Profile Photo

Shah KamalOffline

  • kuriparahs112384
  • Profile picture of Shah Kamal

    Shah Kamal

    • 5 years ago

    ধারাবাহিক গল্প
    :::::::::::::::::::::

    #জমশেদ আলীর মেহমানদারী

    —— শাহ্ কামাল

    (১৪)

    -জমশেদ?
    -ও জমশেদ, ওঠ। আর কতো ঘুমাবি?
    -জমশেদ?
    কথাগুলো হাওয়ায় ভেসে আসছে জমুর কানে। ও ঘুমুচ্ছে। দেদারসে ঘুম। কোন দিকে কোন নজর নাই তাঁর। তাবৎ পৃথিবী যুদ্ধ করে বীরের বেশে এসে শুয়েছে যেন। এক রত্তির ভাবনা নেই তার মনে। কিসের ভাবনাই বা থাকবে? বিত্ত বৈভব নাই, কোন পেরেশানিও নাই। রাত পোহালে বাড়িতে মেহমানদারী। সব ব্যবস্থা হয়ে গেছে। আনাজপাতি, বোসন-কোসন, হাঁড়ি-পাতিলের যোগারও শেষ। তাই মনের সুখে তাঁর ঘুমের দেশে যাত্রা। রাত্রি শেষ প্রায়। পুব আকাশে আবছা আলোর রেখা এখনো দেখা দেয়নি। আবারো জমুকে কে যেন ডাকছে।
    -জমশেদ?
    -ও জমশেদ, ওঠ।
    জমুর কানে গেলো এবারের ডাক। ঘুমের ঘোরে সে জবাব দিল,
    -ক্যাডা? ক্যাডা ডাকে?
    -আমি। আমারে চিনবি তুই?
    -পরিচয় দ্যান।
    -কাইল তো মেহমানদারী করাবি।
    -হু।
    -হাঁসটা জবাহ দিবো ক্যাডা?
    -আমি করমু।বিসমিল্লাহে আল্লাহুয়াকবার বইলা জবাই দিমু।
    – না না। তুই না।
    – ক্যান? আমি দিলে কী হইবো?
    – বেশি বুঝস ক্যা?
    – আপনে ক্যা? আপনেরে তো চিনলাম না।
    – অতো চিনা কাম নাই। সিরাজের বেটা ইমদাদরে দিয়া জবাহ দিবি। বরকত হইবো। ফুলপুরের বড়ো লক্ষ্মী পোলা সে।
    জমু লোকটার পরিচয় জানার আগেই তাঁর ঘুম ভেঙ্গে যায়। হন্তদন্ত হয়ে ঘুম থেকে জেগে ওঠে সে। উঠেই গোলাপজামকে ডাক দেয়। এক ডাকেই সে জমুর ডাকের উত্তর দেয়। বাড়িতে অনেক লোকের এন্তেজাম। ঘুম নেই তাঁর চোখে। বাড়িতে লোকলস্কর খাওয়াবার ধুম থাকলে ঘুম থাকে না কারোই। গোলাপজাম চোখ মেলে দোয়া পড়ে,
    – আলহামদুলিল্লাহ হিল্লাযী আহ ইয়ানা বা দামা ওমা তানা ও ইলাহিন্নুসুর।
    সে ফিসফিসিয়ে দোয়া পড়া শেষ না করতেই জমু বলে,
    – একটা খোয়াব দেখলাম বউ।
    – কী দেকছেন?
    জমু কোন উত্তর না দিতেই গোলাপজাম কুপিতে আগুন দেয়। জমুর কপালে ঘাম দেখা যায়। হাতে গামছা নিয়ে কপালের ঘাম মুছতে মুছতে জমু বলে,
    – খোয়াব দেকলাম ক্যাডা যানি কইলো ঐ সিরাজের পোলা ইমদাদরে দিয়া হাঁস জবা দিতাম।
    – ক্যাডা কইলো? আপনারে কাম কাজের কোন মাথা মুন্ডু নাই।
    – বউ ক্যাডা যে কইলো আমি তো চিনতে পারলাম না। তবে ইমদাদ তো খারাপ পোলা না।
    – হ। হুনছি এলাকার সব ভালা কামে এই পোলা থাকে। সবাই তারে ভালা জানে।
    – হ। তা ঠিক। ময়মুরুব্বীগো মান্যি করে।
    জমুর কথা শেষ হয় না। ফজরে আযান শোনা যায় মাইকে।
    গালাপজাম ভরসা দেয় জমুকে,
    – চিন্তার কিছু নাই। ভোরের খোয়াব ফইলা যায়। আল্লাপাক ভালা চান বইলা খোয়াবে দেখাইছেন। দিবেন জবা ইমদাদ রে ডাইকা। অয় তো ভালা। দশে যারে ভালা কয় আল্লার কাছেও সে ভালা। ওঠেন। নামায পইড়া আহেন।
    – সব আল্লা পাকের ইচ্ছা। তোমার কথাও ঠিক। যাই। জামাত পইড়া আসি।
    জমু পাঞ্জাবিটা পরতে পরতে ঘর থেকে বের হয়।
    আজ জুমা’র দিন। গরীবের হজের দিন। আজ ফজরে অনেক মানুষ হবে। শুক্রবারে ফজরের সময় মসজিদ লোকে লোকারণ্য হয়। এতটুকু জায়গা পর্যন্ত থাকে না। জমু প্রথম কাতারেই জায়গা পেয়েছে। মৌলভী সাহেবের ডান পাশে বসেছে। আজ তাঁর বাড়ি মেহমানদারী। চিকন চালের গরম ভাত দিয়ে হাঁসের গোশত খাওয়াবে সে। মৌলভী সাহেব ফিসফিসিয়ে মেহমানদারীর প্রস্তুতির কথা জিজ্ঞেস করে। জমু হাসি মুখে মাথা নেড়ে ইশারায় বুঝিয়ে দেয় সব ঠিকঠাক আছে।
    জামাত শেষ হয়। মৌলভী সাহেবের অনুমতি নিয়ে মুসল্লিদের কিছু বলার জন্য দাঁড়ায় জমু। মসজিদে মিম্বরের কাছে সবাই দাঁড়ায় না। ওখানে দাঁড়ায় হোমড়া চোমড়া লোকজন; যাঁরা জান্নাতের সওদা করে। কেউ নিজেরটা দিয়ে কেউ অন্যেরটা দিয়ে সে সওদার দেনদরবার করে। তবে সবটাই খোদার সন্তুষ্টির জন্য। যদিও সে সন্তুষ্টি অনেকের নিজেরও। জমু সে জন্য দাঁড়ায় নি। তাই সবাই ওর দিকে নজর দিয়েছে। জমু তাঁর স্বভাব সুলভ নরম গলায় বলল,
    – মুসল্লিয়ানে কেরাম, আসসালামু আলাইকুম।
    সালাম দেওয়ার সময় অবশ্য সে মৌলভী সাহেবের দিকে তাকায়। কয়েকদিন আগে মোলভী সাহেব তাকে সালামের তালিম দিয়েছিল। মৌলভী সাহেবও জমুর সালাম দেওয়াটা মন দিয়ে শুনছিল। জমু তাঁর কথা শুরু করে,
    – আফনেরা আমারে চিনেন। আইজ আমার বাড়ি গেরামের সব ময়মুরব্বী গো দাওয়াত। মেহমানদারী করামু। হাঁসের গোশত দিয়া চিকন চাউলের গরম ভাত। আফনেরা গেলে আমি খুব খুশি হমু।আফনেরা যাইবেন ত?
    উপস্থিত মুসল্লিরা সমস্বরে হাত তুলে জবাব দেয়, ইনশাল্লা যামু।
    – আলহামদুলিল্লা। শুইনা খুশি হইলাম।
    জমু বসে পরে। মৌলভী সাহেব দোয়া করা শুরু করলেন।
    মুসল্লিরা একে একে যার যার মতো বের হয় মসজিদ থেকে। জমু বের হয় শেষের দিকে। মনে মনে সে ইমদাদকে খুঁজছে।মুসল্লিদের দিকে নজর পরতেই ইমদাদকে দেখতে পায়।তাঁর সাথে কথা বলার জন্য একটু জোরে হাঁটতে শুরু করে জমু।
    ইমদাদ মা মরা ছেলে। সিরাজের ছোট ছেলে। গেল বছর আচমকা মারা গেছে সিরাজের বউ। রোজার মাসে। দশ রোজার দিন। কেউ কোন কারণ জানে না। বড়ো ভাল মানুষ ছিল। তিনটা ছেলে আর একটা মেয়ে রেখে মারা গেছে। ছেলেমেয়ের কথা ভেবে সিরাজ আর বিয়ে শাদী করেনি। বাপ বেটারা মিলেমিশেই সংসার চালাচ্ছে। ইমদাদ সিরাজের সবচেয়ে ছোট ছেলে। গঞ্জের সরকারি কলেজে তাঁর পড়াশোনা। মুরুব্বীদের যথেষ্ট সম্মান করে সে। কখনো মাথা তুলে কথা বলে না কারো সাথে। সবার কাছেই তাঁর কদর। মসজিদের পথ ধরে সব মুসল্লির পিছন পিছন হেঁটে চলেছে সে। জমু তাঁর কাছাকাছি চলে আসে। তাকে দেখে ইমদাদ সালাম দেয়,
    -আসসালামু আলাইকুম, চাচা। কেমন আছেন?
    – অলাইকুম আসসেলাম। আলহামদুলিল্লাহ, ভালা। তুমি আছো ক্যামন?
    – আলহামদুলিল্লাহ,ভাল।
    হাসিমুখে ইমদাদ জবাব দেয়।
    – বাবা, আমার একডু কথা ছিল।
    – তুমি তো জান আমার বাড়ি মেহমানদারী আছে।
    – জানি, চাচা। কিছু করতে হবে? টেনশন কইরেন না। একটু পর আরেকজন সাথে নিয়া আপনার বাড়ি আসবো। আপনার কি কি কাজ করতে হবে বলবেন।
    হাঁটতে হাঁটতে কথা বলে তাঁরা। ইমদাদের কথা শুনে জমুর মনটা ভরে যায়। খুশি হয়ে ইমদাদকে বলে,
    – বুকডা ভইরা গেছে বাবা। বিষয় হইলো বিহান রাইতে খোয়াব দেখছি । ক্যাডা যানি কইলো তোমারে দিয়া হাঁস জবা দিতাম।
    – বলেন কী চাচা! আমার সৌভাগ্য। আমি নাস্তা করেই আইসা পরব। আপনি বাড়ি যান।
    – আইচ্ছা, বাবা।
    দুজনে সামনের দিকে এগিয়ে যায়। ইমদাদ জমুর কথা শুনে গর্ববোধ করে। তাঁর মুখ থেকে হাসি হাসি ভাবটা পরে না।

    (চলবে)

    9
    8 Comments
Skip to toolbar