-
ধারাবাহিক গল্প
:::::::::::::::::::::#জমশেদ আলীর মেহমানদারী
—— শাহ্ কামাল
(৫)
একে একে মসজিদ হতে লোকজন বের হচ্ছে। এশার নামাজ শেষ হলো। জমুও মসজিদে এসেছে নামাজ পরতে। নামাজ শেষে সে বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। মুরুব্বী মুসুল্লীদের সাথে একটু আধটু কথা হচ্ছে। মৌলভী সাহেবের সাথে কথা হলতে দাঁড়িয়ে আছে সে। সবাই বের হবার পর মৌলভী সাহেব ধীরে ধীরে বাইরে আসতেই তাকে লম্বা করে সালাম দিলো জমু। সালামের জবাব দিয়ে মৌলভী সাহেব বলল,
– মাইকে তো এলান করাইলো চেয়ারম্যান সাহেব। আরো একবার কী এলান কইরা দিমু?
– না হুজুর। আর এলানের দরকার নাই। অনেকেই জানতে পারছে। একডা কথা জিগ্যাসার ছিল, হুজুর।
– কী কথা?
– আমাগো গেরামে ময়মুরুব্বী কত জন হইবো?
– কঠিন প্রশ্ন জিগ্যাসা করলা। দাঁড়াও একটু ভাইবা বলি।
– আচ্ছা।
মনেমনে একটু সময় বিড়বিড় করে মৌলভী সাহেব বললেন,
– তুমি কাল চেয়ারম্যানের কাছে যাইও। ওনারা সঠিক বলতে পারবো।
– খারাপ বলেন নাই, হুজুর।যাই অহন।
জমু হুজুরের কাছে প্রশ্নের উত্তর না পেলেও বুদ্ধি একটা ভালোই পেয়েছে। এতেই সে সন্তুষ্ট।হরিহর চন্দ্র শীল। ফুলপুরে বসবাস বহু বছর আগে থেকেই। পৈত্রিক ভিটা এখানে তাদের। ছেলেপুলে নিয়ে নয় জনের বসবাস তাঁর বাড়ি। বড়ো ছেলের বউ সন্তান সম্ভবা। নতুন আরেকজন সদস্য জন্মাবে তাদের পরিবারে। বাজারে দুইটা সেলুন ঘর। হরিহরের দুই ছেলে দুই দোকানের কর্ণদার। কাজ ভাল। উপার্জনও খারাপ না। গ্রামে সবচেয়ে সুখী পরিবার তাদের। খুব একটা ঝগড়া ঝাটি হয় না। জমু খুব সম্মান করে হরিহরকে হরিকাকা বলে ডাকে। হরিহরের বয়স সত্তর পেরিয়ে গেছে। চোখে চশমা পরে। আজকাল ভাল দেখে না। কোন কাজ না করলেও সব সময় ব্যস্ততার মধ্যে থাকে। কখনো বাজারে যাওয়া, কখনো পুকুরে মাছ ধরা, কখনো গাছের ডাল কাটা আবার কখনো বা মাচানের লতা ডগা এলিয়ে দিতে ব্যস্ত। তাঁর হাঁটার মধ্যেও একটা ঢং আছে। একটু কুঁজো হয়ে হনহনিয়ে হাঁটে।
মাইকে যতোই এলান হোক কিছু কিছু মানুষকে কাছে গিয়ে না দাওয়াত দিলে অসম্মান হয়। তাই জমু হরিহরের বাড়ি এসেছে। হরিহর খুব খুশি হয় জমুকে দেখে।
ভদ্রতার সাথে হরিহরকে সম্বোধন করে জমু,
-হরিকাকা, কেমন আছেন? শইলডা ভালা?
সাদা চুলের হরিহর সাথে সাথে একগাল তৃপ্তির হাসি দিয়ে জবাব দেয় জমুর প্রশ্নের,
– ভালা আছি। ভগবান খুউব সুখে রাখছে, জমু। তোমরা ক্যামন আছো?
– আলহামদুলিল্লাহ। আল্লার দয়ায় ভালা আছি।
– আমি শুনছি তুমি মেহমানদারী করাইবা।
– যাইবেন কিন্তু। আগামী পরশু। বাদ জুমা। হাঁসের গোশত দিয়া চিকন চালের গরম ভাত। সব ময়মুরুব্বী বলছি।
– না গেলে হয় না, বাবাজি?
– কী বলেন কাকা? আমরা মুসলমান দেইখা যাইবেন না?
– এইডা কী বললা! তোমরা বললে না করি কোন দিন? বয়স হইছে। পা চলতে চায় না।
– অত কথার কাম নাই। যাইতে হইবো, কাকা।
– আচ্ছা। যামুনে…
হরিহর তাঁর দাওয়াতে যাবে শুনে জমু খুশি মনে হাঁটা শুরু করে চেয়ারম্যান অফিসের দিকে। ফুলপুরের ময় ময়মুরব্বীর সংখ্যাটা জানা দরকার। কতো মানুষ পরিচিত কিন্তু দাওয়াতের বেলা সঠিক মানুষ চেনাটা জরুরী। তাছাড়া যোগার যন্তের একটা বিষয় আছে। হাতের কর গুণে গুণে মানুষ জন হিসেব করাটা মুশকিল।তাই জমু চেয়ারম্যান অফিসের দিকে রওয়ানা হয়েছে।
আকরাম খাঁ। ইউনিয়ন পরিষদের সচিব। অফিসে তাঁর হাজার ব্যস্ততা। এরমধ্যেই তাঁর সামনে জমু হাজির। জমুকে দেখেও না দেখার ভান ধরলো আকরাম খাঁ। চেয়ারম্যান এখনো অফিসে আসেনি বলে তাঁর সামনে জমু। ময়মুরুব্বীর সংখ্যা জিজ্ঞেস করতেই রেগে যায় আকরাম।
– তোমাদের খেয়ে দেয়ে কাজ নাই মিয়া। ময়মুরুব্বীর সংখ্যা জানতে ইউনিয়ন অফিস আসছো।
– ক্যান? আফনেরা জানেন না?
জমুর এ প্রশ্নের উত্তরের আগেই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা খোড়া মজিদ বলে,
– ফুলপুর মুরুব্বীর সংখ্যা পাইতিরিশ জন হইবো। ছিল সাইতিরিশ জন। গত বছর তুফানে মরলো আবুলের বাপ। কয় দিন আগে মরল ছিদ্দিক মিয়া। অহন পয়তিরিশ জনই হইবো।
জমু তাঁর প্রশ্নের উত্তর পায়। আকরাম খাঁ চুপ হয়।
গ্রামের মানুষ দাওয়াত পেল কিন্তু একমাত্র শ্বশুরকে বলা হয় নাই। কাজটা ঠিক হয় নাই। ঘর সংসারের আবহাওয়া ঠিক রাখতে শ্বশুর বাড়ির লোকজন মাঝেমধ্যে দাওয়াত দিয়ে খাওয়াতে হয়।
শ্বশুর বাড়ি অনেক বছর পর যাচ্ছে জমু। কিছু নিয়ে যাওয়া দরকার। ঐ বাড়িতে শালা-সম্বন্ধিদের ছেলেমেয়ে আছে। কি নিবে? ভাবতে ভাবতে বাজারে এসেছে সে। বাজারের শেষ দোকানটা ভানু’র। ভানু’র দোকান হিসেবে যথেষ্ট জনপ্রিয়। মুড়ি-মুড়কি, বাতাসা, লজেন্স থেকে শুরু করে চাল, ডাল, তেল, সাবান সবই পাওয়া যায়। দোকানের পাশে একটা ছাগল বাঁধা থাকে সব সময়। ছাগলের জাবর কাটা দেখে বোঝা যায় কতো বছর যেন সে খায় না। ভানু’র পছন্দের ছাগল। বছর বছর বাচ্চা দিতে দিতে মেলা বয়স হলেও ভানু যত্ন করে এ ছাগল লালন পালন করছে। মানুষ জনও বেশ দায় নিয়েছে তাঁর। এ বাজারে যে যেখানেই কলা কিনে খায় তার ছিলকাটা রেখে দেয় ভানু’র ছাগলের জন্য। বাজার থেকে ফেরার সময় ভানু’র ছাগলকে ঢিল মেরে রেখে যায়। তা খেয়ে দিব্যি চলে ছাগলটার। ছাগলের বিপরীত দিকে একটা কাঠের বেঞ্চি। শরীর গতর পোক্ত না হলেও আধমরা বেঞ্চিতেই লোকজন সদাই কিনতে এসে ক্ষণিকের জন্য বসে। জমুকে দেখে দোকানের ভেতর থেকে সজোরে ডাক দেয় ভানু,
– কিও জমু, কামের কাম করতাছো ভাই।
আত্মতৃপ্ত জমু গর্বের একটা হাসি দিয়ে বলে,
– সব আল্লার ইচ্ছা।
– ময় মুরুব্বীর মেহমানদারী সোজা কথা! বড় ভালা কাম,ভাই।
– হ। দোয়া কইরো ভানু বু।
‘ভানু বু’ ডাকটা ওর জন্য সরকারি নাম। ছেলে বুড়ো সবাই ভানু বু ডাকে। একটা মেয়ে হবার পর ওর স্বামী মরে যায়। শ্বশুর বাড়ির লোকজনের অত্যাচারে টিকতে না পেরে বাবার বাড়ি আশ্রয় নেয়। কারও বোঝা হয়ে থাকার পাত্রী নয় ভানু। তাই ঘর লাগোয়া একটা দোকান নিয়ে বসেছে। মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। ভানু’র দোকানে মাঝে মধ্যে তাঁর নাতি আব্দুল বসে। আজো বসে আছে ভানু’র সাথে। জমু ভানুর দোকান থেকে চারটা লজেন্স আর একটা বিস্কুটের প্যাকেট নেয় শ্বশুর বাড়ি যাবে বলে। বেশি টাকা নাই। টাকা থাকলে রসগোল্লা নিয়ে যেতো। শ্বশুর বাড়ি কাছে নয়। শান্তি নগর। আট কিলো রাস্তা। পাকা রাস্তা থাকলেও রিক্সা ছাড়া এ পথে তেমন কোন গাড়ি ঘোড়া চলে না। রিক্সা ভাড়ার দরদাম করতে করতে এক কিলো হেঁটে চলে জমু। শেষটা শান্তি নগরের এক ভ্যান পেয়ে তার পাশে বসেই জমু যাত্রা করে শ্বশুর বাড়ি। শান্তি নগর।(চলবে)
8 Comments-
তুলটের পক্ষ থেকে অজস্র অভিনন্দন! আপনার এই লেখাটি আজ 22 October 2021 তারিখে ‘জনপ্রিয় অবদান’ হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে। আজ সারাদিনের জন্য এই লেখাটি লেখকমঞ্চের সকল সদস্যের দেয়ালে (বন্ধু/অবন্ধু নির্বিশেষে) প্রদর্শিত হবে। তুলটে আমাদের সাথে থাকার জন্য এবং এই মঞ্চকে একটি আনন্দদায়ক ও জনপ্রিয় মঞ্চ হিসাবে চালু রাখাতে আপনার এই অবদানের জন্য আমরা কৃতজ্ঞ ও আনন্দিত!
Friends
Rakib Rakib
@abdurrakib
Md Ashfak Sayed
@ashfak
আব্দুল মজিদ মারুফ
@abdulmojid
আনোয়ার পারভেজ নূর শিশির
@anwar-parvez-nur-shishir
ইফতিশা খানম
@eftishakhanam
Md.Emamuzzaman Wahedi
@emamuzzaman
মাহ্দী সাকিব
@mahdi-sakib
Foyzur Khan
@foyzur-khan
sanjida akter jim
@sanjidajim



গল্পের সরস আনন্দ সাদরে গ্রহন করে চলেছি। শুভেচ্ছা নেবেন লেখক।