-
১৭/১১/২১ইং
বিশ্বব্যাপী করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে দেশের ইউনিভার্সিটি গুলোতে অনলাইনে ক্লাস হচ্ছে।যার ফলশ্রুতিতে গ্রামে থাকার জন্য একটা বড় সময় পেয়েছি। গ্রামে শখের বসে বছর পাঁচেক আগে নবম-দশম এর বিজ্ঞান বিভাগের একটা ব্যাচের কিছু স্টুডেন্টস পড়িয়ে তাদের ভালো ফলাফল অর্জন করাতে পেরে টিউশন মাস্টার হিসেবে মোটামুটি পরিচিতি লাভ করি।যার জন্যে ৮-১০ দিনের ছুটিতে গ্রামে এসেও রক্ষা হয় না।আর করোনাভাইরাস এসে বড় রকমের একটা সুযোগ করে দিল অনেকটা সময় নিজের গ্রামে থাকার জন্যে।তাই অনলাইন ক্লাসের ফাকে ফাকে তিনটা টিউশন রেখেছি যাতে আমার সাধ্যের মধ্যে থেকে গ্রামের মানুষের একটু আধটু উপকারে আসতে পারি।বিকেল বেলা যে টিউশন টা আছে সেইটা একটু দুরে হওয়ায় গ্রামের ঐতিহ্য ভ্যান গাড়ি তে করেই যাওয়া আসা করি। রোজকার মতোই আজও একটা ভ্যান গাড়ি ডেকে নিলাম।কিছুপথ যাওয়ার পরে পেছন দিক থেকে দ্রুত গতিতে অন্য একটি ভ্যান আমাদের অতিক্রম করে কিছুটা গতি মন্থর করে সামনে সামনে চলতে লাগলো। ঐ ভ্যানটিতে চারজন যাত্রী, যাদের দুজন ভদ্রমহিলা সামনে আর দুটো মেয়ে পেছনের দিকে বসেছে। তাদের সকলেই বোরকাবৃত অবস্থায় আছেন।পেছনের মেয়েদুটো কালো রঙের মাস্ক পরেছে যাতে খুব সুন্দর করে সাদা রঙের ফ্লাওয়ার পেইন্টেড আছে।মেয়েদুটো নিজেদের মধ্যে কি কি বলছে আর হাসাহাসি করছে। ওদের অঙ্গ-ভঙ্গীতে স্পষ্ট ওরা আমাকে নিয়ে হাসছে। আমার বেশ লজ্জাও লাগছে,ভাবছি আমার মধ্যে কি এমন দেখে ওদের এতো হাসি পাচ্ছে! এদিক সেদিক মুখ করে থাকি, নিজের পোশাক এর মধ্যে কিছু আছে কিনা খুঁজি, পকেট থেকে ফোন বের করে স্ক্রিনে মুখ দেখি কিছু দেখা যায় কি না আবার ফোন টিপছি এমন অবস্থায় থাকি।এমন করতে করতে প্রায় ২ কিঃমিঃ চলে গেলাম।সামনে গ্রামের হাটের রাস্তা দেখে একটু নিজেকে শান্তনা দিলাম,ভাবছি এবার আমি হাটের মধ্যে ঢুকে পড়বো আর সামনের ভ্যান নিশ্চয়ই হাটের দিকে ঢুকবে না। কিন্তু ভাবতে ভাবতে ওই ভ্যানটিও হাটের মধ্যে ঢুকে পড়লো। এতক্ষণে মেয়েদুটোর শুভবুদ্ধি উদয় হল। তারা এখন আর হাসছে না।কিছুটা সামনেই ভ্যানের স্টপেজ। ওখানে আমাদের নামিয়ে দিল।সামনের ভ্যানের যাত্রীরা ভাড়া মিটিয়ে চলে গেল।কিন্তু আমি খুচরো নেই এমন ভান করে স্টপেজএ কিছু সময় পার করলাম।যাতে ওই চারজন যাত্রী আর আমার মধ্যে ভালো রকমের একটা দূরত্ব তৈরী হয়। এবার আমি হাটতে শুরু করলাম, হঠাৎ করে আমার থেকে ১০-১২ ফিট দুরে ঐ মেয়েদুটোর মধ্যে যে মেয়েটি একটু বড় তাকে উল্টোদিকে ঘুরে দাড়িয়ে থাকতে দেখতে পেলাম। আর অন্য তিনজন প্রায় ৫০-৬০ ফিট সামনে দাড়িয়ে এই মেয়েটির জন্যে অপেক্ষা করছে। আর তাদের মধ্যে একরকম বিরক্তির ছাপ দেখা গেল।
আমি এবার এই মেয়েটির পাশ দিয়ে সামনে যেতে চেষ্টা করি কিন্তু লাভ হল না। মেয়েটি তাড়াহুড়ো করে আমার সামনে এসে হাটতে শুরু করল। আর একটু সামনে এগিয়ে পেছন পানে মুখ ঘুরিয়ে টান মেরে নিজের পরিধেয় মাস্ক খুলে একপ্রকার ব্যাঙ্গাত্মক হাসি দিয়ে আবার হাটতে লাগলো। এতক্ষণে আমি মেয়েটির মুখাবয়ব দেখতে পেলাম।আমি তার সৌন্দর্য্যের ব্যাখ্যা করতে চাই না। তবে শুধু মাত্র শুক্রিয়া করি মহান সৃষ্টিকর্তার, তিনি হয়তো এই মেয়েটিকে বিশেষ তত্বাবধায়নে সৃষ্টি করে এই পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন।
এবার একজন ভদ্রমহিলা মেয়েটির হাত ধরে হাটার চেষ্টা করে কিন্তু মেয়েটি তার থেকে নিজের হাত গুটিয়ে নেয় আর বলে তোমরা ক্যানো আমার জন্যে দাড়িয়ে আছো! আমি তো এই যায়গাটা চিনি। এই বলে আবার অপরুপা সেই মুখখানি পেছনে ঘুরিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসি দিল, যে হাসির মধ্যে সহস্রাধিক অর্থপূর্ণ বাক্যে জড়জড়িত ছিল।আমি তন্মধ্যে ১-২ টা শব্দ আচ করতে পারি। মেয়েটি বারংবার পেছনে তাকায় আর ক্রমশ হাটার গতি কমায়। অন্যদিকে তার গার্ডিয়ান তাকে জোরপায়ে হাটার আবেদন জানায়। কিন্তু এই আবেদন মেয়েটির কর্ণকুহর অবদি পৌছে বলে মনে হয় না।সে ঠিক তার মতো করেই এগোচ্ছে।তার এই কর্মকান্ডে খুব সামান্য পরিমানে হলেও আমার উপর ভিন্নধর্মী একটা প্রভাব পরেছে বলে মনে হল।কিন্তু মন থেকেই আমি চাইনা এমন কোনো প্রভাব আমার উপর পড়ুক। তাই যত তাড়াতাড়ি পারা যায় এই সঙ্গটা ত্যাগ করার চেষ্টা চালাচ্ছি।
হঠাৎ করে মেয়েটি কোনো একটা দোকানের দিকে তাকিয়ে কিছু একটা দেখার ছলে দাড়িয়ে পড়লো। আমি পেলাম সুযোগ, তাই একটু তাড়াহুড়ো করে হাটাতে শুরু করি অন্যদিক থেকে মেয়েটি দু’পা আমার দিকে এগিয়ে দাড়ালো। খুব কাছাকাছি হওয়ায় আমার চোখ তার চোখে পড়ল। খুব অল্প সময়ে যতটুকু বুঝলাম, ওই চোখ দুটোর যদি কথা বলার শক্তি থাকতো তবে তারা হয়তো ভিন্ন ভাষার বড় কোনো প্রোগ্রাম বাংলাতে অনুবাদ করে শোনাতো আমাকে। কিন্তু সৃষ্টিকর্তা তাদের সেই শক্তি দেননি। মেয়েটিকে অতিক্রম করার মুহূর্তে আমার সাথে সাথে মেয়েটুও আস্তে করে ঘুরে আমার পাশাপাশি হাটতে শুরু করল।কেনো যেনো মনে হল মেয়েটি আমাকে চিনে তাই এমন আচরণ করছে,এবার আমি আবার তার দিকে ফেরে তাকালাম।মেয়েটিও আমার দিকে তাকালো কিন্তু মেয়েটির চোখে হয়তো ময়লা পরেছিল, চোখদুটো কেমন লোনাজলে টলমল করছিল তাই বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারছিল না।দেখলাম তার ওড়না হিজাব এর একটা অংশ দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে হাটছে। চোখে পানি এসে সামনের পথটা হয়তো ঘোলাটে দেখছিল তাই নিজের পথ ছেড়ে আমার দিকে আরও চেপে এসেছিল।একমুহূর্তের জন্যে মনে হয়েছিল সে আমার হাত ধরতে চায়।আমি বরং তার পথ পরিষ্কার করে দিতে রাস্তার বাইরের দিকে চেপে গেলাম।আর লক্ষ্য করলাম তার হাতে একটা ভিজিটিং কার্ড,যার উল্টো পাশ আমার দিকে তাক করিয়ে সামান্য পরিমানে হাত উঁচু করে আছে।সে হয়তো বা এটাই চাচ্ছে, আমি তার হাত থেকে কার্ড টা নেই।ভিজিটিং কার্ডটির উল্টো পাশে এলোমেলো করে কিছু সংখ্যা লেখা চোখে পড়ল। আমি বুঝেও বুঝলাম না তার ভাষা।আমি বরং তাকে এড়াতে পরিচিত এক দোকানে ঢুকে পরলাম।
কিন্ত তাও সে ছাড়লো না,সে এবার কাদো কাদো গলায় বলল- আম্মু এই দোকানে একটু আসো,আমি কিছু নিব।এই বলে আমার ঠিক বিপরীতের দোকানে ঢুকে আমার দিকে তাকিয়ে চোখ মুছতেছে।যে দৃশ্যটা
আমার উপর দারুণভাবে একটা প্রভাব সৃষ্ট করে, যেটা আমি নিতে পারছিলাম না।আমি এবার এই দোকান থেকে বেড়িয়ে একবারের জন্যেও পেছনে না তাকিয়ে খুব তাড়াতাড়ি বাজার পার করি এবং স্টুডেন্ট এর বাসায় চলে যাই।4 Comments
Friends
Md Nazrul Islam
@md-nazrul-islam-2
Fahmida Jesmin
@fahmida-jesmin
Soriful Islam
@soriful-islam
ASIM KUMAR NAG
@asimknag
Firoj Mahmud
@firoj-mahmud
JAHIDUL ISLAM
@jahidul-2
MD. SAGOR MIA SABUJ
@sagormunni
Emon Munsi
@emonmunsi123
এফ রা ব্বী
@mdfozlarabby


অভিনন্দন