-
• 4 years, 9 months agoDrako Shajib• 4 years, 11 months ago
৪.
নীল..জোনাকির..আলোয়…চোখের সামনে এক অন্যভূবন দেখতে পাচ্ছি। নিজেকে আর এই পৃথিবীর কেউ বলে মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে আমি এক নির্মল বাতাস বয়ে চলেছি পৃথিবীর পৃষ্ঠতল ঘেসে। দিগবিদিক শূন্য হয়ে হেটে চলেছি, পথ চেনার কোন প্রয়োজন নেই, এমন শর্তেই তো ঘর ছেড়েছিলাম আমরা। অবাক বিস্ময়ভরা চোখে জোনাকের দিকনির্দেশনা মেনে পথ চিনে নিয়ে চলেছি। এভাবে সম্মোহিত হয়ে সে পথে কতক্ষণ ধরে চলছি তার হিসেব কষার চেষ্টা করলাম। মাঝে মাঝে দূর পাহাড়ের ধার করা হীম শীতলতা নিয়ে একটানা বয়ে চলা বাতাস গাছের পাতাগুলোর মাঝে ঝিরিঝিরি সুর তুলছে, শরীর মন ছুয়ে যায় এ পাতার গানে। সেই সুরের তালে তালে ঝিঝি পোকারা বিরামহীন গেয়ে চলেছে। মনে হচ্ছে এক জম্পেশ বিয়ে বাড়ির সকল অনুষ্ঠান সবে শেষ হয়েছে তবে রেশ এখনো কাটেনি। মেঘ কিছুক্ষণ পরপর দুলে দুলে চলতে গিয়ে গায়েগায়ে ধাক্কা দিচ্ছিল, হয়ত তার-আমার অস্তিত্বের জানান দিচ্ছে এই নতুন ভূবনে। আদুরে গলায় মেঘ ডেকে উঠল, দাদা!
হু।
একটা পাতার বিড়ি দাও না, খাই।
এই নে।
দাদা একটা গল্প শুনবে? আমি যখন মাতৃকাননে ছিলাম সে সময়কার এক ঘটনা।
আধো আলো ছায়াতে সমস্ত বিমুগ্ধতা হঠাৎ কয়েক হাত দূরে সরে গেল মনে হল। নিস্তেজ চাদের আলোয় বড় গাছের পাতার ছায়াতে মেঘের মুখে চোখে অপূর্ব এক আলপনা দেখলাম।
মেঘ হাতড়ে বিড়িটি নিল। বেশ কিছু সময় নিয়ে আবার আদুরে স্বরে বলল,
দাদা!
বল।
শোন তবে, প্রথম সেমিস্টারে কোন রকম টেনেটুনে পাশ করেছি শুনে আনন্দে একাই বারে চলে গেলাম। গিয়ে একাই অনেকটা পাগলা পানি খেয়ে টুম্ব হয়ে পরের সেমিস্টারের বই কিনে ফিরলাম হলে। রাতে বই গুলে নিয়ে ঘাটাঘাটি করতে করতেই মনে হল পড়ালেখা নিয়ে সিরিয়াস হতে হবে। নিজেকে প্যাশনেট করে তুলতে হবে। কি ভাবে করব ভাবতে লাগলাম। আকাশ পাতাল ভাবনায় মাথার ভেতর গিজগিজ করা শুরু করল। একটা ভাবনা খুব পছন্দ হল। এখন থেকে প্রতিদিন একঘন্টা করে হাসপাতালের করিডোরে ঘুরব। রোগীদের চব্বিশ ঘণ্টার তথ্য নেবে। দাদা ম্যাচটা দাওনা। কন্ঠে আবার আদুরে টান।
টলতে টলতে কাছে এসে গায়ের সাথে আবার ধাক্কা খেল মেঘ, হাতটি বগলদাবা করে সাথেই হাটতে শুরু করল। মেঘ রীতিমতো দুলছে,পকেট হাত দিয়ে ম্যাচ খুজলাম। পেলাম না।
মেঘ ম্যাচ নেই আমার কাছে।
ওহহ! আচ্ছা দাদা। সহজভাবে মেনে নিয়ে আবার বলা শুরু করল, তারপর শোন, পরের দিন ঘুম থেকে উঠে ক্লাসে ক্লাসে চক্কর দিতেই আবার মনে পড়ে গেল গতরাতে করা পরিকল্পনা। শেষের দুইটা ক্লাস আর করলাম না। এক সিনিয়র ব্যাচের পিছু নিয়ে হাসপাতাল ভবনের এক ওয়ার্ডে রাউন্ডে গেলাম। সিনিয়র প্রফেসর গিলবার্ট স্যার একদিনে পর পর সাতটি সাকসেসফুল অপারেশন করেছে তাদেরকেই ভিসিট করবে।
মেঘের বলার ধরন এত পরিস্কার আর স্পষ্ট যে খুব দ্রুত গল্পের ওলিতে-গলিতে হাটা শুরু করলাম।
প্রথম পেশেন্ট কে স্যার নিজেই কানের কাছে গিয়ে নাম ধরে ডেকে তুললেন ঘুম থেকে। রোগী চোখ খুলতেই স্যার বলল আপনার মেয়ের চোখ ঠিক আপনার চোখের মতই সুন্দর হয়েছে। এত ঘুমালে মেয়েকে সামলাবেন কখন। উঠে বসুন, মেয়েকে দুধ দিয়েছেন একবারো? পুরো হাসপাতাল ঘুরে ঘুরে এভাবে প্রতি রোগীর সাথে অনেক সময় নিয়ে কথা বললেন গিলবার্ট স্যার, তাদের বিভিন্ন পরামর্শ দিলেন।
লেকচার দেয়ার সময় স্যারের সাথে চোখাচোখি হল আমার কয়েকবার। রাউন্ড শেষে আমাকে থাকতে বলল স্যার। আমি আর দাঁড়াইনি। এরপর থেকে প্রতিদিন ক্লাস শেষে চলে যেতাম হাসপাতালের ক্যান্টিনে। সেখানে ভরপেট খেয়ে ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে ঘুরতাম। রোগীদের চোখে একাকিত্ব খুজতাম। যার চোখে খুজে পেতাম তার সাথে গিয়ে গল্পজুড়ে দিতাম। তার সব মেডিকেল ইনফরমেশন নোট করতাম কিন্তু মনে গেথে থাকত তাদের ব্যাক্তিগত খুচরো তথ্যগুলো। সব থেকে ভাল লাগত যে সকল মায়েদের চোখে নতুন সন্তানের রূপ দেখে সেই সন্তানের জন্য ভালবাসার জল গড়িয়ে পড়ত সেই দৃশ্য দেখতে। তাদের কাছে গেলে সেই চোখের জলের ঝিলিক দেখে পৃথিবীর দামী হীরে দেখার সখ মিটে গেছে আমার। দাদা! তোমার কাছে কি ম্যাচ আছে?
কাতরকন্ঠে ওর হঠাৎ এই আকুতি শুনে কেমন যেন শিরশির করে উঠলো মনটা।
বললাম, আচ্ছা মেঘ! আমরা এই যে এক ভোরে এসেছিলাম এ গায়ে আর এক শেষ রাতে চলে যাচ্ছি, এই সময়ের মাঝে কত অচেনা পথে হেটেছি, কত অপরিচিত মানুষের সাথে পরিচিত হলাম, নিনা-পুটু, গ্রামপ্রধান ওদের আতিথেয়তা, ভালবাসা আর এই আগুন ছাড়া পাতার বিড়ি এসব মনে রাখার কোন কারন নেই তবুও কি চেষ্টা করেও খুব সহজেই আমরা ভুলতে পারব?
নাহ! দাদা, আমার তো সারা জীবন মনে থাকবে। মরে গেলেও যদি কোন কিছু মনে থাকে তবে আমার এই স্মৃতিটুকুই স্মরণে থাকবে। আর সেই দুপুরের অভিজ্ঞতাও মনে থাকতে পারে।
যেদিন তুই মাতৃকানন ছেড়ে চলে এলি।
নাহ দাদা সে অন্য এক মজার ঘটনা। এখন কোনটা আগে বলি বলোতো।
উত্তর না পেয়ে নিজেই আবার বলতে শুরু করল, আচ্ছা শোন আগে স্মরনীয় ঘটনাটি শেষ করি।
মাতৃকানন এর মত নিরিবিলি হসপিটাল আমাদের দেশের আর কোথাও আছে বলে আমার মনে হয়না।
ভবনটির প্রথম তলা থেকে শুরু করে ছাদ পর্যন্ত এর রোগীদের সেবায় নিয়জিত। আমি প্রথম সেদিন ঘুরতে ঘুরতে এর ছাদে উঠি। দেখলাম উচু লোহার রেলিং দিয়ে সম্পূর্ণ ছাদ ফ্রেম করা যেন একটি বড় খাচা। পুরো ফ্রেমে লতানো গাছের শাখে শাখে ফুটে আছে যত রঙা ফুল ঠিক তত রঙের পাখিরা উরে বেড়াচ্ছে সেখানে। বেশ কিছুক্ষণ কিচিরমিচির শব্দ কানে লাগলেও রোগীদের দিকে মনযোগ দিতেই সহনীয় হয়ে উঠল। রোগী বলা ভুল হচ্ছে তারা প্রত্যকেই অপেক্ষা করছে মা হবার শেষ কষ্টকর লড়াইয়ের জন্য। এক অল্প বয়সী পেশেন্টের চোখে চোখ পড়তেই সুন্দর করে হাসল। আমায় হাত উচিয়ে মুখে ডাক দিল। কাছে যেতেই বলল, আচ্ছা ওই ছোট লাল পাখিটার কি নাম বলতে পারবেন? ওই যে গলার পাশটা হলুদ। দেখতে পেয়েছন?
আমি তার আঙুলের দিক লক্ষ্য করে তাকালাম কিন্তু পাখিটা আর খুঁজে পেলাম না।
সে বলল, কি সুন্দর না পাখিটা। জানেন নামটা? ভাবছি আমার বাবুটারো সেই নাম রাখব।
তার কথা শুনে খুব ভালো করে আবার একবার রঙের মেলায় খুজলাম পাখিটাকে।
না, ঠিক চিনতে পারছি না।
মিথ্যে বললি!
হ্যা কথা বাড়াতেই মিথ্যে বললাম দাদা। বড় মিষ্টি কন্ঠ দাদা সে মেয়েটির। তবে তার চোখে আতঙ্ক ও ভয় নিয়েও মুখে সত্যিকারের হাসি দেখে বেশ লাগল। বললাম, তবে আমার কাছে একটি সুন্দর নাম রয়েছে এবং সে নামটিও একটি পাখির নাম। মনে মনে ঠিক করছিলাম কোন পাখিটার নাম বলা যায়।
মেয়েটি একটু আশাহত হল তবে আগ্রহ নিয়ে জানতে চাইল নামটি।
বললাম তার আগে বলুনতো আপনি ছেলের জন্য নাম খুজছেন না মেয়ের জন্য নাম খুজছেন।
তার উত্তর শুনে হতবাক হয়ে গেলাম বুঝলে দাদা। বলল, ছেলে না মেয়ে তা তো বলতে পারবো না ভাই। তবে একটা প্রকৃত মানুষের বাচ্চা জন্ম দিতে চাই, শুধু যার নামটা হবে পাখির নামে।
আমি বেশ শব্দ করেই হেসে উঠলাম। দাদা তোমার কথা বললাম তাকে, তারপর আমার পরিচয় জানালাম।
মেয়েটির চোখের ভয় চলে গেল তার পরিবর্তে ঠিক সেই লাল-হলদে পাখিটা আবার দেখতে পাবার আনন্দ দেখতে পেলাম। একটা পাখি উড়ে এসে ঠিক আমার মাথার উপরেই বসল। মেয়েটির চোখে সেই পাখিটি দেখলাম স্থির হয়ে। কালো স্বচ্ছ চোখে সেই পাখিটার রঙ স্পষ্ট বুঝতে পারছিলাম। উড়াল দিতেই সে দিকে চাইলাম তবে এবারো মিলিয়ে গেল রঙ সলীলে। এত রঙের দিকে তাকালে মনের মাঝে এক আকর্ষণ লাগে দাদা। এক মূহুর্ত সে দিকেই চেয়ে থাকতে হয় কোনভাবেই চোখ ফেরানো যায় না।
সে আবার জনতে চাইল আমার জানা সে সুন্দর পাখিটার নাম। বললাম, বাবুই।
নামটি নাকি তার খুব পছন্দ হয়েছে জানাল। বলল তার যে সন্তান হবে তার নাম সে বাবুই রাখবে।
আমি রসিকতা ভেবে আবারো হো হো করে হেসে উঠলাম।
সে আমাকে যত বোঝাতে চেষ্টা করে, আমি তত হাসতে থাকি। একপর্যায়ে বলল, সে যা বলছে তা মোটেও কোন রসিকতা না। সে সত্যি এই নামটি রাখবে। এবং সে একটি ফর্ম চায় যেখানে লেখা থাকবে প্রসবের সময় যদি তার মৃত্যু ঘটে তবে তার সন্তানকে যেনো সবাই এই নামেই ডাকে। দাদা ম্যাচটা দাও না।
আমি হাসতে হাসতে বললাম, মেঘ তোর স্মরণীয় ঘটনা বন্ধ। তোর গল্প শুনবনা আর। হাসির শব্দে জোনাকিরা বোধহয় আরো উৎসাহ পেয়ে কাছে ভিড়ছে।
দাদা! শেষ হয়নি তো। গল্প এভাবে অর্ধেক বলে থামতে পারব না পুরোটা শুনতে হবে।
আচ্ছা। তবে তার আগে তোকে আগুন ছাড়া বিড়ি কিভাবে খেতে হয় বলি শোন, মনে কর বিড়িতে আগুন আছে। করেছিস মনে? আহা আগে বিড়িটা ঠিক মত ধর।
কিভাবে ধরব?
যেভাবে ধরে তুই বিড়ি খাবি ঠিক সেভাবেই ধরবি। এখন টান দে জোরে। বিড়ির ধুয়া দিয়ে তোর ফুসফুস ভরে ফেল। হ্যা। এবার ছাড় ধোয়া। দম বন্ধ হয়ে যাবে যে। এভাবেই টানতে থাক। টানতে টানতে আগুন ধরিয়ে ফেল।
আচ্ছা বুঝেছি। তারপর কি হল শোনো। তাকে জিজ্ঞেস করলাম, সে কোন ওয়ার্ডে, কোন বেডে আছে। পরে এসে খোজ নিয়ে যাব রসিকতা করছেন নাকি সত্যি বলছে।
সে বলল, ভাই আমাকে একটু ধরে বসাও। আমার কেমন যেন লাগছে। বলতে বলতে চেপে ধরল আমার হাত।
পাশেই এক দোলনাতে তাকে বসিয়ে, এদিক-সেদিক তাকিয়ে তার বাসার লোকদের খুজতে লাগলাম। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম কয়েকবার, তার বাসার কেউ আছে কিনা, তারা কোথায়? সে মাথা ঝাকিয়ে অস্পষ্ট উত্তর দিয়ে তীব্র ব্যাথায় কাতরাতে শুরু করল। বুঝতে পারলাম তার ভেতরে থাকা জীবনটি পৃথিবীর আলো দেখার জন্য মাতৃগর্ভের অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসার অদম্য চেস্টা শুরু করেছে। ইমারজেন্সি ইমারজেন্সি বলে বার কয়েক চেচিয়ে উঠতেই একদল নার্স ছুটে আসল। মুহূর্তেই স্ট্রেচারে উঠিয়ে নিয়ে চলে গেল লেবার রুমে। রাত পর্যন্ত বসে রইলাম সেখানেই। বসে বসে হেমাটোলজির ইনভেস্টিগেশন ইন লিউকেমিয়া পড়তে পড়তে চোখ লেগে আসল। এক নার্সের সহযোগিতায় মেয়েটির খবর পেলাম। মা ও শীশু দুজনেই ভালো আছে। সে অনেকক্ষণ হল তাদের বেডে সিফট করেছে। বেড নাম্বার ও ওয়ার্ড নাম্বার তার কাছ থেকে জেনে নিয়ে হলে ফিরে এলাম। এসে লম্বা এক ঘুম দিলাম। ঘুম থেকে উঠে দেখি অনেক বাজে, সেদিন আর ক্লাস ধরতে পারলাম না। লাইব্রেরীতে গিয়ে নোট নিয়ে একবার মনে হল সেই মেয়েটির খবর নেয়া প্রয়োজন আর খুধাও লেগেছে। ততদিনে হাসপাতালের ক্যান্টিনে খাবার অভ্যেস হয়ে গেছে। সেদিন আর আগে ক্যান্টিনে গেলাম না। ওয়ার্ডের সামনে আসতেই দেখলাম মেয়েটি একদম সামনের সারীর বেডে শুয়ে আছে। তার শুকনো ঠোট বার বার চেটে ভিজিয়ে এদিক সেদিক জলের খোজ করছিল। প্রত্যেক বেডের পাশেই একটি সুইচ রয়েছে সেখানে চাপ দিলে সাথে সাথেই নার্স চলে আসার কথা। কিন্তু মেয়েটি বেল চাপল না। চোখ বুজে ফেলল। তারপর আবার চোখ মেলে ওঠার চেষ্টা করতেই আমায় দেখল। ঠিক চিনতে পারেনি বোধহয়। আমি এগিয়ে গিয়ে জল খাওয়ালাম তাকে দাদা। নিচূ স্বরে স্যারের মত করে বললাম আপনার মানুষের বাচ্চার চোখটাতো অবিকল বাবুই পাখির মত হয়েছে। তা কি নাম রাখলেন?
মেয়েটি হাসার চেষ্টা করল।
বাচ্চার ছোট বেডের ঝোলানো বোর্ডে তাকিয়ে দেখি সেখানে সত্যি সত্যি বাবুই লেখা।
শুধু বাবুই?
হ্যা, দাদা! শুধুই বাবুই। দেখে আনন্দে দিশেহারা লাগছিল। বাচ্চাটির পায়ে একটু সুরসুরী দিয়ে বাবুই বলে ডাকতে লাগলাম। ওর মায়ের কথা ভুলে গেলাম বেমালুম। যখন মনে পড়ল, আবার একটু জল তুলে দিলাম তার মুখে। বুঝতে পারলাম মেয়েটি তখনো বেশ ক্লান্ত। মা হওয়া যে আর মুখের কথা না দাদা ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে ঘুরে ততদিনে তা হাড়ে হাড়ে বুঝে গেছি।
দাদা আগুন ছাড়া এই বিড়ি আর ভালো লাগছে না টানতে। আচ্ছা দাদা তোমার কাছে কি একটু আগুন হবেনা।
তুই কি তোর পকেট দেখেছিস একবারো?
মেঘ আমার হাত ছেড়ে সব পকেট হাতড়ে নিল একবার। কিছু না পেয়ে আবার হাত জড়িয়ে ধরে বলতে শুরু করল।
দাদা মেয়েটির স্যালাইন চেক করে ওর ঔষধ, খাবার দাবার সম্পর্কে খোজ নিতে নার্স স্টেশনে গেলাম। মাতৃকাননে এসব করা বাহুল্য। কেননা এখানকার সবাই সবসময়ই রোগী সম্পর্কে এত বেশি তৎপর যে এসকল বিষয়ে প্রশ্ন করাও এক ধরনের অপরাধ। এক প্রবীন নার্স ধৈর্য সহকারে আমার সব প্রশ্নের উত্তর দিয়ে জানতে চাইল রোগী আমার কি হয়। তার নাম কি?
প্রশ্ন শুনে আমি একটু অবাক হলাম, আমার পরিচয় দিয়ে ওয়ার্ডে ফিরে আসতে দেখি বেড খালী পড়ে আছে। বাবুই তখনও ঘুমিয়ে। অনেকক্ষণ মেয়েটির জন্য অপেক্ষা করলাম। চলে যাব ভাবছিলাম এমন সময় বাবুই’র ঘুমভাঙা কান্নায় চারিদিকে এক আলোড়ন পড়ে গেল, আমার মাথার ভেতর ঝনঝন করে বেজে উঠল সে কান্না। সেদিন দুপুরের পর আর ফিরলনা মেয়েটি।মেঘের কথা শুনে হঠাৎ ঠান্ডা এক শিরশিরে অনুভূতির স্রোত মেরুদণ্ড বেয়ে উপরে উঠে গেল, নিজেকে হারিয়ে ফেললাম ঠিক যেখানে ছিলাম সেখানেই। রাতের আধার গাড় ঠেকছে চোখে, পায়ের নিচের মাটিও শক্ত হতে শুরু করেছে।
আহ্, মেঘ গল্পে তোর এই অতিরিক্ত থ্রিলার না ভরলেই নয়। চুপ করতো আর শুনতে ইচ্ছে করছে না। দে বিড়িটা দে একটু টানি।
মেঘ শেষ করতে চাইলো গল্পটা আমি বাধা দিলাম। আপন মনে আগুন ছাড়া বিড়ি টেনে মিথ্যে ধোয়া ছেড়ে বললাম আচ্ছা তুই হঠাৎ সব ছেড়ে ছুড়ে চলে এলি কেন সেই ঘটনাটা বল। সেটা শুনি।
দাদা! এ এক মজার ঘটনা। একটু থেমে দম নিয়ে নিল মেঘ। হাপিয়ে উঠেছে হাটতে হাটতে, আমিও বেশ ক্লান্তবোধ করছি। দাদা! একটু জিরিয়ে নেই।
আধার থাকতেই এই গ্রাম ছেড়ে বেড়োতে হবে আমাদের। বলতে বলতে মেঘের হাত টেনে আবার হাটার তাগিদ দিলাম, ওর ঘোলা চোখে তখনো জোনাকির আলো খেলা করছে।আমাদের তখন শেষ সেমিস্টার হবে বোধহয়। এর পরেই থিসিস, ইন্টার্নশিপ, ভাইভা এক ব্যস্ত সিডিউল। সেসময়ে আমি ক্লাস করা বাদ দিয়ে দিনরাত মাতৃকাননে পড়ে থাকি। পড়ালেখাও সেখানে করি। আমার রেজাল্টের কারনে স্যারেরা আমার খোজ লাগায়। বন্ধু তেমন ছিলনা। তবে সহপাঠীরা এসে ক্লাসের সব খবর দিয়ে যেত। এর মাঝে এক রাতে সুযোগ হয় এক অপারেশনের চাক্ষুস সাক্ষী হবার। বেশ জটিল কেস, জমজ বাচ্চা এবং একজনের শরীর অপরজনের সাথে এট্যাচ। সারাদিন ঘুমিয়ে সন্ধেবেলা চলে যাই মাতৃকাননে। যাবার আগে শরীরে মনে কোথাও উত্তেজনার কোন অস্তিত্ব পাচ্ছি না দেখে নিজেকে চাঙ্গা করতে পর পর দুকাপ চা খেলাম। তারপর শরীরে ম্যাজম্যাজ ভাব গেল না। স্ট্রং কফি নিলাম এবার দুকাপ। কফি শেষ করে সিগারেটে টান দিতেই শরীরে শিরায় শিরায় উত্তেজনার প্রবাহ বয়ে গেল। আচ্ছা দাদা কারো বাড়ি গিয়ে আগুন চাইলে কেমন হয়?
ঠিক তখনি পায়ে শিকড়ের মত কিছুর সাথে বেধে হুমড়ি খেয়ে কয়েকপাক নিচে গড়িয়ে পড়লাম। চোখে অন্ধকারের মাঝে বাহারী রঙের আলোর ঝিলিকে এক ঘোরে বিভোর হয়ে আছি, ঘুমিয়েই পড়লাম সেখানে।
যখন চোখ খুললাম দেখি চারিদিকে আলো ফুটে উঠেছে। মেঘ আমার দিকে ফিরে বসে দাত বের করে হাসছে। ওর হাসি দেখে বিরক্ত লাগছে। উঠে বসতেই মাথার পিছন দিকটার ব্যাথাটায় মনে হল রাতের টাল-মাটাল অনুভূতিটা সেখানে জমাট বেধে আছে। এছাড়া আর তেমন কোন কিছু অনুভূত হচ্ছে না।
দাদা তুমি কি এখানেই ঘুমিয়ে পড়েছিলে?
ওর প্রশ্নের মানে না খুজে ব্যাথা খুজতে শুরু করলাম। শিরা-উপশিরায় বয়ে চলা রক্তের সাথে একটি প্রশ্ন শরীরের বিভিন্ন কোষে কোষে গিয়ে জিজ্ঞেস করছে, তোমার মাঝে কি কোন ব্যাথা লুকিয়ে আছে?
সারা না পেয়ে মেঘ বলল, দাদা একটা ম্যাচ পেয়েছি। বেহায়া হাসি হেসে আবার বলল, দাদা! বিড়িটা দাও না।
উঠে দাড়াতেই শরীরে ব্যাথার একটি ঢেউ দোলা দিয়ে উঠল, হাটুতে বল পাচ্ছিনা দেখে পা ঝাড়া দিয়ে বললাম, মেঘ! রাতে বিড়ি তোর কাছে দিয়েছিলাম না?2 Comments
ধন্যবাদ বন্ধু লেখাটি শেয়ার করার জন্য। শুভেচ্ছা ও ভালবাসা নেবেন।