-
আমি নার্গিস,নিম্নমধ্যবিত্ত মুসলিম পরিবারে আমার জন্ম।মা-বাবার তৃতীয় সন্তান আমি,আমার বড় এক ভাই এক বোন। বড় বোনের বিয়ে হয়েছে এই গ্রামেরই দূরসম্পর্কের চাচাতো ভাইয়ের সাথে। আমার ভাই নাম সালাম আমার থেকে তিন বছরের বড় সে বিদ্যা বিরাগি,স্কুলে তার এলার্জি,জোর করে স্কুলে পাঠালেও বাজারে চায়ের দোকানে বই রেখে চলে যায় সিনেমায়। তাই বাবা ওকে স্কুল থেকে ছাড়িয়ে জুতার দোকানে কাজে লাগিয়ে দেন।আমা৬র বয়স তখন তেরো অনেক দেরিতে স্কুলে পাঠানো হয়েছে আমাকে। লেখাপড়ায় আমি বরাবরই ভালো।তখন আমি প্রাথমিকের পাঠ চুকিয়ে উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছি। প্রাথমিকে প্রথম স্থান অধিকার করেছি।প্রধান শিক্ষক আমাকে একটি রংবেরঙের ছাতা উপহার দিয়েছিলেন।আসল কথাই বলা হয়নি,আমি যখন খুব ছোট আমার মায়ের একটি দুর্ঘটনা ঘটে, হাসপাতালে থাকতে হয় দীর্ঘদিন।এরই মাঝে বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করেন।শুরু হয় আমার সীমাহীন কষ্টের দিন। কারন বাড়িতে কষ্ট পাওয়ার মতো আমি একাই ছিলাম,বড় বোন শ্বশুরবাড়ি,ভাই জুতার দোকানে।তাই সৎ মায়ের যত নির্যাতন সব আমার নসিবে,সৎ মা কি জিনিস! আগে জানতাম না এখন হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করছি। পৃথিবীর সমস্ত বাবাদের উদ্দেশ্য করে বলতে চাই,আপনাদের যদি দ্বিতীয় বিয়ে করতেই হয়, তাহলে আপনাদের সন্তানদের তিলে তিলে কষ্ট না দিয়ে খাবারে বিষ মিশিয়ে দিন ঝামেলা চুকে যাবেযাবে,আর কোনো বাধা থাকবে না।পান থেকে চুন খসলেই শুরু হতো সৎ মায়ের অমানুষিক নির্যাতন। যারা সৎ মায়ের হাতে পরেন নাই তারা হয়তো উপলব্ধিও করতে পারবেন না সৎমা কত নিষ্ঠুর হতে পারে। আমার উপরে হওয়া নির্যাতনের কিছুটা শেয়ার করছি।একদিনের ঘটনা মাঘ মাসের মাঝামাঝি কনকনে ঠাণ্ডা ফজরের আযান হয়েছে মাত্র, ছোট-মা আমাকে ঘুম থেকে উঠিয়ে দিলেন বিলে মাছ ধরতে যাওয়ার জন্য,অথচ তার আদরের ছেলে লেপের নিচে ঘুমে বিভোর।আমি বললাম ছোট মা কালামকে ও উঠিয়ে দাও আমার সাথে যাবে একা একা আমার ভয় লাগে।ছোটমা আমার কানে মোচড় মেরে মুখ ঝামটা দিয়ে বললেন,ওরে আমার নবাবের বেডি লো ওনার বডিগাড নাগবো।আমি কান ডলতে ডলতে বিলের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম।প্রায় তিন ঘন্টা ধরে ঠান্ডা পানির মধ্যে হাতরে হাতরে কিছু মাছ ধরলাম।ঠান্ডায় হাত পা অবশ হয়ে গেছে,আর পারছিনা কিন্তু কিছুই করার নেই,ছোট মায়ের অত্যাচারে চেয়ে এটা বেশি কিছু না।এক দিন খাওয়ার মত মাছ না ধরলে রক্ষা নাই।তাই কষ্ট হলেও বাড়িতে ফিরতে পারছিনা।আরো ঘন্টা খানিক মাছ ধরলাম,যা পেলাম জানিনা ছোট মায়ের মন ভরবে কিনা?স্কুলে যেতে হবে তাই বাড়ির দিকে রওয়ানা দিলাম।মনে মনে যা ভাবছিলাম তাই হলো,মাছ দেখে তার মন ভরলোনা,মাছের পাতিল আছড়ে ফেললো উঠানে,খিস্তি যা করার তা তো করলই।একটা শৈলটাকি লাফিয়ে পরলো গিয়ে ঘড়ের পিছে খালের পানিতে তাতেই যেন জ্বলন্ত আগুনে ঘি পরলো।মাছটা নাকি আমারই কারনে খালে পরেছে,তাই আমার পিঠে পরলো কাঁচা কঞ্চির কয়েক ঘা।সেই সাথে অধ্যাদেশ জারি হল আজ আমার খাওয়া বন্ধ।আমার মা শুধু চোখের জল ফেললেন,আর চেয়ে চেয়ে দেখলেন,প্রতিবাদের ক্ষমতা টুকোও নাই তার কাছে।দৌড়ে গিয়ে মায়ের গলা জরিয়ে একটু কেঁদে বুকটা হলকা করব তারও উপায় নাই।কি আর করার,এমনটা তো দৈনন্দিন রুটিন।এমনো সময় গেছে দুই তিন দিনের জন্য আমার খাওয়া বন্ধ করেছে,ক্ষুধার জ্বালা সহ্য করতে না পেরে পাশের বাড়িতে গরুর জন্য রাখা তিন দিনের পচা ভাত তাই খেয়েছি গোগ্রাসে।এমন আরো কত শত অত্যাচার নিরবে সয়েছি! বড় বোনের বাড়িতে যাবো সেখানেও তার শাশুড়ি আরেক দাজ্জাল।তাই না খেয়েই স্কুলে চলে গেলাম,স্বপ্ন একটাই লেখা পড়া আমাকে করতেই হবে।তারপর চাকরি করবো মাকে এই নরক থেকে মুক্ত করবো।আপনাদের মনে প্রশ্ন আসতে পারে,আমার বাবা কি এ সবের কিছুই দেখেন না?না তার চোখ তো এখন ছোট মায়ের আঁচলে বাধা,আর কানে মধ্যে বিষ ঢালা।তাই তার দৃষ্টি ও শ্রবন শক্তি দুটোই লোপ পেয়েছে। মিয়ে ভাই খাওয়া খরচ বাদে মাসে তিনশ টাকা পেত,তা থেকে একটি টাকাও সে খরচ করত না সবটাই তুলে দিতো বাবার হাতে,বাবার হাত থেকে ছোট মায়ের হাতে।তা থেকে একটি পয়সাও আমাদের জন্য খরচ হতোনা।মাইনে দিতে পারতাম না বলে স্কুলে যাওয়াই ব্ন্ধ করে
দিয়েছিলাম,কয়েক দিন পরে রফিক স্যার আসলেন আমার খোজে।রফিক স্যার খুব দয়ালু ,স্কুলের পিছনেই উনার দোতলা বাড়ি।তাঁর বাবা কত সম্পদ রেখে গেছেন,তার হিসাব অজানা।শিক্ষকতা তাঁর পেশা নয়,বেতনের সব টাকাই তিনি গরিব ছাত্রদের জন্য খরচ করেন।তিনি আমার জন্য কমলা আর আপেল এনেছেন,ব্যাগটা আমার হাতে দিলেন।ছোট মায়ের চোখ বলছে এই বান্দির বাচ্চা তোর পেটে একটা ফলও যাইবো না।তার চোখের ভাষা পড়তে একটুও দেরি হলোনা আমার,তারাতারি ব্যাগটা ছোট মায়ের হাতে দিলাম।তারপর ঘর থেকে মোড়া এনে স্যারকে বসতে দিলাম।স্যার বসলেন তারপর ছোটমাকে ডাকলেন,ছোট মা আসতেই স্যার জিজ্ঞেস করলেন,নারগিস স্কুলে যায়না কেনো?ছোট মায়ের চোখে মুখে বিরক্তির ছাপ,আপনের ছাতিরেই জিগান!ছোট মা আমাকে ছাতি বলায় স্যার মনে মনে ক্ষুব্ধ হলেন। আমাকে কাছে ডেকে বললেন,নারগিস তুমি স্কুলে যাও না কেনো?আমি মাথা নিচু করে দাড়িয়ে রইলাম।স্যার উঠে দাড়িয়ে বললেন কাল স্কুলে আসো আমি সব শুনবো,বলেই স্যার চলে গেলেন।পরের দিন স্যারকে সব কিছু জনালাম।তিনি আমার বাবাকে ডেকে পাঠালেন,বাবাকে বললেন আমার লেখাপড়া নিয়ে কোনো চিন্তা না করতে।সমস্ত খরচ নিজের কাঁধে নিয়ে নিলেন।
হলো না আমার দুঃখের অবসান শনির দশা কাটলো না কারণ আমি যে সতীনের ঝি!ছোটমার প্রয়াস ছিল একটাই কি করে আমার স্কুল যাওয়া বন্ধ করা যায়।তাই বিভিন্ন অজুহাতে আমাকে দূরে পাঠিয়ে দিত।যেন কাজ সেরে এসে ক্লাস করতে না পারি।আর সে কারণেই সপ্তাহে প্রায় তিন থেকে চার দিন স্কুলে যেতে পারতাম না।বিষয়টা রফিক স্যার বুঝতে পারলেন,তাই তিনি বাবাকে ডেকে আমাকে দত্তক নেওয়ার ব্যবস্থা করলেন।রফিক স্যারের কোন কন্যা সন্তান নাই,শুধুমাত্র দুই ছেলে,বড় ছেলে সবে মাত্র কলেজে ছোট ছেলে ক্লাস নাইনে।স্যারের স্ত্রী আমাকে মেয়ের মত আদর করতেন।সুখেই কাটছিলো দিনগুলো হঠাৎ একদিন। বাকিটা আগামি পর্বে।5 Comments
Friends
Syeda Tahmin Ara
@tahmina-s
MD AKRAMUL HOQUE
@akramul-here
MD AMAN ULLA
@aman06
Farhana Nawrin (Sumi)
@nawrin
Omar Sani
@omar-sani
RITON MOSTOFA
@riton
Mustafa Nazmus Sakib (Zubair)
@mustafasakib
Md.Akram hosen
@hosen
Arefeen
@arefeen


শুরুটা সুন্দর। পরবর্তী পর্বের অপেক্ষায় রইলাম। শুভেচ্ছা ও স্বাগতম লেখক।