Profile Photo

আবির হাসান সায়েমOffline

  • Abir-Hassan-Sayem
  • #ধারাবাহিক
    একমুঠো জোনাকি (পর্ব-০৭)
    ~ আবির হাসান সায়েম

    ফরিদ চলে যাবার কিছুক্ষণ পর একটা লোক বালতি আর একটা লাঠি নিয়ে ঢুকল। লাঠির মাথায় কাপড় লাগানো। ঘর মুছতে এসেছে। পুরো ঘরটা লাইজলের বোটকা গন্ধে ভরে গেলো। কি বাজে একটা গন্ধ। লোকটা কোনো দিকে না তাকিয়ে ঘর মুছতে শুরু করল। লোকটার মুখ ভর্তি দাড়ি, মাথায় টুপি। পান খেয়ে মুখ একদম লাল হয়ে আছে। বয়স কত হবে আন্দাজ বেয়াল্লিশ -তেঁতাল্লিশ। শক্ত সমর্থ্য শরীর। আমি বললাম,
    “আসসালামু আলাইকুম, ভাই। ভালো আছেন?”
    লোকটা কোনো কথা বলছে না।চুপচাপ নিজের ঘর মুছে যাচ্ছে। আমি গলার স্বর খানিকটা উঁচু করে বললাম,
    “আসসালামু আলাইকুম, ভাই। ভালো আছেন?”
    এইবারও সে কোনো উত্তর দিলো না। লোকটা কি বধির নাকি? আমি বললাম,
    “ভাই আমার খুব শীত করছে, এসিটা একটু কমিয়ে দিবেন?”
    সে সোফা থেকে এসির রিমোট নিয়ে এসির পাওয়ার বাঁড়িয়ে দিলো। তার মানে সে বঁধির না। আমি আবার বললাম,
    “ধন্যবাদ ভাই। আপনি আমার সাথে কথা বলছেন না কেনো?রোগীদের সাথে কি কথা বলা মানা? ”
    লোক আমার দিকে তাকালো। তার চোখে পানি এসে জমে আছে। কান্নার ঠিক আগ মুহুর্তে চোখ যখন পানি দিয়ে ভরে যায়, তখন এমন দেখায়। আমি মাথার দিক দিয়ে বেডটা হালকা উঁচু করে দিতে দিতে বললাম,
    “কি হয়েছে ভাই? আমাকে বলুন। আমিও তো আপনার ছোট ভাইয়ের মতো তাই না?”
    “আমি আসরের নামায পইড়া আপনের পাশের কেবিনে মুছতে ঢুকসি। আচানক আমার কনুই লাইগা একটা টেবিল ঘড়ি পইরা ভাংগা গেলো। একটা সামান্য টেবিল ঘড়ি। এর লেইগ্যা আমারে মাইয়্যাডা যা তা কইলো। আমার ছোট মাইয়্যার সমাইন্যা একটা মাইয়্যা আমারে কয়, ছোটলোকের বাচ্চা।”
    লোকটা কাঁদতে শুরু করল। আমার ডান হাতে কেনোলার লাগানো আমি বাম হাত দিয়ে লোকটাকে ধরে এনে আমার বেডের পাশের বসালাম। পিঠে হাত বুলাতে বুলাতে বললাম,
    ” দুঃখ পাবেন না ভাই। যে আপনাদের দুঃখ দিয়েছে সে আপনার থেকেও বেশি দুঃখ পাবে৷ পৃথিবী তাকে কোনো না কোনোভাবে তাকে ফেরত দিবে। পৃথিবী কারো কাছে ঋণী থাকে না। কান্না থামান ভাই। চোখ মুছেন।”
    আমি টিস্যু এগিয়ে দিলাম তার দিকে। সে চোখ মুছলো। তারপর বলল,
    “ভাই আপনের কি হইসে? ”
    “জি যতদূর শুনেছি, নিয়মোনিয়া আর আলসার একসাথে ধরেছে। ”
    “আপনে খুব ভালা মানুষ ভাই। আমি আল্লাহর দরবারে আপনের লেইগ্যা দোয়া করুম। ”
    আমি হালকা হেসে বললাম,
    ” আপনি যদি বিশেষ ব্যাস্ত না থাকেন তাহলে বসুন একটু গল্প করি। ”
    “না ভাই ব্যাস্ত না আপনের ঘর মুছলেই কাম শেষ। ”
    “থাক আমার ঘর আজ মুছার লাগবে না। একদিন না মুছলে কিছু হয় না। আপনার নাম কি ভাই?”
    ” আমার নাম আইনুল্লাহ। মোহাম্মদ আইনুল্লাহ। ”
    ” আমার দাদার নামও ছিলো -আইনুল্লাহ। আইনুল্লাহ অর্থ জানেন?”
    ” না ভাই। এতো জ্ঞান আমার নাই। গরিব মানুষের জ্ঞানের খুব অভাব। জ্ঞান থাকলে কেও গরিব হয় না। ”
    ” গরিব মানুষের জ্ঞান কম কথাটা ঠিক না। গরিব-ধনী সবার জ্ঞানই এক। কিন্তু গরিবরা তাদের জ্ঞানটা ফোলানোর সুযোগ কম পায়৷”
    “খুব ভালা একটা কথা কইসেন৷ মনে ধরসে খুব৷ আইনুল্লাহ নামের অর্থটা কী ভাই?”
    “আইনুল্লাহ নামের অর্থ হলো-আল্লাহর চোখ। ”
    “নিজের নামের অর্থ জাইনা খুব ভাল্লাগলো। ভাইসাব আপনে কি করেন?”
    “টিউশনি করতাম কিন্তু এখন কিছুই করছি না । দেখি কি করা যায়। ”
    “আপনের আব্বা-আম্মা কই? দেশেরবাড়িতে থাকে? ”
    “না, তারা খুব সম্ভবত জান্নাতে থাকেন। ”
    “আমি তাদের জন্যও দোয়া করব। মৃত মানুষেরা আমাগোর থেইক্যা দোয়া ছাড়া কিছুই তো আশা করে না। তয় ভাই আপনে কিছু করেন না, তাইলে এই হাসপাতালে আইলেন কেমনে? এইহানে তো মেলা ট্যাকার কারবার। ”
    “দুঃসম্পর্কে এক আত্মীয় টাকা দিচ্ছে। ”
    “ওহ আচ্ছা। হাসপাতালে কেও থাকে না আপনের লগে?”
    ” থাকে, ফরিদ থাকে। ”
    নাম বলতে না বলতেই ফরিদ ঘরে ঢুকল। আমি বললাম,
    “এইতো ফরিদ। ”
    ফরিদ কিছুই বুঝতে পারল না। আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
    “এই লোকডা কেডা?”
    আমি বললাম,
    “তার নাম আইনুল্লাহ। আমার বড় ভাইয়ের মতো। ”
    ফরিদ আইনুল্লাহ দিকে তাকিয়ে সালাম দিলো।
    “আসসালামুয়ালাইকুম। ”
    আইনুল্লাহ বললন,
    “ওয়ালাইকুমআসসালাম। কেমন আছো?”
    “জ্বে ভালো। ”
    আমি বললাম,
    “ফরিদ খুব কাজের ছেলে। আর তার ব্রেনও খুব শার্প। যা বলবেন তাই মনে রাখতে পারে। ”
    আইনুল্লাহ আনন্দিত গলায় বললেন,
    “আমার ছোট মাইয়্যাডাও খুব ভালা ইয়াদ রাখতে পারে। এইবার ক্লস পাইভে উঠসে। ”
    “ওহ আচ্ছা। ”
    “ভাই আজকে যাই। আমার ডিউটি শেষ। ”
    “আচ্ছা ভাই যান। দোয়া করবেন আমার জন্য। ”
    “কি যে কন না ভাই৷ আপনের লেইগ্যা দোয়া করমু না তো কার লেইগ্যা করমু? আপনে আমারে বড় ভাই বুলাইসেন। ”
    আমি কিছু বললাম না মুচকি হাসলাম। আইনুল্লাহ উঠতে উঠতে বললেন,
    “খোঁদা হাফেজ ভাই। ”
    আইনুল্লাহ চলে যাচ্ছিলো, আমি বললাম,
    “আচ্ছা ভাই একটু শুনুন।”
    আইনুল্লাহ ছুঁটে আমার বেডের পাশে এসে বলল,
    “জি ভাই বলেন। ”
    “আজকে ডাক্তার সাহেব দেখতে আসবেন না?”
    ” না ভাইজান, আজকে তো শুক্কুরবার। শুক্কুরবার ডাক্তার সাব হাসপাতালে আসেন না। কাইল সক্কালবেলা বেলা আসবেন। সে আমারে খুব ভালা পায়৷ আমি তারে আপনার ব্যাপারে নিশ্চয়ই বলমু। ”
    “আচ্ছা। আরেকটা কথা আপনি ঘর মোছার জিনিসপত্র না নিয়েই চলে যাচ্ছেন৷ ”
    “ওহ আচ্ছা, খেয়ালই নাই। আহারে, ঘরটা মুছা হইলো না”
    “আজকে দরকার নেই। কালকে মুছলেই হবে৷ ”
    আইনুল্লাহ হাসিমুখে ঘর থেকে চলে গেলো। মানুষ খুব অল্পতেই খুব খুশি হয়। কিন্তু খুশি করার জন্য একটা আলাদা গুন লাগে। আমার মনে হয় আমার মধ্যে সেই গুনটা আছে। আবার মাঝে মাঝে কিছু মানুষকে রাগাতেও বেশ ভালো লাগে। বিশেষ করে শিলাকে। বেশি রাগ করলে তার নাক লাল হয়ে যায়। এইটা রাগের প্রাথমিক লক্ষণ তারপর তা গিয়ে শেষে কান্নায় পরিণত হয়। শিলাকে একটা ফোন দেয়া দরকার।

    চলবে…

    6
    5 Comments
Skip to toolbar