Profile Photo

Rana ZamanOffline

  • RanaZaman
  • Profile picture of Rana Zaman

    Rana Zaman

    4 years, 9 months ago

    ফিট-ফর-অল
    রানা জামান

    বেড়ালটা রাস্তায় বের হতেই একটা আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লো চারিদিকে। অবশ্য আতঙ্কটা মানবজাতির মধ্যে না-পশুকূলে। ফুটপাতে দুটো নেড়ি কুকুর শুয়ে ঝিমোচ্ছিলো-হুলো বেড়ালের গন্ধ নাকে লাগতেই গুটানো লেজ আরো গুটিয়ে কুই কুই করতে করতে দৌড়ে চলে গেলো পাশের গলি দিয়ে যতদূর যেতে পারে।
    বেড়ালটা সাধারণ বেড়ালের চেয়ে বেশ লম্বা, তবে বাঘডাসার চেয়ে খানিকটা ছোট। হুলোর একটু বড় হলেও এটাকে হুলো বেড়াল বলা যায়। বিস্ময়ের ব্যাপার হলো হুলো বেড়ালগুলোও ওকে ভয় পায়।
    বেড়ালটা হেটে যাচ্ছে বেশ রাজসিক চালেই। ডানে-বামে তাকাতে তাকাতে হেটে যাচ্ছে। চলায় কোনো তাড়া নেই ওর-গেলেই হলো কোনো এক সময় ভাবটা এমন। একটা মেশিনে চলা রিক্সা ওর পাশে দাঁড়াতেই ও উঠে বসলো ওতে। সিটেই বসলো হুলোটা কায়দা করে। পথচারীদের মধ্যে যারা ওকে দেখেনি কেবল ওরাই বিস্ময়ের দৃষ্টি নিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে থাকছে।
    চলতে চলতে রিক্সা এসে একটি সুপার শপের সামনে দাঁড়ালো। গলায় ঝুলানো ব্যাগ থেকে টাকা বের করে ভাড়া পরিশোধ করে হুলোটা এগিয়ে গেলো প্রবেশপথের দিকে। ও জানে সুপারশপগুলোয় পশুদের প্রবেশ নিষিদ্ধ। সে চামড়ার থলে থেকে ছোট টর্চের মতো একটা ডিভাইস বের করলো। প্যান্টের পকেট থেকে একটা ফর্দ বের করে এক দারোয়ানের হাতে দিয়ে ডিভাইসটা গলায় ঠেকিয়ে মানুষের কণ্ঠে বললো, এই পণ্যগুলো কিনে দেবেন প্লিজ!
    দারোয়ান পণ্যের ফর্দটা একবার পড়ে হুলো বেড়ালের দিকে তাকালে হুলো ব্যাগ থেকে একটি ক্রেডিট কার্ড বের করে ওর হাতে দিলো। দারোয়ান চলে গেলো ভেতরে। হুলো বেড়ালটা পাশেই একটি খামের আড়ালে বসে থাকলো। হুলোটা নিম্নস্বরে মিউ মিউ করে গুনগুনিয়ে গান গাচ্ছে।
    একজন পশু ডাক্তার যাচ্ছিলেন সুপার শপের ভেতরে। নিম্নস্বরে মিউ মিউ শব্দ শুনে দাঁড়িয়ে পড়লেন প্রবেশপথে। এদিকওদিক তাকিয়ে খামের আড়ালে হুলোটাকে দেখতে পেয়ে এগিয়ে গেলেন সেদিকে। হুলোটাকে চোখ বুজে মিউ মিউ করতে দেখে মনে মনে ভাবলেন: নিশ্চয়ই হুলো বেড়ালটা অসুস্থ! তিনি কাঁধের ব্যাগ থেকে একটা পশুর পাল্সবিট দেখার স্টেথোস্কোপ বের করে হুলোর গায়ে হাত দিতেই হুলোটা মিউ মিউ থামিয়ে চোখ বড় বড় করে তাকালো ডাক্তারের দিকে।
    ডাক্তার হুলো বেড়ালের মাথায় একবার হাত বুলিয়ে বললেন, ডোন্ট অরি! সব ঠিক হয়ে যাবে। আগে আমাকে পাল্সবিটটা চেক করতে দাও হুলো!
    কেউ হুলো বললে হুলোটার খুব রাগ হয়। ও গম্ভীর স্বরে ম্যাও ম্যাও করে উঠলে ডাক্তার ফের বললেন, রাগ করার কিছু নেই। মাটির শরীরে রোগবালাই হতেই পারে। সেজন্য ডাক্তার আছে না! আমি কুড়ি বছর যাবৎ তোমাদের ট্রিটমেন্ট করছি। আমি পথপশুদের কাছে থেকে ফি নেই না! ফৃ ট্রিটমেন্ট! তবে ঔষধ তোমাকে কিনে খেতে হবে! টাকা আছে তো সাথে? নাকি?
    বিপদ বুঝতে পেরে হুলো বেড়াল আরো জোরে ম্যাও ম্যাও করতে লাগলো। ভয়ানক স্বরে ম্যাও ম্যাও শুনে বাইরে থাকা প্রহরিরা চলে এলো এদিকে। পুরোনোরা হুলোকে চেনে; কিন্তু বলার সুযোগ পাচ্ছে না-ডাক্তার পাল্সবিট মাপার জন্য জবরদস্তি করছেন হুলো বেড়ালের সাথে। একজন প্রহরি ভেতরে গিয়ে ম্যানেজারকে বললে ম্যানেজার ছুটে এসে ডাক্তারকে টেনে দূরে সরিয়ে বললেন, কী করছেন স্যার!
    ডাক্তার স্টেথোস্কোপটা গলায় ঝুলিয়ে বললেন, বেড়ালটা অসুস্থ। তাই প্রেসক্রিপশান করার আগে ওর পাল্সবিটটা মাপতে চাচ্ছিলাম। কিন্তু কী বেড়াল রে বাবা! নিজের ভালো বুঝে না! চেঁচামেচি শুরু করে দিয়েছে!
    ম্যানেজার হুলো বেড়ালের মাথায় একবার হাত বুলিয়ে বললো, আপনি বোধ হয় এই এলাকায় নতুন এসেছেন স্যার!
    আমার এই এলাকায় নতুন আসার সাথে এই বেড়ালের ট্রিটমেন্টের সম্পর্ক কী?
    ও প্রফেসর মাসুদের বেড়াল। ওর নাম ফিট-ফর-অল। আমরা ওকে চিনি। প্রফেসর মাসুদ অসুস্থ হলে ওকে শপিং করতে পাঠান।
    কোন প্রফেসর মাসুদ?
    বাংলাদেশে প্রফেসর মাসুদ একজনই আছেন স্যার।
    ও বুঝেছি। পাগলা প্রফেসর মাসুদ। আমরা একই কলেজে ইন্টারমিডিয়েট পড়েছি।
    তখন ঐ দারোয়ানটা বাজারের ব্যাগ এনে ফিট-ফর-অল এর গলায় ঝুলিয়ে দিলে ও ডাক্তারের দিকে একবার তাকিয়ে মিউ শব্দ করে একটা রিক্সায় উঠে পড়লো। রিক্সা চলতে লাগলো। বাসার সামনে এসে রিক্সা থাকলে ও নেমে ভাড়া দিয়ে দরজার তালা খুলে নিঃশব্দে ভেতরে ঢুকলো। প্রফেসর মাসুদ তখনো ঘুমাচ্ছেন।
    ফিট-ফর-অল বাজারের ব্যাগটা ডাইনিং টেবিলে রেখে দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকালো-কাঁটায় কাঁটায় এগারোটা। প্রফেসর মাসুদের ঔষধ খাওয়ার সময় হয়ে গেছে। প্রফেসর মাসুদ নিজের চিকিৎসা নিজেই করেন। হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা। ঔষধ তৈরি করে পাশের টেবিলে রাখা আছে। একটা চা-কাপে অর্ধেক পানি ঢাললো ফিট-ফর-অল। একটা ঔষধের শিশি নিয়ে দশবার ঝাকি দিয়ে দশ ফোঁটা ঔষধ ঢেলে চা-চামচ দিয়ে নাড়লো।
    ডিভাইসটা গলায় ঠেকিয়ে বললো, অনেক ঘুমের ভান হয়েছে প্রফেসর! এখন ঔষধ সেবনের জন্য গাত্রোত্থান করো!
    সাথে সাথে প্রফেসর মাসুদ চোখ মেলে হুলোর দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসতে গিয়ে চমকালেন। দাঁড়িতে একবার হাত বুলিয়ে বললেন, তোর চোখ খানিকটা লাল দেখাচ্ছে কেনো রে ফিট? সুপারশপে কোনো সমস্যা হয়েছে?
    প্রফেসর টেবিল থেকে ঔষধের কাপটা নিয়ে এক ঢোকে ঔষধ পান করে টেবিলে রেখে দিলেন কাপটা।
    আর বলো না! এক পাগল ডাক্তার জোর করে আমার চিকিৎসা করতে চেয়েছিলো!
    নিশ্চয়ই তুই গুনগুনিয়ে গান করছিলি যা রোগীর মতো শোনায়?
    হাঁ।
    এমন হতেই পারে। কিন্তু তুই ম্যাও ম্যাও করে চিৎকার না করে ডিভাইসে কথা বললি না কেনো?
    রাগের চোটে ডিভাইসের কথা ভুলেই গিয়েছিলাম!
    এর মানে তোর রাগ বেড়ে গেছে! সেসাথে ভুলের ব্যারাম ঢুকেছে! আমাকে আবার ল্যাবে ঢুকতে হবে।
    সে পরে করো। আগে সুস্থ হয়ে নাও!
    হাঁ! আগে সুস্থ হতে হবে। একটু পরে কিছু একটা খেতে হবে। কী এনেছিস?
    সুপ খাবে।
    রান্না করতে পারবি?
    আমি চুলার ধারেকাছে নেই প্রফেসর! আগুনের আঁচে গায়ের পশম পুড়ে যায়! পশম পুড়া বেড়ালের সাথে কে মেয়ে দেবে বলো?
    তাও ঠিক। তোর জন্য এখন থেকেই মেয়ে দেখতে হবে। দুই বেড়ালের ধাক্কা কি আমি সামলাতে পারবো? কী বলিস তুই?
    তাহলে আমি ঘরজামাই চলে যাই? শ্বশুরবাড়ি পায়ের উপর পা তুলে খাবো!
    আমারও অমন প্ল্যান ছিলো! কিন্তু মনের মতো মেয়েও পেলাম না, শ্বশুরও পেলাম না! বুড়ো বয়সে এখন তোর উপর ডিপেন্ড করতে হচ্ছে! তুই আমার মতো ভুল করিস না! এখন সুপটা বানিয়ে দে!
    ফিট-ফর-অল ব্যাগ থেকে দুটো সুপের কাপ বের করে টেবিলে রাখলো। একটা কেটলিতে পানি ঢেলে বিদ্যুৎ সংযোগ দিয়ে বললো, এভাবে ঘরে বসে থাকলে কি কনে পাওয়া যাবে প্রফেসর?
    প্রফেসর মাসুদ ভ্রু নাচিয়ে বললেন, দেখা যাচ্ছে হঠাৎ তুই বিয়েপাগলা হয়ে গেছিস!
    বিয়ে যখন করতেই হবে, তখন সময় থাকতে সেরে ফেলা ভালো! আমি বুড়ো বয়সে তোমার মতো কষ্ট পেতে রাজি না!
    কী করতে বলিস তুই আমাকে?
    পেপারে পাত্র চাই বিজ্ঞাপন দিয়ে দাও।
    ঠিকাছে। আগামীকাল পেপারে বিজ্ঞপ্তিটা দিয়ে আসিস।

    পত্রিকায় পাত্রচাই বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পরদিন বাসার সামনে পাত্রী/পাত্রীর অভিভাবকদের লাইন লেগে গেলো বাসার সামনে; তবে বেড়ালের না-মানুষের। পত্রিকার সম্পাদক ভুল মনে করে বিজ্ঞপ্তি থেকে বেড়াল শব্দটা বাদ দিয়ে দিয়েছে!

    5
    3 Comments
Skip to toolbar