Profile Photo

শ্যামল কান্তি বৈদ্যOffline

  • Shyamol
  • গল্প: চাঁদনী পসর রাত
    শ্যামলকান্তি বৈদ্য
    (এই গল্পে ভৌতিক দৃশ্যকল্প রয়েছে)
    ঘুটঘুটে অন্ধকারও নয়, চাঁদনী পসর রাত, আকাশে ঝলসনো চাঁদ, কিন্তু কেমন যেন স্বপ্ন স্বপ্ন লাগছে। গা ছমছমে একটা ভাব আছে। জনমানবশূণ্য মাটির পথ, হাঁটছিতো হাঁটছি।যেতে হবে কুশিয়ারা পাড়ের গ্রাম গালিমপুরে। মনুমুখ লঞ্চ ঘাটে আসতে আসতে সন্ধ্যা হয়ে গেলো, লঞ্চ চলে গেছে সেই বিকাল বেলা, এইদিকে এখনও ইঞ্জিন নৌকা তেমন ভাবে প্রচলন হয়নি, স্রোতের উল্টোপিঠে নৌকা চালাতে দুইজন লাগে একজন মাঝি দাড় ধরে রাখে আর আরেক জন নদীর পাড় দিয়ে গুন টেনে হেঁটে যায়। কিন্তু সন্ধ্যার পর নৌকা নিয়ে আর কেউ এপথে যেতে চায় না। আজও অনেকক্ষন চেষ্টা করে কাউকে পাওয়া গেলোনা।
    সুতরাং কি আর করা, শ্রীচরণ ভরসা করে রওয়ানা দেওয়ার আগে নদী পার হবার সময় খেয়া নৌকাতে দেখে নিলাম সহযাত্রী কাউকে পাওয়া যায় কিনা।না, দুই জন ছিলো যারা নদীর ওপারে পাশের গ্রাম সেওয়াইজুড়িতে যাবে। কনকনে শীত হালকা কুঁয়াশার চাঁদরে ঢেকে আছে চারপাশ। ভালই লাগছিলো প্রথমে, গায়ের জ্যাকেট আর উলের মাংকি টুপিতে এক আরামদায়ক উষ্ণতার অনুভূতি হেঁটে যাওয়ার কষ্টটাকে আর কষ্ট মনে হচ্ছিলো না।কিন্তু কিছুদূর যেতেই কুঁয়াশা ঘন হতে থাকলো আর সময়ের সাথে সাথে মনের জোর আর সাহস কমতে শুরু করল।
    মনে হতে লাগলো প্রতিবেশী মহিম দাদুর বলা অনেক গা ছমছমে গল্প।দাদু মারা গেছেন অনেক বছর। ভরা অমাবশ্যায় ঝড়বৃষ্টির রাতে দাদু ঠেলা জাল নিয়ে মাছ ধরতে গেলে নিশায় পেয়েছিলো। ঘুটঘুটে অন্ধকারে হারিক্যানের আলোয় বিলে মাছ ধরতে ধরতে পথ হারিয়ে ফেলেন। সারা রাত এক জায়গায় ঘুরপাক খেতে খেতে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলেন। সকালে আরেক মাছ শিকারী অচেতন অবস্থায় দেখতে পেয়ে বাড়ীতে খবর দিলে লোকজন গিয়ে মহিম দাদুকে নিয়ে আসে। সেই যে অসুস্থ হয়েছিলেন আর সুস্থ হননি। বেশ কিছুদিন অজানা রোগে ভোগে পরপারে পাড়ি জমালেন।
    ছোটবেলায় রাতে পড়াশোনা শেষ করে দাদুদের উঠানে যেতাম যেখানে দাদু আরও দু’একজন সমবয়সীকে নিয়ে পাটি বিছিয়ে বসতেন আর হুকোতে তামাক খেতে খেতে মজার মজার গল্প বলতেন। প্রায় সব গল্পই ছিলো রহস্যে ভরপুর।দুচার লাইন বলার পর যখন একটু থেমে হুকোতে গুড়গুড় শব্দে টান দিতেন তখন মনে হতো ইস্ দাদু এখনই হুকোতে টান না দিলেই পারতেন, বুড়ো দাদুরা কেন যে এসব হুকো টুকো টানেন বুঝিনা। যখন আরও ছোট ছিলাম একদিন শুনশান নিস্তব্ধ দুপুর বেলায় ওই দাদু আমাকে তাঁর হুকোতে তামাক সাজিয়ে আনতে বলেছিলেন। তুষের আইল্যাতে টিকিয়া রেখে আগুন ধরিয়ে কল্কিতে সাজিয়ে কৌতুহল বশতঃ দিলাম একটা টান!কি বলবো এমন কাশি শুরু হলো যে আর একটু হলে আমার কাশী বাস হয়ে যেত। সেই থেকে ধুমপানে আমার ভীষণ এলার্জি । মনে হলেই কাশি চলে আসে। এদিকে আমার বাকি কথা গুলো শুনার তর সইছেনা। তার পর আবার শুরু করতেন তার রহস্যে ভরপুর গল্প!
    বলতেন, রাতে মাছ ধরতে গেলে মক্কলে বা নিশায় পাওয়ার গল্প, আমাদের বাড়ীর পূর্ব দিকে কালাছড়া পাহাড়ে জ্বালানী কাঠ বা লাকড়ী আনতে গেলে গহীন জঙ্গলে হারিয়ে যাওয়া কিংবা কুকুর ,হরিণ কিংবা হিংস্র পশুর রূপে ভূত প্রেত অশরীরী আত্মা আর পরীদের দেখা পাওয়ার গল্প।গায়ে কাঁটা দেওয়া লোম খাড়া হওয়া সে সব গল্প শুনে রাতে ঘুমাতে পারতাম না। স্বপ্নের মাঝে দেখা দিতো গল্পের অশরীরী আত্মারা, ভুত প্রেত ডাকিণী যোগিণীরা। ভয় পেয়ে জেগে উঠতাম আর মাকে জড়িয়ে ধরতাম আরও শক্ত করে। তারপর অনেকক্ষন আর ঘুম লাগতো না।
    আরে যা! এই মুহুর্তে এমন আজগুবি গল্প মনে করার কি দরকার।নিজেকে সাহস যোগাতে গুনগুনিয়ে গান গাইতে শুরু করলাম –
    “সাজাইয়া গুজাইয়া দে মোরে
    সজনী তোরা-
    আতর গোলাপ চন্দন মাখাই দে..”
    নিজেকে ধমক দিয়ে বললাম গান আর খুঁজে পেলিনা! ভয় যেন আরও জাকিয়ে বসছে, পা দুটো ভারি হয়ে আসছে। চার কিলোমিটার গালিমপুর যেন চারশো কিলোমিটার হয়ে গেছে। ইস ! যদি একজন সঙ্গী পেতাম।গল্প করতে করতে যাওয়া যেত। ঠিক সেই সময় দিগন্ত ছোঁয়া মাঠের ওই পাশ থেকে কুয়াশার আলো আঁধারী কেটে কেটে এক ছায়ামুর্তিকে আপন মনে গান গাইতে গাইতে এগিয়ে আসতে দেখলাম। সেই একই গান – “সাজাইয়া গুজাইয়া দে মোরে ……..” সারা শরীর হিম হয়ে আসলো। এটা কি কাকতালীয়।
    -কিতা ভাই কই যাইতা, গালিমপুরনি ? কাশতে কাশতে সিলেটের আঞ্চলিক ভাষায় বললো লোকটা। খুড়িয়ে খুড়িয়ে হাঁটছে, গায়ে কালো রঙের চাদর জড়ানো মাথায় খয়েরী মাফলার। লোকটাকে কোন ভিন গ্রহ থেকে আসা এলিয়েনদের মতো মনে হচ্ছে। চেহারার দিকে সরাসরি তাকাতেও পারছিনা, কেমন ভয় ভয় লাগছে।
    ফ্যাসফ্যাসে কন্ঠের এমন প্রশ্ন শুনে বুকটা ধক্ করে ঊঠলো। আমি গালিমপুর যাবো লোকটা জানলো কি করে! হ্যাঁ ভাই, আপনি কোথায় যাবেন? সাহস সঞ্চয় করে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে উত্তর দিলাম।
    -আর মাইত্তইন না ভাই, এই সন্ধ্যায় খবর পাইলাম আমার এক বন্ধুরে গলায় দড়ি দেওয়া অবস্থায় গাছে ঝুলতে দেখা গেছে। রাক্ষসকান্দি গ্রাম।এতক্ষনে পুলিশ মনে হয় আইছে। শেষ দেখাটা দেইখ্যা আই” হাঁটতে হাঁটতে জানালো লোকটা।“মনে হয় কেউ মাইরা ঝুলাইয়া রাখছে।এমন ভালা মানুষটারে যে কেনে মারলো মাথাত কিছু ধরের না” একটু থেমে বললো।
    রাক্ষসকান্দি, এমন অদ্ভুত নাম শুনলেই এক অন্যরকম অনুভূতি হয়। এই গ্রামটি গালিমপুরের আগের গ্রাম।যেখানে বাঘের ভয় সেখানেই রাত হয়। মৃত্যু বিষয়টা আমাকে ছাড়ছেইনা।লোকটাকে আমার কেমন জানি রহস্যময় লাগছে, মানুষ নাকি অন্য কিছু। পাশাপাশি হাঁটবো নাকি আগে পিছে, সিদ্ধান্ত নিতে পারছি না।একটু আগেই একজন সঙ্গীর কথা ভাবছিলাম কিন্তু এখন মনে হচ্ছে একাই ভাল ছিলাম।এদিকে একটু আগেও প্রচন্ড ক্ষিদায় পেটে ছুছু ডন দিচ্ছিল কিন্তু এখন তার ছিটেফোটাও অবশিষ্ট নাই।কি কুক্ষনে যে আজ বাড়ি থেকে বের হয়েছিলাম! নিতু আমার স্ত্রী আসার আগে খেয়ে আসতে বলেছিলো। লাউ দিয়ে গজার মাছ রেঁধেছিলো।খেয়ে আসিনি। জরুরী প্রয়োজনে গালিমপুর আমার শ্বশুর বাড়ী যেতে হচ্ছে।
    কানের দু’পাশ গরম হয়ে গেছে। প্রাণপন চেষ্টা করছি সহজ হতে, পারছিনা।সিগারেট তো খাই না তবু খুব ইচ্ছে করছে একটা সিগারেট ধরাতে পারলে হয়তো ভাল লাগতো।
    -কিতা ভাইচাব, বিড়ি টিড়ি খাইননি আফনে? আমার কাছে পাতার বিড়ি আছে, ধরাউক্কা একটা, ভালা লাগবো!
    ইন্ডিয়ান পাতার বিড়ি, গাছের পাতা দিয়ে তৈরী, বিচ্ছিরি গন্ধ, মনে হলেই গা গুলিয়ে আসে।
    আশ্চর্য লোকটা বুঝলো কিভাবে আমি এটাই ভাবছিলাম? কোন অশরীরী আত্মা আমার পিছু নিলো নাকি? মনের কথা বুঝে ফেলছে! এই কনকনে শীতের মধ্যে আমার শরীর বেয়ে ঘাম ঝরছে মনে হয়। বিজ্ঞানের এই যুগে নিজে মোটামুটি শিক্ষিত একজন মানুষ হয়ে একি ভাবছি আমি!
    -না ভাই, আমি বিড়ি টিড়ি খাই না, ধন্যবাদ।
    লোকটা খুঁরিয়ে খুঁরিয়ে হাঁটে কিন্তু গতি আমার চেয়ে বেশী। আমার উপেক্ষাতে মনে হয় একটু মনক্ষুন্ন হয়েছে। আমাকে পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে গেল।
    পড়েছি উভয় সংকটে, ওই লোকটাকেও ভয় লাগছে আবার একা যেতেও ভয় করছে! কি যে করি! কোন প্রশ্নও করতে পারছিনা।
    -ভাইচাব আপনে কিতা ডরাইরানি? মাতইননাদেখি? আচ্ছা আপনার কাছে দেশলাই আছেনি , বিড়িটা ধরাইতাম আছিল। ও না লাকতো নায়, আমার ফকেটওই আছে।
    বলেই পকেটে হাত দিয়ে দেশলাই বের করে বিড়িটা ধরাবার সময় ওটার আলোতে লোকটার চেহারাটা আমার চোখে পড়লো, ক্লিনসেভ করা কিন্তু ফ্যাকাসে। বিড়িতে একটা টান দিয়েই তার ফ্যাস ফ্যাসে কন্ঠে বলতে লাগলো:
    -আমার নাম রমজান আলী, পাশের গেরাম বল্লভপুরে বাড়ী। আমার আবার তাড়াতাড়ি বাড়ী যাইতে হইবো, বউটা বাড়িত একলা, আজ কুশিয়ারা বাজার থাকি একটা গজার মাছ আর কদু আনছি আমার খুব পছন্দর ছালন রানছে আমার বউ। খাইয়া আওয়ার কথা কইছিল, কইনচাইন দেখি ই খবর হুইন্না কিতা ঘরো থাকা যায়নি? কইছি আইয়া খাইমু।
    একথা শুনে আমার মাথা ঘুরে পড়ে যাবার অবস্থা। শরীরটা একটু একটু কাঁপছে।
    আমার উত্তরের অপেক্ষা না করেই লোকটি ক্রমাগত তার ফ্যাসফ্যাসে কন্ঠে কথা বলেই যাচ্ছে। আরও দুই কিলোমিটার রাস্থা বাকী। রাস্থার দুই পাশের সারি করে লাগানো গাছের চারাগুলো এমন উঁচু, ঘন কুয়াশায় চাঁদের আলোতে মাঝে মাঝে মানুষ বলে ভ্রম হয়। মনে হয় অনেকগুলো লোক পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে। কলিজাটা কেঁপে উঠে।
    এখন আর আমার সন্দেহ রইলো না আমাকে কোন অশরীরী আত্মা পেয়ে বসেছে। প্রাণপনে উপায় খুঁজতে লাগলাম কিভাবে পালাবো। মাথা ভনভন করছে, শরীর ঘামে ভিজে গেছে। আর কিলোমিটার খানেক হাঁটতে হবে। না আর হাঁটা নয়, বাঁচতে হলে দৌড় দিতে হবে। মনে পড়লো স্কুল জিবনে একশো মিটার দুইশ মিটার দৌড়ে নিয়মিত অংশ নিতাম। পুরষ্কার ও পেতাম। এখন ও নিয়মিত ব্যায়াম ট্যায়াম করি।শরীরটা দূর্বল নয় মোটেই।
    দৌড় দিলাম প্রাণপনে। না, পা এগোচ্ছে না। কে যেন পায়ে দুটো পাথর বেঁধে দিয়েছে।তার পরও দৌড়াচ্ছিতো দৌড়াচ্ছি!
    বেশ কিছু দূর যাওয়ার পর অনেক মানুষের জটলা দেখে সাহস হলো। পেট্রম্যাক্সের আলোয় চারদিক আলোকিত। হাঁপাতে হাপাতে থামলাম। কিন্তু একি! বিস্ময় বিস্ফোরিত চোখে দেখলাম পুলিশ যে লোকটিকে গলায় ফাঁস দেওয়া ঝুলন্ত অবস্থা থেকে নীচে নামাচ্ছে সে আর কেউ নয় আমার পথের সাথী সেই লোকটা।
    লোকজন কানাঘুষা করছে, বল্লভপুরের রমজান আলী এখানে এসে আত্মহত্যা করলো কেন! বড় ভালো লোক ছিলো। দূনিয়াটা ঘুরে উঠলো আমি এবার জ্ঞান হারিয়ে পড়ে গেলাম মাটিতে।
    তিনদিন পর নিজেকে আবিষ্কার করলাম মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালে।শুনলাম তিনদিন পূর্বে সকাল বেলায় আমার ঘরের মেঝেতে
    আমাকে অচেতন অবস্থায় পাওয়া গেছে। তাড়াতাড়ি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়্। এখন আমার অবস্থা বেশ ভালো।হাসপাতাল থেকে ফ্রিতে দেওয়া দুধ ডিম খেয়েছি। শ্যালক আপেল আঙুর নিয়ে এসেছে। তা-ও একটু খেয়েছি। শ্বশুর বাড়ী গালিমপুর হতে শ্যালক এসেছে আমাকে দেখতে।
    ডাক্তার বারণ করলেও আমার অত্যন্ত প্রিয় শ্যালক আমার সাথে গল্প করেই যাচ্ছে।কথায় কথায় এক সময় বললো তাদের গ্রামের পাশে পরশুদিন রমজান আলী নামে এক লোককে রাস্থার পাশে একটি বরুন গাছের ডালে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া গেছে, আত্মহত্যা করেছে নাকি হত্যাকান্ড বুঝা যাচ্ছে না। অজাতশত্রু রমজান আলী বড় ভালো লোক ছিলো। একথা শুনে আবার জ্ঞান হারানোর অবস্থা আমার ? দূনিয়াটা অন্ধকার হয়ে আসছে। শরীরটা কাঁপতে শুরু করলো।
    শ্যালক আমার অবস্থা দেখে ভয় পেয়ে কান্না করতে করতে ডাক্তারকে ডাকতে গেলো!
    সমাপ্ত।

    11
    5 Comments
Skip to toolbar