-
ছোটগল্পঃ বাবলুর দাঁত
কদিন ধরেই নিশা লক্ষ্য করছে, বাবলু ঠিকমতো খেতে পারছে না।ভাতের লোকমা মুখের ভেতর ঢুকাতে গেলেই কেমন একটা অস্বস্তি বোধ করছে।ইশারায় বারবার নিশার হাত সড়িয়ে দিতে চাইছে।নিশা ভালো করে লক্ষ্য করার পর বুঝতে পারল বাবলুর নিচের পাটির দুটো দাঁত মাড়ি থেকে একটু যেন আলগা হয়ে গিয়েছে।আসলেই তো বাবলু তো দেখতে দেখতে সাত এ পা দিয়েছে।বাবলুর দুধের দাঁত পড়ে গিয়ে নতুন দাঁত বেড় হবার সময় এসে গিয়েছে।বাবলু আজ ঘুম থেকে ওঠার পর থেকে এক মুহূর্তের জন্যও তাকে একা রাখা যাবে না।আজ যে কোন সময়ই দাঁতটা পড়ে যেতে পারে।ওর এই দাঁতকে নিয়ে নিশার কতো জল্পনা কল্পনা।
ছেলের সবগুলো দাঁত সে হরলিক্সের কাঁচের বোয়োমে জমিয়ে রাখবে।বাবলু বড় হলে তাকে দেখাবে আর বলবে,
“এই বোয়োমের ভেতর ইঁদুরের দাঁতের মতো যে দাঁতগুলো দেখতে পারছিস এগুলো আসলে তোর।এগুলো পড়ে গিয়েই এখনকার এই কোদালের মতো দাঁতগুলো বেড় হয়েছে, বুঝলি?রোজকার মতো আজও বাবলু ঘুম থেকে ওঠার পরই নিশার দিকে তাকিয়ে ফিক করে হেসে ফেলেছে।প্রতিটাদিন এই হাসির অপেক্ষাতেই থাকে নিশা কিন্তু আজ এই হাসি চোখে পড়া মাত্র নিশা বিচলিত বোধ করল।কারণ,বাবলুর হালকা নড়া দাঁতদুটোর ভেতর একটি নেই।এখন কি হবে?বাবলুকে বেশ আলতো করে কোলে নিয়ে সে সোফায় বসালো। তারপর বিছানা ঝাড়লো।আনাচে কানাচের বালিশ কাঁথা উল্টিয়ে পাল্টিয়ে দেখল। কিন্তু না, কোথাও নেই।বাবলুকি তবে গিলে খেয়ে ফেলেছে দাঁতটা?
খালা অবশ্য একটু আগেই ঘর ঝাড়ু দিয়ে বেড় হয়ে গেল। তাহলে কি সেখানে?কিন্তু এ তো মোটামুটি অসম্ভব ব্যাপার। এতো আবর্জনার ভেতর কোথায় খুঁজবে সে এতো ছোট্ট একটা দাঁত?ছুটির দিন হওয়ায় বাবলুর বাবা অবশ্য আজ সারাদিন বাড়িতেই আছে।কিন্তু সে তো ঘুমোচ্ছে আরাম করে। এ সময় তাকে ডাকা কি ঠিক হবে? বেচারা ৬ দিন ঘোড়া দৌড় দৌড়িয়ে একটা দিনই ছুটি পায়।
তবে এতটুকুই নিশার মানসিক শান্তি, কেউ যদি শেষপর্যন্ত দাঁতটা খুজে না পায়, বাবলুর বাবা যে করেই হোক দাঁতটা খুঁজে বের করবেই কারন,নিশা কে সামাণ্য আনন্দ থেকেও সে বঞ্চিত করতে চায় না।প্রায় এক যুগ প্রেম করার পর ওদের বিয়ে হয়েছিল।বিয়ের আগে তাদের যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম ছিল চিঠি।তখন থেকেই তারা স্বপ্ন দেখত তাদের একটা ফুটফুটে কন্যা সন্তান হবে।নামটাও ঠিক করে রেখেছিল।নাম রাখতে চেয়েছিল চিত্রা।কিন্তু,সব স্বপ্ন, সব ভাবনাই যে সত্য হবে এমন তো না।প্রকৃতি হয়তো অন্য কিছুই ঠিক করে রেখেছিল তাদের জন্য। আর তাই তো বিয়ের এক বছরের মাথায় তাদের ঘর আলো করে চিত্রার জায়গায় বাবলু এল।একদম রাজপুত্রের মতো হয়েছিল দেখতে বাবলু।একবার তো বাবলুর বাবা আর নিশা মিলে প্রায় ঠিক করেই ফেলেছিল ছেলের নাম রাজপুত্র রাখবে।কিন্তু শেষপর্যন্ত আর রাখা হয় নি। পরে বাবলুর দাদার ইচ্ছাতেই বাবলুর নামকরণ করা হয়।খালার চিৎকারে নিশার ভাবনার সুতোতে টান খেল।
আম্মা গো আম্মা, আহেন, আব্বাজানের দাঁত পাইছি গো আম্মা।
নিশা প্রায় ছুটেই গেল এটা শোনার পর।মুক্তোর দানার মতো কিছু একটা হাতে নিয়ে খালা দাঁড়িয়ে ছিল।
নিশার মনটা এতো ভালো হয়ে গেল যে আনন্দে চোখে পানি এসে গেল।খালা অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিল।হঠাৎ খালার দিকে চোখ পরাতে নিশা লজ্জা পেয়ে গেল।
কি দেখ, খালা?
আমাগো ছাওয়া গো কুন সমে দাঁত পইছে আমরা কবার না পাঁও।আর তোমরা এক খান দাঁত ধরি কান্দি দুনিয়া ভাসাইছেন।
না খালা তা না।দোয়া কর, একদিন যেন বাবলু কে তার দাঁত পড়ার এই গল্প শোনালে তার বোঝার ক্ষমতা হয়। আল্লাহ যেন তার বয়স অনুযায়ী বোধ শক্তির ক্ষমতা ফিরিয়ে দেন।
হ আম্মা, কথা ঠিক কইছেন।আল্লাহ যে কেন হের সাথেই এমনডা করল।দেইখা কিন্তু কিছু বোঝা না যায় আম্মা।কি সুন্দর রাজপুত্রের লাহান চ্যাহারা।খালি জবান খান যদি আল্লায় ফিরায়া দিত আমার বাবলু বাপজানের।হের মতো ছাওয়া পুরা বাড়ি মাতায়া রাখে আর হ্যায়।মনে দূঃক্ষ না পান আম্মা। আমি কই কি আরেকডা ছাওয়া নেন ক্যানে।
আরো ১০০ টা সুস্থ বাচ্চা হলেও কি আমার বাবলু র জন্য অনুভূতি গুলো কমে যাবে, খালা?
আর কি নিশ্চয়তা আছে যে আমার পরের বাচ্চা অটিস্টিক হবে না?
হেইডা মানে কি, পাগল, আম্মা?
না খালা।অটিস্টিক সাধারণত বলা হয় বুদ্ধি প্রতিবন্ধিদের।এদের বয়সের সাথে এদের মস্তিষ্কের ম্যাচুরিটি আসে না।
কি কথা কন, আম্মা?কিছু তো বুঝি না।
আমি বলছি।আসলে অনেক সময় ৫ বছর বয়সে একটা বাচ্চা যা বোঝে এরা তা বোঝে না।
৩ মাসের একটা বাচ্চা যা বোঝে এরা ৫ বছর বয়সে কোন কোন ক্ষেত্রে তাদের চেয়েও কম বোঝে।আবার কোন কোন ক্ষেত্রে আমরা যা আশা করি ওরা তার থেকেও অনেক বেশি বোঝে।একেকটা বাচ্চার ক্ষেত্রে একেক রকম ভাবে প্রগ্রেস হয়।
ও আম্মা অহন বুঝছি আমগো গেরামে এক বেটির ছাওয়া ৯ বছর বয়সে গিয়া মা কয়া ডাকছে।বেটির সে কি কান্দন, মা ডাক হুইনা।
তুমি মনে কিছু নিও না গো আম্মা।আমগো বাবলু শোনাও কতা কইবে।
হুম খালা বাবলুর আসলে এই কথা বলতে পারার সেক্টর টাই ডেভলোপ হয় নি।তাই ও বুঝতে পারে, শুনতে পারে কিন্তু বলতে পারে না।এদের ভেতর অনেকে দশ বছরে কথা বলা শুরু করে। অনেক কে ২৫ বছর বয়সেও কথা বলতে দেখা গেছে আবার অনেকে আজীবন কথা বলে নি।
আল্লাহ, মাফ করুক আম্মা। আমগো বাবলু আব্বাজান যেন ঠিক হইয়া যায়।
হুম খালা। সেই দোয়াই করো।
নিশা, নিশা, বাবলু। কই তোমরা সবাই?
ওই শোন খালা,বাবলুর বাবা ঘুম থেকে উঠে গেছে।এদিকেই আসছে। এখন এসব কথা বার্তা থাক।ও সহ্য করতে পারে না।এই তো আমি এখানে। জান, আজ বাবলুর প্রথম দাঁত পড়ল।এক মিনিট, আমি ক্যালেন্ডারে দাগ কেটে রাখি।
আচ্ছা, তোমরা মেয়েরা কি এতো মজা পাও বলোতো এতো ডে পালন করে। আজকে প্রোপোজ ডে,অমুক দিন হাত ধরা ডে, তমুক দিন কাছে আসার ডে…….
হইছে, হইছে… ব্রেক দাও এবার।……..
এভাবেই বাবলুর মতো বাচ্চাদের মা বাবা রা চোখের কোনের জল লুকিয়ে স্বাভাবিক ভাবেই এক একটা দিন পাড়ি দেবার যুদ্ধ চালিয়ে যায় আর দিন গুণতে থাকে সেই একবার মা বা বাবা ডাক শোনার ।।।।।।
4 Comments
Friends
UTTAM KUMAR BISWAS
@uttamk
Drako Shajib
@drako
স্মৃতি রানী রত্না
@srratna1990
ভাস্কর
@vaskarchou
Prithula Zaman
@prithula
তুলট ডেস্ক
@toulot
Sharbanam Gupta
@sharbanam-gupta
অভিমানী মন
@ovimanimon
Md.Masud ahmed
@masud




খুব ভালো লাগল গল্পটি। বাবলুর দাত যেমন খুজে পাওয়া গেল, তেমনি বাবলু খুজে পাক তার আপন ভাষা। ভালো থাক সকল শিশু এই সুন্দর ভুবনে। শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা নেবেন গল্পকার।