Profile Photo

Rifa Tasfiah HimiOffline

  • Himi@1912
  • Profile picture of Rifa Tasfiah Himi

    Rifa Tasfiah Himi

    4 years, 9 months ago

    {সাদাক্ত}
    [১]
    আজকে ফুল নিবেন না স্যার ?
    এক উৎফুল্ল বালিকার কণ্ঠস্বর শুনে আমি পিছনে ফিরলাম । এতক্ষণ ওরই অপেক্ষা করছিলাম । মেয়েটি আমাকে দেখে তার ফোকলা দাঁতের মিষ্টি একটা হাসি উপহার দিল । আমিও তার হাসির উত্তরে একটা মুচকি হাসি দিয়ে বললাম, “কি পুষ্পকন্যা, খবর কি ?” এবার যেন তার হাসিটা আরো বিস্তৃত হয়ে গেল ।
    –ভালো, স্যার । আপনের ?
    –আমিও ভালো আছি । তো আমার ফুল কোথায় ?
    –এইযে স্যার, আপনের ‘ইস্পেশাল’ সাদা গোলাপ ।
    আমি হাত বাড়িয়ে ফুলটি নিয়ে পুষ্পকন্যাকে একটি বিশ টাকার নোট বের করে দিলাম । টাকাটি নিয়ে মেয়েটি সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ” আচ্ছা স্যার, আপনে সবসময় সাদা গোলাপ নেন ক্যান ? আপার কি সাদা গোলাপ পছন্দ ?” । বলেই সে মুখ টিপে একটা হাসি দিল যেন খুব পাকনা কথা বলে ফেলেছে ।
    –খুব পেকে গেছিস দেখছি, হুমম !
    – ভুল কি কইলাম ? তাইলে, আপনেই বলেন ক্যান কেনেন ?
    –সাদা হচ্ছে শান্তির প্রতীক । আর আমিও শান্তিপ্রিয় মানুষ । এজন্যই, বুঝলি ?
    –উমমহ, মিছা কথা ।
    –হয়েছে, তোকে আর এখন সত্য কথা শুনতে হবে না, যা ।
    –আপনে না বললে নাই । তয়, আমি কিন্তু জানি ।
    বলেই সে একটা চালাকির হাসি দিয়ে পালিয়ে গেল ।
    আমি হাঁটতে শুরু করলাম । ভেবেছিলাম রিক্সায় যাব । কিন্তু বিষন্ন সুন্দর আকাশটা দেখে হাঁটতে ইচ্ছে করল । পুষ্পকন্যা ঠিকই বলেছে । আমি ওকে মিথ্যাই বলেছিলাম ।

    [২]
    কাব্য দূর থেকে আমার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে । আমি ওর কাছে গিয়ে আমার লাল দাঁতগুলো দিয়ে একটা হাসি দিলাম । কাব্য বিরক্ত হয়ে বলল, ” এমনিতেই দেরী করে এসেছ, তার উপর আবার লাল দাঁতগুলো বের করে হাসছ । তোমাকে কতদিন বলেছি না এভাবে পান খেয়ে আসবে না । ”
    –পান খেলে সমস্যাটা কোথায় বলতো ?
    –খুবই বিচ্ছিরি লাগে আমার । মনে হয় যেন কেউ রক্ত মুখে নিয়ে কথা বলছে ।
    কাব্যর কথা শুনে আমি অট্টহাসি দিয়ে উঠলাম ।
    –কি হলো ! ওভাবে হাসছ কেন ?
    –নাহ, এমনি । এই নাও তোমার ফুল ।
    –রোজ রোজ তুমি সাদা গোলাপ আন কেন বলতো ?
    –এখন কি সাদা গোলাপেও সমস্যা ?
    –না, এমনি জিজ্ঞাসা করছি ।
    –আসলে, সাদা রঙটা অন্যদের খুব সুন্দর ফুটিয়ে তুলতে পারে ।
    –মানে ?
    –মানে হচ্ছে, সাদার উপরে তুমি নীল দাও, হলুদ দাও, সবুজ দাও ; সবই খুব সুন্দর ফুটে ওঠে । লালটা যেন আরো বিশেষভাবে ফুটে ওঠে ।
    বলতেই একধরনের শিহরণ বোধ করলাম ।
    –তো আমি কি এই সাদা ফুল নিয়ে গিয়ে বাড়িতে লাল, নীল, হলুদ, সবুজ রঙ করব নাকি ?
    –ইচ্ছে হলে করতে পারো ।
    –যাও, বাজে বকো না । এই রে….. বৃষ্টি পড়ছে । চল ছাউনির নিচে গিয়ে বসি ।

    [৩]
    সকাল নয়টা বাজে । আকাশ মন খারাপ করে আছে। রোদের দেখা নেই । অবশ্য, বেশ কয়েকদিন ধরেই বৃষ্টি হচ্ছে । এই বৃষ্টিতেই মনে হয় শীত নামবে । কিছুটা ঠান্ডা ঠান্ডা লাগছে । কিন্তু, গোসল করতে আলসেমি লাগছে না । বরং, এই ভেবে আনন্দ হচ্ছে যে আজ বেশ একটা চা-গোসল দেয়া যাবে । না শীত, না গরম । এই আবহাওয়া চা-গোসলের জন্য একেবারে আদর্শ সময় । আমি চুলোয় পানি বসিয়ে দিলাম । কে যেন ফোন করছে । কাব্যই হবে বোধহয়।
    –হাঁ, বল ।
    –আজ কখন আসতে হবে মনে আছে তো ?
    –জী, মেমসাহেব । খুব মনে আছে । একদম দশটায় পৌঁছতে হবে । এক ন্যানো সেকেন্ডও দেরী করা যাবে না ।
    –তো, ঠিক সময়ে চলে এস ।
    –আচ্ছা । কিন্তু, তুমি এত গম্ভীর হয়ে আছো কেন ?কি এমন জরুরী কথা বলতো ?
    –সেটা আসলেই জানতে পারবে ।
    খট করে ফোনটা কেটে গেল । যাক গে, এখন জরুরী কথার চেয়েও জরুরী হচ্ছে আমার চা-গোসল । এরকম মোক্ষম আবহাওয়াকে বৃথা যেতে দেয়া ঠিক না । এই রে, এতক্ষণে বোধহয় পানি ফুটতে শুরু করেছে ।

    [৪]
    এই হালকা ঠান্ডায় শরীরে ঠান্ডা পানি পড়ছে আর শরীর হালকা একটা কাঁপুনি দিয়ে উঠছে । তারই ভিতর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে ধোঁয়া ওঠা গরম চা । আহহহ….. এ যেন এক অন্যরকম অনুভূতি ! শরীরের বাইরেটা ঠান্ডা আর ভিতরটা গরম !

    গোসল করতে করতে কতক্ষণ যে চলে গেছে বুঝতেই পারিনি । বের হয়ে দেখি দশটা বেজে গেছে । তাড়াতাড়ি জামা-কাপড় পাল্টে বাইরে বেরিয়ে পড়লাম । কাব্য ইতোমধ্যেই বেশ কয়েকবার ফোন করেছে । আমি তাড়াতাড়ি একটা রিক্সা ডাকলাম ।
    –এই রিক্সা !
    –থাক, আর রিক্সা ডেকে কাজ নেই ।
    নারীকন্ঠ শুনে পিছনে ফিরলাম । কাব্যই দাঁড়িয়ে আছে । বুঝতে পারছি না, কি এমন ঘটল যে কাব্য নিজেই হাজির । আর তাছাড়া, ও আমার বাড়ির ঠিকানাই বা কোথায় পেল !
    –ওভাবে হা করে তাকিয়ে আছ কেন ?
    –না মানে, তুমি ঠিকানা কোথায় পেলে ?
    –তুমিই তো বলেছিলে । কিন্তু, তোমাকে দেখছি তোমার বাড়ির আশে-পাশের কেউই চেনে না । তাই, রিক্সা স্ট্যান্ডের কাছে দাঁড়িয়ে আছি ।
    –ওহ ।
    –তো, তোমার দশটা এখনো বাজেনি, তাই না ?
    –একটু দেরী হয়ে গেল আরকি ।
    –আমরা কি এখানেই দাঁড়িয়ে থাকবো ?
    –চল, কোথাও একটা গিয়ে বসি ।
    –কেন, তোমার বাড়িতে কি সমস্যা ?
    –আ……বাড়ি !
    –হ্যাঁ, গেলে অসুবিধা আছে নাকি ?
    –নাহ, অসুবিধা থাকবে কেন !
    আমি কাব্যকে আমার বাড়িতে নিয়ে চললাম । বাড়িটি আসলে আমার দাদার । এখন কিছুটা ভগ্নদশা । আমি কাব্যকে বসার ঘরে বসালাম ।
    –তো বল এখন কি বলতে চাও?
    –এটা কি তোমার নিজের বাড়ি ? বেশ পুরোনো মনে হচ্ছে ।
    –হুমম….. আমারই বাড়ি । পৈতৃক সূত্রে পাওয়া । এটাই কি তোমার জরুরী কথা ?
    কাব্য একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল ।
    –তুমি আমাকে কতটা ভালবাসো, শুভ্র ?
    –ভালোবাসা ! হঠাৎ এই কথা বলছ কেন ?
    –কারণ আছে, বল না শুভ্র ।
    কাব্য ব্যাকুল হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে ।
    –কি কারণ ?
    এবার কাব্য আগের চেয়েও বড় করে শ্বাস নিল ।
    –আমার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে ।
    আচ্ছা, কাব্য আমার কাছে কি উত্তর আশা করছে ? কি শুনতে চাচ্ছে ?
    –কিছু বলছ না কেন ?
    –কি বলব ?
    –আশ্চর্য! তোমার কি কিছুই বলার নেই?
    –তুমি কি বলতে চাচ্ছ, আমি তোমার পরিবারকে গিয়ে বলব যে আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই ?
    কাব্যের চোখে সত্যি বিস্ময় । আমি কাব্যের প্রশ্নই কাব্যের দিকে ছুড়ে মারলাম ।
    –তুমি আমাকে কতটা ভালবাসো কাব্য ?
    –অনেক ভালবাসি শুভ্র, অনেক ভালবাসি । আমি তোমাকে ছাড়া অন্য কারো কথা ভাবতেই পারি না ।
    কাব্য আমার হাত দু’টো নিজের কাছে টেনে নিল । ওর চোখে পানি । কি আশ্চর্য ! ও কিসব সর্বনাশা কথা বলছে! আমার মাথা ঝিমঝিম করছে । নিশ্বাস ভারী হয়ে আসছে ।
    –কি হলো শুভ্র? কিছু বলছ না কেন ?
    –কিন্তু, কিন্তু তুমি আমাকে ভালবাসতে পার না ।
    –কেন শুভ্র?
    –না, তা ঠিক না ।
    –কেন ঠিক না ?
    –আমি কাউকে ভালবাসতে পারি না । আমি কাউকেই ভালবাসতে চাই না ।
    –কি বলছ তুমি?
    –আমি ঠিকই বলছি । তুমি চলে যাও ।
    –না, আমি কোথাও যাব না । আমি তোমাকে ভালবাসি আর তুমিও আমাকে ভালবাসো । সেটা তুমি খুব ভালো করেই জান শুভ্র ।
    –না, আমি কাউকে ভালবাসতে চাই না । আমি যাকেই ভালোবাসি সেই দূরে চলে যায় । আর কখনো ফিরে আসে না । আড়াল হয়ে যায় ।
    –আমি তোমাকে ছেড়ে দূরে চলে যেতে চাই না শুভ্র। আজ সেজন্যই তো তোমার কাছে এসেছি ।
    –না, যাবে । তুমিও দূরে চলে যাবে ।
    –যাব না শুভ্র, যাব না ।
    –তুমি মৃত্যুকে ঠেকাতে পারবে ?
    –কেন পারব না শুভ্র ? তুমি আমার পাশে থাকলে অবশ্যই পারব । মৃত্যুর পরেও আমি তোমার মনের ভিতর থাকবো । আমাদের যোগাযোগ হবে মনে মনে।
    –কিন্তু, তুমি আমাকে কতটা চেন ?
    –হ্যাঁ, হতে পারে আমি তোমার অতীত জানি না । তুমি কি করো, না করো, তোমার পরিচয় কি কিচ্ছু জানি না । কিন্তু, তবুও আমি তোমাকে ভালোবাসি । এই যে শুভ্র আমার সামনে বসে আছে, আমি তাকেই ভালোবাসি ।
    –কিন্তু, তোমার সামনে যে বসে আছে, সেই কি শুভ্রর সম্পূর্ণ রূপ ?
    –তোমার যে রূপই থাকুক না কেন, আমি তোমাকেই ভালোবাসি ।
    –তুমি কি আমাকে জানতে চাও?
    –হ্যাঁ, এখন আমি তোমাকে জানতে চাই । সম্পূর্ণ তোমাকে ভালবাসতে চাই ।
    –তুমি কি সত্যিই শুনতে চাও ?
    –হ্যাঁ শুভ্র, বল ।
    কাব্য আমার দিকে তাকিয়ে আছে । আমি ওর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলাম । আমি যেন ধীরে ধীরে ঘোরের মধ্যে চলে যাচ্ছি ।

    আমি শুভ্র, আশফাক ইনতিহাল শুভ্র । আমার দাদুর নাম জয়নাল ইনতিহাল । এক সময় এই শহরে আমাদের বেশ বড় ব্যবসা ছিল । এই বাড়িটাও সেই সময়েরই । ব্যবসাটা আসলে আমার দাদুর ছিল । ব্যবসার খাতিরে দাদুর বেশ নাম-ডাকও ছিল । বাবা দাদুর একমাত্র সন্তান । কিন্তু, ব্যবসার প্রতি কোনোদিনই তার কোনো আগ্রহ ছিল না । তিনি তার চাকরি নিয়েই ব্যস্ত থাকতেন । আমরা ছিলাম দু’ ভাই-বোন । আমি বড় । আমার ছোট বোনের নাম শৌখিন । আমি ওকে আদর করে ‘শখ’ ডাকতাম । আমরা সবাই মিলে এই বাড়িতেই থাকতাম । সেই সময়ে বাড়িটাও বেশ জমজমাট ছিল । কিন্তু, একদিন বাবা নিজের সাথে করে আজকের দিন তৈরির সেই মূল কারণটি নিয়ে এলো । বাবা বললেন যে চাকরির জন্য এখন থেকে তিনি কানাডায় থাকবেন । সাথে মা, আমায় আর শখকেও নিয়ে যাবেন । এই সংবাদ যেন দাদু-দাদীর বুকে চরমভাবে আঘাত হানল । মায়েরও খুব একটা যাওয়ার ইচ্ছে ছিল না । আমি আর শখও ভেবে পাচ্ছিলাম না যে কিভাবে দাদীকে ছাড়া থাকবো । কিন্তু, বাবা তার সিদ্ধান্তে অটল । তিনি আমাদের যাওয়ার ব্যবস্থা একেবারে পাকা করে ফেললেন । নির্দিষ্ট সময়ে আমরা এয়ারপোর্টে হাজির হলাম । কিন্তু, তখনি আমার জীবনের সর্বনাশ অধ্যায়ের প্রথম সর্বনাশ ঘটে গেল । আমরা সবাই বাড়ি ফিরে এলাম । তখন বাবাকে সবচেয়ে বড় অপরাধী মনে হয়েছিল । দাদুর মৃত্যুর পরে আমাদের ব্যবসায় ধ্বস নেমে এল । বাবা ব্যবসা বিক্রি করে দিলেন । এবার তিনি দাদী সমেত আমাদেরকে নিয়ে কানাডায় যেতে চাইলেন । কিম্তু, দাদী এতে নারাজ । তিনি কিছুতেই দেশ ছেড়ে যাবেন না । তাই, বাবা আর গেলেন না । সবকিছু ঠিকঠাকই চলছিল । কিন্তু, আবার সেই সর্বনাশ । এবার দ্বিতীয় ও তৃতীয় সর্বনাশ একসাথে ঘটে গেল। বাবা-মা একটা কাজে বাহিরে গিয়েছিলেন । কিন্তু, সেই যে গেলেন আর ফিরে এলেন না ।

    আমি কাব্যর দিকে তাকালাম । ও এমনভাবে তাকিয়ে আছে যেন কান দিয়ে শুনছে না, সবকিছু চোখ দিয়ে দেখতে পাচ্ছে ।
    –কি হলো? থামলে কেন ?
    আমি মুখ ফিরিয়ে নিয়ে আবার বলতে শুরু করলাম—
    এই ঘটনার পরে দাদী একদম ভেঙে পড়লেন । তখন সহায়-সম্বল বলতে এই বাড়িটিই ছিল । বাবার অফিস থেকে অবশ্য কিছু সাহায্য-সহযোগিতা পেয়েছিলাম । কিন্তু তা দিয়ে আর কতদিন । ধীরে ধীরে দাদী অসুস্থ হয়ে পড়লেন । চিকিৎসা করানোর মত তেমন কিছুই অবশিষ্ট ছিল না । আত্বীয়-স্বজন যারা ছিলেন তারাও আমাদের অসময়ে আড়ি দিয়ে দিলেন । এবার দাদীও ইতি টানলেন । আমি পুরোপুরি ভেঙে পড়লাম । তখন আমার বয়স দশ আর শখের ছয় । আশে-পাশের মানুষজন মিলে আমাদেরকে একটি আশ্রমে দিয়ে দিলেন । এছাড়া, আর কিই বা করতেন তারা ! নানুবাড়ির সাথেও তো আমাদের তেমন যোগাযোগ ছিল না । ভালোই চলছিল আশ্রমের দিনগুলো । লাঞ্চনা-বঞ্চনার পরেও অনেকেই আমায় ভালবাসত । কিন্তু ভালোবাসা বোধহয় আমার কপালে সহ্য হয় না । তুমি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ কাব্য, এরপর কি ঘটেছিল ।
    আমি কাব্যর দিকে ফিরলাম । ও মাথা নিচু করে আছে ।
    –শখ নিশ্চয়ই তোমার সর্বনাশ অধ্যায়ের পঞ্চম সর্বনাশ ঘটিয়ে ফেলল ।
    –শখের ডেঙ্গু হয়েছিল । আমার সবচেয়ে প্রিয় মানুষটিও আমাকে বিদায় জানালো ।আমার ভালোবাসার সবাই চলে গেল আমাকে একা ফেলে । আমি সেবার দারুন ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম । এরপর থেকে আমি কাউকে ভালবাসতেই ভয় পাই, পাছে সে ছেড়ে চলে যায় ।
    কাব্য আমার হাতদু’টো নিজের কাছে টেনে নিল ।
    –আমি তোমাকে ছেড়ে যাব না, শুভ্র । আমি ভাবতেই পারিনি তোমার জীবন এরকম হতে পারে । কিন্তু মৃত্যুর পরেও তো মানুষের সাথে যোগাযোগ করা যায় ।
    আমার হৃৎপিণ্ড ধ্বক করে উঠল ।
    –কি বলছ তুমি!
    –আমি ঠিকই বলছি । তুমি চোখ বন্ধ করে তাদের কথা ভাবো, দেখবে ঠিকই যোগাযোগ করতে পাচ্ছ ।
    হঠাৎ আমি প্রচন্ড জোরে হেসে উঠলাম ।কাব্য এবার একটু ভড়কে গেছে ।
    –হাসছ কেন? সত্যি বলছি । তুমি নিজের মন দিয়ে তাদেরকে দেকে দেখ, দেখবে সারা পাচ্ছ ।
    –সম্ভব নয় ।
    –কেন ?
    –কে বলেছে নেই ?এইযে আমি তোমাকে মন দিয়ে ভালোবাসি ।
    –নাহ, তুমি মস্তিষ্ক দিয়ে ভালোবাস ।
    –হ্যাঁ, মস্তিষ্কই তো মন ।
    –তাই যদি হয়, তবে মৃত্যুর পরে তুমি কিভাবে যোগাযোগ করবে, যদি মস্তিষ্কই না থাকে ।
    –আহা, ব্যাপারটা ঠিক তা নয় ।
    –তাহলে?
    –তুমি চেষ্টা করে দেখ, পারবে ।
    –আমি তো যোগাযোগ করি ।
    –সত্যি ! তাহলে অভাবে বললে কেন ?
    –কিন্তু, আমার প্রক্রিয়া যে ভিন্ন ।
    –কি রকম ?
    –তুমি দেখতে চাও ?
    –হ্যাঁ, অবশ্যই ।
    আমার মেরুরজ্জু দিয়ে শীতল হওয়া বইছে । সবকিছু এলোমেলো লাগছে । এ কোন জগতে পা দিতে চাচ্ছে কাব্য ?
    –তাহলে এস আমার সাথে ।
    আমি কাব্যকে নিয়ে চললাম সেই ঘরটিতে, যেই ঘরের করণেই আমি এ বাড়িতেজ পড়ে আছি । আমার অত্যন্ত আপন একটি ঘর । যার খবর কেউ জানে না । আমি রোজ এ ঘরে আসি । না এলে যেন ঠিক শান্তি মেলে না । আমি ঘরের দরজাটি খুলে ভিতরে ঢুকলাম । ঢুকে বাতিটি জ্বালিয়ে দিলাম ।
    –এস কাব্য ।
    কাব্য ঘরের ভিতরে ঢুকল । আমি ওর দিকে তাকিয়ে আছি আর ও সামনের দিকে তাকিয়ে আছে । আমি বুঝতে পারছি কাব্যের নিশ্বাস ভারী হয়ে আসছে । ও এমনভাবে তাকিয়ে আছে যেন ওর চোখগুলো বেরিয়ে আসবে ।
    –কাব্য, কাব্য তুমি কি শুনতে পাচ্ছ?
    আমি কাব্যর কাঁধে হাত রাখলাম । বুঝতে পারলাম ও কাঁপছে ।
    –এসব কি শুভ্র?
    –আমার যোগাযোগের মাধ্যম ।
    –তুমি কি আমার সাথে মজা করছো?
    –না, মজা করব কেন !
    কাব্য কাঁদতে শুরু করেছে ।
    –আমাকে সব খুলে বল শুভ্র, এসব কি ? আর দয়া করে আমাকে অন্য ঘরে নিয়ে চল ।
    আমি কাব্যকে পাশের ঘরে নিয়ে গিয়ে বসালাম । ও এখনো কাঁদছে ।
    –ওগুলো তুমি ওভাবে রেখেছ কেন শুভ্র ? ওগুলো নিশ্চয়ই তোমার বাবা-মায়ের না ।
    –যদি বাবা-মা মারা যাওয়ার সময় বিষয়টা জানতাম, তাহলে তাদেরটাও রাখতাম । আর রাখতাম আমার শখেরটা । শখ মারা যাওয়ার পরে আমার পৃথিবীটাই এলোমেলো হয়ে গিয়েছিল । কারো সাথেই মিশতে চাইতাম না । সবসময় দূরে দূরে থাকতাম । সবাইকে ঘৃণা করতে চাইতাম । ভয় হতো, ভালবাসলে যদি দূরে চলে যায়! কিন্তু ভালো না বেসে কি থাকা যায়! ধীরে ধীরে বড় হয়ে উঠলাম । পড়া-শোনাতেও মোটামুটি ভালোই ছিলাম । তাই, স্যার-ম্যাডাম সবাই বেশ ভালবাসতো । আমাদের আশ্রমের রমজান চাচাও আমাকে অনেক ভালবাসতো । আমি তখন আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে পদার্পন করেছি । আমার বিষয় হলো সাইকোলজি । একদিন রমজান চাচা অসুস্থ হয়ে পড়লেন । আমি আবার ভয় পেয়ে গেলাম । এসে গেল আরেকজনের বিদায়ের পালা । এতো বিসর্জনের পরে আমি সত্যি ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম । সারাদিন ভাবতাম যে কীভাবে মৃতদের সাথে যোগাযোগ করা যায় । আর তখনই আমি সমাধান পেয়ে গেলাম । কিন্তু, সাধারণ মানুষ যে এতে সায় দেবে না, তা আমি খুব ভালো করেই জানতাম । তবে, আমি আর আমার ভালোবাসার মানুষদের দূরে চলে যেতে দেব না । তাই, এক রাতে রমজান চাচার বাড়িতে গেলাম । বাড়ি বলতে একটা ছোট্ট ঘর । আমি দরজায় টোকা দিলাম । কিছুক্ষণ পরে চাচা দরজা খুললেন ।
    –বাবা তুমি?
    –কেমন আছেন চাচা?
    –দেখতেই তো পাচ্ছ বাবা । সময় বোধহয় ফুরিয়ে এল ।
    চাচার শরীর সত্যি ভেঙে পড়েছে । উনি ধরে ধরে হাঁটছেন । আমি একটা চেয়ারে বসে পড়লাম । চাচা বসলেন বিছানায় ।
    –চাচা, আজকের দিনে কি ঘটেছিল, আপনার মনে আছে ?
    –কি বাবা ? ঠিক মনে করতে পারছি না ।
    –আজকের দিনেই শখ চলে গিয়েছিল ।
    চাচা মাথা নিচু করে ফেলেছেন । তিনিও শখকে খুব ভালবাসতেন ।
    –আপনার কি মনে আছে চাচা, আমার মন খারাপ ছিল বলে সেদিন রাতে আপনি আমাকে নিয়ে ঘুরতে বেরিয়েছিলেন । আর কেউ ছিল না । ফাঁকা রাস্তা । শুধু আপনি আর আমি ।
    –মনে আছে বাবা, খুব মনে আছে ।
    –চলুন না চাচা, আজকেও সেভাবে হাঁটি ।
    –কিন্তু…..
    –আপনি আমার কাঁধে ভর দিয়ে হাঁটবেন ।
    চাচা মুখ তুলে চাইল । ওনার চোখে পানি ।

    [ ]
    আমি চাচাকে নিয়ে হেঁটে চললাম । নির্জন রাস্তা । মাঝে মাঝে দু’-একটা গাড়ি দেখা যাচ্ছে ।আমার বাড়িটি চাচার বাড়ি থেকে খুব একটা দূরে নয় । আমি চাচাকে সেখানেই নিয়ে চললাম । দু’জনে অনেক্ষণ গল্প করলাম ,চা খেলাম । চাচাকে যে ড্রাগটা দিয়েছিলাম, ৩ ঘন্টার মধ্যেই তার কাজ করার কথা ছিল । চাচার বেলায় তা ২ ঘন্টাতেই কাজ করে ফেলল । তবে, বিশ্বাস কর কাব্য এতো সুন্দর মৃত্যু আমি কখনো দেখিনি । চাচা হাসতে হাসতে, আমার সাথে গল্প করতে করতে টলে পড়লেন গভীর ঘুমে । আমার ভালোবাসার মানুষকে এতো সুন্দর মৃত্যু উপহার দিতে পেরে আমি সত্যি খুশি হয়ে উঠলাম । তুমিই বল, এমনিতে কি চাচা এতো সুন্দরভাবে মরতে পারতেন !
    কাব্য নিঃপ্রাণভাবে আমার দিকে তাকিয়ে আছে । আমি আলতো করে ওর ঠোঁটে ছুঁয়ে দিলাম । ঠোঁট দু’টো একটু কেঁপে উঠল । আমি কাব্যকে আমার মস্তিষ্ক সংগ্রহের একের পর এক গল্প বলে যাচ্ছি । কিন্তু, মনে হয় না এখন ও আর কিছু শুনতে পাচ্ছে । কাব্য নিষ্পলক দৃষ্টিতে দেয়ালের দিকে তাকিয়ে আছে । আমি কাব্যর কাঁধে হালকা একটা ধাক্কা দিলাম । ও পড়ে গেল । আরো একটি সুন্দর, শান্তিপুর্ণ মৃত্যু । কাব্যকে আর কেউ আমার থেকে দূরে সরাতে পারবে না । আমি শেলভে নতুন একটি মস্তিষ্ক তুলে রাখলাম । দেহটাকে একটু পরে সমাধিস্ত করবো । আমি হাত ধুয়ে বসার ঘরে এলাম । এমন সময় বেলটা বেজে উঠল ।
    –স্যার, কেমম আছেন ?
    গেটের বাইরে পুষ্পকন্যা সহাস্যমুখে দাঁড়িয়ে আছে। দু’হাত পেছনে নিয়ে কি যেন একটা লুকিয়ে রেখেছে।
    –আরে, পুষ্পকন্যা যে ! হঠাৎ আমার বাড়িতে?
    –আপনের জন্য গিফ্ট আনছি স্যার ।
    –গিফ্ট ! কি গিফ্ট ?
    –আগে চোখ বন্ধ করেন ।
    –আহা, তুই তো খুব ঝামেলা করিস । নে, করলাম চোখ বন্ধ ।
    পুষ্পকন্যা আমার হাতে একগোছা ফুল ধরিয়ে দিল বোধহয় । হ্যাঁ, ফুলই । অনেকগুলো সাদা গোলাপ ।
    –পছন্দ হইছে স্যার?
    –খুব পছন্দ হয়েছে । এবার তো তোর অনেক টাকা পাওনা হয়ে গেল রে । একটু দাঁড়া, আমি নিয়ে আসছি ।
    আমি টাকা আনতে আমার ঘরের দিকে চললাম । পুষ্পকন্যা পিছন থেকে আমার জামা টেনে ধরল ।
    –আরে স্যার, কই যান ?
    –বললাম তো টাকা আনতে যাচ্ছি ।
    –আমি না কইলাম এগুলো আপনেরে গিফ্ট দিছি । গিফ্ট দিয়া কি কেউ টাকা নেয় !
    –ও বাবা, তো তুই কি সবাইকে এরকম গিফ্ট দিস নাকি ?
    –নাহ, সবাইরে দিতে যামু ক্যান ? আপনেরে দিলাম ।
    –আমাকে কেন ?
    –আপনে কি আর বাকি সবার মতন নাকি ! আপনে হইতাছেন ভালো স্যার । আপনেরে আমি অনেক পছন্দ করি ।
    –তাই নাকি !
    –হুমম, অনেক ভালোবাসি ।
    ভালোবাসা ! আবার আমার মাথাটা ঝিমঝিম করছে। আমার সাথেই কেন এমন হয় !
    –তো বস রে পুষ্পকন্যা । আমার বাড়িতে এলি, না খাইয়ে কি যেতে দিতে পারি !
    পুষ্প বসলো, খেলো, গল্প করলো । তবে, ও এখন কিছুটা নিস্তেজ হয়ে পড়েছে ।
    –কিরে, পুষ্প ! অভাবে নুয়ে পড়েছিস কেন ?
    –কেমন যেন অবশ অবশ লাগতাছে স্যার ।
    –একটা জিনিস দেখবি ?
    –কী জিনিস ?
    –তুই না বলেছিলি যে আমি সাদা গোলাপ কেন কিনি । আমার তো লাল গোলাপ কেনা উচিৎ ।
    –আপনে সাদা গোলাপ দিয়া কি করেন ?
    –দেখবি ? দাঁড়া ।
    আমি কাব্যর কিছুটা রক্ত হাতে নিয়ে এসে, পুষ্পের আনা ফুলগুলো থেকে একটি তুলে নিয়ে, সেটিতে রক্ত মাখিয়ে দিলাম ।
    –কিরে, কেমন লাগছে দেখতে ?
    পুষ্প মলিন হাসি দিয়ে উঠল । হাসার কোনো শক্তি নেই, তবুও হাসছে ।
    –আপনে ফুল রং করেন !
    –হ্যাঁ, সুন্দর লাগছে না ?
    –হ, খুব সুন্দর লাগতাছে ।
    –তোর কি ঘুম পাচ্ছে পুষ্প ?
    –হ, স্যার । চোখ দুইটা যেন র খুইলাই রাখতে পারতাছি না ।
    –তাহলে জোর করে খুলে রাখার দরকার নেই । তুই নিশ্চিন্তে ঘুমা ।
    পুষ্প সোফাতেই শুয়ে পড়ল । আমি ওর মাথাটা আমার পায়ের উপরে তুলে দিলাম । এখন, আমি এক হাতে পুষ্পের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছি, আর আমার অন্য হাতে রক্তাক্ত গোলাপ । আচ্ছা, পুষ্পের ছোট্ট মস্তিষ্কটিতে কি শখের মস্তিষ্ক স্থাপন করা যাবে না ! করে কি শখের সাথে কথা বলা যাবে না ! কেন জানি না এখন পুষ্পকন্যাকেই আমার শখ মনে হচ্ছে। আমি শখের মাথাতেই হাত বুলোচ্ছি । ঠিক ছোটবেলায় যেমন করতাম । আমি বড় হয়েছি, কিন্তু শখ এখনো আমার সেই ছোট্ট শখই রয়ে গেছে । আমি নিজের অজান্তেই অস্ফুট স্বরে গেয়ে উঠলাম,

    “বাতির আলো লজ্জা পায়, জোনাকির আলো লজ্জা পায়, চাঁদের আলোও লজ্জা পায় ; শখের আলোর কাছে ।
    সবাই এখন বহুদূরে, শখ আমার আছে ।”

    5
    4 Comments
Skip to toolbar