Profile Photo

কবি ইমদাদ শাহ্Offline

  • d7d9622a148864d078eb915a7458eb8b
  • রাত পরীর রূপকথা -এক পতিতা মেয়ের গীতিকথা
    কবি ইমদাদ শাহ্

    কাজল কালো তার চোখের তারা
    রূপ বাজারে ভাঙা মন বেঁচে বেচারি
    জগতের লোকে ডাকে তারে রাতের রানী

    … রাতপরী…

    ওরে ও ধবলি মেয়ে কাজল-কালো চোখ
    সোনার বরণ অঙ্গ তোর মনে কী ভীষণ রোগ
    উড়তে গিয়ে ডানা দুখান হারিয়েছিস তো কবে
    কে রেখেছে খোঁজটি তোর বল এই পাপিষ্ঠের ভবে

    মুখেতে মাখিয়া সস্তার রঙ ঠোঁটেতে রাঙায় সে খুন
    ভিতরে তার জ্বলিতেছে ধিকিধিকি নিভৃত চিতার আগুন
    কার লাগি কাঁদে যে পরাণ কার স্মরণেতে বুক
    নকল হাসির চাদরে ঢেকে রাখে সে চেনা মুখ

    সমাজ ওদের ঘৃণা ছুঁড়ে দেয় পতিতা বলে ডাকে
    নয়ন-কাজলে ঢাকিয়া সে রূপকথা ছবিখান আঁকে
    রঙিন শাড়ি ও সস্তা পাউডার ওষ্ঠ রাঙানো লাল
    ক্ষতবিক্ষত বুকের ওপরে বিছানো অভিনয় জাল

    কেউ তো জানে না কোন সে গাঁয়ের মায়াবতী মেয়ে তুই
    কোন ধানের শীষেতে খেলিত সোনার রোদসে তনু খানি
    নদীর কূলের ভাঙনে যেমন ঘরখানি ভেসে যায়
    তেমনি করিয়া ভাগ্যের ফেরে ছিটকে পড়েছ এ শহরে বুকে হায়

    উদাস চোখেতে মনে পড়ে তার মনে পড়ে কাশবিল
    প্রেমিকের হাতের ফুলের বাস আর আকাশের গাঙচিল
    সেই কথা মনে চাপিয়া রাখিয়া হাসে সে কৃত্রিম হাসি
    নকল মায়ায় জড়িয়ে ধরে পরপুরুষেরা আসি

    শহর-নদীর ওপার গাঁয়ে যেখানে রাত নামে
    সোনার খাঁচায় বন্দী পাখি বিকায় সস্তা দামে
    চাঁদের আলোয় মাখামাখি ও রূপ-মহলের ঘরে
    কেউ হয়না মনের মানুষ সবাই খেলা করে

    বুকের ভেতর জমানো মেঘ চোখে শ্রাবণ ধারা
    সমাজ যাদের নাম দিয়েছে লিপস্টিক-বেহায়া মরা
    কারো ঘরেতে বুড়ো বাপ আর কাহারো ছোট ভাই
    ওদের মুখের অন্ন জোগাতে নিজের বলি দিত তাই
    কলঙ্কিনী নামখানি তার কপালে দিল এঁকে
    ভদ্রলোকের মুখোশগুলো যায় যে রাতে ঢেকে

    পাষাণ নগরে শরীর বেচিয়া জোগায় ওদের পেটের ভাত
    তার চোখের জলের খবর রাখে শুধু এ অন্ধ কালো রাত
    বাবুসোনারা আসে যে গো কত রূপের নেশায় মাতি
    ভোরবেলা তারা চেনে না তোমারে তুমি শুধু এক কালো রাতি

    বাবুটি আসিয়া টাকা ছুঁড়ে দেয় খোঁজে সে ক্ষণিক সুখ
    কেউ তো দেখেনা রূপার ওপিঠে কতটা পুড়েছে বুক
    সোনার খাঁচায় বন্দি ময়না ডানা ঝাপটায় আর মরে
    নিশুতি রাতের কান্না তাহার কেউ শুনে না ঘরে

    দুনিয়ার লোকে পাপী বলে তারে করে কত ধিক্কার
    কেউ তো দেখে না বুক ফেটে যাওয়া নীরব হাহাকার
    তুমি নও পরী, তুমিও মানুষ মায়ের কোলটি জুড়ি—
    আঁধারে কাঁদিয়া প্রভাতে হাসিয়া মেশে মন মাধুরী

    হায়রে সমাজ হায়রে মানুষ জেনো তোমরাই দোষী
    ওদেরকে তুমি পতিতা বলিয়া নিজে দেখাও কি ভালোমানুষী
    ওরাও তো কারো ভগিনী-কন্যা ওরাও তো মানুষেরই জাত
    ওদের অশ্রু মুছাইয়া দিতে বাড়াও না দু হাত

    সোনার বরণ অঙ্গ তার পরনে সাটিন শাড়ি
    বুকের ভেতর লুকায়ে রেখেছে ভালোবাসার এক বাড়ি
    প্রেমিকের বাঁশির সুরে যে কুমারী হেঁটেছে মাঠে
    কপাল-দোষে আজ সে বিকায় শহরের হাট-ঘাটে

    ভোরের আলোটি ফুটিলেই ওগো রূপকথা যায় টুটে
    কাজল-ধোয়া সে নয়ন দুটিতে ক্লান্ত বেদনা ফুটে

    রাতের পরীরা ঘুমায় তখন কল্পনার ফুলের বাসে
    অভাগা জননী কাঁদে দূর গাঁয়ে আকুল দীর্ঘশ্বাসে
    রূপকথা আজ ডুকরে কাঁদে চেনা মানুষের পাশে

    রাত ফুরালে রূপকথা শেষ মোছে চোখের জল
    আবার এসে জড়িয়ে ধরে কঠিন মাটির ধরাতল
    পদ্মা-মেঘনার পাড় ভাঙা সেই গাঁয়ের কুমারী মেয়ে
    আজকে কাঁদে শহরের এই অন্ধ গলির ছাদ পানে চেয়ে

    খোদার দুনিয়ায় সবার তরে আছে যে ঘরবাড়ি
    ওদের কেবল ভাঙা কপাল চোখের জলের সারি
    নগরের আলো-ঝলমল পাপিষ্ঠ জলমহল ঘরে
    বিকিয়ে দিয়েছে সোনার তনু পর-পুরুষের তরে

    লোকে কয় পতিতা মেয়ে সমাজ দেয় না ঠাঁই
    মানুষের মাঝে মানুষ সে নয় যেন সে মানুষ নাই
    সোনার চেলী আর রূপার নূপুরে সাজে সে রাতের পরী
    বুকের ভেতর জমানো কান্না মুখে হাসাটুকু ধরি
    তোমরা যারে ঘৃণা ভরে দেখ দূর দূর করে তাড়াও
    তারাই তো বোঝে এই পৃথিবীর কত শত দায়-ভারও
    সে না থাকিলে কত যে উপাধি ভাঙিত ভদ্র ঘরে
    কত যে পাপের কালিমা পড়িত নিলাজ সমাজ-স্তরে
    কত যে নারীর ইজ্জত বাঁচে তাদের আঁধার ঘরে
    কত যে পুরুষ লালসার বিষ ঢালে সে রাতের তরে

    সে যদি না বসত সেথা উজার করিয়া মন
    পুরুষের কামনার আগুনে তবে পুড়ত এ ভুবন
    কত ঘরের কুলবধূরা পাইত যে লাঞ্ছনা
    কার ঘরের শান্ত প্রদীপ সইত যে যাতনা
    আঁধার ঘরের রাতের পরী পাপের বোঝা টানে
    কত পুরুষের গোপন ক্ষত একা সে তা জানে

    সমাজের লোকে বলে তারে নষ্ট মেয়ের দল
    চোখে তাহার কেউ দেখে না লুকিয়ে থাকা জল
    ঘেন্না যারে করিস তোরা মানুষ কি সে নয়
    কত পুরুষের লালসার বিষ সে একাই বয়

    ঝড়ের দিনে যেমন করে বুক পেতে দেয় বন
    তেমন করেই আগলে রাখে কতই পাপী মন
    লম্পটেরা তাহার ঘরে শান্ত করে তন
    নইলে তারা ছিঁড়ে খেতো সতী নারীর মন

    সে যদি না দিত নিজেরে সঁপে এই সমাজের তরে
    কত শত ওই হিংস্র কামুক হানা দিত ঘরে ঘরে
    কত যে সরল অবলা মেয়ের ইজ্জত হতো শেষ
    নিজেরে বিলায়ে বাঁচায়ে রাখল কত যে নারীর বেশ

    মাটির মানুষ মাটি হয় লম্পটের পুরে আশ
    কবে আর শেষ হবে এই কান্নার ইতিহাস
    নিন্দুকেরা নিতেই জানে দেয় না কিছু তারে
    সমাজের লোকে দেখে একে অন্যের ঘাড়ে
    কেউ বলে নষ্ট লোভী মেয়ে গাঁয়ের ওপার যাহার বসত-ভিটাটি ছিল
    কোন সে লোভের মরীচিকা তারে এ কোন নরকে নিল

    সোনার চুড়ির চকমকিতে নয়ন মেলিয়া হাসি
    বুঝিল না হায় রূপার লোভেই বিকালো ঘরের দাসী
    শহরের এই যে চকচকে আলো আঁধারির ঘরে
    নিত্য নতুন রূপের পসরা সাজায় সে রূপ ভরে
    গাঁয়ের মেঠো পথ ভুলিয়াছে আজ ভুলিয়াছে নদী জল
    চোখেতে তাহার কেবলি এখন টাকার ঝলমল

    বুকের গভীরে মিছে মায়া আর মেকি হাসিটারে টানি
    দিন গুনে সে তো ক্ষণিকের তরে ছড়ায় রূপের বাণী
    গায়ের সেই সহজ সরল রূপটি গিয়াছে ধুয়ে
    লোভের আগুনে পুড়ে আজ সে তো কাঙাল গিয়াছে হয়ে

    তবুও যখন নিঝুম রাতে প্রদীপ নিভিয়া যায়
    মনের গহীনে গাঁয়ের চাতক তৃষ্ণায় কাঁদিতে চায়
    নরম মনের চষা জমিতে লোভের বুনে বীজ
    টাকার নেশায় সঁপেছে শরীর হয়েছে সস্তা চিজ
    পয়সার লোভে বিকালো যে দেহ মন তো বিকায় নাই
    নষ্ট মেয়ের কান্না শুনিতে কেহ নাই রে এ ঠাঁই
    লোভের অনলে পুড়িল রে রূপ পুড়িল না হিয়া
    কী হবে আর এই পাপের ধনে তারে বিলিয়ে দিয়া

    3
    4 Comments
    • সমাজের কলঙ্ক নয়, সে তো নিঃশব্দে পুড়ে যাওয়া এক মানুষ যার অশ্রু আমাদের বিবেকের আয়না…..🤍🖤

    • আপনার লেখাটি পড়ে বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল, সত্যি খুব গভীর আর আবেগী একটি কবিতা। সমাজের অন্ধকার দিকের এই সত্যগুলো আপনি যেভাবে শব্দের কারুকাজে ফুটিয়ে তুলেছেন, তা আসলেই প্রশংসার দাবি রাখে। এই মানুষগুলোর জীবনের আড়ালে থাকা হাহাকার আর কষ্টের কথাগুলো আমরা প্রায়ই এড়িয়ে যাই, যা খুবই দুঃখজনক।

    • পড়তে পড়তে মনটা এক অদ্ভুত বিষাদ আর ভাবনায় ভরে উঠলো

    • মানুষের ভেতরের গভীর বেদনা ও সমাজের প্রতি আপনার এই নিরাসক্ত কিন্তু বলিষ্ঠ দৃষ্টিভঙ্গি সত্যি পাঠককে ভাবিয়ে তোলে। আপনি অন্য সদস্যদের লেখাতেও নিয়মিত ভালোবাসা ও মন্তব্য রেখে আমাদের এই আসরটিকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলবেন বলে আশা রাখি।

Skip to toolbar