Profile Photo

Shah KamalOffline

  • kuriparahs112384
  • Profile picture of Shah Kamal

    Shah Kamal

    • 5 years ago

    ধারাবাহিক গল্প
    :::::::::::::::::::::

    #জমশেদ আলীর মেহমানদারী

    —— শাহ্ কামাল

    (৮)
    রাত বাড়তে থাকে।

    সুবশিাল রাজ মহলে রাজকীয় পোশাক পরে আছে জমু। তাঁর বিশ্বাস হচ্ছে না। তবে সে অবাক হয়। জগতের রুপ বড়ই বিচিত্র। কখন যে কী হয় তা বলা মুশকিল। গোলাপজামও রাজকীয় পোশাক পরে রানীর বেশে। চম্পা শাহাজাদীর পোশাক পরে তাদের পাশে। মনের মধ্যে সুখ আর সুখ। আনন্দ ধরে না। রাজমহলের বাইরে সুন্দর করে সামিয়ানা টানানো। সাজসজ্জায় মনেহচ্ছে আজ জমু’র মেয়ে চম্পার বিয়ে। যে সে বিয়ে নয় রাজকীয় বিয়ে। কিন্তু বিয়ে তো আর না। ফুলপুরের ময়মুরুব্বী সব মিলিয়ে জনা চল্লিশ হবে। একটু বাড়তি রান্না বান্না না করলে সমস্যা। শেষে আবার খানাপিনা টান পরে যাবে। খানা-পিনায় টান পরলে রটে যায় তাড়াতাড়ি। তাই জমু বাড়ির আশপাশের দু’এক ঘরের লোক লস্কর মিলিয়ে পঞ্চাশ জনের রান্নার চিন্তা করেছে। তাদের জন্য চলছে জমজমাট আয়োজন। বাড়ির চারদিকে হুর পরীদের আনা গোনা। অনেকটা আরবের শেখদের বাড়ির আয়োজনের মতো। হরেক রকম বাতির আলোয় ঝল ঝল করছে চার পাশ। সামিয়ানার নিচে কী সুন্দর ব্যবস্থা! কোন সাধারণ চেয়ার নয়। ওয়াজ মাহফিলে বড়ো হুজুরদের এমন সোফায় বসতে দেখেছে জমু। আজ তাঁর বাড়ি অল্প কয়েকজন মেহমানের জন্য এ আয়োজন। তাঁর মুখে খুশি ধরে না। একেক জন মেহমানের জন্য একেকটা সোফার গদি। সামনে খাবার পরিবেশনের জন্য কুচিকরা কাতান কাপড়ে সাজানো টেবিল।
    চম্পা আকাশে উড়ে বেড়াচ্ছে হুর পরীদের সাথে। ঘুরে ঘুরে দেখছে সারাদুনিয়ার যতো বড়ো বড়ো সুন্দর জায়গা। তাজমহল হতে তাবৎ দুনিয়ার বড়ো বড়ো রাজমহল দেখে চোখ জুড়ায় চম্পার। দেও-দানব, দৈত্য-রাক্ষষ, ভুত-প্রেত, জ্বিন-পরী দেখে দেখে অবাক হয় সে। কত্তো সুন্দর আল্লাহপাকের দুনিয়া। সাগর-মহাসাগর, পাহাড়-পর্বত দেখে চোখ জুড়ায় তাঁর। কখনো সে ফুল বাগে হাঁটে, কখনো বা গুলবাগে দোল খায়। প্রজাপতি উড়ে যায় তাঁর গা ঘেষে। দখিণা বাতাসে তাঁর এলা চুল উড়তে চায়। সই পরীরা তাঁর খোপায় গেঁথে দেয় ইরানী গোলাপ। বড়ো বড়ো হ্রদ সে পাড়ি দেয় দৈত্যের পিঠে চড়ে। সাগরের গর্জনে আতকে উঠে কখনো। এমন স্বর্গরাজ্য আগে দেখেনি সে। সারা দুনিয়া ঘুরে পরীদের সাথে সে তাদের রাজমহলে ফিরে আসে।
    গোলাপজাম আরদশটা রানীর মতো সাজ সজ্জায় ব্যস্ত না হলেও তাঁর দাসী বাদীর কমতি নেই। পালঙ্কে বসে তাসবীহ পরে সে আল্লাহপাকের শোকর গোজারী করছে। দূর হতে তাঁর কানে ভেসে আসে কুরআনের সুললিত তিলোয়াত। চারদিকে তিন-তিন জন দাসী দাঁড়ানো। একজন পাশে বসে সেবা করছে তাঁর।
    জমু আয়োজন দেখছে চারপাশ ঘুরে ঘুরে। সাথে চার জন রাজ-কর্মচারী। কী সাজ গোজের ধরণ! মনেহয় বেহেশতের প্রহরী। স¤্রাট আকবরের সিপাহসালারের মতো জমুর পিছনে পিছনে হাঁটছে তাঁরা। ধবধবে সাদা হাঁস, কালচে হাঁস, কালচে সবুজাভ-নীল রঙের হাঁসে রন্ধনশালা ভরতি। দেখে খুব তৃপ্ত জমু। মনে তাঁর বেজায় আনন্দ। তাঁর খুশীর বানে বাবুর্চির চোখে মুখে হাসির ছাপ। উৎসব উৎসব রাজকীয় আমেজে খুবই ফুলফুরে মেজাজে জমু। বিভিন্ন রঙের বেলনে সামিয়ানার নিচে সাজানো হয়েছে। মনটা ভরে যায়। বাড়ির প্রবেশ দ্বারে একটা রাজকীয় তোরণ। দৃষ্টি নন্দন।
    হাঁস জবেহ হচ্ছে। কয়েকজন বসে বসে জবেহ দেওয়া হাঁসের পালক ছাড়াচ্ছে। হালকা বাতাসে হাঁসের পালক উড়ছে। পালক উড়তে উড়তে উড়ে যাচ্ছে পুকুরে, জমিতে, মাঠে, আকাশে। জমু চেয়ে চেয়ে দেখে পালকের উড়াউড়ি। একটা হাঁস জবেহ করার সময় ছুটে দৌড় দেয় জমুর দিকে। জমু হাঁসটাকে হাত নেড়ে জবেহ’র দিকে তাড়া করে…
    জমু’র ঘরে থপাস একটা শব্দ হয়। মাইকে ফজরের আজান শোনা যাচ্ছে, আসসালাতু খাইরুম মিনান্নাউম। জমু চৌকি হতে পরে যায়। স্বপ্নে হাঁস তাড়া করতে গিয়ে এ অবস্থা তাঁর। রাজমহলের স্বপ্ন পুরনো টিনের ঘরে সমাপ্ত হয়।
    আ্ওয়াজ শুনে গোলাপজান উঠে যায়। সতর্ক হয়ে সে ধীরে ধীরে গিয়ে কুপি জ্বালায়। জমু উঠে বসে মেঝেতে।
    ব্যথা পায়নি তেমন। একটু চোট লেগেছে।
    তাকে ধরে চৌকিতে বসায় গোলাপজাম। – হইছে কী আপনের?
    গোলাপজাম প্রশ্ন করে।
    হঠাৎ করে ব্যথা পেয়েছে। একটু লেগেছে।
    – আহ। লাগছে বউ।
    – মালিশ কইরা দেই।
    – লাগবো না। খোয়াব দেইখা এই দশা।
    – হ। আরো বেশি কইরা খোয়াব দ্যাখেন।
    কিছুটা বিরক্ত হয়ে গোলাপজাম চলে যায় পুকুর ঘাটের দিকে। ফজর নামাজ পরতে হবে। জমুও মসজিদে যাবার চেষ্টা করছে। যাওয়া যাবে। তড়িঘড়ি করলে হবে না। কচ্ছপ দৌড়ে যেতে হবে। চিন্তা মতো মসজিদে গেল জমু।
    ফজরের নামাজের সময় অনেক লোক মসজিদে আসে নামাজ পরতে। মসজিদটা ভরে যায় মুসল্লীতে। আজো অনেক মুসল্লী। নামাজ শেষে বাড়ি ফিরতে থাকে জমু। সে মৌলভীর পিছন পিছন এগোয়।গ্রামের আরো কয়েকজন আছে মৌলভী সাহেবের সাথে। জমুর ধীর চলন দেখে মৌলভী সাহেব জিজ্ঞেস করে,
    – জমু, অতো পিছে ক্যান?
    – খোয়াব দেইখা চকি থাইকা পইরা গেছে ভোর রাইতে। একডু চোট লাগছে।
    – ইন্নালিল্লাহ…
    – বেদনা কী বেশি?
    – নাহ। কোমরের বা দিকে একডু।
    – অহ। মালিশ করাইয়োনা আবার। আমি একবার বেদনা পাইছিলাম। পাশ করা ডাক্তোর বলছে বেদনা পাইলে মালিশ করতে না। মালিশ করলে ঝামেলা হয়। গোছলের সময় গরম পানি ঢালবা অইখানে।
    – জ্বি, হুজুর।
    – তোমার মেহমানদারী কদ্দুর?
    – আজ বিসুদবার। গোলাকান্দাইল যামু হাঁস কিনতে কাল আসবেন আমার বাড়ি।
    মৌলভীসহ সাথের সবাই একসাথে বলে, আমরা সবাই আসমু।
    জমু’র ব্যথা শরীরে কিন্তু প্রফুল্লভরা মুখ।সে বলে,
    – আলহামদুলিল্লাহ, সব আল্লার ইচ্ছা।
    কথা আর এগোয় না।
    বাড়ির দিকে যেতে থাকে জমু।

    আজ বৃহস্পতিবার। প্রতি বৃহস্পতিবার জমু ঘরে জ্বিন সাধনের নানা আচার হয়। ব্যবসা করে লাটে ওঠা নেকবরের বউও আসে জমু’র ঘরে।বছর পাঁচেক আগে নেকবরের বউকে জ্বিনে আছড় করেছিল। রংবেরঙের কবিরাজ আর ডাক্তার দেখাতে দেখাতে ফতুর হয় নেকবর। এখন জ্বিনের প্রতাপ না থাকলেও তাঁর বউটা আগের মতো নাই। কথা কম বলে। পর পুরুষের সাথে দেখা সাক্ষাৎ করে না বললেই চলে। গোলাপজামের ভক্ত সে। প্রতি বৃহস্পতিবার মাগরিব নামাজ পরেই চলে আসে গোলাপজামের কাছে। ঘরের কোণে ধ্যান করার মতো বসে থাকে গভীর রাত অবধি। কখন যে সেখানে ঘুমিয়ে পরে টের পাওয়া যায় না।

    (চলবে)

    8
    5 Comments
Skip to toolbar