Profile Photo

কবি ইমদাদ শাহ্Offline

  • d7d9622a148864d078eb915a7458eb8b
  • রাতের সাফারি
    কবি ইমদাদ শাহ্

    অঘ্রানের বিমর্ষ শেষ রাত—আমি তখন একাকি নিশাচর সাফারিতে
    গ্রামে জঙ্গলে বনে নদী ও পাহাড়ে–হিজল তমাল বড়াল মৃনাল বটে
    খুব দূরে নয় –যেখানে গ্রাম ও শহর একাকারে মিশে রয়
    তার থেকে অদূরে — একা একা হাঁটছিলাম মধ্য রাতের প্রহরে

    নীলিমার নীলে জোছনা করেছিল খেলা
    আধার রাতে তারার বসিয়েছিল আলোর মেলা
    মৃদু মৃদু ফুলের বাস নিশাচর প্রাণীদের চলাফেরা

    যেন ঝোপের ভেতর থেকে কেউ আমাকে দেখছে
    অথচ আমি তাকে দেখি না
    শিরশির করে বইছিল হাওয়ার দক্ষিনা

    অন্ধকারের ভেতর জেগে ওঠে অসংখ্য চোখ রক্তের লোভে
    ঘাসের ডগায় শিশির ঝরে নক্ষত্রের মতো নীরবে
    শিয়ালের আওয়াজ ছিঁড়ে ফেলে রাতের পর্দা

    সেই বিমর্ষ চিৎকারে কেউ একজন সন্ত্রস্তর্পনে এসে বুকে জড়িয়ে ধরল
    যেন একটা কাঞ্চনজঙ্ঘা হৃদয় নিংড়ে খামচে ধরলো বুকে
    কেমন কোমল স্পর্শ যেন স্বর্গের সব সুধা সে স্পর্শসুখে
    শরীরটা একটা ঝাঁকি দিয়ে উঠল
    নিজেকে সংবরণ করে তাকে অভয় দিতে থাকলাম

    একটা শ্যামল বরন রক্ত কমল মুখ গায়ে বিয়ের শাড়ি
    সদ্যই যে পালিয়ে আসে বিয়ের আসর থেকে
    নিভৃত চিত্তে তাকালাম তার চোখে চোখ রেখে
    পৃথিবীর চাঁদ আর স্বর্গের চাঁদের মধ্যে পার্থক্য যেমন
    আমি আধো ঘোরের মধ্যে পড়ে গেলাম
    পৃথিবীর কোনো মদ্যপই তখন আর আমার মতো না
    পৃথিবীর কোনো সুখ সে সুখের মতো না
    আর সে আমার অচেনাও কেউ না
    আমি বিমর্ষ ছিলাম যার জন্যে যে মুখটির জন্য
    অঘ্রানের শেষ রাত শীতল হাওয়া বইছিল
    বিয়ের জৌলুস হাওয়ায় হাওয়ায়
    ফুটছিল সমস্ত রাতের দীপাবলি
    আর আমাদের অন্তিম আকাঙ্ক্ষা

    পেঁচা ইঁদুর চামচিকা কাঠবিড়ালী এদের হুল্লোড়
    দূরের খালপাড়ে ঢালাশিয়ারীদের টর্চের আলো
    সুপারির মৃদুবন থমকে দাঁড়িয়েছিল সারি সারি
    যেন পৃথিবীর সব সোন্দর্যের বিস্তার সে বনে
    তার মধ্যে দিয়ে আমারা হেঁটে গেলাম গোপনে
    সুপারির ফুলগুলো তারার মতো আমাদের পথে
    খসে খসে পড়তে থাকল
    সাথে চাঁদের আলো আমরা স্বর্গের পথে
    পায়ের নিচের ঝরা ফুলের কান্না আর তার কান্না
    যেন একাকার হয়ে মিশে যাচ্ছিল
    প্রতিটি পদক্ষেপে নতুন হয়ে উঠল পুরোনো স্মৃতি

    অন্ধকার নিজেই এক ধরনের দৃষ্টি
    যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপ একটা প্রশ্ন আর কৃষ্টি
    আর প্রতিটি নীরবতা একটা উত্তর
    এখানে শিকার আর শিকারীর মাঝে কোনও সীমা নেই
    শুধু একটা নিঃশ্বাসের ব্যবধান

    একটি ছায়া নদীর মতো বয়ে যায় নীরব শিকারিদের ভেতর
    আলো জ্বলে ওঠে হঠাৎ, চোখের পাতায় ঝরে পড়ে তারা
    কাঁটাগুলো জানে কীভাবে গোপন রাখতে হয় রক্তের গন্ধ
    আর আমরা জানি কীভাবে নিঃশব্দে এগিয়ে যেতে হয়
    একটি শহরের ক্লান্ত দেয়ালের পাশ দিয়ে

    পেঁচার চোখে জ্বলে থাকে প্রাচীন এক অন্ধকার
    যেন কোনও মৃত নক্ষত্রের শেষ বার্তা
    গাছেরা দাঁড়িয়ে আছে সাক্ষীর মতো
    পাতা নিচু করে কেউ যেন ফিসফিস করে
    বলে দিচ্ছে পুরনো পথের ঠিকানা
    তাকে তার পথ চিনে নিতে হবে

    সব কিছু স্বপ্নই স্বপ্নের অধিক স্বপ্ন নীলিন
    তারায় তারায় রটিয়ে দিলাম –তার খুশীর নীড়
    আলো আর ছায়ার মাঝখানে ঝুলে চাঁদের শরীর

    1
    3 Comments
    • কবি ইমদাদ শাহ্, আপনার লেখা এই রাতের সাফারি কবিতাটি পড়তে পড়তে খুব অদ্ভুত একটা ঘোরের মধ্যে চলে গেলাম। প্রকৃতির বর্ণনার সাথে মানুষের আবেগের এমন মিশ্রণ খুব একটা সচরাচর চোখে পড়ে না। রাতের নিস্তব্ধতা আর সেই রহস্যময় পরিবেশটি বেশ চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন আপনি।

    • কবি ইমদাদ শাহ্, ‘ঘাসের ডগায় শিশির ঝরে নক্ষত্রের মতো নীরবে’—আপনার এই পঙক্তিটিতে প্রকৃতির যে মায়াবী ছবি ফুটে উঠেছে, তা এক কথায় অপূর্ব। বর্ণনার সাথে অনুভূতিগুলো মিলিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে আপনি আরও কিছুটা পরিমিতিবোধের চর্চা করলে লেখাটি হয়তো পাঠককে আরও গভীরভাবে ছুঁয়ে যেতে পারত। আপনার লেখনীর এই স্নিগ্ধতা ও কল্পনার জগৎ যেন সবসময় এভাবেই পাঠকের মনে আনন্দ ছড়িয়ে দেয়।

    • নিশীথের ভয় ও জোছনার মায়া পেরিয়ে পলাতকা প্রেমিকা নিয়ে কবি এক অলৌকিক স্মৃতির বনে হারিয়ে যান…..🤍🖤

Skip to toolbar