Profile Photo

নির্ঝর চৌধুরীOffline

  • nirjhor2021
  • Profile picture of নির্ঝর চৌধুরী

    নির্ঝর চৌধুরী

    4 years, 9 months ago

    দিনগুলি মোর সন্ধ্যাতারার মত
    ★★★★★★★★★★★★★★★★

    আজকের মত সেই দিনটিও ছিল বৃষ্টিমুখর,
    যেন কোন বিরাম নেই। মাঝেমাঝে প্রকোপ কমে
    আবার পরক্ষণেই টুপটাপ, ঝমঝম, টিপটিপ…..
    রেজিস্টার ভবনে পরীক্ষার ফি সহ যাবতীয় কাগজ-পত্র
    জমা দিয়ে হেঁটে ফিরছিলাম।
    একটা পাজেরো জিপ কোত্থেকে এসে গায়ে কাদামাখা পানি
    ছিটিয়ে হাপিত্যেষ হয়ে গেল।
    নিজের আচরণে অবাক হলাম খানিকটা।
    কোনরকম গালি-গালাজ না করে একটু উদাসীন মত হয়ে গেলাম।
    দিঘীর সাথে এমনটা প্রায়ই হতো।
    বেছে বেছে ওকেই যেন শহরের সব গাড়িগুলো কাদা ছিটাতে আসতো।
    বেচারি!!! গ্রেড একটু কমে গেলেই নাকিকান্না জুড়ে দিত।
    বৃষ্টির বেগ তখন আরও বেড়েছে।
    জুনায়েদের চায়ের দোকানটার শুকনো ঘুণে ধরা বেঞ্চিটায় এসে বসলাম।
    সময়গুলোর বোধ হয় বড্ড তাড়াহুড়ো।

    চা খেতে খেতে বৃষ্টি পড়ার দৃশ্যটা দেখছিলাম আর ভাবছিলাম
    কিংবা ভাবছিলাম আর দেখছিলাম।
    জুনায়েদের দোকান থেকে আমাদের ক্যাম্পাসটার সবচাইতে সুন্দর ভিউ পাওয়া যায়।
    অন্য কোনদিন এভাবে ব্যাপারটাকে অনুভব করা হয়নি।
    অন্য দিনগুলোতে অনেক কোলাহল, ঠাট্টা-তামাশা, বেঞ্চ চাপড়িয়ে গান আর দুষ্টুমিতে মুখরিত থাকতো দোকানটা।
    সেদিন তো একা বসে বসে ভাবছিলাম।
    বিরামহীন বৃষ্টি যেন দৃষ্টিটাকে ঝাপসা করে দিচ্ছিল।
    ওপাশে থাকা ভার্সিটি বিল্ডিংটা ক্রমেই অস্বচ্ছ হয়ে যেন
    দুখজাগানিয়া কোন সুর বাজাচ্ছিল আর বৃষ্টি দিচ্ছিল তাল।
    স্মৃতিবিধুর সময়গুলো শিকল বিক্রিয়ার মত,
    একটা কোনভাবে মনে পড়ে গেলে পরপর বাকিরা এসে স্থান দখল করবে।

    সোবহানটা খুব ভালো গান করতো। কোনদিন ওকে স্টেজে তুলে গান গাওয়াতে পারিনি আমরা। বলতো,
    ” স্টেজে উঠে গাইলে তো নিজেকে শিল্পী মনে হবে রে।
    তখন তো বন্ধু হয়ে তোদের গান শোনাতে পারবো না। ”
    দীনাকে খুব ভালোবাসতো সোবহান। থার্ড ইয়ার, সেকেন্ড সেমিস্টারে যখন ওর রেজাল্টটা খুব ফল করলো তখন আস্তে আস্তে দীনা ওকে এড়িয়ে যেতে লাগলো।
    ছেলেটা কেমন যেন হয়ে গেল তখন থেকে।
    দীনার সাথে বিচ্ছেদের পর ওকে আর গান গাইতে শুনিনি।
    ফাইনাল পরীক্ষার পরপরই দীনার বিয়ে। স্বামী আমেরিকার কোন একটা ইউনিভার্সিটির টিচার। আমাদের সকলকেই দীনা দাওয়াত দিবে বলেছে।

    প্রোগ্রামিং ক্লাসে আমরা সকলেই ফেসবুক খুলে বসে থাকতাম।
    সানি লাস্ট বেঞ্চে গিয়ে বসতো ঘুমুবে বলে। এটেন্ডেন্সটা দিয়েই ঘুমিয়ে পড়তো।
    ছেলেটার হাতে জাদু আছে মনে হয়। গিটার ওর হাতে গেলে যেন আপনা-আপনি বেজে উঠতো।
    আমি, সানি, তপু আর রায়হান মিলে অনেক দিন গভীর রাতে টি.এস.সি, ছবির হাট আর শাহবাগের মোড় দিয়ে হেঁটেছি। কখনও মার্ক্স, কখনও লেনিন, কখনও কনফুসিয়াস, কখনও ডেজাব্যু, কখনও পপুলার সায়েন্স, কখনও দর্শন আবার কখনও সমসাময়িক রাজনীতি ছিল আমাদের আড্ডার রসদ।
    বন্ধুদের লুকিয়ে রাখা সব প্রেমের খবর আনতো তপু।
    অবশ্য নিজেই বাজি ধরা টাকা জিতে গার্লফ্রেন্ডকে সিনেপ্লেক্সে নিয়ে যেত।
    কমন একটা রেস্টুরেন্টে গিয়ে চাওমিন খেতো। রেস্টুরেন্ট আর খাবার মেন্যু অপরিবর্তিত থাকতো,
    শুধু পরিবর্তন হতো তপুর উল্টো দিকে থাকা মানুষটা।

    জাহিদকে প্রায়ই দেখতাম ক্লাস শেষে ধানমণ্ডি লেকের দিকে যেতে। একদিন পিছু নিয়েছিলাম।
    জাহিদ লেকের পাশে সিমেন্টের একটা বেঞ্চিতে বসে একটা কালো ডায়েরিতে কী যেন লিখছিল। ওর চোখের কোণাটা ভেজা ছিল। আমার অনাবশ্যক উপস্থিতি ওকে সেদিন খুব বিব্রত করে দেয়। জাহিদের সবটা সেদিন শোনা হয়নি আমার। শুধু বলেছিল ওর মা অন্য কারও সাথে চলে গেছে।

    দ্বিতীয় বর্ষের মাঝামাঝি দিকে আমরা সিলেট গেছিলাম স্টাডি ট্যুরে। তারুণ্যপনা কী জিনিস সেদিন আমরা বুঝতে পেরেছিলাম। রাতারগুলের বৃষ্টি দেখে সেদিন আমি একটি কবিতা লিখেছিলাম। কবিতাটা যাকে দিব ভেবেছিলাম আজও তাকে দিতে পারিনি। সেভাবেই ব্যাগের পকেটে রয়ে গেছে।

    মৌমিতাকে কোনদিন দেখিনি ক্লাস মিস করতে। এতটা স্বতঃস্ফূর্ত কোন মেয়েকে আজ অবধি মনে হয়নি আমার। ডিলানের গান ওর খুব প্রিয়। ক্লাস শেষে ওকে কোনদিন আচার, কোনদিন ফুচকা কিংবা কোনদিন ভেলপুরি খাওয়ানোই লাগতো। ও কোনদিন খাওয়াতো না। খোঁচা মারলে বলতো, ” এই যে আমি খাওয়াই না এই অপ্রাপ্তিটা তোর মধ্যে থাকুক সেটা আমি চাই। বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ দিন অবধি এই আফসোসটা তোর থাকবে। ”
    আমি প্রতিদিন লেট-এ আসতাম বলে মেয়েটা আমার জন্য জায়গা রাখতো।

    পরীক্ষাটা শেষ হয়ে যাবে। ক্লাসে আর আসতে হবে না। যে যার মত ব্যস্ত হয়ে পড়বে ক্যারিয়ার নিয়ে। দীনা স্বামীর সাথে বিদেশ চলে যাবে, সোবহান সম্ভবত কোন একটা স্কুলের টিচার হবে।
    জাহিদ বড় কোন কর্পোরেট হবে আর তপু বাবার ব্যবসায় মন দিবে। সানি হয়তো কোন ভালো ব্যান্ড দলের গিটারিস্ট হয়ে যাবে। একাডেমিক ব্যাপার-স্যাপার ওর ধাতে ছিল না কোনদিন।
    শুধু ক্যাম্পাসটা থেকে যাবে। আলো-আঁধারির রহস্যময় খেলা উপভোগ করবে একা দাঁড়িয়ে থেকে। জুনায়েদের চায়ের দোকানে নতুন মুখগুলো আসবে। তাদের স্মৃতিগুলোও এখানকার বাতাসে আঁকা হয়ে যাবে। হয়তো আমারই মতন কেউ বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শেষ দিকে এসে ঠিক এইখানটাতে বসে ভাববে, ” অদ্ভুত এই স্মৃতিচারণ!! বুকটা হু হু করিয়ে ছাড়ে। যে রঙিন দিনগুলো গত হয়ে যায় জীবন থেকে সে দিনগুলো সন্ধ্যাতারার মত, হৃদয়াকাশে মন খারাপ করা কোন দিনে জ্বলজ্বল করে উঠবে। মানুষগুলো নতুন হয়, গল্পগুলো নতুন হয় না। শুধু তার চিত্রপটটা পাল্টে যায়। ”

    খেয়াল করলাম কোন ফাঁকে আমার চোখ বেয়ে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়েছে। সাথেসাথেই মুচকি হাসলাম। এত অঝরধারার বৃষ্টির মধ্যে আমার এই এক ফোঁটা জলের খবর কেউ পাবে কি?? ওদের অনেক মিস করবো। ক্যাম্পাস লাইফটা শেষ হয়ে গেলে ওদের এমনি করে তো আর কাছে পাবো না কোনদিন।
    চায়ের কাপটা রেখে উঠে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ দেখলাম দূর থেকে ছাতা মাথায় দিয়ে মৌমিতা আসছে। ওর হাতে এক ঠোঙা ঝালমুড়ি। আমার কাছে এসে ঠোঙাটা এগিয়ে দিয়ে বলল,
    ” নে মুড়ি খা। অবশ্য আজ তোকে দুপুরে লাঞ্চও করাবো। ”
    আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলাম। কী নির্বিকার ভঙ্গিতে মৌমিতা হাসছে। ওর হাসির শব্দ যেন ওর হাতে পরা কাঁচের চুড়ির শব্দের মতই অনেকটা।

    ——————

    নির্ঝর চৌধুরী
    সিদ্ধেশ্বরী রোড, ঢাকা।
    ৫ই এপ্রিল, ২০১৭ইং।

    6
    3 Comments
Skip to toolbar