-
ধারাবাহিক গল্প
:::::::::::::::::::::
জমশেদ আলীর মেহমানদারী
—— শাহ্ কামাল(১)
ফুলপুরের জমশেদ আলী তালুকদার। সবাই ডাকে জমু বলে।তালুকদারী না থাকলেও ঠাটবাট কম না। জমিদারী হালতের বারান্দা ওয়ালা চৌচলা একটা ঘর আছে। দূর থেকে দেখলে বোঝা যায় এ বাড়ি কেউ থাকে না। সামনে একটা ছোট্ট উঠোন। উঠোন বললে ভুল হবে। পুরনো কালী মন্দিরের পিছন ধারের জঙলা বলা যায়। যেখানে রাত বিরেতে ভুত সর্দার আড্ডা দেয় সাঙ্গো পাঙ্গো নিয়ে। জমু’র বাড়িতে তেমন কোন হল্লা থাকে না। একটা মেয়ে। চম্পা।বারো বয়স। জমু তাকে আম্মাজান, চম্পা বলে ডাকে। বউ গোলাপজাম বিবি। সারাক্ষণ নতুন বউদের মতো ঘোমটা টেনে ঘরের এক কোণে বসে বসে ধ্যান করে। খোদার ভক্তি আর জ্বিন সাধনায় তাঁর কোন তুলনা নাই এ তল্লাটে।
জমু’র বয়স দিনকে দিন কম হলো না। সাদা একটা হাফ হাতার গেঞ্জি আর লুঙ্গি ছাড়া আর কোন পোশাক কেউ তাকে পরতে দেখেনি কোন দিন। জুতা পরার অভ্যাসও নাই।
জমু’র একটা সখ চেপেছে মাথায়। গরীবের সখ। মেলা বছর হয় মেহমানদারী করা হয় না। অবশ্য মেহমানদারী করার মতো শান শওকতও নাই তাঁর। বারান্দায় বসে চম্পা মাটির পুতুল বানাচ্ছে। জমু পা দুটো উঠোনে রেখে বারান্দায় বসে আছে। গামছা দিয়ে মুখটা মুছতে মুছতে জমু চম্পাকে বলল,
– আম্মাজান, চম্পা।
মাটির পুতুলের মুখ টিপতে টিপতে চম্পা উত্তর দিলো,
– জ্বি আব্বা।
– কি কর আম্মাজান?
– পুতুল বানাই আব্বা।
– পুতুল! মাটির পুতুল! মূর্তি ! শোন আম্মাজান, চম্পা। একটা কথা কই।
জমু পা দুটো বারান্দায় তুলে মেয়ের দিকে ঘুরে আবার বলতে শুরু করল,
– মাটির পুতুল বানান পাপ। এই যে পুতুল বানাইতাছো তুমি তার জান দিতে পারবা না। আল্লাহপাক নারাজ হইবো। তোমারে মেলা পাপ দিবো।
– নারাজ কী, আব্বা? চম্পা জানতে চায়। বাবার কথা শুনে তাঁর পুতুল বানানো বন্ধ করে মন দিয়ে সে বাবার কথা শোনে।
– নারাজ? নারাজ হইল অপছন্দ। দেহ আল্লাহ পাক বানাইয়া রুহু দিয়ে এই জগতে পাঠায়। দেহ বানান মানুষের কাম না। তাই পাপ হয়।
– আব্বা, আমার কী পাপ হইছে?
– হইছে। তুমি তো ছোট। আল্লাহপাক ছোট বাচ্চাদের পছন্দ করে। তারা মাছুম। আর বানাইয়ো না।
– আচ্ছা। বানামু না।
– তুমি তো কত্তো সুন্দর পাতিল বানাও। ওগুলাই বানাইয়ো আম্মাজান।
– জ্বি আচ্ছা।
– আম্মাজান, চম্পা। আমার একটা বাসনা হইছে।
– কী বাসনা, আব্বা?
– মেহমানদারী করাবো। ময়মুরুব্বী দাওয়াত করবো।
মেহমানদারীর কথা শুনে চম্পা খুব খুশি হয়। শহরের শিশুরা দূর ভ্রমণের কথা শুনলে যেমন খুশি হয় চম্পা আজ তেমন খুশি।
– মেহমানদারী করাইবা! হাছাই আব্বা?
– হ আম্মাজান। আমার বহু দিনের ইচ্ছা। মৌলভী সাব আর গেরামের সব ময়মুরব্বী দাওয়াত দিমু। হাঁসের গোশত দিয়া চিকন চাউলের গরম ভাত।
– খুব ভালা হইবো।
– জ্বি, আম্মাজান। মা’য় রে যাইয়া কই।
– এহন না। পরে কইয়ো। জ্বিন সাধোন করতাছে। বলা যায় না এহন কোন জ্বিন লগে আছে। বদ জ্বিন হইলে মসিবৎ।গেদু পাগলা। মাথায় সীট। কাঁদে একটা মহিষের শিং সব সময় থাকে। ডান হাতে থাকে একটা লোহার রড। উপরটা সামনের দিকে বাঁকীনো আর নিচে চোখা। কোমর হতে হাঁটু পর্যন্ত চটের বস্তা ছাড়া অন্য কোন পোশাক আশাক কেউ কখনো দেখেনি। গ্রামের মাঝ পথে তাঁর সাথে জমু’র দেখা।
– গেদু…..
ডাকতেই একটা আধ্যাত্মিক ভাব নিয়া গেদু থামলো। চোখ বন্ধ করে সজোরে ডান হাতের লোহার রডটা মাটিতে গেঁথে চিৎকার করে সে বলল,
– হ্যাৎ মাওলা, হ্যাৎ।
– সামনে শুক্কুর বার আমার বাড়ি যাইয়ো।তোমার দাওয়াত। জুমা বাদ। মেহমানদারী করামু। হাঁসের গোশত দিয়া চিকন চাউলের গরম ভাত। যাইবা কইলাম।
– হুম। যামু…. যামু….. পেট ভইরা খাওয়াবি…
– আইচ্ছা। যাই। মৌলভী সাবেরে দাওয়াত দিমু।
চোখ বন্ধ করে জমুকে কাছে ডাক দিলো গেদু পাগলা। বা কাঁদের মহিষের শিংটা কাৎ করে একটু সরিষার তেল দিলো জমু’র মাথায়। কতোদিন তাঁর কাছে একটু
তেল চেয়ে পায়নি। অথচ গেদু আজ ইচ্ছে করেই তেল দিল জমুকে। এই তেলে অনেকের ভক্তি। রোগে-শোকে, নানা ধরনের শরীর বেদনায় ভাল কাজ দেয় গেদুর তেলে। তবে সে সবাইকে এই তেল দেয় না। অনেকে চেয়েও পায় না। কারো মাথায় মেখে দিলে খোদার ফজলে তার দিন যাপন নাকি ভাল যায়; বরকত আসে।
তেল দিয়ে চোখ বন্ধ করে ডান হাতটা মাটিতে গাঁথা রডের আগায় রেখে গেদু একটা আধ্যাত্মিক ভাব নিয়ে জমুকে বলল, যাহ….।
একটু আগে আসরের নামায সেড়ে হুজরায় বসে কিতাবের পৃষ্ঠা উল্টাচ্ছে মৌলভী সাহেব। দরজার কাছে গিয়ে চুপচাপ দাঁড়ালো জমু।
– স্লামালাইকুম, হুজুর।
মৌলভী সাহেব ভ্রু কুঁচকে তাকালেন। অনেকটা না তাকানোর মতোই। জমু’র সালামের ধরণটা মনেহয় পছন্দ হয়নি। কিঞ্চিত বিরক্ত হয়ে সালামের জবাব দিলেন,
– ওয়ালাইকুম।
– হুজুর, পুরো জবাবটা দিলেন না?
– পুরা জওয়াব!! তুমি সালাম দিতে জানো, মিয়া? স্লামালাইকুম কোন সালাম হইলো?
– তয় ক্যামনে দিমু, হুজুর? বাপ দাদারা তো এমনেই দিতো।
– শোন জমু।
– হুজুর আমি জমু না। জমশেদ আলী তালুকদার। আকীকার দিন হুজুর এই নামডাই রাখছে।
– আহা বুঝলাম। সবাই তো জমু ই বলে।
– আফনে হুজুর মানু। আফনে বললে….
– আচ্ছা শোন। সালাম দিবা এইভাবে, আসসালামু আলাইকুম। দাও তো দেখি।
– হুজুর একবার তো ছালাম দিলাম।
– সহী কইরা আবার দাও।
– আচ্ছা। দেই। এক দেখায় তো দুইবার দেওন যায় না। আমি একটু ঘুইরা আইসা আবার দিতাছি, হুজুর।
জমু হুজরা হতে একটু দূরে গিয়ে আবার আসলো হুজরার সামনে।এসেই হাত তুলে মৌলভী সাহেবকে সালাম দিলো,
– আসসালামালাইকুম, হুজুর।
– ওয়ালাইকুম। তা এইবারও তো হইলো না। তবে ঠিক হইয়া যাইবো।
– জ্বি হুজুর। দোয়া করবেন।
– ফি আমানিল্লাহ। আসছিলা ক্যান, জমু?
– সামনে শুক্কুর বার আমার বাড়ি একটু পায়ের দুলা দিতেন যুদি।জুমা বাদ। মেহমানদারী করামু। হাঁসের গোশত দিয়া চিকন চাউলের গরম ভাত। আফনে ছাড়া তো সম্ভব না। ময়মুরুব্বী সবাইরে বলবো।
– মেহমানদারী! তোমার বাড়ি? কও কী! কুঁড়ি বছরে দেখলাম না মিলাদ পরাইতে। তুমি তো নামাযও পড়ো না। তোমার বাড়ি ক্যামনে যাই?
– নামায পড়ি, হুজুর। সব সম না। ফেরে কচিতে।
– আচ্ছা যাও। ইনশাল্লাহ যামুনে।
– আলহামদুলিল্লাহ। খুশী হইলাম, হুজুর। আসসালামালাইকুম।
– ওয়ালাইকুম।
জমু খুশি মনে রওয়ানা হলো।
(চলবে)-
তুলটের পক্ষ থেকে অজস্র অভিনন্দন! আপনার এই লেখাটি আজ 17 October 2021 তারিখে ‘জনপ্রিয় অবদান’ হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে। আজ সারাদিনের জন্য এই লেখাটি লেখকমঞ্চের সকল সদস্যের দেয়ালে (বন্ধু/অবন্ধু নির্বিশেষে) প্রদর্শিত হবে। তুলটে আমাদের সাথে থাকার জন্য এবং এই মঞ্চকে একটি আনন্দদায়ক ও জনপ্রিয় মঞ্চ হিসাবে চালু রাখাতে আপনার এই অবদানের জন্য আমরা কৃতজ্ঞ ও আনন্দিত!
Friends
Rakib Rakib
@abdurrakib
Md Ashfak Sayed
@ashfak
আব্দুল মজিদ মারুফ
@abdulmojid
আনোয়ার পারভেজ নূর শিশির
@anwar-parvez-nur-shishir
ইফতিশা খানম
@eftishakhanam
Md.Emamuzzaman Wahedi
@emamuzzaman
মাহ্দী সাকিব
@mahdi-sakib
Foyzur Khan
@foyzur-khan
sanjida akter jim
@sanjidajim


গল্পটায় বেশ কিছু মজাদার বিষয় রয়েছে। লেখকের বেশ কিছু সুন্দর কবিতার পর গল্পটি পেয়ে আরো বেশি আগ্রহ বোধ করছি। পরবর্তী পর্বের অপেক্ষায় রইলাম। শুভেচ্ছা নেবেন।