Profile Photo

রবিউল আলম মাজেদOffline

  • majed1997
  • Profile picture of রবিউল আলম মাজেদ

    রবিউল আলম মাজেদ

    • 3 hours, 40 minutes ago

    # কেন আমার ছদ্মনাম ‘অপরাধী মাজেদ ‘

    *— নিজের কাছে নিজের জবানবন্দি*

    অনেকেই আমার কাছে জানতে চান, আমি কেন আমার নামের পাশে ‘অপরাধী’ শব্দটি ব্যবহার করি। নামের সঙ্গে এমন একটি শব্দ জুড়ে দেওয়ার কারণ কী? আমি কি সত্যিই কোনো অপরাধ করেছি, নাকি এর আড়ালে লুকিয়ে আছে অন্য কোনো গল্প?

    আজ সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে চাই।

    আমি জানি না, আমার এই ব্যাখ্যা পাঠকের কাছে কতটা গ্রহণযোগ্য হবে। তবে এটুকু জানি, এই নামের সঙ্গে আমার জীবনের উপলব্ধি, আমার সীমাবদ্ধতা, আমার ব্যর্থতা, আমার অনুশোচনা এবং আমার একান্ত ব্যক্তিগত অনুভূতিগুলো গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।

    আমি প্রায়ই নিজের সীমাবদ্ধতা নিয়ে ভাবি। নিজের প্রতি অবহেলা, পরিবারের প্রতি দায়িত্ব পালনে অপূর্ণতা, ভালোবাসার মানুষের প্রতি যত্ন ও অনুভূতি প্রকাশের ঘাটতি, কর্মক্ষেত্রে নিজের দায়িত্ব পালনের সীমাবদ্ধতা—সবকিছুই আমাকে ভাবায়, পীড়া দেয়। সমাজের অসংগতি, বৈষম্য ও অনিয়ম দেখেও যখন প্রত্যাশিত প্রতিবাদ করতে পারি না, কিংবা কোনো সমস্যার সমাধানে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হই, তখন সেই ব্যর্থতার ভারও আমাকে বহন করতে হয়।

    একজন নাগরিক হিসেবে রাষ্ট্রের প্রতি আমার দায়িত্ব, একজন মানুষ হিসেবে সমাজের প্রতি আমার দায়, একজন পরিবারের সদস্য হিসেবে আমার কর্তব্য, ভালোবাসার মানুষের প্রতি আমার অনুভূতি ও দায়বদ্ধতা—এমনকি সৃষ্টিকর্তার দেওয়া নিয়ামত ভোগ করেও তাঁর প্রতি আমার কর্তব্য যথাযথভাবে পালন করতে না পারার উপলব্ধি আমাকে নিজের কাছেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।

    আমি যখন নিজের দিকে তাকাই, তখন শুধু আমার অর্জনগুলো দেখি না; দেখি আমার অপূর্ণতাগুলোও। দেখি, কত কিছু করতে চেয়েও করতে পারিনি, কত দায়িত্ব পালন করতে চেয়েও শেষ পর্যন্ত পালন করতে ব্যর্থ হয়েছি, কত মানুষের প্রাপ্যটুকু হয়তো আমার কাছ থেকে তারা পায়নি।

    বিশেষ করে যখন মনে হয়, আমার সীমাবদ্ধতার কারণে কোনো মানুষ তার প্রাপ্যটুকু পায়নি, তখন সেই উপলব্ধি আমাকে গভীরভাবে পীড়া দেয়। কারণ, সেখানে শুধু আমার ব্যর্থতা নেই; রয়েছে অন্য একজন মানুষের না-পাওয়া, তার প্রত্যাশার অপূর্ণতা, তার কষ্টের সম্ভাবনাও।

    তখন নিজেকে প্রশ্ন করি—আমি কেন পারলাম না? কেন নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী দায়িত্বশীল হয়ে উঠতে পারলাম না? কেন আমার ইচ্ছা আর বাস্তবতার মধ্যে এত ব্যবধান রয়ে গেল?

    এই প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি হতে গিয়েই আমি নিজের কাছে নিজেকে অপরাধী মনে করি।

    আমি নিজের কাছে অপরাধী। পরিবারের কাছে অপরাধী। ভালোবাসার মানুষের কাছে অপরাধী। সমাজের কাছে, কর্মক্ষেত্রে, পরিবেশের প্রতি, দেশ ও রাষ্ট্রের প্রতি নিজের দায়িত্ব পালনে অপূর্ণতার জন্য অপরাধী। ধর্ম পালনে নিজের সীমাবদ্ধতা এবং সৃষ্টিকর্তার প্রতি নিজের কর্তব্য যথাযথভাবে পালন করতে না পারার জন্যও নিজের কাছে অপরাধী।

    এই অপরাধবোধের বিচার করার জন্য আমার জীবনে আলাদা কোনো আদালত নেই। এখানে আমিই বিচারক, আমিই সাক্ষী, আমিই অভিযুক্ত। নিজের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো আমিই উত্থাপন করি, নিজের কাজের পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তি আমিই খুঁজি, আবার সেই যুক্তির বিচারও আমাকেই করতে হয়। নিজের অপরাধের স্বীকৃতি দিয়ে নিজেকেই জবাবদিহির মুখোমুখি দাঁড় করাই।

    কিন্তু এই আত্মবিচারের মধ্যেও আমার একটি আক্ষেপ রয়ে গেছে।

    আমি জানি, আমার সীমাবদ্ধতা আছে। আমার পরিস্থিতি আছে, সামর্থ্যের সীমা আছে, অসহায়ত্ব আছে। আমারও এমন কিছু বাস্তবতা আছে, যেগুলো হয়তো বাইরে থেকে দৃশ্যমান নয়। কিন্তু আমার জীবনে এমন কাউকে খুঁজে পাইনি, যিনি আমার ব্যর্থতার হিসাব করার আগে একবার জানতে চাইবেন—কেন আমি পারিনি? কী পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে আমাকে যেতে হয়েছে? আমার সামর্থ্য কতটুকু ছিল? আমি কি চেষ্টা করিনি, নাকি চেয়েও পরিস্থিতির কাছে পরাজিত হয়েছি?

    মানুষ সাধারণত তার না-পাওয়ার হিসাব করে। সে কী প্রত্যাশা করেছিল, কী পায়নি, কে তার প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি—সেই হিসাবগুলো সামনে আসে। কিন্তু যার কাছ থেকে প্রত্যাশা ছিল, তার পরিস্থিতি কী ছিল, তারও কোনো সীমাবদ্ধতা ছিল কি না, সে কেন দিতে পারেনি—সেই প্রশ্নগুলো অনেক সময় অনুচ্চারিত থেকে যায়।

    আমি বলছি না, আমার সব ব্যর্থতার জন্য অন্যরা দায়ী। আমি আমার দায় অস্বীকার করতে চাই না। আমি শুধু মনে করি, কোনো মানুষকে বিচার করতে গেলে তার ব্যর্থতার পাশাপাশি সেই ব্যর্থতার পেছনের বাস্তবতাকেও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। একজন মানুষ তার দায়িত্ব পালন করতে পারেনি—এটি যেমন সত্য হতে পারে, তেমনি সেই দায়িত্ব পালন করতে না পারার পেছনে তার সীমাবদ্ধতাও সত্য হতে পারে।

    কিন্তু আমার জীবনে নিজের সেই পরিস্থিতিগুলো ব্যাখ্যা করার সুযোগ খুব কমই হয়েছে। নিজের ভেতরের কথাগুলো বলতে গেলেও অনেক সময় মনে হয়েছে, সেখানে আমার কষ্ট বোঝার চেয়ে কষ্টের তুলনা করার প্রবণতাই বেশি। ফলে নিজের কথাগুলো নিজের ভেতরেই রেখে দিতে শিখেছি।

    একসময় ভাবতাম, পৃথিবীতে নিশ্চয়ই এমন কেউ আছেন, যিনি আমার না-বলা কথাগুলো বুঝবেন। আমার নীরবতার পেছনের কারণগুলো অনুভব করবেন। আমার ব্যর্থতার বিচার করার আগে আমার পরিস্থিতিটাও বোঝার চেষ্টা করবেন।

    কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই প্রত্যাশা থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছি। এখন আর মনে হয় না, আমার মনের সমস্ত কথা বোঝার মতো কাউকে পৃথিবীতে খুঁজে পাবই। আমার অনুভূতিগুলো শেষ পর্যন্ত আমার নিজের কাছেই ফিরে আসে।

    সব কথা তো হৃদয় বলে না; কিছু কথা বুঝে নিতে হয়। কিন্তু সেই বুঝে নেওয়ার মানুষটিকে এখনো খুঁজে পাইনি।

    তাই একসময় নিজের মনের কথাগুলো প্রকাশ করার জন্য কলমকে বেছে নিয়েছি। আমার না-বলা কথা, আমার অনুশোচনা, আমার ব্যর্থতা, আমার ক্ষোভ, আমার ভালোবাসা, আমার প্রতিবাদ—সবকিছুর জন্য কবিতার কাছে আশ্রয় নিয়েছি।

    কবিতা আমার কাছে কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আমি চাই, আমার মনের কথাগুলো কবিতা হয়ে থাকুক। জীবনের যে অনুভূতি আমাকে নাড়া দেয়, যে উপলব্ধি আমাকে প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়, যে ঘটনা আমাকে আনন্দিত কিংবা ব্যথিত করে, তা-ই আমার লেখার বিষয় হয়ে উঠতে পারে।

    সেই কবিতায় কখনো আমি সমাজের অসংগতি দেখি, কখনো মানুষের মুখোশ উন্মোচন করি, কখনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলি। আবার কখনো নিজের দিকেও তাকাই। নিজের সীমাবদ্ধতা, নিজের ব্যর্থতা, নিজের অপরাধবোধের মুখোমুখি দাঁড়াই।

    কারণ, সমাজের অন্যায় নিয়ে প্রশ্ন তোলার আগে নিজের কাছেও আমার প্রশ্ন আছে। অন্যের দায় নিয়ে কথা বলার পাশাপাশি নিজের দায়ের হিসাবও আমাকে রাখতে হয়।

    আর এই সবকিছুর মধ্য দিয়েই আমার নামের পাশে এসে বসেছে একটি শব্দ—‘অপরাধী’।

    এই নামের অর্থ শুধু আমি অপরাধ করেছি, এতটুকু নয়। এটি আমার নিজের কাছে নিজের জবাবদিহির একটি পরিচয়। আমার অপূর্ণতার স্বীকৃতি, আমার দায়িত্ববোধের যন্ত্রণা, নিজের প্রত্যাশিত মানুষটি হয়ে উঠতে না পারার আক্ষেপ এবং নিজের বিবেকের সামনে দাঁড়ানোর একটি প্রতীক।

    আমি জানি না, আমার কবিতাগুলো কোনো দিন আমার এই আত্মবিচারের সাক্ষী হয়ে থাকবে কি না। জানি না, কোনো পাঠক আমার লেখার ভেতর দিয়ে আমার না-বলা কথাগুলো কতটুকু বুঝতে পারবেন। তবে আমি বিশ্বাস করি, আমার প্রতিটি অনুভূতি, আমার প্রতিটি কথা, আমার প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত সবকিছুই সৃষ্টিকর্তার অজানা নয়।

    তিনি আমার সীমাবদ্ধতা জানেন, আমার সামর্থ্য জানেন, আমার চেষ্টা ও ব্যর্থতা জানেন। আমি তাঁর কাছে আশাবাদী—তিনি সবকিছু দেখেন, বোঝেন এবং তাঁর প্রজ্ঞা অনুযায়ী সবকিছুর সমাধান করবেন।

    আমি আমার অপরাধবোধকে অস্বীকার করতে চাই না। নিজের দায়িত্ব থেকে পালিয়ে যেতে চাই না। কিন্তু আমার এই নামের পেছনে যে মানুষটি রয়েছে, তার অনুভূতি, তার সীমাবদ্ধতা, তার না-পারা এবং তার না-বলা কথাগুলোও আমার কাছে সত্য।

    আমি সেই মানুষটিকেই আমার কবিতায় ধরে রাখতে চাই।

    তাই আমার নামের পাশে ‘অপরাধী’ শব্দটি ব্যবহার করি।

    এটি আমার কাছে শুধু একটি ছদ্মনাম নয়; এটি নিজের কাছে নিজের জবানবন্দি, নিজের বিবেকের সামনে দাঁড়ানোর একটি পরিচয় এবং আমার অন্তর্গত কথোপকথনের প্রতিফলন।

    **আমি অপরাধী—কারণ আমি নিজের দায়িত্বের হিসাব এড়িয়ে যেতে চাই না। আমি অপরাধী—কারণ আমার অপূর্ণতাগুলো আমাকে পীড়া দেয়। আর আমি অপরাধী—কারণ আমার ভেতরের মানুষটি এখনো নিজের কাছে জবাবদিহি করতে চায়।**

    এই পরিচয়ের বিচার আমি পাঠকের ওপর ছেড়ে দিলাম।

    — *অপরাধী মাজেদ*

Friends

Profile Photo
Tanjina Talukder
@tanjinatalukder
Profile Photo
Mst. Hena Parvin
@mst-henaparvin
Profile Photo
MA Rashid
@marashid
Profile Photo
Shamim Hossain
@shamimhossain
Profile Photo
Sumaiya Khatun
@sumaiyakhatun
Profile Photo
Rokeya Khanam
@rokeyakhanam
Profile Photo
Mirza A.parvez
@mirzaa-parvez
Profile Photo
st. martin
@st-martin
Skip to toolbar