাশার দায় কার?
স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রেও কি মানুষ নিরাপদ?
হাসপাতালে একজন মানুষ যায় সুস্থ হওয়ার আশায়।
তার হাতে থাকে টাকা।
মনে থাকে বিশ্বাস।
সঙ্গে থাকে পরিবার।
কিন্তু চিকিৎসা নিতে গিয়ে যদি কোনো ভুল, অবহেলা বা ব্যবস্থাগত ব্যর্থতার অভিযোগ ওঠে—
তখন প্রশ্নটা কে করবে?
রোগী?
পরিবার?
নাকি তদন্ত কমিটি?
আর তদন্ত কমিটি যদি বলে—
“ঘটনাটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে”—
তাহলে সেই পরিবারের অপেক্ষার শেষ কোথায়?
একজন মানুষ মারা যাওয়ার পর তদন্ত শুরু হয়।
কিন্তু যে ভুলের অভিযোগ উঠেছে, সেটি যদি আগে থেকেই প্রতিরোধ করা যেত—
তাহলে তদন্ত কি তখনও যথেষ্ট?
পরিবেশের নিরাপত্তার কথাও কি বলা যায়?
নদী দখল হচ্ছে।
খাল ভরাট হচ্ছে।
গাছ কাটা হচ্ছে।
জলাধার হারিয়ে যাচ্ছে।
ফুটপাত দখল হচ্ছে।
অপরিকল্পিত ভবন উঠছে।
তারপর বৃষ্টি হলে পানি জমে।
রাস্তা ডুবে যায়।
মানুষের ঘর ডুবে যায়।
যাতায়াত বন্ধ হয়।
তখন কি আমরা শুধু বলব—
“প্রকৃতি আমাদের শাস্তি দিচ্ছে”?
নাকি প্রশ্ন করব—
প্রকৃতির স্বাভাবিক পথটা আমরা কতদিন ধরে বন্ধ করে রেখেছি?
একটি শহর যত উঁচু ভবনে ভরে ওঠে—
তার নিচে মাটি কি ততটাই নিরাপদ থাকে?
উন্নয়ন যদি মানুষের জীবনকে সহজ করার কথা বলে—
তাহলে সেই উন্নয়নে মানুষ কেন বারবার নতুন ঝুঁকির মুখোমুখি হয়?
আর ভোট?
একজন নাগরিক ভোটকেন্দ্রে যায়।
তার হাতে একটি ব্যালট।
সেই ব্যালটের সঙ্গে কি শুধু একটি প্রতীক থাকে?
নাকি তার সঙ্গে থাকে তার নিজের সিদ্ধান্ত, তার নিজের অধিকার, তার নিজের কণ্ঠ?
নির্বাচন নিয়ে কোনো অনিয়মের অভিযোগ উঠলে—
অভিযোগ মানেই কি সত্য?
না।
আবার অভিযোগ উঠেছে বলেই সেটিকে উপেক্ষা করা যায় কি?
তাও নয়।
তাহলে প্রশ্ন—
এ ধরনের অভিযোগ যাচাইয়ের সবচেয়ে স্বচ্ছ পথ কী?
প্রতিটি কেন্দ্রের ফল কি সহজে দেখা যায়?
রিটার্নিং কর্মকর্তার নথি কি যাচাইযোগ্য?
পোলিং এজেন্টদের তথ্য কি মিলিয়ে দেখা যায়?
প্রয়োজনে পুনর্গণনার সুযোগ কি কার্যকর?
আর কোনো ভোট বাতিল হলে—
কেন বাতিল হলো, সেটি জানার অধিকার কি ভোটারের নেই?
নির্বাচন শুধু ভোট দেওয়ার দিনটির নাম নয়।
নির্বাচন হলো—
ভোট দেওয়ার আগে বিশ্বাস,
ভোট দেওয়ার সময় নিরাপত্তা,
আর ভোট দেওয়ার পরে ফলাফলের প্রতি আস্থা।
এই তিনটির কোনো একটি যদি দুর্বল হয়—
তাহলে ভোটের কাগজ অক্ষত থাকলেও মানুষের বিশ্বাস কি অক্ষত থাকে?
সীমান্তে চোরাচালান বন্ধের কথা বলা হয়।
কিন্তু প্রশ্ন—
শুধু পণ্য আটকানো হচ্ছে?
নাকি পেছনের ব্যবসায়িক নেটওয়ার্কও খুঁজে বের করা হচ্ছে?
মানুষ বিদেশে কাজ করতে যায়।
কেউ ঋণ নেয়।
কেউ জমি বিক্রি করে।
কেউ পরিবারের শেষ সঞ্চয়টুকু দেয়।
তারপর যদি কোনো দালালের প্রতারণায় সে নিখোঁজ হয়—
তাহলে অপরাধী শুধু সেই ব্যক্তি, যে তাকে নিয়ে গিয়েছিল?
নাকি তার পেছনে আরও কেউ ছিল?
যে মানুষগুলো স্বপ্ন বিক্রি করে টাকা নেয়—
তাদের নেটওয়ার্ক কতদূর?
আর যারা সেই নেটওয়ার্ক চালায়—
তাদের কাছে পৌঁছানো কি সবসময় সম্ভব?
একটি অভিযোগ উঠল।
মানুষ রাস্তায় নামল।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা হলো।
ক্যামেরা এলো।
শিরোনাম হলো।
তদন্ত কমিটি হলো।
প্রতিবেদন হলো।
তারপর?
কিছুদিন পর নতুন একটি ঘটনা এলো।
নতুন শিরোনাম।
নতুন আলোচনা।
নতুন তদন্ত।
পুরোনো ঘটনাটি ধীরে ধীরে মানুষের স্মৃতি থেকে সরে গেল।
কিন্তু সেই পুরোনো ঘটনার প্রশ্নগুলো কি সত্যিই শেষ হয়ে গেল?
নাকি তারা কোথাও জমে রইল?
একটি ফাইলে।
একটি পরিবারের মনে।
একজন ভুক্তভোগীর নীরবতায়।
একজন সাক্ষীর ভয়ে।
একজন নাগরিকের অবিশ্বাসে।
তাহলে “ব্যবস্থা নেওয়া হবে”—এই কথাটির পর আসলে কী হওয়া উচিত?
তদন্ত?
প্রতিবেদন?
দায় নির্ধারণ?
শাস্তি?
সংস্কার?
নাকি শুধু আরেকটি সংবাদ সম্মেলন?
নিরাপত্তা তাই শুধু পুলিশের হাতে অস্ত্র, রাস্তায় ক্যামেরা, ভবনে পাহারা কিংবা আইনের কঠোরতা নয়।
নিরাপত্তা হলো আস্থা।
আস্থা যে অভিযোগ করলে তদন্ত হবে।
আস্থা যে তদন্ত হলে রিপোর্ট হবে।
আস্থা যে রিপোর্ট হলে ব্যবস্থা হবে।
আস্থা যে ভোট দিলে ভোট গণনা হবে।
আস্থা যে মামলা করলে পরিচয় নয়, প্রমাণ কথা বলবে।
আস্থা যে ক্ষমতার সামনে আইন ছোট হবে না।
আস্থা যে কোনো শিশু অন্যায়ের শিকার হলে তার কণ্ঠ হারিয়ে যাবে না।
কিন্তু সেই আস্থার জায়গাটিই যদি বারবার প্রশ্নের সামনে দাঁড়ায়—
তাহলে উন্নয়নের পরিসংখ্যান দিয়ে কি সেই শূন্যতা পূরণ করা যায়?
একটি সমাজের নিরাপত্তা শুধু কতজন অপরাধী গ্রেপ্তার হলো, কতটি মামলা হলো, কতটি তদন্ত কমিটি হলো—সেই হিসাবেও কি মাপা যায়?
নাকি নিরাপত্তার আসল হিসাবটা লুকিয়ে আছে মানুষের মনে?
মানুষ রাতে একা রাস্তায় হাঁটতে গিয়ে কতটা ভয় পায়?
অন্যায় দেখেও কতজন চুপ করে যায়?
অভিযোগ করার আগে কতজন ভাবে—
“আমার কিছু হবে না তো?”
বিচার চাইতে গিয়ে কতজন ভাবে—
“বিচার চাইতে গিয়ে আমি নিজেই বিপদে পড়ব না তো?”
আর একজন সাধারণ মানুষ যখন ক্ষমতাবান কারও বিরুদ্ধে কথা বলার আগে চারপাশে তাকায়—
সেই একবার চারপাশে তাকানোর মধ্যেই কি একটি সমাজের নিরাপত্তার প্রকৃত চিত্র লুকিয়ে নেই?
আমরা কতবার বলেছি—
“তদন্ত চলছে”?
কতবার বলেছি—
“ব্যবস্থা নেওয়া হবে”?
কতবার বলেছি—
“দোষীদের আইনের আওতায় আনা হবে”?
কিন্তু কতবার নিজেদের জিজ্ঞেস করেছি—
তারপর?
তারপর কী হয়েছিল?
কার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল?
কী পরিবর্তন হয়েছিল?
আর যে মানুষটি অন্যায়ের শিকার হয়েছিল—
তার জীবনে কি সত্যিই কিছু ফিরে এসেছিল?
নাকি শুধু সংবাদটি পুরোনো হয়েছিল?
শিরোনাম বদলেছিল?
ক্যামেরা সরে গিয়েছিল?
মানুষ ভুলে গিয়েছিল?
আর ফাইলটি থেকে গিয়েছিল?
যদি একটি অপরাধের বিচার হয়, কিন্তু একই ধরনের অপরাধ আবার ঘটে—
তাহলে আমরা কি শুধু একজন অপরাধীকে শাস্তি দিয়েছি?
নাকি সমস্যাটিকে বাঁচিয়ে রেখেছি?
যদি একটি তদন্ত সত্য প্রকাশ করে, কিন্তু সেই সত্য প্রকাশের পরও কোনো পরিবর্তন না আসে—
তাহলে সত্য জানার মূল্য কোথায়?
যদি আইন সবার জন্য সমান হয়—
তাহলে একজন সাধারণ মানুষের ভয় আর একজন ক্ষমতাবানের ভয় কি একই হওয়ার কথা নয়?
আর যদি একই না হয়—
তাহলে আইনের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সেই অদৃশ্য দেয়ালটি কোথায়?
কে বানিয়েছে?
কে পাহারা দেয়?
আর কে ভাঙবে?
যদি কোনো অপরাধের আড়ালে সত্যিই ক্ষমতা, অর্থ কিংবা প্রভাবের ছায়া থাকে—
আমরা কি সেই ছায়ার শেষ প্রান্ত পর্যন্ত যেতে চাই?
নাকি সত্যটা জানার আগেই আমাদের সবচেয়ে বড় ভয়টা অন্য কোথাও—
সত্যটা যদি সত্যিই বেরিয়ে আসে, তাহলে তারপর কী হবে?
আর যদি সত্যের পথ আমাদের এমন কারও দরজায় নিয়ে যায়, যাকে আমরা প্রশ্ন করতে অভ্যস্ত নই—
তখন কি প্রশ্ন থেমে যাবে?
যদি সত্য আমাদের নিজের প্রতিষ্ঠানকে প্রশ্ন করে—
আমরা কি প্রতিষ্ঠানকে বদলাব, নাকি সত্যটাকেই অস্বস্তিকর বলে সরিয়ে রাখব?
যদি সত্য আমাদের সমাজের দিকে আঙুল তোলে—
আমরা কি আয়নার দিকে তাকাব?
আর যদি একদিন বুঝতে পারি—
অপরাধী শুধু একজন মানুষ নয়,
কখনো কখনো তাকে তৈরি করে একটি নীরব সমাজ,
একটি দুর্বল প্রতিষ্ঠান,
একটি ভয় পাওয়া সাক্ষী,
একটি অদৃশ্য প্রভাব,
একটি অসম আইনপ্রয়োগ,
অথবা আমাদের নিজেদের নীরবতা—
তাহলে দায়টা ঠিক কোথায় গিয়ে থামে?
অপরাধীর কাছে?
প্রতিষ্ঠানের কাছে?
ক্ষমতার কাছে?
নাকি আমাদের কাছেও এসে দাঁড়ায়?
আর সবচেয়ে ভয়ংকর প্রশ্ন—
আমরা কি সত্যিই নিরাপত্তা চাই?
নাকি শুধু চাই, বিপদটা যেন আজ আমাদের দরজায় না আসে?
আমরা কি সত্য চাই?
নাকি এমন একটি সত্য চাই, যেটা আমাদের স্বস্তি নষ্ট করবে না?
আমরা কি বিচার চাই?
নাকি শুধু চাই, বিচারটা অন্য কারও জন্য হোক?
আমরা কি অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলতে চাই?
নাকি এমন দিনটির অপেক্ষায় থাকি, যেদিন অন্যায়টা আমাদের সঙ্গে ঘটবে না?
আর যদি কোনো একদিন সেই অন্যায় আমাদের দরজায় এসে দাঁড়ায়—
তখন কি আমরা এখনও চুপ থাকব?
নাকি তখন বুঝব—
যে ভয়কে আজ অন্যের সমস্যা ভেবে এড়িয়ে গিয়েছিলাম,
সেই ভয় আসলে ধীরে ধীরে আমাদের সবার জন্যই একটি ঘর বানাচ্ছিল?
তখন হয়তো প্রশ্নটা আর হবে না—
“নিরাপত্তা কোথায়?”
প্রশ্নটা হবে—
“নিরাপত্তা হারাল কে?”
রাষ্ট্র?
সমাজ?
প্রতিষ্ঠান?
আইন?
নাকি আমরা নিজেরাই?
আর যদি উত্তর খুঁজতে গিয়ে দেখা যায়—
আমরা সবাই কোনো না কোনো জায়গায় চুপ ছিলাম,
তাহলে সেই নীরবতারও কি কোনো দায় নেই?
আর যদি থাকে—
সেই দায়ের বিচার করবে কে?
আর যদি বিচার করার মানুষটিও একদিন প্রশ্নের মুখে দাঁড়ায়—
তখন?
তখন আমরা কোথায় যাব?
কার কাছে যাব?
কোন দরজায় কড়া নাড়ব?
আর যদি শেষ পর্যন্ত এমন কোনো দরজাই না থাকে—
তাহলে আমরা কি সত্যিই নিরাপদ?
নাকি এতদিন শুধু নিরাপদ থাকার অভিনয়টাই করে এসেছি?
আর যদি কোনো একদিন সব প্রশ্নের উত্তর সত্যিই আমাদের সামনে এসে দাঁড়ায়—
আমরা কি সেই উত্তর শুনতে প্রস্তুত?
নাকি কিছু সত্য জানার চেয়ে,
অজানার ভেতর নিরাপদ থাকার ভান করাটাই আমাদের কাছে সহজ?যদি সত্য প্রকাশের আগে মানুষ ভয় পায়—
তাহলে ভয়টা কিসের?
সত্যের?
নাকি সত্য প্রকাশের পর যে পরিবর্তন আসতে পারে, তার?
আর যদি একটি সমাজে মানুষ অপরাধের চেয়ে অপরাধ প্রকাশ করাকে বেশি ভয় পেতে শুরু করে—
তাহলে সেখানে আসলে শক্তিশালী কে?
অপরাধী?
ক্ষমতা?
নাকি সেই ভয়?
আর যদি ভয়ই ধীরে ধীরে মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে যায়—
তাহলে নীরবতাকে কি আর নীরবতা বলা যায়?
নাকি সেটিও এক ধরনের সম্মতি?
একদিন যদি কোনো শিশু বড় হয়ে আমাদের জিজ্ঞেস করে—
“তোমরা যখন এসব দেখেছিলে, তখন কী করেছিলে?”
আমরা তাকে কী উত্তর দেব?
বলব—
“আমরা জানতাম না”?
যদি জানতাম?
বলব—
“আমরা পারিনি”?
কেন পারিনি?
বলব—
“আমরা ভয় পেয়েছিলাম”?
তাহলে সেই ভয় তৈরি করেছিল কে?
আর যদি আমরা সবাই একটু একটু করে ভয় পেয়ে চুপ করে থাকি—
তাহলে সেই নীরবতার ভেতর দিয়ে যে অন্যায় বড় হয়ে উঠল,
তার দায় কি শুধু অন্যায়কারীর?
নাকি ইতিহাস কোনো একদিন আমাদের কাছেও এসে জানতে চাইবে—
“তুমি যখন প্রশ্ন করার সুযোগ পেয়েছিলে, তখন চুপ ছিলে কেন?”
হয়তো সেদিন আমাদের হাতে কোনো উত্তর থাকবে না।
শুধু থাকবে কিছু পুরোনো প্রশ্ন।
কিছু অসমাপ্ত বিচার।
কিছু বন্ধ দরজা।
কিছু মানুষের নীরব মুখ।
আর একটি অস্বস্তিকর সত্য—
নিরাপত্তা হারানোর দিনটি হয়তো সেই দিন ছিল না, যেদিন রাস্তায় অপরাধ ঘটেছিল।
হয়তো তারও আগে—
যেদিন আমরা অন্যায়ের খবর শুনে বলেছিলাম,
“এটা আমার সঙ্গে তো ঘটেনি।”
তাহলে শেষ প্রশ্নটি কি নিরাপত্তা কোথায়—সেটি নয়?
শেষ প্রশ্নটি কি আরও ভয়ংকর—
যেদিন অন্যায় আমার দরজায় কড়া নাড়বে, তার আগে আমি কি এমন একটি সমাজ গড়ে তুলেছি, যে সমাজ আমার দরজার সামনে দাঁড়াবে?
নাকি সেদিন দরজার ওপাশে আমি একাই থাকব?
আর যদি একাই থাকি—
তাহলে এতদিন যাকে আমরা “সমাজ” বলে এসেছি,
সেটি আসলে কোথায় ছিল?
4 Comments-
Israt Jahan Iqra, আপনার এই লেখাটি পড়ার পর কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকতে বাধ্য হলাম, কারণ প্রতিটি শব্দে আমাদের চারপাশের সেই চরম অনিশ্চয়তার ছবিটা খুব স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। আমাদের প্রতিনিয়ত এই যে ‘নিরাপদ’ থাকার মিথ্যে অভিনয় করে বেঁচে থাকা—সেটির যে কতটা অসহায় পরিণতি হতে পারে, তা আপনি খুব চমৎকার আর গভীর উপলব্ধির জায়গা থেকে তুলে ধরেছেন। সত্যি বলতে, উন্নয়ন বা আধুনিকতার এসব হিসাব-নিকাশ তখন অর্থহীন হয়ে পড়ে যখন সাধারণ একজন মানুষের জীবনের ন্যূনতম নিশ্চয়তাটুকুই কেবল খাতা-কলমের পাতায় আটকে থাকে। আপনার প্রতিটি প্রশ্নই আয়নার মতো—যা শুধু রাষ্ট্র বা সমাজের দিকেই নয়, বরং আমাদের নিজেদের নীরবতার দিকেও আঙুল তোলে। খুব ভাবনার খোরাক জোগালেন আপনি।
-
আপনার এই সুচিন্তিত ও গভীর পর্যবেক্ষণমূলক লেখাটি আমাদের সমাজের প্রতিটি স্তরের নিরাপত্তাহীনতার বাস্তবতাকে খুব সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছে, যা পাঠক হিসেবে আমাকে বারবার নিজের দায়িত্ব ও সমাজের প্রতি প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। আপনি যেভাবে অপরাধের পেছনের অদৃশ্য কাঠামো এবং বিচারব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয় এবং অত্যন্ত জরুরি একটি আলাপ। আপনার এই লেখনী শৈলী যেন ভবিষ্যতে আরও মানুষের মনে সচেতনতার আলো জ্বালিয়ে দেয়, সেই প্রত্যাশা রইল।
Friends
Md Najmul
@mdnajmul
Hafizur Rahman shakil
@shakilahamed72gmail-com
k helal
@khelal
Soul Mate
@soulmate
জাকির শামসুদ্দীন
@zakirshamsuddinzakir
তানজিদা তানি
@tanjidatani
আয্যাহ্ নূর
@azyahnoor
shahin
@shahin1
Aziz Helali
@azizhelali

এটা আমার নিজস্ব মতামত যা এতদিন চেপে রেখেছিলাম ।আমি তেমন কিছুই জানিনা বুঝিযোনা। আমি এইচএসসি ২৭ ব্যাচ এর স্টুডেন্ট মাত্র,তবে আমার মতে এই প্রশ্নগুলো প্রতিটি মানুষের ।