Profile Photo

Golam Rabbani SarkerOffline

  • Golam-Rabbani-Sarker
  • Profile picture of Golam Rabbani Sarker

    Golam Rabbani Sarker

    4 years, 9 months ago

    বদরগ‌ঞ্জের কৃ‌তি সন্তান শহীদ লে. কর্ণেল মোহাম্মাদ আব্দুল কাদির।
    জন্ম ১৯২৯ সালের ২ জানুয়ারী রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার মোস্তফাপুর গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলমান পরিবারে। বাবা মোহাম্মাদ আব্দুল হোসেন, একজন অবস্থাপন্ন গৃহস্ত এবং মাতা বেগম আসতুন্নেছা একজন গৃহিণী। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে আব্দুল কাদির ছিলেন দ্বিতীয়।

    ছোটবেলা থেকেই মেধাবী ছাত্র ছিলেন আব্দুল কাদির। রংপুর জিলা স্কুল থেকে প্রথমে ম্যাট্রিক এবং রংপুর কারমাইকেল কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগ থেকে গ্রাজুয়েশন শেষ করেন তিনি। পরবর্তীতে গ্রাজুয়েশন শেষ করে বুয়েট (বর্তমান) থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং সম্পন্ন করেন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইউওটিসি’র একজন সক্রিয় সদস্য ছিলেন। তৎকালীন ইউওটিসি’র অধিনায়কের প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ১৯৪৭ সালের পর পরই তিনি তৎকালীন পাকিস্তান মিলিটারী একাডেমীর ক্যাডেট হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৪৯ সালে তিনি সেকেন্ড লেফটেনেন্ট হিসেবে ইঞ্জিনিয়ার্স কোরে কমিশন লাভ করেন এবং ১৯৬২ সালে ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রী অর্জন করেন। ১৯৬৫ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়াতে ইঞ্জিনিয়ার অফিসারস ক্যারিয়ার কোর্স-৩ সফলতার সাথে সম্পন্ন করেন এবং ১৯৬৬ সালে লেফটেনেন্ট কর্ণেল পদে পদোন্নতি পান। লে. কর্ণেল হিসেবে তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সেনা সদর ইঞ্জিনিয়ার পরিদপ্তরে জেনারেল স্টাফ অফিসার-১ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৭০ সালের মাঝামাঝি সময়ে পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডি থেকে তৎকালীন অয়েল এন্ড গ্যাস ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশনের পূর্বাঞ্চলীয় প্রধান হিসেবে চট্টগ্রামে বদলী হয়ে আসেন।

    ৭ মার্চে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ যেদিন রেডিওতে প্রচার হয়, সেদিন তিনি ভীষণ খুশী হয়েছিলেন এবং বার বার তাঁর পরিবারকে বলছিলেন, ‘যুদ্ধ শুরু হচ্ছে, বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন। এবার আমরা স্বাধীন হবো।’ এরপর একদিন, তিনি তাঁর সন্তানদের জন্য স্বাধীন বাংলার একটি বড় পতাকা কিনে আনেন এবং সেটি বাঁশ পুঁতে চট্টগ্রামের পাঁচলাইশের কোয়ার্টারে লাগিয়ে দেন। শুধু তাই নয়, নিজের গাড়িতেও লাগাতে শুরু করেছিলেন স্বাধীন বাংলার ছোট একটি পতাকা। এছাড়া, তাঁর অফিসেও তিনি নুরুল ইসলামসহ অন্যান্য আওয়ামী লীগ নেতাদের উপস্থিতিতে বাংলাদেশের পতাকা ওড়ান। তখন অনেকে তাঁকে বলেছেন, ‘কর্ণেল সাহেব, আপনি যে এসব করছেন, দেখবেন শিগগিরই হয়তো আপনার বিপদ হবে।’ কিন্তু তিনি এ সবের তোয়াক্কা করেননি একটুও। আব্দুল কাদির ছিলেন একজন খাঁটি দেশপ্রেমিক বাঙালী। চট্টগ্রামে আসার পরে স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত সামরিক বেসামরিক অফিসারদের সাথে গোপনে সম্পর্ক স্থাপন করেন। সে সময় পূর্ব পাকিস্তান তেল-গ্যাস উন্নয়ন সংস্থার প্রধান নিয়ন্ত্রক (অপারেশন) পদে থাকাকালীন কাদির শহীদ জাতীয় নেতা কামরুজ্জামানকে একটি চিঠি লিখেছিলেন, যেখানে পূর্ব পাকিস্তানকে পশ্চিম পাকিস্তান কীভাবে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে অসহযোগিতা করছে, তা তিনি বিস্তারিত জানিয়েছিলেন। আর তেল-গ্যাস ক্ষেত্র অনুসন্ধানের জন্য যে সব বিস্ফোরক ব্যবহৃত হয়, প্রচুর পরিমাণে এ সব বিস্ফোরক গোপনে সরবরাহ করেছিলেন মুক্তিযোদ্ধাদের। মুক্তিযোদ্ধারা শোভাপুর ব্রিজ উড়িয়ে দিয়েছিলেন এই বিস্ফোরক ব্যবহার করে।

    ১৭ এপ্রিল ১৯৭১ আনুমানিক সকাল নয়টার দিকে একজন পাকিস্তানী ক্যাপ্টেনের নেতৃত্বে পাক হানাদার বাহিনীর একটি ছোট্ট দল লে. কর্ণেল মোহাম্মাদ আব্দুল কাদিরকে তাঁর নিজস্ব বাসভবন থেকে চট্টগ্রামস্থ সেনানিবাসের উদ্দেশ্যে উঠিয়ে নিয়ে গিয়েছিল এবং এরপর তিনি আর কোনদিনই ফিরে আসেননি। ধারণা করা হয়, স্বাধীনতাকামী সামরিক অফিসারদের সাথে তাঁর গোপন যোগাযোগের খবর পাক সেনাবাহিনী জানতে পারে এবং সেই অপরাধেই তাঁকে হত্যা করা হয়। পরবর্তীতে নাদীম কাদির স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে আলোচনা করে ও তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করে জানতে পারেন, লে. কর্ণেল কাদিরকে চট্টগ্রামের পাঁচলাইশে গুলি করে হত্যার পর মাটি চাপা দেয়া হয় আরও সতেরো জনের সাথে।

    স্বাধীনতার পর ১৯৮৩ সালে দেশমাতার স্বাধীনতার জন্য তাঁর আত্মোৎসর্গের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে তৎকালীন সরকার নাটোরের বাগাতিপাড়া উপজেলাস্থ দয়ারামপুর সেনানিবাস-এর নাম পরিবর্তন করে “কাদিরাবাদ সেনানিবাস” করে, যা ইঞ্জিনিয়ার সেন্টার ও স্কুল অফ মিলিটারী ইঞ্জিনিয়ারিং হিসেবে সমাধিক পরিচিত। তাঁর প্রতি সম্মান জানিয়ে এই সেনানিবাসে হোম অব স্যাপার্স নামে একটি স্মৃতিসৌধও নির্মাণ করা হয়। সরকার তাঁকে শহীদ বুদ্ধিজীবি হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে এবং তাঁর নামে একটি ডাকটিকেট চালু করে।

    স্বাধীনতার পর দীর্ঘ ৩৬ বছর ধরে অনেক খোঁজাখুজি করে ২০০৭ সালে শহীদ লে. কর্ণেল এম এ কাদিরের বড় ছেলে সাংবাদিক নাদীম কাদির চট্টগ্রামের পাঁচলাইশে তাঁর বাবার কবরস্থান চিহ্নিত করেন। পরবর্তীতে পরিবারের আবেদনের প্রেক্ষিতে ও সরকারের নির্দেশে ২০১১ সালের ২২ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার দুপুরের দিকে তাঁর দেহাবশেষ সেনাবাহিনীর একটি হেলিকপ্টারে করে চট্টগ্রাম থেকে নাটোরের দয়ারামপুরে অবস্থিত কাদিরাবাদ সেনানিবাসে নিয়ে আসা হয়। বেলা তিনটার দিকে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শহীদ মুক্তিযোদ্ধা লে. কর্ণেল মোহাম্মদ আব্দুল কাদিরের দেহাবশেষ হোম অব স্যাপার্সে নির্মিত স্মৃতিসৌধের পাশে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় পুনঃসমাহিত করা হয়।

    তাঁর যোগ‌্য সন্তান সাংবা‌দিক না‌দিম কা‌দির নিজ উ‌দ্যো‌গে এই স্মৃ‌তি সৌধ নির্মান ক‌রে‌ছেন নব নি‌র্মিত মোস্তফাপুর ব্রী‌জের পূর্ব প্রা‌ন্তে।

    10
    6 Comments
Skip to toolbar