-
বাড়ি নাম্বার ফোর নট থ্রি (প্রথম পর্ব)
সীমান্ত পিটার গমেজ
———————————-
বাংলাদেশের নামকরা প্রাইভেট ডিটেকটিভ মিঃ থমাস আব্রাহাম তার ব্যক্তিগত লাইব্রেরিতে তিনটা দৈনিক পত্রিকা প্রায় একঘন্টা ধরে খুটিয়ে খুটিয়ে দেখছেন আর আনমনে বিরবির করছেন। চোখে মোটা গ্লাসের চশমা। বয়স যে খুব বেশি হয়েছে তা না, মাত্র পয়ত্রিশ। অতিরিক্ত রাত জাগা আর বই নিয়ে বসে থাকায় কয়েক মাস ধরে মাথা ব্যাথা ও চোখ দিয়ে পানি পরার ব্যধি শুরু হয়েছে। ডাক্তার খুব করে বলে দিয়েছে তিনি যেন পর্যাপ্ত বিশ্রাম করেন। এমনিতেই মিঃ থমাস যথেষ্ট শক্তপোক্ত গড়নের অধিকারী।তার সমানের পত্রিকা গুলো যথাক্রমে, ১৪-০২-২০২১, ১৭-০৪-২০২১ ও গতকাল ০৫-০৮-২০২১ এর। তিনটি পত্রিকারই প্রথম পাতায় বিভৎস খুনের বর্ণনা দেওয়া। খুন হওয়া ব্যক্তিরা যথাক্রমে বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মিঃ রাজীব আহমেদ (৪০), নামকরা হার্ট স্পেশালিষ্ট ডঃ রমেশচন্দ্র গুপ্ত (৩৮) ও বিখ্যাত ডিরেক্টর মিঃ রাকিব হাসান (৩৯)। সবাইকেই প্রচন্ড রকমভাবে শারীরিক অত্যাচার এর পর খুন করা হয়েছে। পোস্টমর্টেম রিপোর্ট অনুযায়ী প্রত্যেকটা খুন কোন পেশাদার খুনির সংকেত দেয়। খুব ঠান্ডা মাথায় খুন গুলো করেছে খুনিরা। মিঃ থমাসের ধারনা তিনটা খুন একই ব্যক্তি করেছে। যদিও তারপক্ষে যথেষ্ট যুক্তি মিঃ থমাস দাড় করাতে পারছেন না। তিনজনকেই খুন করার আগে শারিরীক অত্যাচার করা হলেও অত্যাচারের ধরন ছিলো ভিন্ন। মিঃ রাজীব কে খুন করা হয়েছে কারেন্টে শক দিয়ে। মিঃ রমেশচন্দ্র কে খুন করার আগে এসিড দিয়ে তার মুখ পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তারপর বাথটাবের জলে ডুবিয়ে শ্বাসরোধ করে খুন করা হয়েছে। আর মিঃ রাকিবকে অনেকট ফিল্মি স্টাইলেই খুন করেছে খুনি। ফ্যানের সাথে উল্টো করে ঝুলিয়ে মাথায় লোহার রড দিয়ে পিটানোর পরে হাতের রগ কেটে দিয়ে শরীরের সব রক্ত বের করে দিয়েছে খুনি। যার ফলে মৃত্যু হয়েছে মিঃ রাকিবের।
শুধু একটা জায়গাতেই কিছুটা মিল পাওয়া যায়। সেটা হল তিনজনেরই মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পরে খুনি তাদের হৃদপিণ্ডের ভিতরে কিছু না কিছু ঢুকিয়ে দিয়েছে। কিন্তু এতেও নিশ্চিত হওয়ার কোন উপায় নেই যে খুনি একজনই। কারন মিঃ রাজীব আহমেদের অনেকগুলো ব্যবসার মধ্যে একটি ছিলো সিগারেটের ব্যবসা। নামকরা সিগারেট ব্র্যান্ড “বি এন্ড বি” এর মালিক ছিলেন তিনি। হয়তো ধুমপান করে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া কোন রোগীর আত্মীয় স্বজন রাগের বসে তাকে খুন করে তার হৃদপিণ্ডে গুলি করে নিজের মনকে শান্তনা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। যদিও যুক্তি টা হাস্যকর লাগছে তবুও একদম ফেলে দেওয়াও যায় না।। মিঃ রমেশচন্দ্র যেহেতু একজন হার্ট স্পেশালিষ্ট তাই তার খুনি তার হার্টে সার্জিক্যাল ছুড়ি ঢুকিয়ে খুন করেছে। বেচারা হার্ট স্পেশালিষ্ট, নিজের হার্ট রক্ষা করতে পারলেন না। আর মিঃ রাকিবকে তার পরিচালিত সিনেমা “পোড়া হৃদয়” এর একটা সিনের হুবহু নকল করে খুন করা হয়েছে। খুনি মিঃ রাকিবের হৃদপিণ্ডে স্ক্রু-ড্রাইভার ঢুকিয়ে দিয়েছে। তিনটা খুনের পিছনেই আলাদা আলাদা যুক্তি আছে। তাছাড়া খুনের তারিখ ও খুন হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে কোন সম্পর্কও খুজে পাওয়া যায় নি। এমন কি বেঁচে থাকতে কেউ কাউকে দেখা তো দুরের কথা কে কারো কাছাকাছি ও কোন দিন আসে নি। সব কেমন যেন জট পাকিয়ে যাচ্ছে। মিঃ থমাস ঘর থেকে বের হয়ে বাগানে চলে গেলেন। মাথা থেকে খুনের বিষয় গুলো ঝেরে ফেলতে চাইছেন। কিন্তু পারছেন না। প্রশাসন থেকে খুনের রহস্য উদঘাটনের ব্যাপারে তার কাছে কোন সাহায্য এখনো চায় নি। তবে তিনি নিশ্চিত যে আর কয়েকদিনের মধ্যেই তার সাথে প্রশাসন ঠিকই যোগাযোগ করবে।
আরো একমাস পার হয়ে গেল। খুনের ব্যপার টা আস্তে আস্তে ধামাচাপা পরে গেল। মিডিয়া নতুন সংবাদের পিছনে ছুটলো। রাজধানীর ভিতর যে এত বিভৎস তিনটা খুন হয়ে গেল তাতে যেন এ শহরের কিছুই আসে যায় না। বর্তমান বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থাটাই এমন। প্রত্যেকদিন নতুন নতুন খবর তৈরি হচ্ছে আর গতদিনের খবর তার নিচে চাপা পরে যাচ্ছে। আজ ০৭-০৯-২০২১। টেলিফোনের তীব্র আওয়াজে ঘুম ভাঙলো মিঃ থমাসের। সকাল সাড়ে ছয়টা বাজে। এত সকালে কে হতে পারে মিঃ থমাস ভেবে পেলেন না। ফোনটা কানে নিতেই অপর প্রান্ত থেকে চিফ অব বাংলাদেশ পুলিশ মিঃ জামান ওয়াহিদের গলা শোনা গেল। গলার আওয়াজে কেমন একটা আতংকিত ভাব স্পষ্ট। মিঃ থমাস, ঢাকায় আছেন তাহলে। কি যে এক মুশকিলের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি বোঝাতে পারবো না। আমি গাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছি, এক্ষুনি কলাবাগান চলে আসুন। আরো একটা খুন হয়েছে। আপনাকে আমার সাথে স্পটে যেতে হবে। একদমে কথাগুলো বলে গেলেন মিঃ জামান ওয়াহিদ, তিনি তাড়াহুড়োর করে ফোন দিলে কখনোই কুশল বিনিময়ের ধারে কাছেও জান না এইটা মিঃ থমাস খুব ভালো ভাবেই জানেন।
মিঃ থমাস প্রস্তুত হয়ে তার ছোট যন্ত্রপাতির ব্যাগটা হাতে নিয়ে জামান সাহেবের পাঠানো গাড়িতে গিয়ে উঠলেন। কলাবাগ খুনের স্পটে পৌঁছে দেখলেন জামান সাহেব আগেই সেখানে হাজির। মিঃ থমাসকে দেখে ছুটে এলেন জামান সাহেব। কুশল বিনিময় করে মিঃ থমাসকে ডেড বডির কাছে নিয়ে চললেন। একটা আন্ডার কনস্ট্রাকশন বিল্ডিংয়ের পাঁচ তলায় খুনটা করা হয়েছে। গলায় হাফ ইঞ্চি যায়গায় গোলাকার হয়ে কালো হয়ে আছে। মাঝের আঙুলটা ভাজ করে একটু উচু করে ঘুষি মেরেছে গলায়, তাই শুধু এক আঙুলের আঘাতই লেগেছে গলায়। তার ছাপ স্পষ্ট হয়ে আছে। বুকের বাম পাশে প্রচন্ড জোরে ঘুষি মেরে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ করে দিয়েছে খুনি। কাজটা করতে সর্বোচ্চ দুই সেকেন্ড লেগেছে খুনি। বুকের পাঁজরের হার ভেঙে গেছে। বোঝাই যাচ্ছে কোন প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত খুনির কাজ। আর এই লাশটিরও হৃদপিণ্ড একটা লোহার রড দিয়ে এফোড় ওফোড় করে দিয়েছে খুনি। মিঃ থমাস এখন শতভাগ নিশ্চিত যে আগের খুন গুলো ও একই ব্যক্তি বা একই গ্রুপের লোকই করেছে। মিঃ থমাস তার ব্যাগ থেকে আতশ কাচ বের করে সব খুটিয়ে খুটিয়ে দেখতে লাগলেন। কিন্তু কোন চিহ্ন বা প্রমান কিছুই খুজে পেলেন না। আশা প্রায় ছেড়েই দিচ্ছেন এমন সময় লাশের পাশের পিলারের গোড়ায় চোখ আটকে গেল। পিলার সামনে ঠিক মাঝামাঝি অবস্থানে আবছা জুতার ছাপ দেখা যাচ্ছে। মিঃ থমাস হাটু গেড়ে বসে আতস কাচ দিয়ে জুতার ছাপ টা ভালো ভাবে পরীক্ষা করতে লাগলেন। তার কপাল কুঁচকে গেল। জামান সাহেব সেটা লক্ষ্য করে প্রশ্ন করলেন, মিঃ থমাস কোন সূত্র পেলেন? উত্তরে মিঃ থমাস বললেন, খুনি একজন মহিলা। মিঃ থমাসের কথা শুনে জামান সাহেব স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। নিজেকে সামলে নিয়ে আবার প্রশ্ন করলেন, আপনি এতটা শিওর কিভাবে হচ্ছেন যে খুনি একটা মেয়ে। মিঃ থমাস জামান সাহেব কে কাছে ডাকলেন। তার পার আতস কাচ দিয়ে জুতার ছাপ দুটো ভালো ভাবে দেখালেন। দেখুন জামান সাহেব জুতার সামনের অংশের ছাপ স্পষ্ট মাঝখানে কোন ছাপ নেই আবার শেষ অংশে ছোট বর্গাকার একটি ছাপ। এমন ছাপ শুধু মাত্র মেয়েদের হাইহিল থেকেই পড়ে। জামান সাহেব মাথা ঝাকিয়ে মিঃ থমাসের কথায় সায় দিলেন। মিঃ থমাসা বির বির করতে লাগলেন, মেয়েটা কেন এই পিলারের সামানে দাড়ালো? মিঃ থমাস ভালো ভাবে পিলারটা আতস কাচ দিয়ে পরীক্ষা করতে লাগলেন। একটু উপরের দিকে উঠতেই মিঃ থমাসের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। অনেক ছোট কের একটা লাভি চিহ্ন আকানো। আর তার মাঝখানে পাঁচটি ক্রস চিহ্ন। মনে হয় খুনি কোন কিছু ইঙ্গিত দেওয়ার চেষ্টা করেছে। সাইকো কিলার রাই বেশিরভাগ এমন করে থাকে। খুন করার পর একটা সিম্বল রেখে যায়। এতে খুনি একধরনের পৈচাশিক আনন্দ পায়। মিঃ থমাস তার ব্যাগ থেকে মেজারমেন্ট টেপ বের করে দেওয়ালে কি যেনো মাপ ঝোক করলেন। তারপরে নোট খাতার মধ্যে লিখতে শুরু করলেন, “খুনি একজনে মহিলা। উচ্চতা পাঁচ ফুট সাত ইঞ্চি। এবং খুনির কারাতে ব্ল্যাকবেল্ট হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি।” জামান সাহেব অবাক হয়ে প্রশ্ন করলেন, মিহলার উচ্চতা পাঁচ ফুট সাত ইঞ্চি আপনি কিভাবে জানলেন? উত্তরে মিঃ থমাস বললেন, মানুষ সাধারণত দেওয়ালে বা বোর্ডে এক লাইনের কিছু লিখতে গেলে নিজের চোখ বরাবরই লিখে। এই পিলারের গায়ে আঁকা চিহ্নটা মাটি থেকে পাঁচ ফুট ছয় ইঞ্চি উপরে। এবার পাঁচ ফুট ছয় ইঞ্চি থেকে হাই হিলের উচ্চতা দুই ইঞ্চি বাদ দিন, তাহলে থাকে পাঁচ ফুট চার ইঞ্চি, এবার তার সাথে চোখের উপরের অংশের তিন ইঞ্চি যোগ করুন, তাহলেই চলে আসে পাঁচ ফুট সাত ইঞ্চি। জামান সাহেব মিঃ থমাসের দিকে হা করে তাকিয়ে রইলেন।
9 Comments
Friends
ইফতিশা খানম
@eftishakhanam
Foyzur Khan
@foyzur-khan
Kabi Doctor Mohammad Zakir Hossain Biplob
@zakir-hossain
Rezaul Karim
@rezaul-karim
অবাক রহমান
@jahedi
Nipun Chandra
@nipunch
Jubayer Al Mahmud
@jubayer
UTTAM KUMAR BISWAS
@uttamk




খুব ভাল লাগল নতুন সাসপেন্স থ্রিলার পেয়ে। লিখে যান লেখক শুভ কামনা রইল।