Profile Photo

Sohag MiaOffline

  • Sohag-Mia
  • Profile picture of Sohag Mia

    Sohag Mia

    4 years, 10 months ago

    ল্যাম্পপোস্ট
                       

                রাত আটটার মতো বাজে, ঝিরি ঝিরি বৃষ্টি পড়ছে। রাস্তার পাশে ময়লার ড্রেন ফুলে ফেপে উঠছে, একটু ভারী বর্ষণ হলে ড্রেনের ময়লা উঠে যাবে ফুটপাতে। ফুটপাতে পলিথিনের ঘর বানিয়ে সরুফারা থাকে, তারা তখন তল্পিতল্পা নিয়ে সারা রাত খোলা রাস্তায় দাড়িয়ে থাকবে।
       ঘরের ভেতর থেকে পলিথিনের দরজা ফাক করে সরুফা আর তার মেয়ে হাসি উকি দিয়ে বৃষ্টি দেখছে, ধীর গতিতে বৃষ্টি পড়ছে তবু ড্রেনের ময়লা পানি দ্রুত স্ফীত হচ্ছে। আর একটু বাড়লে তাদের ঘরে উঠে যাবে। সরুফা চিন্তিত মুখে ঘরের ভিতর ঘুমিয়ে থাকা ছেলের দিকে তাকালো, কুপির আলোয় ছেলেটাকে দেখা যাচ্ছে,নগ্ন রোগা শরীর, পেট শরীরের তুলনায় কিছুটা বড়। সরুফা ছেলের মাথার বালিশের উপর পাতলা ন্যাকড়া দিলো। লালা পড়ে তেলচিটচিটে বালিশ ভিজে গেছে। আরেকটা তেনা দিয়ে মুখ মুছিয়ে দিলো।হাসি বলল “ মা চুল্যা বাইর করমু ? বৃষ্টি কমছে ”
    সরুফা বাইরে উকি দিয়ে দেখে বলল “বাইর কর”।
             বৃষ্টি কমেছে তাদের খুপরীর পাশের ল্যাম্পপোস্টের আলোয় সরুফাকে দেখা যাচ্ছে মাটির চুলায় হাঁড়ি বসিয়ে আগুন ধরানোর চেষ্টা করছে। আগুন ধরছে না ভেজা কাঠ থেকে বের হওয়া ধোয়া গোল হয়ে উপরের দিকে উঠে যাচ্ছে, কয়েক বার চুলায় ফুঁ দিয়ে সরুফার কাশি উঠে গেল। সে কাশতে কাশতে বলল “ হাসি হাসি”
    ঘরের ভিতর থেকে হাসি বলল “ কি ? ”।
    “কুপি নিয়া আয়”
    হাসি কুপি এনে চুলার পাশে রাখলো।সরুফা বলল “খালি গায়ে ঘুরতাছস ক্যান ? জামা পড়।”
    “ জামা তো বিজা ”
    “ ভিজলো ক্যামনে ?”
    “ বাবু পেসাব করছে ”
    “ তাইলে গামছা গায়ে দিয়া আয়”
             হাসি গামছা গায়ে জরিয়ে চুলার পাশে বসলো। চুলায় আগুন ধরেছে, হাঁড়িতে চাল ফুটানো হচ্ছে। কিন্তু ঘরে কোন তরকারি নেই আছে শুধু তিনটি আলু যার মধ্যে একটি পঁচা। সরুফা ভালো আলু দুইটি ভাতের মধ্যে দিয়ে দিলো, ভাত হতে হতে আলু সিদ্ধ হয়ে যাবে। সিদ্ধ আলু শুকনা মরিচ আর সরিষার তেল দিয়ে আলু ভর্তা বানাবে । আচ্ছা ঘরে শুাকনা মরিচ কি আছে ? মনে হয় নাই। সরুফা ঘরে গেলো শুকনা মরিচ খুজতে।না শুকনা মরিচ ঘরে নাই, মরিচের ডিবায় কয়েকটা মরিচের বিচি পরে আছে।
    সরুফা বাইরে এসে চুলার পাশে বসতে বসতে বললো “হাসি পাঁচ ট্যেকার শুকনা মরিচ নিয়া আয় ”
    “ট্যেকা দেও ”
    হাসি মরিচ আনতে গিয়েছে অনেক্ষন, সরুফা চুলার পাশে বসে আছে, ভাত ফুটতে শুরু করেছে। আবার হালকা ছোট ছোট ফোটায় বৃষ্টি পরছে, ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলোয় মনে হচ্ছে কুয়াশা পরছে। দূরে বাবুর বাপকে আসতে দেখা যাচ্ছে। দুই চাকার একটি ঠেলা গাড়ি ঠেলে খুড়িয়ে খুড়িয়ে এগিয়ে আসছে,খুড়িয়ে খুড়িয়ে আসছে কারন তার বা পায়ে ব্যাথা। পুলিশের এক সাজেন বাড়ি মেরেছে, কথা নাই বাতা নাই হঠাৎ পিছন থেকে আচমকা বাড়ি।
    “বাবুর মা কি রানছো ? ”
    “ যা আছে তাই রানছি, কোন তরকারি দিয়া গেছেন?”
    “রাগ কইরোনা বাবুর মা, দুইডা দিন একটু কষ্ট কর”
    বসির কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললো”ভাবতাছি রিকসা নিমু।ব্যাবসা কইরা জুইত নাই”
    “ আইজ আবার কি হইছে ?”
    “ বৃষ্টি বাদলার দিনে বেঁচা বিক্রি কম সারাদিন বৃষ্টিতে বিঝা মইছ বেইচা পাইছি তিনশো বিশ ট্যেকা আর চান্দা দিছি দুইশ ট্যেকা, বল ক্যামন লাগে ”
    সরুফা কিছু বলল না, খুন্তি দিয়ে কয়েকটি ভাত উঠিয়ে টিপে দেখলো নরম হয়েছে কিনা।
    বসির বলল”খোজ নিছি বউ রিকসায় রোজগার বালো,জমা খরচের পরও বালোই থাকে,ছোট একটা ঘর ভাড়া নেওন যাইবো তখন”
    “ চলেন দ্যেশে ফিরা যাই ”
    বসির একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল”দ্যেশে যাইবা!দ্যেশে যাইয়া উঠবা কই, জায়গা আছে ? ”
    সরুফা চুপ হয়ে গেল। দেশে তাদের সত্যিই তো থাকার কোন যায়গা নেই, কারো বাসায় যেয়ে দুই দিন থাকবে সেই রকম আশ্রয় ও নেই। আত্মীয়স্বজন সকলেই তো তাদের মতো ঢাকা চলে এসেছে।দেশে তাদের কিছু নেই সরুফা একথা প্রায়শই ভুলে যায়, তার মনেহয় যেন এই শহরে তারা বেড়াতে এসেছে কয়েকটি দিন পরই আবার গ্রামে নিজেদের বাড়িতে ফিওে যাবে।
    বসির বলল “ মাইয়া কই বউ ? ”
    “ মইছ আনতে দোকানে পাঠাইছি ”
    হাসিকে আসতে দেখা যাচ্ছে। হাফ প্যান্ট পড়া ক্ষিণ শরীর গামছায় ঢাকা, মাথার কোকড়াঁ চুল হালকা ভেজা। এক হাতে শুাকনো মরিচের ঠোঙ্গা অন্য হাতে একটি গোলাপ ফল। বসির বলল “ ফুল কই পাইছো গো মা?”
     “ রাস্তায় পইরা ছিলো আমি নিয়া আইছি। ”
     ” রাস্তায় পাওয়া জিনিস নিবা না গো মা, নেওয়া ঠিক না। ”
      “আব্বা চুড়ি আনছো ? ”
      “ আইজ আনতে পারি নাই কাইল আইনা দিমু।”
      “ তুমি কাইলও বলছো আইজ আইনা দিবা ”
    বসির বলল “ কাইল ঠিকই আইনা দিমু মা সকালে মনে করাইয়া দিও ”
    সরুফা বলল “ ঘরে যাইয়া দেখ বাবু উঠছে নি”
    হাসি ঘরে গেলো, সরুফা ভাতের হাড়ি নামাতে নামাতে বলল “ মাইয়া টার ভালো জামা নাই সারাদিন খালি গায়ে ঘুরে ”
    বসির বলল “ কাইল জামাও দুইটা নিয়া আমু। গুলিস্তান বাচ্চাগো জামা কাপড়ের দাম কম আছে”
    কিছুক্ষণ পর হাসি ঘরে থেকে বের হয়ে বলল “ আব্বা আমারে পাঁচটা ট্যেকা দিবা ?”
    সরুফা বলল “ এই রাইতে ট্যেকাদিয়া করবি কি ?” বসির লঙ্গির গিট থেকে দশ টাকার একটা চকচকে নোট বের কওে মেয়ের হাতে দিলো।
    সরুফা বলল “ আমার কাছে দে, হারাইয়া ফেলবি।”
    হাসি টাকাটা তার প্যান্টের রাবারে মুড়ে ফেললো। সে মার কাছে কখনো টাকা রাখেনা, খেয়াল করে দেখেছে মার কাছে টাকা রাখালে টাকা আর ফেরত পাওয়া যায় না।
            রাত দশটার মতো কাজ, রাস্তার লোক চলাচল কমে এসেছে। মাঝে মাঝে দুই একজন পথচারী দেখা যাচ্ছে। কয়েকটা রিকশা দ্রত গতিতে ছুটে যাচ্ছে এদিকে সেদিকে। কিছু শৌখিন মানুষ এই সময় রিকশা করে ঘুরে বেড়ায় তাদের হাতে থাকে জলন্ত সিগারেট। বৃষ্টি হওয়ায় রাস্তায় আজ মানুষের আনাগোনা কম।
    ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলোয় রাস্তা ফকফক করছে তবু রাস্তার পাশে ফুটপাতে বসিরের ঘরে এই আলো প্রবেশ করতে পারে নি সেখানে কুপির টিমটিম আলোয় তিনটি অভুক্ত প্রাণি তাদের রাতের আহার সারছে। বসির দ্রুত খেয়ে যাচ্ছে এত প্রচন্ড খিদে লেগেছে আগে বুঝতে পারেনি।
    হাসি বলল “ আব্বা মাছ মাংশ খাইবার মনে চায়”
    বসির বলল “মাছ মাংশ কই পামুরে বেটি?”
    “পত্তেকদিন আলু ভর্তা ভালা লাগেনা আব্বা”
    “এক কেজি গরুর মাংশোর দাম পাঁচশ ট্যেকা আমি আমি প্রতিদিন কামাই দেরশ ট্যেকা ”
    সরুফা বলল “ গুড়া মাছ পাওন যায় না ”
      বসির বলল “ গুড়া মাছের দাম আরো বেশি।”
    সরুফা একটু অন্যমনস্ক হয়ে বলল “ আমাগো গ্রামের বিলে কত গুড়ামাছ !”
    বসিরের খাওয়া শেষ। সে হাত ধুতে ধুতে বলল “ এইসব কথা এখন ভাইবা লাব নাই বউ।” তারপর কিছু একটা ভেবে মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলল “যাও কাইল তোমারে মাংশো দিয়া ভাত খাওয়ামু,নতুন চুড়ি নতুন জামা কিনা দিমু,ধর কাইল তোমার ঈদ”
    “ ঘরে কে ” 
    বসির বাইরে চুপি দিয়ে দেখলো দুইজন পুলিশ দাড়িয়ে আছে একজন একটু মোটা বেটে অন্য জন লম্বা পাতলা হাতে মোটা লাঠি।
    বসির বলল “ আস্সালামুয়ালাইকুম ”
    বেটে পুলিশটি বলল “তোরে এইখানে ঘর তুলতে দিসে কে?”
    “সার আমরা ভাড়া দেই”
    “ ভাড়া দিস ! কে ভাড়া নেয় ?
    বসির বলল“ নেতারা নেয় সার, পুলিশও নেয়। ”
    “ পুলিশ নেয় !কোন পুলিশ নেয়?নাম বল?”
     বসির নাম বলতে পারলোনা,বেটে পুলিশটি বলল “এই এর গালে কষায়া একটা চড় মারো তো”
    লম্বা পুলিশটি এগিয়ে এসে বসিরের গালে চড় মাড়লো। বেটে পুলিশটি বলল “ রাতের ভিতর ফুট পাত খালি করবি।”
    “ এই রাইতে কই যামু স্যার ? ”
    “ কই যাবি সেটা তুই জানিস। সকালে এখান দিয়া মন্ত্রি গাড়ি যাবে রাস্তা ফুটপাত ক্লিয়ার চাই। সকালে তোরে যাতে না দেখি”
    “সার একটা কথা”
    “কোন কথা নাই, সকালে যাতে না দেখি তোরে”
    পুলিশ দুটো চলে যাওয়ার সময় বাইরে রাখা মাটির চুলায় একটা লাথি মেরে চুলার একপাশ ভেঙ্গে ফেললো ।

              বসির ঠেলা গাড়ি নিয়ে এগিয়ে চলছে ঠেলা গাড়িতে তাদের ব্যবহৃত কিছু মালামাল রাখা।একটা ছোট ট্রাঙ্ক,কয়েকটি থালা,পাতিল,ডিবা। গাড়ির নিচের বাক্সে ছেড়া মশারী,চাদর,তেল চিটচিটে তিনটি বালিশ,নিভানো কুপি,আধ কৌটা শরিষার তেল।পুরানো আবাসে তারা কিছু জিনিস ফেলে গেছে। একটা ভাঙ্গা চুলা,কয়েক গজ ছেড়া প্লাস্টিক,কুড়িয়ে পাওয়া ভাঙ্গা খেলনার গাড়ি,রঙচটা মাটির পুতুল আর একুটি গোলাপ ফুল।
              তারা হাঁটছে। বসির ঠেলা নিয়ে আগে হাঁটছে। সরুফা একটু পেছনে পরে গেছে, বাবুকে কোলে নেবার কারনে বসিরের সাথে তাল মিলিয়ে হাটতে পাড়ছে না। হাসি মায়ের কাপরের আঁচল ধরে হাঁটছে,একবার সে কোমরে হাত দিলো,টাকাটা এখনো গোজা আছে প্যান্টে। তার ঘুম পাচ্ছে খুব,তবে এখন ঘুমানোর উপায় নেই, তাদের যে অনেক পথ হাঁটতে হবে আরো। এই শহরের অন্ধকার ফুরাবার আগে খুজে বের করতে হবে নিজস্ব ডেরা। ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলোয় তাদের পথ চিনতে কোন সমস্যা হচ্ছে না।

                           —————-

    11
    8 Comments
Skip to toolbar