Profile Photo

সাইফুন নেসা সীমা।Offline

  • MeherMeherShima
  • কিশোরী_বয়সের_ভালোবাসা
    (না কি অপরিণত বয়সের ভুল )
    লেখাঃ মেহের_মেহের_সীমা।
    পর্বঃ৮

    সিগ্ধ সকালে গ্রামের নির্মল পরিবেশ যে কারো মন ভালো করে দেয়।
    রাতের আঁধার শেষে ভোরের আলো ফোটার আগে মোরগের ডাকে।
    ভোরের পাখির কিচিরমিচির শব্দ মনকে নাড়া দেয়।
    চাঁদনী বানু যেহেতু ছোট থেকেই গ্রামে বড় হয়েছে।
    সেহেতু এমন পরিবেশ প্রতিদিন দেখে সে অভ্যস্ত থাকা সত্বেও সব সময় মনে হয়েছে গ্রামে না জন্মালে তার এমন নির্মল পরিবেশ তার আজীবন অদেখা থেকে যেত।
    কিন্তু আজ তা লাগছে না।
    বরং আজ সবকিছু কেমন বিষাদময় লাগছে।
    পাখির কিচিরমিচির শব্দে তার মাথা ধরে যাচ্ছে।
    যা আগে কখনো হয়নি।
    আজকে বাহিরের পরিবেশ তাকে মুগ্ধ করার বদলে বিরক্ত করছে।
    তা এতো কষ্ট গড়া সংসার যে নষ্ট হওয়ার পথে।
    গতকাল ছেলেকে হেলেদুলে ঘরে ঢুকতে দেখে কষ্টে তার বুক ফেটে যাচ্ছে।
    অল্প বয়সে স্বামী মারা যাওয়ার পর কত কষ্ট করে তিনি ছেলেদের মানুষ করেছেন।
    আসলেই কি তার ছেলেরা মানুষ হয়েছে?
    যদি মানুষ হতো তো মধ্য রাতে নেশা করে বাড়িতে আসার সাহস পেত না।
    এই দিন দেখার আগে তার মৃত্যু হলো না কেন?
    এসব ভেবে ভেবে গতকাল রাতে থেকে চোখের ঘুম হারাম হয়ে গেছে।
    এটা তিনি কি দেখলেন তা ভেবে পাচ্ছে না।
    ছেলের এমন অধঃপতন কোন মা যে মানতে পারে না।
    প্রতিদিন ছেলেদের নামাযের জন্য ফজরের সময় ডেকে তুলেন তিনি।
    কিন্তু আজকে রাগ হয়ে ছেলেদের ডাক দেননি।

    অন্যদিকে
    শাহেদ বেপারি ঘুম থেকে ছয়টার দিকে উঠে পড়েছেন।
    আজকে ফজরের নামাজ মিস করেছেন।
    সে যত নেশা করেই বাড়িতে ফেরেন না কেন।
    বাড়িতে থাকলে ফজরের সময় তার মায়ের এক ডাকে ঘুম থেকে জেগে যায়।
    তাহলে কি মা আজকে তাকে ডাকতে আসেনি?
    নাকি ঘুমের মধ্যে মায়ের ডাক সে শুনেনি।
    কথাটা ভাবা মাত্র গতকাল রাতের কথা মনে পড়ে যায়।
    রাতের কথা মনে পড়ায় শাহেদ বেপারির চোখে থেকে ঘুম ছুটে গেছে।
    দৌড়ে মায়ের রুমে গিয়ে দেখে তার মা জানালা দিয়ে দূরে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন।
    শাহেদ বেপারির মনের মধ্যে কামড়ে উঠল।
    তার মায়ের এই দৃষ্টিভঙ্গি বলে দিচ্ছে ছেলের এমন অধঃপতন দেখে তিনি কি পরিমান কষ্ট পেয়েছেন।
    শাহেদ বেপারি মায়ের পা জড়িয়ে ধরে বললেন,মা আপনাকে এমন লাগছে কেন?
    শরীর খারাপ?
    ডাক্তারের কাছে যাবেন?
    ছেলের কথা শুনে চাঁদনী বানু শান্ত তবে দৃর কন্ঠে বলেন,যে মায়ের ছেলে নেশা করে রাত বিরাতে ঘরে ফেরে তার তো বেঁচে থাকার কথা নয়।
    কিন্তু দেখ তবুও বেঁচে আছি।
    মা! আপনি এসব কি বলছেন?
    আল্লাহ্ আপনাকে হাজার বছর হায়াত দান করুন।
    চাঁদনী বানু ছেলের কথা শুনে বিদ্রুপ করে বললেন, কেন যাতে ছেলের বেহায়াপনা দেখতে পারি।
    তোমার বাপ দাদার এতদিনের সঞ্চিত সম্মান নষ্ট করবে তা দেখার জন্য বাঁচব?
    শাহেদ তার মায়ের পা ধরে বললেন,মা আমার ভুল হয়েছে।
    আপনি আমায় যা খুশি শাস্তি দেন তবুও আমার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিবেন না।
    তাহলে যে আমার দুনিয়া অন্ধকার হয়ে যাবে।
    চাঁদনী বানু ছেলের কথা শুনে তাচ্ছিল্যের স্বরে বললেন,তা এখন বুঝি তুমি আলোতে আছো বাবা ?
    যার পুরোটাই অন্ধকারে ডুবে গেছে তার মুখে আলোর কথাটা যে শুনতে বড্ড বেমানান লাগে।
    তবে তোমাকে আমি এমনিতেও কথা বলতে ডাকতাম।
    ভালো হয়েছে তুমি নিজে থেকে আমার সাথে দেখা করতে এসেছ।
    শাহেদ একটা কথা কি জানো?
    কি মা?
    দুষ্টু গোয়াল থেকে শূন্য গোয়াল অনেক ভালো।
    তোমার অধঃপতন দেখে আমার আফসোস হচ্ছে সুমনার জন্য।
    তোমার সাথে ওর বিয়ে দিয়ে আমি ঠিক করিনি।
    ওর জীবনটা নষ্ট করে দিয়েছে।
    সেজন্য ভিতরে ভিতরে আমি শেষ হয়ে যাচ্ছি।
    মৃত্যুর পর আল্লাহর সামনে কিভাবে দাঁড়াব সেটাই ভাবছি।
    শাহেদ মায়ের কথা শুনে বললেন,মা ওই মেয়ে আপনাকে উল্টাপাল্টা বুঝিয়েছেন।
    ওর জন্য আমার ছেলেটা মারা গেছে।
    ও একটা অপেয়া অলক্ষী।
    চাঁদনী বানু তার ছেলের কথা শুনে রেগে বললেন, কোন মা ইচ্ছে করে কখনো নিজের সন্তানকে মারে না।
    আর শাহেদ তুমি কি ভুলে গেছ জন্ম মৃত্যু বিয়ে আল্লাহর হাতে।
    সেখানে সাইদুরের মৃত্যুর জন্য তুমি সুমনা কে দায়ী করতে পারো না!
    দশমাস কষ্ট করে সন্তানকে পেটে রেখেছে সুমনা।
    তাই তোমার থেকে ওর কষ্ট বেশি ছাড়া কম নয়।
    সে যায় হোক তোমাকে যে জন্য ডেকছি।
    মা আপনি হুকুম দেন।

    তোমাকে হুকুম দেওয়ার অধিকার আমার নেয়।
    আর শুনো শাহেদ বারবার মা বলবে না, আজকে থেকে আমি তোমার মা না।
    তোমার সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেয়।
    আর আজ থেকে তোমার দেওয়া বা কিনে আনা কোন কিছু আমি খাবো‌ না।
    আজকে থেকে আমার একটাই ছেলে সে হচ্ছে রাশেদ।
    শাহেদ বেপারি মায়ের মুখে এমন শক্ত কথা শুনে তার পা জড়িয়ে ধরে কেঁদে বললেন,মা মাগো আপনার পায়ের নিচে আমার জান্নাত।
    তা থেকে আমাকে বঞ্চিত করবেন না।
    শাহেদ পা ছাড়ো তোমার নেশা করার আগে কথাটা ভাবা উচিত ছিল।
    এখন এসব বলে লাভ নেয়।
    আর শুন আজ থেকে তুমি সুমনার সাথেও তোমার কোন সম্পর্ক নেয়।
    কারণ আমি যাকে পছন্দ করে ঘরে তুলেছি তাকে তো পায়ে পিষ্ট হতে দিতে পারি না।
    আজকে থেকে সুমনা আমার সাথে আমার রুমে থাকবে।
    এই বাড়িটি যেহেতু তোমার জন্ম দাতার ।
    জন্ম সুত্রে তার রেখে যাওয়া বাড়িতে যেহেতু তোমার অধিকার আছে ।
    সেজন্য বাড়ি থেকে বের হতে বলবো না।
    তাই বলে তুমি তোমার রুমে যা ইচ্ছে করতে পারবে না।
    আর এই মুহূর্তে আমার সামনে থেকে দূর হয়ে যাও।

    সেদিনের পর থেকে কেটে এক মাস।
    এই এক মাসে চাঁদনী বানু সুমনাকে শাহেদ এর সাথে কথা বলতে বা দেখা করতে দেয়নি এমনকি নিজেও ছেলের সামনে আসেননি।
    ছেলের তার কাছে এলে ভুলে কথা বলেননি।
    শাহেদ বেপারি ছোট থেকেই মা বলতে পাগল।
    আর একমাস ধরে মায়ের সাথে কথা বলতে না পেরে তার পাগল পাগল অবস্থা।
    অন্যদিকে সুমনা শ্বাশুড়ির হাতে পায়ে ধরেও স্বামীর কাছে যাওয়ার অনুমতি পায়নি।
    চাঁদনী বানু মনে করেন,সে এখন নরম হলে তার ছেলে কখনও ভালো হতে পারবে না।
    তার ছেলে মানুষ হিসেবে তেমন খারাপ নয়।
    কারণ তার বড় ছেলে কখনও কারও বিপদে এগিয়ে আসে না।
    কিন্তু শাহেদ সব সময় যে কারো বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়ে।
    টাকা পয়সা দিয়ে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ান।
    যাদের বিয়ে হয় না তাদের বিয়ের জন্য টাকা দেয়।
    হয়তো ছেলেটা সঙ্গ দোষে এমন নষ্ট হয়েছে।
    সেজন্য সে নিজে ছেলের থেকে দূরে থেকে ছেলেকে শাস্তি দিচ্ছেন।
    এভাবে কেটে যায় আরও ১৫ দিন।
    মায়ের মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার কারণে দিন দিন শাহেদ বেপারির শরীর খারাপ হতে থাকে তা দেখে সুমনা শাহেদ বেপারিকে ক্ষমা করে দিতে বলেন তার শ্বাশুড়িকে।
    শাহেদ অসুস্থ শরীর নিয়ে মায়ের পায়ের কাছে পরে থাকেন।
    মাফ পাওয়ার আসায়।
    চাঁদনী বানু তো একজন মা।
    মা হয়ে ছেলের এমন করুন অবস্থা দেখতে পারেন না।
    ছেলেকে মাফ করে দেন।
    তবে তার আগে আর কখনো এমন কিছু দেখলে আমার মৃত্যুর পর আমাকে শেষবারে দেখার অধিকার কেড়ে নিতে আমার ভুল হবে না।
    এটা বলতে ভুলেনি।
    শুধু এতটুকুই কথায় যথেষ্ট ছিলেন শাহেদ বেপারির জন্য।
    শাহেদ বেপারি দীর্ঘ দুই মাস পর তার মায়ের পায়ে মাথা রেখে নিরবে কেঁদে যাচ্ছে।
    ভুলের চোরাবালিতে ফেঁসে মায়ের থেকে অনেক দূরে সরে গিয়েছিল।
    মা বলার বা মায়ের জন্য কিছু করার অধিকার হারিয়েছিলেন।
    কিন্তু তার মা তাকে আবারও মা বলার অধিকার দিয়েছেন।
    সেজন্য সে তার মায়ের কাছে কৃতজ্ঞতার শেষ নেয়।
    তবে এই অধিকার ফিরে পাওয়ার ব্যাপাটা তার কাছে অবিশ্বাস্য লাগছে।
    এদিকে চাঁদনী বানু ছেলে দিকে তাকিয়ে বললেন, শাহেদ বাবা আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করো। তোমাকে দ্বিতীয় বার বাবা হওয়ার সুযোগ দিয়েছেন।
    কথাটা শুনে শাহেদ চমকে উঠে!
    সে আবারো বাবা হচ্ছেন তা কি করে সম্ভব?
    সুমনার সাথে প্রায় মাস খানেক এর বেশি সময় ধরে তার সাথে দৈহিক সম্পর্ক নেয়।
    মা এসব কি বলছেন।
    চাঁদনী বানু হয়তো ছেলের মনের কথা বুঝতে পারছেন।
    সেজন্য বলে উঠলো।
    তোমার সন্তানদের জন্য সুমনা পাঁচ মাস ধরে অসুস্থ।
    কিছু খেতে পারছে না।
    আর তোমার সেদিকে খবর নেয়।
    আমি না বললে তো মনে হয় বাচ্চা হওয়ার পর জানতে।
    তুমি কেমন বাবা?
    আমার ছেলেকে তো এতটা উদাসীন হওয়ার কথা নয়।

    শাহেদ বেপারি মায়ের কথা শুনে বুঝতে বাকি থাকে না। তার স্ত্রী পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা।

    দেখতে দেখতে সব কিছু আগে মতে হয়ে গেছে তবে ভিতরে ভিতরে একটা কিন্তু থেকে যায় ।
    রিটা কি চুপ করে থাকবে।
    শাহেদকে পেতে যে মেয়ে এতো মারপ্যাঁচ করেছে।
    দেখতে দেখতে কেটে যায় কয়েক বছর
    এখন শাহেদ বেপারির ঘরে দুই ছেলে ও এক মেয়ে।
    শাহেদ বেপারি বড় ছেলেটাও কম সুন্দর নয়। খাড়া নাক ফর্সা গায়ের রং শান্তশিষ্ট ।
    তবে দেখতে সাইদুর এর মত নয়।
    আর মেঝো ছেলেটার গায়ের রং পাকা সুন্দর,চোখ হালকা ছাই কালার ।
    চেহারায় কেমন একটা মায়াবী।
    আর তাদের ঘরে ছোট সদস্য হচ্ছে তাদের মেয়ে। পুতুলের মতো দেখতে।
    বিদেশীদের মত ফর্সা, বাদামী চোখ যে কারো নজরে পরার মতো।
    অবশ্য শাহেদ বেপারির ছোট মেয়েটিকে প্রথমে যে কেউ দেখলে বিদেশি ভাবে।
    শাহেদ বেপারির, তার পরিবারের সবাইকে নিয়ে আনন্দে দিন কাটাচ্ছেন।
    তবে কতদিন এমন আনন্দে কাটবে বলতে পারছেন না।
    ইদানিং মনটা অস্থির হয়ে আছে।
    এদিকে
    চাঁদনী বানু তো দুই ছেলের নাতি নাতনি নিয়ে খুশিতে আত্মহারা হয়ে আছেন।
    বড় ছেলের ঘরে দুই ছেলে তিন মেয়ে আর ছোট ছেলের ঘরে দুই ছেলে এক মেয়ে।
    প্রতি রাতে তার নাতি নাতনি ঝগড়া শুরু করেন কে শুবে দাদুর কাছে।
    এরমধ্যে বড় ছেলের ঘরে দুই নাতি বেশ বড় হয়েছে।
    সেজন্য তারা আলাদা রুমে ঘুমান।
    আর বড় ছেলের ছোট মেয়ের বয়স আট মাস সেজন্য সে মায়ের সাথে ঘুমায়।
    আর ছোট ছেলের ঘরে ছোট মেয়ের বয়স দুই মাস সে তার মায়ের সাথে ঘুমায়।
    বাকি চার নাতি নাতনি দাদুর কাছে ঘুমাতে যুদ্ধ বাঁধায় ।
    নাতি নাতনি এর খুনসুটিতে সময় ভালোয় যাচ্ছে।
    তাদের দিনগুলি বেশ আনন্দে কেটে যাচ্ছে।
    কেটে যায় আরও কিছুদিন

    এরমধ্যে হঠাৎ করে একদিন ভোর রাতে ওযু করতে গিয়ে সুমনা দেখেন কলপাড়ে সাদা কিছু পড়ে রয়েছে।
    প্রথমে ভয় পেলেও পরে ভাবলেন তার বড় ঝা হয়তো চালের বস্তা রেখেছেন।
    সেজন্য বস্তা ভেবে সরিয়ে রাখতে সাদা বস্তুতে হাত দিয়ে আল্লাহ বলে চিৎকার দিলেন

    #চলবে।

    বিঃদ্রঃঃ লেখার ভুল ত্রুটি হলে ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন না হলে ভুলগুলো ধরিয়ে দিবেন।
    লেখাটা ভালো লাগলে আপনাদের মূল্যবান মতামত জানাবেন।

    15
    11 Comments

Saifun nesa Shima

Housewife

Skip to toolbar