-
অভাববোধ:
ছোট বেলা থেকে এখন অবদি জীবনের প্রতিটি বাঁকে বাঁকে মনের বাড়ির অরক্ষিত দরজায় একজন অজানা অচেনা অস্তিত্বহীন মানুষ প্রায়শই কড়া নাড়তো। বাস্তবে তার উপস্থিতি না থাকলেও জীবনের প্রতিটি বাঁকে বাঁকে মনের বাতায়নে তার অভাববোধের জানান দিয়ে গেছে, এখনো যাচ্ছে। সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে জীবনের গতিপথ অনুযায়ী অদৃ্শ্য মানুষটির কাছ থেকে প্রাপ্ত চাহিদার পরিবতন হয়েছে, চাহিদার বৈচিত্র্য়য়ন এসেছে কিন্তু জীবনে এ অদৃশ্য মানুষটির অভাববোধের পরিবর্তন হয়নি বরংচো দিন দিন তার অভাববোধ বেড়েই চলছে, ইদানিং যেন আরও বেশি করে তার অভাববোধটি অনুভব করছি।যখন প্রাইমারি স্কুলে পড়তাম তখন স্কুলেই হোক আর বাড়িতেই হোক বন্ধুদের সাথে খেলাধুলা করা টাই ছিল মুখ্য আর পড়াশোনা ছিল গৌণ। পড়াশোনাটা করতাম শুধুমাত্র বাবা-মার বকুনি আর শিক্ষকদের বেতের ভয়ে। এই সময়টাতে যখন বাবা-মা খুব বকুনি দিত, চাহিদা মতো বাবা-মার কাছ থেকে আবদারকৃত জিনিসগুলো পেতাম না, খেলাধুলার উপকরন না থাকায় বন্ধুরা খেলাধুলায় নিতো না, স্কুলের টিচাররা পড়া না পাড়ার কারনে মারতো তখন মনটা সাদা বেদনায় ভরে যেত। তখনকার সে ছোট্ট মনের অব্যক্ত সাদা কষ্টগুলো সাদা মেঘের ভেলায় ভাসিয়ে দেয়ার জন্য একজনকে খুজতাম। এই খুজে না পাওয়া থেকেই বোধ হয় আমার ভিতরে এই অস্তিত্বহীন মানুষটির জন্ম এবং আমার সাথে তার পথচলা শুরু।
প্রাইমারী ছেড়ে যখন হাইস্কুল ও কলেজে আসলাম তখন পড়াশোনাটি হয়ে গেল মুখ্য আর লেখাধুলাটি হয়ে গেল গৌণ। পড়াশোনার পাশাপাশি জীবনে যোগ হতে থাকলো বিপরীত লিঙ্গের ছোট ছোট লাল, নীল প্রজাপতিদের সাথে বন্ধুত্ব করা অসম প্রতিযোগিতা। এ বয়স থেকেই মনে হয় লাল-নীল প্রজাপতিদের প্রতি ভালোলাগা-ভালোবাসার জন্ম হয়ে থাকে। সময়ের সাথে সাথে জীবনে পড়াশনার চাপ, প্রজাপ্রতিদের সাথে বন্ধুত্ব করার অসম প্রতিযোগিতার চাপ, প্রত্যাশার চাপ ক্রমশই বৃদ্ধি পেতেই থাকে, যা আমার সরল মনটিকে নীল কষ্টে ভরিয়ে দিত। এই নীল কষ্টগুলো নীল মেঘের ভেলায় ভাসিয়ে দেয়ার জন্য এ সময়টিতেও একটি মানুষের ভীষন অভাববোধ করেছি।
কলেজ পেরিয়ে যখন ইউনিভার্সিটিতে গেলাম তখন পড়াশোনাটি হয়ে গেল মুখ্য আর লেখাধুলাটি চিরদিনের জন্য হারিয়ে গেল জীবন থেকে। এখানে এসে দেখলাম স্কুল –কলেজে দেখা ছোট ছোট প্রজাপ্রতিগুলো পাখনা মেলে স্বপ্নের ডানায় ভর করে পুরো ক্যাম্পস দাপিয়ে বেড়াচ্ছে, মুগ্ধতার বৃষ্টি ছড়িয়ে একে অপরকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছে। কেউ কার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে যাচ্ছে, কেউ নীল বেদনা নিয়ে একে অপরকে ছেড়ে যাচ্ছে, কেউ আবার ভবিষ্যতের তাজমহল বানাচ্ছে। এখানেও যোগ্যতা ও পছন্দের অভাবে প্রজাপতি ধরার প্রতিযোগিতায় নামতে পারিনি। এই যে প্রজাপ্রতি না ধরার একটি নীল কষ্ট, পড়াশনা নামক ইদুর-বিড়াল দৌড়ের প্রতিযোগিতার চাপ, আথিক দৈন্যতার চাপ, পারিবারিক মূল্যবোধের চাপ, ধমীয় মূল্যবোধের চাপ, রাজনৈতিক মতাদর্শের চাপ, মিশ্র সংস্কৃতির চাপ এবং পড়াশোনা শেষে ভালো চাকুরি পাওয়ার চাপ আমাকে ভীষনভাবে লাল কস্টে জজরিত করে ফেলতো। এই লাল কষ্টগুলো লাল মেঘের ভেলায় ভাসিয়ে দেয়ার জন্য এ সময়টাতেও একজন মানুষের ভীষন অভাববোধ করেছি।
ইউনিভাসিটি পেরিয়ে চাকুরি জীবনে আসলাম। এখানে এসে ফেস করতে থাকলাম কাজের চাপ, প্রযুক্তির চাপ, উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সময়মতো কাজ ডেলিভারি দেয়ার চাপ, ভালো অফিসার হওয়ার চাপ, প্রত্যাশা অনুযায়ী প্রাপ্তির চাপ, সময়মতো অফিসে আসার চাপ, নীতি-নৈতিকতার চাপ, সৎ থাকার চাপ, ভালো এসিআর প্রাপ্তির চাপ, সম্মান রক্ষার চাপ, পরাফরমেন্সের চাপ এবং চাকুরির নিরাপত্তহীনতার চাপ। এই নানামুখি চাপে প্রায়ই পরিবারের কথা, বন্ধু-বান্ধবের কথা, আত্বীয় সজনের কথা ভুলতে বসেছি। এ এক অদ্ভত জীবন। যে জীবনে কাউকে বিশ্বাস করাটাই দুরুহ। সবাই যেন একে অপরের প্রতিযোগি। খুব ইচ্ছে করে এ চাপযুক্ত জীবন থেকে বেরিয়ে মুক্ত পাখির ডানায় ভর করে চাপহীন পৃথিবীর কোন এক প্রান্তরে চলে যেতে এবং কোন এক পাল তোলা নৌকায় বসে ঝিরিঝিরি বাতাসে গা এলিয়ে একটি বিশ্বস্থ হাত ধরে বুকের গহীনে জমানো চাপগুলো শেয়ার করতে। এই জীবনেও এমনটি একটি বিশ্বস্থ হাতের অভাববোধ করছি।
ইউনিভার্সিটি জীবন শেষ করে চাকুরি জীবনের শুরুর দিকেই কোন এক গোধূলি বিকেলে ঘরোয়া পরিবেশে পারিবারিকভাবে খুব সাদামাটা আটপৌড়ে এক ষোড়শীর হাতে হাতে রেখে সুখে দুখে একসাথে চলবো প্রতিশ্রুতি দিয়ে অজানা অচেনা এক জীবনে প্রবেশ করলাম। যে জীবনের প্রতিটি গলিই ছিল নতুন, যা প্রতি নিয়ত রং বদলায়, কখনো কালো, কখনো লাল, কখনো সাদা, কখনো আবার নীল। প্রতিদিন নতুন রুপে, নতুন গন্ধে, নতুন আবহে আসে। এই জীবনের সাথে তাল মিলে চলতে গিয়ে কখনো সুখে ভেলায় ভাসতে থাকি আবার কখনো অব্যক্ত চাপা কষ্ট নিয়ে ঘুরে বেড়াই। এ যেন বড্ড রহস্যে ভরপুর এক দুর্ভেদ্য জীবন। যে জীবনে প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর আমার জানা নেই। প্রতিদিনও নতুন প্রশ্ন আর সেই প্রশ্নের উত্তর খোজার নিরন্তন চেষ্টা। এই উত্তর খোজার জন্যেও একটি বিশ্বস্থ হাত, উদার মন, চওড়া কাধওয়ালা একজন optimistic মানুষের অভাববোধ করছি।
জীবনের প্রতি বাঁকেই বাবা-মাকে বন্ধু হিসেবে পেয়েছি, জীবনের গতিপথ অনুযায়ী কিছু অসম্ভব ভালো বন্ধু পেয়েছি, বড় ভাই পেয়েছি, বন্ধুবৎসল সহকমীসহ চাকুরি পেয়েছি, বউ-বাচ্চা কাচ্চা নিয়ে একটি সুন্দর সংসার পেয়েছি, যারা প্রতি নিয়তই আমাকে প্রয়োজনানুযায়ী সাপোট, উৎসাহ এবং সাহস দিয়ে গেছে এবং দিয়ে যাচ্ছে। এতো প্রাপ্তির পরেও অবচেতন মন জীবনের প্রতিটি বাঁকেই একজন মানুষের অভাববোধ করে এসেছে।
এই যে আমার ভিতরে একজন অস্তিত্বহীন মানুষের অভাববোধে তাড়না সারা জীবন আমাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে এটি কি স্বাভাবিক?? যদি স্বাভাবিক হয় তবে আপনার ভিতরেও কি এই ধরনের অভাববোধ কাজ করে? আর যদি স্বাভাবিক না হয় তবে কেন এমন হয় বলতে পারবেন আমাকে??
মজনু সরকার
১০ সেপ্টেম্বর, ২০২১।6 Comments
Friends
বিলকিস খানম কাজল
@bilkiskhanam-kazal
কবি মোঃ সামিদুল ইসলাম
@samidul
Md. Nur Alam (এইচ. এম নুর আলম)
@nuralam
আনোয়ার পারভেজ নূর শিশির
@anwar-parvez-nur-shishir
Humayun Kabir Surjo
@humayunkabir-surjo
Kazi Zuberi Mostak
@kazi-zuberi-mostak
মাহ্দী সাকিব
@mahdi-sakib
নন্দিনী
@nandini-chowdhuri
ইফতিশা খানম
@eftishakhanam


আধুনিক মানুষের মানসিক সংকট যেন। খুব সুন্দর মোলায়েম ভাষায় লিখেছেন। লেখাটা পড়োতে পড়োতে কেনে যেন এলিয়টের কবিতা মনে পড়ে যেয় …
” …
Shall I say, I have gone at dusk through narrow streets
And watched the smoke that rises from the pipes
Of lonely men in shirt-sleeves, leaning out of windows? … ”