-
যত হুশ খরগোশ
রানা জামানখরগোশগুলোর চ্যাচামেচিতে প্রফেসর মাসুদ মহাবিরক্ত। ভেবেছিলেন শান্ত প্রকৃতির জীবগুলো নিয়ে আরামেই থাকবেন। পৌঢ় বয়সে শান্তি আর মিলছেই না! সারাজীবন কাটিয়েছেন নিরীহ পশু-পাখিদের নিয়ে; তাই মানুষে অস্বস্তি লাগে। কাঠবিড়ালি দুটো বেশ মানিয়েছিলো ওর সাথে। কিন্তু একদিন বেড়াতে বেরিয়ে আর ফিরে এলো না। নিখোঁজ বিজ্ঞাপন দিয়ে পড়তে হয়েছে উঢকো ঝামেলায়। সংবাদপত্রের লোকগুলো যতবার পণ্ডিতি করেছে, ততোবার ঝামেলায় পড়তে হয়েছে ওকে।
অনেক চিন্তা-ভাবনা করে পাঁচটি খরগোশ সংগ্রহ করেছেন প্রফেসর মাসুদ। প্রশিক্ষণ দিতে হয়েছে টানা তিনমাস! মূল সমস্যা: কার কী কাজ তা মনে রাখতে পারছে না খরগোশগুলো। সবসময় কাজের মধ্যে থাকতে চায় খরগোশগুলো। যত গণ্ডগোল এই কাজ নিয়ে। ওদের চাহিদা অনুযায়ী কাজ তো নেই প্রফেসর মাসুদের হাতে বা বাসায়। অলস মস্তিষ্ক যে শয়তানের কারখানা তা এখন হাড়ে হাড্ডিতে টের পাচ্ছেন প্রফেসর মাসুদ।
খরগোশগুলোর চেচামেচি সহ্য করতে না পেরে বিছানায় উঠে বসলেন প্রফেসর মাসুদ। অটোমেটেড হুইলচেয়ারে বসে বোতাম টিপে এগিয়ে গেলেন ড্রয়িংরুমে। ওখানেই খরগোশগুলো শোরগোল পাকাচ্ছে। ড্রয়িংরুমে ঢুকে দেখতে পেলেন:
পাঁচটি খরগোশ একে অপরকে ঝাপটে ধরে হুটোপুটি খাচ্ছে মেঝেতে।
প্রফেসর মাসুদ রাগ করলেন না-রাগ দেখালে খরগোশগুলো আরো পাগলামি শুরু করে। প্রফেসর রাগ হজম করে মোলায়েম অথচ উচ্চ কণ্ঠে বললেন, ফৃজ!
থেমে গেলো খরগোশগুলোর হুটোপুটি ও শোরগোল। জড়াজড়ি অবস্থায় স্থির হয়ে আছে পাঁচ খরগোশ।একই স্বরে ফের বললেন প্রফেসর মাসুদ, স্প্লিট ফাইভ, প্লিজ!
এক লহমায় পাঁচ খরগোশ ছিটকে গেলো পাঁচ দিকে। ওখানেই দাঁড়িয়ে থাকলো প্রফেসরের দিকে মুখ করে।
প্রফেসর ফের বললেন, এবার তোমরা আস্তে ধীরে এসে আমার সামনে এসে পাশাপাশি দাঁড়াও।
পাঁচ খরগোশ এসে পাশাপাশি দাঁড়ালো পেছনের দুই পায়ে ভর দিয়ে। তিনজনের সামনের দুই পা সামনে এবং দুই খরগোশের পেছনে।
প্রফেসর মাসুদ দুই খরগোশের দিকে তাকিয়ে বললেন, থিটা গামা, তোমাদের হাত পেছনে কেনো?
থিটা ও গামা আস্তে ধীরে পেছন থেকে হাত দুটো সামনে এনে মেলে ধরলো। প্রত্যেকের হাতে ওর-ই সামনের উপরের পাটির একটি দাঁত।
আবার ভেঙ্গে ফেলেছো দাঁত! তোমাদের দাঁতের সাথে এতো শত্রুতা কেনো?
থিটা বললো, এবার ডান দিকেরটা ভেঙ্গেছে প্রফেসর!
কার ডান দিক? আমার না তোমার?
আমার ডান দিক হলে তোমার বাম দিক।
গামা বললো, আমারও তাই প্রফেসর।
এ নিয়ে তোমরা দুজন তিনবার দাঁত ভেঙ্গেছো!
আমার দাঁত ভাংতে ভালো লাগে!
থিটা বললো, আমারও ভালো লাগে।
একে একে সবাই বলতে লাগলো তাদের দাঁত ভাংতে ভালো লাগে। সবাই একসাথে সুর করে বলতে বলতে একটি চক্র তৈরি করে নাচতে লাগলো। প্রফেসর মাসুদ কিছু বলতে গিয়ে থেমে মুচকি হাসলেন। মৃদু লয়ে হাত তালি দিতে লাগলেন।
দশ মিনিট নেচে ওরা আচমকা থেমে সারি ধরে আগের মতো দাঁড়িয়ে গেলো।
প্রফেসর মাসুদ হাততালি থামিয়ে বললেন, তোমাদের সমস্বরে গান অতি চমৎকার হয়েছে। নাচও অতি মনোরম হয়েছে।
পাই জিজ্ঞেস করলো, সমস্বরে মানে কী প্রফেসর?
সমস্বরে মানে কোরাস।
বিটা জিজ্ঞেস করলো, মনোহর মানে?
মনোহর মানে স্প্লেনডিড। এবার কাজের কথায় আসি। তোমাদের আনন্দের গান ও নাচ দেখে বুঝতে পারলাম তোমাদের দাঁতের প্রয়োজন নেই। ভালো কথা! আমি বারবার দাঁত বানানো থেকে বেঁচে গেলাম!
সব খরগোশ সমস্বরে উল্লাসধ্বনি করে উঠলো, হুর রে!
তখন একটা সমস্যা হতে পারে তোমাদের। প্রকট সমস্যা!
কী সমস্যা?
তোমরা চিবুবে কিভাবে? অবশ্য যদি লিকুইড খাও তাহলে কোনো সমস্যা থাকে না!
ল্যাম্ডা বললো, না না! আমি লিকুইড খেতে পারি না! খাওয়ার পরপরই পেচ্ছাব হয়ে পেট খালি হয়ে যায়!
থিটা বললো, আমারও লিকুইড খাবার পছন্দ না!
একে একে সকল খরগোশ বলে গেলো ওদের লিকুইড খাবার পছন্দ না।
ফৃজ বলে সবাইকে থামিয়ে প্রফেসর বললেন, তার মানে তোমাদের সবার দাঁত দরকার।
জ্বী প্রফেসর!
তাহলে এই কথাট মনে রাখো: খেলার ছলে আর কখনো দাঁত ভাঙ্গা যাবে না! এবার বলো: তোমরা হুটোপুটি করছিলে কেনো? থিটা বলো!
থিটা ভাংগা দাঁত দেখিয়ে বললো, আমার দাঁত ভেংগে গেছে। তাই কথা বলতে ইচ্ছে করছে না!
গামাও ভাংগা দাঁত দেখিয়ে বললো, আমারও কথা বলতে ইচ্ছে করছে না!
ওকে। সবার পক্ষে বিটা বলো।
বিটা এক কদম এগিয়ে এসে বললো, আমরা কাজ চাই। কাজ ছাড়া থাকতে ভালো লাগে না। বেড়ানোর জায়গা চাই।
প্রফেসর মাসুদ বললেন, আমার জানামতে তোমাদের সবার কাজ আছে।
যে কাজ আছে তাতে সময় কাটে না। আরো বেশি কাজ চাই।
আমার কাজ যা আছে তার চেয়ে বেশি কাজ দেবো কিভাবে!
ল্যাম্ডা ফস করে বলে দিলো, আমরা লোক বেশি হয়ে গেছি, তাই না প্রফেসর?
প্রফেসর মাসুদ বিস্মিত হয়ে বললেন, আরে! তোমাদের দেখছি ব্রেন খুলে যাচ্ছে! আমি ভেবেছিলাম তোমরা পাঁচ জন মিলেমিশে আমার বাড়িতে থাকবে, খেলাধূলা করে সময় কাটিয়ে দেবে। আমি একা মানুষ। ডালভাত খেয়ে অভ্যাস।
সাদাসিধা জীবন যাপন করি। তাই ভেবেছিলাম তোমাদের নিয়ে হাসিখুশি জীবন কাটিয়ে দেবো। তোমরা পাঁচ জনই আমার খুব প্রিয়। তোমরাই বলো কয় জনকে বিদায় দিলে তোমরা বিজি থাকতে পারবে।
বিটা বললো, দুই জনকে বিদায় করে দাও!
কাকে কাকে?
আমাকে আর থিটাকে বিদায় করতে পারো!
থিটা ও বিটা! কিন্তু কিভাবে বিদায় করা যায় বলো!
থিটা বললো, তুমি খেয়ে ফেলো!
খেয়ে ফেলবো মানে?
আমাদের সবাই খায়। মানুষ, বাঘ, শেয়াল সবাই। তুমি আমাদের বানিয়েছো, তুমিই খেয়ে ফেলো! তাহলে আমাদের কষ্ট কম হবে।
তোমরা জানো আমি নিরামিষ ও মৎসভোজি-মাংশ খাই না। তোমাদের বাইরে ছেড়ে দিলে মানুষ অথবা কোনো জন্তু-জানোয়ার খেয়ে ফেলবে। পেপারে একটা বিজ্ঞপ্তি দেই। কোনো পশুপ্রেমিক আগ্রহী হলে তোমাদের লাইফটা সেট হয়ে যাবে; আর যদি কেউ আগ্রহী না হয় তো চিড়িয়াখানায় দিয়ে দেবো।
বিজ্ঞপ্তিটা পড়ে বন বিভাগের জেলা অফিস প্রধান ভ্রু কুচকে মনে মনে বললেন, পেপারে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে প্রকাশ্যে বন্যপ্রাণী বিক্রি করা হচ্ছে! এখনই রেইড করতে হবে কালপ্রিটকে।
এবারও পত্রিকার সম্পাদক বিজ্ঞপ্তিটায় সামান্য সংশোধনী দিয়েছে ভুল মনে করে। প্রফেসর মাসুদ কর্তৃক প্রেরিত বিজ্ঞপ্তিতে খরগোশ দুটোর কোনো মূল্য উল্লেখ করা ছিলো না-দৈনিক এলেবেলে পত্রিকার সম্পাদক খরগোশ দুটোর মূল্য উল্লেখ করে বিজ্ঞপ্তিটি প্রকাশ করেছেন।3 Comments
Friends
Moniruzzaman Sarjil
@zaman2802
Jannatul Ferdous Ivy
@jannatul-f-ivy
Shadman-Shiam
@shadman-shiam
Md.Khaladur Rahman (অনল)
@wanol
অরিন্দম সাইফুল্লাহ
@arindam-saifullah
Shah Muhammad Alam
@smalam112
UTTAM KUMAR BISWAS
@uttamk
Md Suruzzaman Shohel
@suruzzaman
Sanwar Hossain
@sanwar


খুব ইন্টারেসটিং 🙂 । যেন রূপকথা, আবার রূপকথা নয়। শুভেচ্ছা নিন !