-
ধারাবাহিক গল্প
:::::::::::::::::::::#জমশেদ আলীর মেহমানদারী
—— শাহ্ কামাল
( ১০)
হাওয়া বিবি’র নাতিন ছালেহা। হাওয়া বিবি নাই। ছেলেও ছিল না তাঁর। মেয়ের ঘরের নাতিন সালেহা। এ গ্রামেই থাকে। নানার ভিটায় বাতি জ্বালিয়ে যাচ্ছে। কথায় এতোই পটু যে তাঁর সাথে পেরে উঠা মুশকিল। পান খেয়ে ঠোঁট লাল থাকে সব সময়। পান চিবুতেই থাকে সারাক্ষণ। তাঁর ঘরে জিনিস পত্রের অভাব নাই। একটা ঘর হলে কি হবে পরিপাটী করে সাজানো। গ্রামে কোন বাড়ি অনুষ্ঠান হলে তাঁর কাছে সবাই আসা। হাঁড়ি-পাতিল বা থালাবাটির জন্য।
বাতাসার নানী চম্পাকে নিয়ে ছালেহার উঠোনে এসে ডাক দেয়,
– কি লো ছেড়ি, গেলি কই? ও ছালে?
ছালেহাকে সবাই ছালে বলেই ডাকে। ঘর হতে বের হতে হতে ছালেহা পান চিবোয় আর বলতে থাকে,
– কোন জমিদারের বেডি গো? গলা ত বাতেসার নানীর। কি জন্য আইলেন নানী?
– জমু’র বাড়িত মেমানদারী করব। থাল বাডি দরকার। দে বইন।
বাতাসার নানীর কথা শেষ না হতেই গা জ্বলে ছালেহার।
– দিমুনা। একটা থালও দিমু না। থাল বাডির সম আমার কতা মনেপড়ে। আমারে দাওয়াত দিলো না?
– এইডা কী হইলো?
পানের পিক ফেলে উত্তর দেয় ছালেহা,
– কী হইলো না? আমারে দাওয়াত দিলো না তো। হাঁসের গোশত দিয়া কী আমরা ভাত খাই না? দাওয়াত হইলো ইজ্জত।
– আরে কী কছ না কছ। ময়মুরুব্বী দাওয়াত দিছে। হগ্গলরে দেয় নাই ত।
এরোম করিচ্চা। দে বইন। কুড়িডা থাল আর চাইড্ডা বাডি দে।
রাগ পরে যায় ছালেহার। হাজার রাগের স্নায়ু যাদের দেহে কিলবিল করে তাদের মনটা মায়ার পাথরে গড়া। ছালেহা বাতাসার নানীকে থালা-বাটি দিয়ে বিদায় করে।
চম্পা বাটি মাথায় নেয়।কাখে থালা নিয়ে জমু’র বাড়ির দিকে রওয়ানা দেয় বাতাসার নানী।গোলাকান্দাইল হাট।প্রতি বৃহস্পতিবার বসে। ঐতিহ্যবাহী হাট। গরু, ছাগল, হাঁস, মুরগী, হলুদ, মরিচ, চাউল, ডাল, নানা রকম বিস্কুট, কাঠের তৈরি কতো জিনিসপত্র, ঘর-দোর নির্মাণের কাঠ থেকে শুরু করে এমন কোন জিনিস নাই যা এ হাটে পাওয়া যায় না। জমু এসেছে হাঁস কিনতে।
জমু পুরনো একটা ফতুয়া আর লুঙ্গি পরে হাটে এসেছে।কাঁধে গামছাও আছে একটা। অনেকদিন পর এসেছে এ হাটে। লোকে গমগম করছে। দূর দূরান্ত হতে আসে অনেকে। ঐতিহ্যবাহী হাট। এমন হাট দিনকে দিন কমে যাচ্ছে। ঐতিহ্যকে লালন করে সামনে এগিয়ে নিতে অনেকে এ হাটে আসে।কারো কাছে হাটে ঘুরতে আসা আজকাল ফ্যাশন হয়ে গেছে। অনেক ছেলেপুলে মুড়ি মুড়কি খেতেও আসে। রশিদের দোকানে গরুর দুধের চা বানায়। রশিদ চা বানিয়ে বেশ নাম করেছে। অন্যান্য এলাকা হতে একটু কম দামে জিনিস কিনতে এ হাটে সবাই আসে। সব দোকান হলো ভিটি দোকান। সপ্তাহে একদিন বেচাকেনা। একদিনেই পুষে যায় দোকানদারদের।
জমু মানুষ জন ঠেলে ডুকতে পারে না। অনেক মানুষ। গলায় গামছা লাগিয়ে বুকের দিকে ট্রে ঝুলিয়ে একজন ঘুরে ঘুরে বিক্রি করছে মলম, ইঁদুর মারার ওষুধ। জমু তাকিয়ে আছে ওর দিকে। “ চুলকাইতে চুলকাইতে যারা ঘা বানাইয়া ফেলাইছেন তারা নিয়া যান আমার শারমিন মলম। আহ চুলকাইতে কী মজা! মন চায় বদলা নিয়া চুলকাইতে। নিয়া যান আমার শারমিন মলম। এক বার লাগাইলেই ফল পাইবেন, রাইতে লাগাইলে সকালে বোঝবেন না মলম কোন জায়গায় লাগাইছেন। খাওজানি চুলকানির যন্ত্রণা, শ্বশুর ভাসুরও বোঝে না।”- বলতে বলতে মলম ওয়ালা চলে গেল জমুর সামনে দিয়ে। জমু সামনে এগোয়। ইঁদুরের ছবি সম্বলিত একটা পোস্টার কাঠিতে লাগিয়ে কাঁধে নিয়ে ঘুরে ওষুধ বিক্রি করছে একজন। “ ইন্দুর মারবেন না পালবেন সিদ্ধান্ত আফনার। এক প্যাকেট নিয়া যান। সিরিয়ালে খাইবো কাতারে কাতারে মরবো।” বলতে বলতে লোকটা চলে গেল জমুর কাছ দিয়ে। চারদিকে হইচই। রোদ মাথার উপরে। এ হাটে এতো মানুষজন আসে যে শীত-গ্রীষ্ম সব কালেই ঘামে ভিজতে হয়। বাজারের এক পাশে মধু মিয়ার গুড়ের শরবতের বেশ কদর। লেবু কচলে গুড় সিরাপে বরফ গুড়ো বেশ লাগে। অনেকে রাম দা’য়ে বরফ কাটা দেখে দূরে তাকিয়ে। জমুর তিয়াস লাগছে বড্ডো।মধুর দোকানের কাছে আসতেই মধু পান চিবোতে চিবোতে জিজ্ঞেস করে,
– ক্যামন আছো জমু ভাই?
গামছা দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে জমু বলে,
– আলহামদুলিল্লা। ভালা। তুমি?
– ভালা আর বুড়া… দিন চলতাছে।
এ কথা বলেই মধু এক গ্লাস শরবত জমুর হাতে তুলে দিয়ে বলল, খাও। লেমুডা বাড়ায়া দিছি। ভাল্লাগবো।
জমু শরবতের গ্লাসটা হাতে নিয়ে পাশের বেঞ্চিতে বসল। এক ঢোক শরবত খাওয়ার সাথে সাথে দিলডা জুড়ায়া গেল। শরবত খেয়ে দাম দিতে চাইলেও মধু কোন দাম নিলো না। এ হাটে এলে জমু কিছু কিনুক বা না কিনুক মধুর দোকানে শরবত ওর জন্য ফ্রি। জমু বহু বছর আগে মধুর বড় ছেলেকে আধ মরা অবস্থায় পানি থেকে তুলেছিল ওদের গ্রামে। সে না দেখলে মধুর ছেলে বাঁচতো না। পানিতে ডুবে মারা যেতো। আল্লাহপাক রহমত করেছেন।রাখে আল্লাহ মারে কে? সেই থেকে জমুর খুব কদর মধুর কাছে। জমু ক্লান্তিহীন দেহে চাঙা মেজাজে সামনে এগোয়।
চোখে পরে দা, কুড়াল, বটির দোকান। পাশেই বাঁশের ঝুড়ি, ডুলা আর ডালার দোকান।
গ্রামে এসব জিনিসের মেলা কদর। মাটি-মানুষের সাথে বাঁশ-বেতের এসব দরকারি জিনিসপত্রের কদর শহরেও কম না। আজকাল শহরের অলিতে গলিতে শোরুমও গড়ে উঠেছে বেশ। মানুষ দিন দিন যতোই আধুনিক হোক না কেন সে স্বাভাবিকভাবেই আদিমতায় যায়। কোটি কোটি টাকা খরচা করে সুউচ্চ ইমারত গড়লেও আদিমতা ধরে রাখতে ছাদেও গাছ লাগায়। জমু সব দোকানের পাশ কাটিয়ে সামনে এগোয়। মানুষ আর মানুষ। গোল ঝটলা করে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষজন দেখে জমু বার বার উঁকি-ঝুকি মারে। মাঝখানে হচ্ছে কী? তাঁর ভাবনা বেশিদূর গড়ায় না। ছোট এক বাচ্চা মেয়ে নাচছে। ট্রান্জিস্টরে গান বাজছে,
‘রুপের মাইয়া একবার চাইয়া গো
ভাব লাগাইয়া পরাণ কারিলে
রুপের মাইয়া একবার চাইয়া গো
ভাব লাগাইয়া পরাণ কারিলে।’
ঝাকড়া চুলের আবুল মিয়ার সালসা বেচার খোলা দোকান। মানুষ জনের ভীড় যেমন তেমন বিক্রি বাড্ডা খারাপ না। পেট কামড়ানি, পুরানো আমাশা, বদহজম আর অরুচির সালসা। কাঁচের বোতলে এক বোতল ত্রিশ টাকা। গাছ-গাছড়ার নির্যাস আর আবুলীয় ফর্মুলায় উৎপাদন করা হয় এই সালসা। আবুল মিয়ার সালসা যথেষ্ট কাজের। অরুচি কেটে যেতে দু-তিন বোতল খেতে হয়। অনেক কাস্টমার আবুল মিয়ার। পুরনো বোতল ফেরত দিলে পাঁচ টাকা কমে পঁচিশ টাকায় সালসা পায় তাঁরা। ঠিক মতো না খেয়ে যাদের চোয়ালে ঝং ধরে গেছে তাদের জন্য সালসা আরে বেশি কার্যকর। জমু কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে দেখলো। তারপর গরুর হাট পার করে সামনের দিকে এগুলো। বাজার ভর্তি গরু ছাগলে। একটা তেজী ষাঁড় গরু দড়ি ছিড়ে বাজারের মাঝ বরাবর দৌড় দিল। পিছন পিছন গরুর পাইকারও দৌড়াতে লাগলো। জমু’র সামনে দিয়ে গরুটা গেল। হইচই পরে গেল, গরু… গরু… গরু আইলো….(চলবে)
7 Comments
Friends
এসকে হেলাল
@skhelal
Rakib Rakib
@abdurrakib
Md Ashfak Sayed
@ashfak
আব্দুল মজিদ মারুফ
@abdulmojid
আনোয়ার পারভেজ নূর শিশির
@anwar-parvez-nur-shishir
ইফতিশা খানম
@eftishakhanam
Md.Emamuzzaman Wahedi
@emamuzzaman
মাহ্দী সাকিব
@mahdi-sakib
Foyzur Khan
@foyzur-khan



ভাল লিখেছেন। আপনাকে অভিনন্দন