-
আমার ভালোবাসা তবে সার্ভার ডাউন”
নাজনীন শামীম
চট্টগ্রাম থেকে
২৮শে সেপ্টেম্বর ২০২৬ইংমের নাম বাঁশঝুড়ি। আর সেই গ্রামের সবচেয়ে বড় ‘লেখক’ এবং ‘গবেষক’ হলেন আমাদের কলিমুদ্দিন ভাই। সমস্যা হলো, কলিমুদ্দিন ভাই গল্প-উপন্যাস যত না লেখেন, তার চেয়ে বেশি লেখেন ‘তুলট লেখকমঞ্চের’ বার্ষিক সাহিত্য প্রতিযোগিতার নিয়মকানুন।
এবারের প্রতিযোগিতার থিম ছিল: “ডিজিটাল যুগে প্রাচীন প্রেম”।
প্রতিযোগিতার শেষ দিন বিকাল ৪টা। বিচারক হিসেবে বসে আছেন গ্রামের হাইস্কুলের অবসরপ্রাপ্ত হেডস্যার আর গ্রামের একমাত্র এম.এ পাশ করা জয়নাল আবেদীন।
ঠিক ৩টা ৫৯ মিনিটে হাাঁপাতে হাাঁপাতে মঞ্চে এসে হাজির হলেন পল্টু। তার হাতে বিশালাকার এক বান্ডিল খাতা, যেটা লাল ফিতায় শক্ত করে বাঁধা।
কলিমুদ্দিন ভাই চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে বললেন, “পল্টু, তোমার গল্পের নাম কী? আর এত মোটা খাতা কেন?”
পল্টু বুক ফুলিয়ে বলল, “ভাই, গল্পের নাম ‘আমার ভালোবাসা এখন সার্ভার ডাউন’। খাতা মোটা কারণ গল্পটা অত্যন্ত হৃদয়বিদারক আর আধুনিক।”
হেডস্যার গলা খাকারি দিয়ে বললেন, “তা গল্পটা পইড়া শোনাও দেখি। সাহিত্যরস কতখানি আছে টের পাই।”
পল্টু খাতা খুলে পড়তে শুরু করল:
*”নায়ক মজনু গভীর রাতে জানালার ধারে বসে আছে। বাইরে টিপটিপ বৃষ্টি। মজনুর মন কাঁদছে, কারণ নায়িকা লাইলির ফেসবুক আইডি হঠাৎ ডিঅ্যাক্টিভেট হয়ে গেছে। মজনু মেসেঞ্জারে নক দেয়—’তুমি কোথায় লাইলি?’ কিন্তু পাশে ভেসে ওঠে লাল রঙের চিহ্ন: Message not delivered.
মজনু ব্যাকুল হয়ে লাইলির বাড়ির দিকে ছোটো। কিন্তু লাইলির বাবা রোমিওপ্রেমী লোক নন, তিনি অত্যন্ত প্র্যাক্টিকাল মানুষ। তিনি বাড়ির উঠানে একটা বিশালাকার ওয়াই-ফাই রাউটার বসিয়ে রেখেছেন, কিন্তু সেটার পাসওয়ার্ড বদলে দিয়েছেন।
মজনু দেয়াল টপকে ভেতরে ঢোকে। লাইলি তিনতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকুল চোখে তাকিয়ে আছে। মজনু নিচ থেকে ফিসফিস করে বলে, ‘লাইলি! পাসওয়ার্ডটা বলো! আমি ইনস্টাগ্রামে ঢুকতে পারছি না, তোমার নতুন রিলস দেখতে পাচ্ছি না!’
লাইলি কান্নাভেজা গলায় ওপর থেকে চিল চিৎকার দিয়ে বলে, ‘মজনু! পাসওয়ার্ড হলো—MajiHasina2026! কিন্তু কোনো লাভ নেই, আব্বা নেটওয়ার্কের তার কেটে দিয়েছে!'”*
গল্পের এইটুকু শুনেই বিচারক জয়নাল আবেদীন চশমা মুছে বললেন, “আরে থামো থামো! এইডা কেমন প্রাচীন প্রেম হইলো? এ তো পুরোটাই ওয়াই-ফাই আর ফেসবুকের গল্প!”
পল্টু অত্যন্ত গম্ভীর হয়ে বলল, “আহা জয়নাল ভাই, শেষটা তো শুনবেন! সাহিত্যের আসল ‘ট্যুইস্ট’ তো শেষ পাতায়!”
হেডস্যার বললেন, “আচ্ছা পড়ে শেষ করো।”
পল্টু শেষ পাতা উল্টে নাটকীয় গলায় পড়তে লাগল:
*”মজনু যখন বুঝল ওয়াই-ফাই আর কাজ করবে না, তখন সে পকেট থেকে বের করল একটা আসল তুলট কাগজ আর বাঁশের কঞ্চি। রক্তের বদলে লাল কালির ডটপেন ভাঙা কালি দিয়ে সে লিখল—’প্রিয়তমা লাইলি, যদি নেট না থাকে, তবে এই চিঠিটাই তোমার ইমেইল।’
মজনু চিঠিটা একটা কবুতরের পায়ে বাঁধতে গেল। কিন্তু কবুতরটা ডানা ঝাপটে উাল—কারণ কবুতরটা ছিল আসলে লাইলির বাবার পোষা ড্রোন ক্যামেরা! ড্রোনটা মজনুর মাথার ওপর ঘুরতে ঘুরতে যান্ত্রিক গলায় বলে উঠল—’আনঅথরাইজড পার্সন ডিটেক্টেড! অ্যালার্ম অন!'”*
পুরো তুলট লেখকমঞ্চে তখন চরম নীরবতা।
কলিমুদ্দিন ভাই চোখ বড় বড় করে বললেন, “পল্টু… কবুতর ড্রোন হয়ে গেল? আর তুমি এইটারে সাহিত্য বলছ?”
পল্টু খাতা বন্ধ করে বিজয়ের হাসিতে বলল, “ভাই, আধুনিক যুগে প্রেম করতে গিয়া ডিজিটাল ট্র্যাপে পড়া—এর চেয়ে হাসির আর ট্র্যাজিক গল্প আর কী হইতে পারে? আর সবচেয়ে বড় কথা, গল্পটা আমি নিজে লেখি নাই!”
হেডস্যার অবাক হয়ে বললেন, “তুমি লেখ নাই মানে? তো কে লিখছে?”
পল্টু মাথা চুলকে বলল, “ঐ যে জয়নাল ভাইয়ের ওয়াই-ফাই চুরি কইরা এআই (AI) দিয়া লেখাইছি! আমি খালি প্রিন্ট কইরা লাল ফিতা দিয়া বাঁধছি!”
এক মুহূর্তের নীরবতা… তারপর পুরো তুলট লেখকমঞ্চে হাসির রোল উঠল। হেডস্যার হাসতে হাসতে টেবিল চাপড়ে বললেন, “সবচেয়ে বড় হাসির গল্প তো গল্পের ভেতরে না, গল্প জমা দেওয়ার পদ্ধতিতেই হয়ে গেছে!”
শেষ পর্যন্ত সেবার তুলট লেখকমঞ্চের সেরা পুরস্কারটা পল্টুই পেয়েছিল—তবে গল্পের জন্য নয়, “সেরা ওয়াই-ফাই চোর ও উদ্ভাবনী প্রযুক্তি ব্যবহারকারী” বিভাগে!2 Comments
Friends
Zahidul Jamy
@zahidul
মোঃ বায়েজীদ
@bayejid
ঈশিতা ঈরু
@eshitabiswaseru15
Shojan Maria Shoche
@shojanmaria
সিরাজুল ইসলাম
@sherajulislam
Santo Mon
@santomon
Ariba Mehzabin Yeana
@aribamehzabin
Md. Jahangir Alam
@md-jahangiralam
Nusrat jahan Sadia
@nusratjahansadia
নাজনীন শামীম, আপনার লেখায় প্রযুক্তির আধুনিকতার সাথে গ্রামের সহজ-সরল আবহের এমন মজাদার সংমিশ্রণ বেশ উপভোগ্য ছিল, বিশেষ করে ‘ড্রোনটা মজনুর মাথার ওপর ঘুরতে ঘুরতে যান্ত্রিক গলায় বলে উঠল—’আনঅথরাইজড পার্সন ডিটেক্টেড! অ্যালার্ম অন!”—এই অংশটি পড়ার সময় খুব হাসি পেয়েছে এবং আপনি চাইলে প্রযুক্তির সাথে অনুভূতির দ্বন্দ্ব নিয়ে আরও বড় পরিসরে কাজ করে দেখতে পারেন; আপনি যেভাবে রসবোধের মাধ্যমে আমাদের আনন্দ দিয়েছেন, তা সত্যিই প্রশংসার যোগ্য।