-
আমি কি মিষ্টি দোকানের সামনে বসে আছি? না তো! বাঙালীদের শুভদিনে মিষ্টি খাবার থাকাটা একটা রীতি তে পরিণত হয়েছে।মিষ্টিগুলোর উপর মাছি বসে বন বন করছে, বিচ্ছিরী অবস্থা!পাশেই আব্বু-আম্মু আর রুমি খালা বসে আছে।উনারা মানহার আব্বু আম্মুর সাথে কথা বলছে।তাদের পাশে একজন বসে পান চাবাচ্ছে,লোকটাকে দেখে সন্ত্রাসী সন্ত্রাসী মনে হচ্ছে। সাদা লুঙ্গি আর সাদা ফতোয়া পড়ে মুখ ভর্তি করে পান চাবাচ্ছে। আবার ফতোয়ার একটা বোতম খোলা। যখন আমরা বাসায় ডুকলাম তখন লোকটা আমার দিকে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে ছিল।আমি যথেষ্ট ভয় পেয়েছি বটে কিন্তু কাউকে বুঝতে দেয় নি। উনাদের মেয়ের হবু জামাই ভীতু প্রকৃতির এটা উনাদের বুঝতে দেওয়া যাবে না, তাই মনের ভেতর এক দফা ভয় নিয়ে হাসি মুখে লোকটাকে সালাম করলাম।
উনাদের আলাপচারিতার মনোযোগী শ্রোতা হওয়ার বদৌলতে জানতে পারলাম, পান চাবানো- সন্ত্রাসীদের মতো দেখতে লোকটা সম্পর্কে মানহার মামা হয়। মানহার মামার চেহারা সন্ত্রাসীদের মতো হলেও মানুষ টা অনেক ভালো,খুব রসিক মানুষ। উনি একটা করে কথা বলে আর উপস্থিত সবাই হো হো করে হেঁসে উঠে।
আমার বিয়ে দেওয়ার জন্য পরিবারের সবার রাতের ঘুম চলে গেছে।এর মধ্যে রুমি খালা একটা মেয়ের খোঁজ করেছে।রুমি খালা এ ব্যাপারে সবাইকে ছাড়িয়ে গেছে,বিয়ে করতে হলে আমাকে এই মেয়েকেই করতে হবে।উনি নাকি মেয়ের মা-বাবাকে কথা দিয়ে ফেলেছে যে, ছেলে পক্ষ থেকে আমরা সবাই রাজি।এ কথা শুনে আব্বু আম্মুর মাথায় হাত!আব্বু রুমি খালাকে বিস্ময়ের সাথে বলল,তুমি এটা কী করেছো?খালা হাসি চেপে বলল,কেন দুলাভাই! বিয়ে ঠিক করেছি।
কিন্তু এভাবে হুট করে! কাজটা তুমি ঠিক করোনি রুমি।আব্বুর মুখ দেখে মনে হচ্ছে তিনি খালার উপর খুব বিরক্ত।উনার মুখে মন খারাপের একটা ছাপ লেগে আছে।
যদিও এই মন খারাপের ছাপ বেশিক্ষণ ছিলো না। খালা যখন মেয়েটার ছবি দেখালেন আব্বু আম্মু তখন থেকেই রুমি খালার পিছনে ঘোরা শুরু করলেন। মেয়েটাকে উনাদের খুব পছন্দ হয়েছে। আম্মু খালাকে বলল,রুমি,মেয়েটা তো অনেক সুন্দর..!
খালা শাড়ির আচল গুছাতে গুছাতে বলল,তো আমি কি আমার ভাতিজার জন্য অসুন্দরী মেয়ে খুঁজে আনবো নাকি?
তবুও তুই কি মেয়ের পরিবার সম্পর্কে খোঁজ- খবর নিয়েছিস?
–আরে আমি কি খোঁজ খবর না নিয়েই উনাদের কথা দিয়েছি নাকি।মেয়ের পরিবার আমার ননদের শুশুর বাড়ির পাশেই,অতি ভদ্র আর সুশীল পরিবার।
মেয়েটার ছবি দেখার সুভাগ্য আমার হয় নি।উনারা আমাকে দেখতে দেয় নি;আর আমি লজ্জায় বলতে পারি নি। তবে উনাদের কাছে মেয়েটার নাম শুনেছি “মানহা” খুব সুন্দর নাম। সময় যত বয়ে যাচ্ছে মানহাকে দেখার কৌতুহল বাড়ছে।কৌতুহল বাড়ার কারণ হচ্ছে,আম্মু বলেছে “মেয়েটা সুন্দরী।” আমাদের কাছে যা অতি সুন্দর আম্মুর কাছে তা সাধারণ কিছু।
“ইভা তোর ভাইয়াকে ছাঁদে নিয়ে যা তো” সোফার কোণায় দাড়িয়ে থাকা মেয়েটার উদ্দেশ্য বলল মানহার মা। ইভা কোণায় দাড়িয়ে কড়ি আঙ্গুলের নখ কামড়াচ্ছে।ইভাও আমার মতো নিরব শ্রোতা। ইভা এবার তার নখ কামড়ানো বাদ দিয়ে আমাকে ছাঁদে নিয়ে আসলো।
একতলা বাসার ছাঁদ টা খুব সুন্দর। চারপাশে রেলিঙ করা।টবে নানা রং-বেরংয়ের ফুল ফুটে রয়েছে।কিন্তু ছাঁদের মাঝে নাড়িভুড়ির মতো লোহার পাইপ। অন্ধকারে অচেনা মানুষ ছাঁদে আসলে অনায়সে মুখ থুবড়ে পড়বে।শীতের তীব্রতা এখন কমে গেছে।গাছে গাছে কচি পাতা উঁকি দিচ্ছে। ফুলে ফুলে সেজে উঠার আনন্দময় প্রস্তুতি প্রকৃতিজুড়ে।চারিদিকে ঝিরিঝিরি বাতাস বয়ে যাচ্ছে। কোকিলের কুহুতান জানান দিচ্ছে ‘আজি বসন্ত জাগ্রত দ্বারে…।’
ছাঁদের একপ্রান্তে প্রচন্ড রোদ,আর এক পাশে ছায়া পড়েছে। ‘বাসন্তুী রংয়ের’ শাড়ী পড়ে দাড়িয়ে আছে মানহা। কাছে আসার পর মনে হলো, মানহাকে আমি আগে কোথাও দেখেছি। কোথায়? মনে নেই। খোঁপা করা চুল,চিবুক দেখলে মনে হয় উনিশ-কুড়ি বছরের বেশি হবে না। ভারী চমক্কার দাঁত, সেই দাঁতের ঝিলিকে প্রশ্ন,আচ্ছা,আপনি রক্তকাঞ্চন ফুল চিনেন?
আমি বিস্ময়ের ভাব ফুটিয়ে বললুম, না তো আমি এরকম ফুলের নাম শুনিনি!
–ওও আচ্ছা,আপনার পিছন দিকটা ফিরে দেখুন-
ছাঁদের পিছন দিকে বেশ পুরাতন একটা গাছ।
বসন্তে প্রায় নিষ্পত্র গাছ বেগুনি রঙের ফুলে ভরে গেছে। ৷পাঁচ পাপড়ির মধ্যে একটি বড় ও গাঢ় রঙের, তাতে কারুকার্য।গাছে শিমের মতো দেখতে ফল ঝুলে আছে।কুমের সুরে তিনি বললেন,আমাকে একটা ফুল এনে দিবেন…! আমি খোঁপায় পড়বো।বেশ কিছুক্ষণ চেষ্টা করলাম। কিছুতেই হাতের নাগাল পেলাম না! অবশেষে ব্যর্থতার চরম পর্যারে এসে- হতাশা নিয়ে ফিরত আসলাম। মানহার চোখে-মুখে বিষন্নতার ছাপ!
–ফুলটা আসলে ছাদ থেকে অনেকটা দূরে,আপনি কি মন খারাপ করেছেন? করবেন না দয়া করে! অনুনয়ের ভঙ্গিতে বললাম-
মানহা আমার দিকে নির্ণিমেষ ভাবে চেয়ে রইল,মনে হয় ওর খুব দুঃখ,এইভাবে কেউ প্রথম দেখা নদীর দিকে তাকিয়ে থাকে! মানহার মুখ এখনো বিষাদময়।মানহা তার কপালের বাম পাশের চুল সরালো, সাদা টসটসে একটা ব্রণ,আগুনের শিখার মতো,মনে হয় খুব ব্যথা? আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম।বললেম,এই জন্য আপনার মন খারাপ?
না ব্রণ আমার গা সহা হয়ে গেছে।আমার মুখে কিছু থাকুক আর না থাকুক, দু-একটা ব্রণ থাকবেই।সাদা হয়ে এলেই আমি গেলে দিই।ভেতরের সাদা অংশটা টিপে বের করে ফেললে চুপসে যায়, তখন অতটা চোখে পড়ে না।নইলে,মুখে ব্রণ থাকলে আমাকে খুব বাজে লাগে।কিন্তু কপালে ব্রণ থাকায় গেলে দিতে পাচ্ছি না,দারুণ সেফটিক হতে পারে।এমনিতেও কপালে ক্ষত করা ভালো না! এটা নিয়েও আমার কোনো মাথা ব্যাথা নেই, আব্বু আমাকে গত একসপ্তাহ থেকে ঘর বন্দী করে রেখেছে।
–ঘর বন্দী করে রেখেছেন, মানে কী?
উনি মনে করেন, এই বয়সে ঘরের বাইরে থাকা ঠিক না।মেয়েদের ওপর কু-নজর লাগে।
যত্তসব কুসংস্কার; আপনিই বলেন, এই বসন্তের হাওয়া গায়ে না লাগানো পাপ না? ঘরের ভেতর কি আর হাওয়া আসে,শুধু পাখার হাওয়া ব্যতিত!–আপনাকে কি বিয়ের জন্য কোনোরকম চাপ দিচ্ছে?
না! আমার বিয়ে নিয়ে কোনো আপত্তি নেই।আপনাদের আগেও একটা পরিবার আমাকে দেখতে এসেছিল; কথাবার্তা অনেকটা আগানোর পরেও শেষমেশ, বিয়েটা আর হলো না!
–কেন, ছেলে আপনার পছন্দ হয় নি?
সেরকম না, ছেলে পছন্দ হয়েছে।বিয়েটা উনারা ভেঙে দিয়েছে!তাদের অভিযোগ,আমি নাকি বেশি কথা বলি,প্রয়োজনের থেকে বেশি।
মানহা চোখতুলে সাড়ম্বরে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।মুখটা এখনো বিষাদময়। মানহার মুখ আকুতি করে,যেতে হবে,আমাকে বাইরে যেতেই হবে।
আমি বিস্ময়ের ভাব ফুটিয়ে বললুম,আপনি কি আমার সাথে বাইরে যেতে চাচ্ছেন?
মানহা নির্ণিমেষ ভঙ্গিতে আমার চোখে তাকিয়ে রইল। কুমের স্বরে বলল, চলেন একটু কচিপাতার হাওয়া গায়ে লাগায় আসি !
আমার কেন জানি সন্দেহ হচ্ছে,মেয়েটা সুস্থ তো,নাকি পাগল? একটা অচেনা ছেলের কাছে এতো আবদার! আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লাম।বললেম,আচ্ছা নিচে গিয়ে আপনার আব্বু-আম্মুর কাছে বলে দেখি উনারা অনুৃমতি দেয় কিনা? আরে আমি এমনটা কেন বলতে যাব,উনারাই বা কী মনে করবে আমার সম্পর্কে! নিজেকে নিজেই প্রশ্ন ছুঁড়ে মারলাম-
সে আঁৎকে উঠে বলল, না, উনাদের বলা যাবে না; যদিও আপনাকে অনুমতি দেওয়া হবে,কিন্তু উনারা বুঝে যাবে যে,এটা আমারি আবদার।
–তাহলে কিভাবে যাবেন?সবাই তো বসে আছে নিচে!
আমরা পিছনের দরজা দিয়ে বের হবো।আপনি আমাকে অনুসরণ করেন!
মানহা আর আমি, সিক্রেট-অপারেশনের মাধ্যমে পিছনের দরজা দিয়ে বাইরে আসলাম। গেটের কাছে যেতেই আমার চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল! গেটের সামনে মানহার মামা দাঁড়িয়ে, লোকটা এখনো পান চাবাচ্ছে! মানহা আমাকে আশ্বাস দিলো, মামা আমার দলের লোক।উনি কিছু বলবে না,এতো ঘাবড়ে যাওয়ার মতো কিছু হয় নি।
নিস্তব্ধ। অপমান? আমি কি ভীতু নাকি!উনার মামাকে দেখে আমি ঘাবড়ে যাব কেনো? আমি নিজেকে সামলে নিলাম।সত্যি! মামা কিছুই বললেন না,হেঁসে হেঁসে মানহার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন,আমার দিকে তাকালেন – আমিও ঠোঁট বাঁকা করে হাসলাম..জিহ্বায় চুন লাগাতে লাগাতে উনি বাসার ভেতরে চলে গেলেন।
২.
স্কুল কলেজ ছুটির পর যে রাস্তাঘাটে তরুণ তরুণীদের মেলা বয়ে যায়,সে মেলা আজ কোথায়? আজকে কলেজ বন্ধ নাকি? হাতের কব্জি উঁচু করে ঘড়িতে থাকিয়ে দেখলাম সাড়ে চার’টা বাজে,কলেজ ছুটি হয়ে গেছে অনেক আগেই।রাস্তায় ভরপুর নীরবতা,কোলাহাল আজ শহর থেকে ছুটি নিয়েছে। নিকোটিনের ধোঁয়ার মতো শহরের সব ধুলাবালি যেন আকাশে উড়ে গেছে।সবুজ পাতায় ছেয়ে গেছে পথঘাট,আর সেই পথে হাঁটছি আমরা দুজন,অনন্ত পথ ধরে।রাস্তার ওপাশ থেকে গান ভেসে আসছে –
এই ধুলো ধুলো শহর, তোমার, আমার
আসতে পারো, চলে যেতে পারো,
এই পৃথিবীর বিষন্ন ধুলোয় মিশে যেতে পারো,
তবু, এই বিষাদগ্রস্ত মেঘময় প্রাচীন শহর
বারবার তোমাকে ফিরে পেতে চাইবে
এই করুণ নেক্রপলিসে।গানটার সাথে আজকের শহরের কোনো মিল নেই,আজকে কোনো ধূলাবালি নেই,আকাশে একগুচ্ছ মেঘদল ছুটাছুটি করছে,তাতে কোনো যাই আসে না! বসন্তের এই দিনে বৃষ্টি হবে না। মানহা মিটি মিটি হাসছে, বারবার হাত মেলে দিচ্ছে। মনে হচ্ছে,খাঁচায় বন্দী পাখি অনেকদিন পর মুক্তি পেয়ে- মুক্ত আকাশে উড়ছে।
ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে বাশের মাচার উপর বসে আছি,হাতে লেবু চা।মানহা নদের দিকে তাকিয়ে পা দুলিয়ে চা পান করছে।আমার গরম চা খেতে ভালো লাগে না- আমাদের দুজনের মাঝে চায়ের কাপ টা রাখা, আমি পুরো উদ্যানে চোখ মেলিয়ে দেখলেম, সবুজ পাতায় পুরো উদ্যান সজ্জিত। আহা!মানুষের কি সুখ।রাস্তা দিয়ে একদল কলেজ ছাত্র যাচ্ছে,পিছনে ভারী ব্যাগ,মুখভরা হাসি সবার।
অস্পষ্টভাবে কানে আসলো, আমি কি খুব বেশি কথা বলি?
আমি ধরা গলায় বললুম, না, তবে বললেও সমস্যা নেই! আমি এ জন্য বিয়ে ভেঙে দিব না-
সে উচ্চস্বরে হেঁসে বলল, কেন? বিরক্তি আসবে না এতো প্রশ্নে?
না, আপনার কন্ঠ অনেক সুন্দর, কোকিল কন্ঠ।
মানহা এবার লজ্জায় চায়ে চুমুক দিলো।
তার মুখ থেকে আবার প্রশ্ন- আপনি কী এরকম-ই!
আমি বিস্ময়ের ভাব ফুটিয়ে বললুম, কেরকম?
–এই যে রোবট এর মতো, সবার কথায় শুনেন যে! আমি একটা অচেনা মেয়ে,আপনি আমার কথা শুনবেন কেন?আমার মন ভালো করতে আমার সাথে বাইরে আসবেন কেন?
আমি শীতল চায়ে চুমুক দিয়ে বললেম, আপনার বিষাদময় মুখ দেখে মানা করতে পারি নি।
মানহা সাড়ম্বরে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
শিল্পাচার্য জয়নাল আবেদীন চত্বরের কাছে গিয়ে তার মুখ থেকে প্রশ্ন, আচ্ছা এটা মূতি নাকি ভাস্কর্য?
– জানি না! সপ বিখ্যাত ভঙ্গিতে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ,তারপর বলল,
– আপনি কি বিজ্ঞানের ছাত্র ছিলেন?
–হ্যা,!
–তাহলে আপনার এইসব না জানলেও চলবে- চলেন খেয়াঘাটে গিয়ে বসি!
– হ্যা চলুন।লাল পাঞ্জাবি, আর মেরুন রঙের শাড়ী গায়ে এক কপোত-কপোতী ঘাটের পাড় দিয়ে হাটছে।ঘাটে নৌকা বাঁধা,নদীর মাঝে কিছু নৌকা ভাসছে।মানহা বাদামের খোসা ছাড়িয়ে বাদাম গুলোকে উদ্ধার করে মুখে ফেলছে।সে বাদামের খোসা ছাড়াতে ছাড়াতে বলল, আপনারা এই প্রথমবার মেয়ে দেখতে এসেছেন?নাকি,আমার আগেও দেখেছেন?
আমি ধরা গলায় বললুম, না-না, আপনিই প্রথম,আর আপনিই হয়তো শেষ-– শেষ কেন?
– আব্বু আম্মু আর খালা উনাদের খুব পছন্দ আপনি-
– আপনার পছন্দ না?আমি এবার লজ্জায় লাল হলাম, কিছু বলতে পারলাম না। মানহা আমার টমেটোর মতো লাল মুখখানা পাত্তা দিলো না। অন্যমনস্ক হয়ে বলল,চলেন নৌকাভ্রমণ করি-
– না, আমি সাতার জানি না,আর আমার পানি ভীতি আছে!
বয়স যখন আট ছুঁই ছুঁই, তখন আব্বুর সাথে পুকুরে গিয়েছিলাম।ছিপ দিয়ে মাছ ধরব বলে। পুকুরের পাড় আর পানি প্রায় সমান-সমান,পানি নদীর ঢেউ এর মতো পাড়ে উঠে আসতে চায়।ঘন্টাখানেক ছিপ ফেলে রাখার পরও যখন মাছ উঠছিল না,তখন আমার চোখে মুখে হতাশা আষ্টেপৃষ্টে লেগে যাচ্ছিলো।আব্বু সাঁই সাঁই করে শুধু ছিপ টান দেয় কিন্তু মাছ আর উঠে না।আমার হতাশা যখন চরম পর্যায়ে তখন আব্বুর ভাগ্যে একটা পুঁটি মাছ উঠে আসল। কড়ি আঙ্গুলের মতো দেখতে মাছটা দেখে আমি খুশিতে আত্মহারা হয়ে লাফাতে শুরু করলাম! আব্বুর অগোচরে লাফাতে লাফাতে ধপাস করে পড়লাম পুকুরে,আহা! সে কী গভীর?পানির ভেতর শুধু অন্ধকার।আব্বু পানি থেকে তুলতে তুলতে পেট ভর্তি পানি পান শেষ। সেই থেকে এখনো ড্রেনের পানি দেখলেও ভয় করে।
মানহা আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল, ধরুন,আমার হাত ধরুন।
আমি দু-টানায় পড়ে গেলাম, মানহা আবার জোর গলায় বলল, কি হলো ধরছেন না কেন?
আমি কাঁপা কাঁপা হাতে তার নরম হাত টা ধরলাম, আহ! কি শীতল হাতখানা।
আমরা নদীর মাঝামাঝি চলে এসেছি।ভয় করছে! কিছুটা ভালোও লাগছে,নরম হাতটা খুব শক্ত করে ধরে রেখেছি।মানহা মিটমিটে হাসছে,একবার আমার দিকে তাকাচ্ছে আবার পানির দিকে। এবার মুখ থেকে একটা আবদার বের করলেম, খোলা চুলে আপনাকে অনেক সুন্দর লাগবে!
–সে কুৃমের সুরে বলল, কেন খোঁপায় ভালো লাগছে না বুঝি?
– হ্যা,তবে খোলা চুলে আরো সুন্দর লাগবে-
সে খোপা খুলে ফেলল। এতো লম্বা চুল! কালো কুচকুচে চুলগুলো কোমর ছেড়ে গেছে।আমি তাকে চোখটা বন্ধ করতে বললাম,সে কিছুটা বিস্ময়ের ভঙ্গিতে আমার দিকে তাকালো!আমি আবার বললেম চোখ বন্ধ করতে- এবারও সে শুনলো,তার চোখ দুটো বন্ধ করলো। আমি পাশ পকেট থেকে রক্তকাঞ্চন ফুল টা বের করে তার কানে গুঁজে দিলাম,সে কিছুটা আৎকে উঠে বলল,এটা আপনি কোথায় পেলেন?আপনাদের বাসার পিছন দিয়ে আসার সময়,ফুলটা গাছের নিচে পড়ে ছিল-
–কিন্তু ফুলটা তো থ্যাৎলানো,পাঁচ টা পাপড়ির মাঝে দুইটা পাপড়ি অক্ষত আছে!
ফুল টা থ্যাৎলানো হলেও আপনার জন্য আমার ভালোবাসাটা সতেজ।সে হেঁসে বলল,এই অল্প সময়ের মধ্যে ভালোবেসে ফেললেন?
এই অল্প সময়ে যদি ভালোবাসাটা না হতো তাহলে আরো এক যুগ সাথে থাকলেও হতো না।মানহা বিস্ময়ের ভাব ফুটিয়ে বলল, আপনাকে কিছুক্ষণ আগেও মনে হচ্ছিল,আপনি একটা নিরামিষ মানুষ! পুঁইশাকের মতো- কিন্তু এখন বেশ রোমান্টিক মনে হচ্ছে।
সূর্য ডুবে যাচ্ছে।আমরা ঘাটে চলে এসেছি- নরম হাতটা ছাড়তে ইচ্ছে করছে না, তাই এখনো ধরে আছি! মানহা বলল, চলেন! ভাবলাম সময় হয়ে গেছে, বাসায় ফেরত যাবে।কিন্তু না,সে হাঁটা শুরু করে বলল,আজকে আপনার সাথে সন্ধ্যেভ্রমণ করব,যদিও হেঁটে হেঁটে ভ্রমণ টা করা যায়! কিন্তু আমরা রিক্সায় করব।
জয়নাল আবেদীন চত্বরে একটা রিক্সাওয়ালাকে পেলাম।দিনশেষে সকল ক্লান্তি চোখে মুখে লেগে থাকার কথা! কিন্তু রিক্সাওয়ালা খুব ফুরফুরে মেজাজে আছে- আজকেই দিন টাই এমন ক্লান্তিবিহীন।মানহা রিক্সাওয়ালাকে বিনীতভাবে বলল,ভাইয়া যাবেন?
না আফা,রিক্সার হুড ভাঙ্গা।রিক্সাওয়ালার সহজ স্বীকারোক্তি –হুড লাগবে না ভাইয়া,আপনি চলেন।
রিক্সাওয়ালা একবার আমার দিকে তাকালেন। তারপর বললেন,কই যাবেন আফা?
কোথাও না আশেপাশে ঘুরবো!
রিক্সাওয়ালা হাসলেন,নির্মল হাসি।আমরা দুজন পাশাপাশি বসে আছি,রাস্তার শেষে লাল বর্ণের সূর্য টা ডুবছে।মানহা কুৃমের সুরে বলল,হাতটা কি সারাজীবনের জন্য ধরলেন?আমি তার দিকে তাকালাম! সে হাসলো,স্নিগ্ধ হাসি।আমি আরো শক্ত করে ধরলেম হাতখানা! সে বলল, আপনাকে সোয়ামি বলে ডাকবো!নাকি, নামটা বলবেন?
– সাফিন আহমেদ।মানহা আমার চোখে তাকিয়ে রইলো। দুজনের চাহনিতে কেমন যেন নেশা আছে,চোখ ফেরানো যাচ্ছে না!
তার মাথা থেকে রক্ত ঝাড়ছে,লাল রক্ত! কি হলো? পিছন থেকে শুধু হর্ণ এর আওয়াজ শুনছিলাম,কিছু একটা রিক্সার পিছনে ধাক্কা মারলো মনে হলো! মানহার পাশেই রক্তকাঞ্চন ফুল টা পড়ে আছে।সে হাসলো,বলল,এতো তাড়াতাড়ি হাতটা ছেড়ে দিলেন? আমি হাত বাড়াইলাম,ফুলের ছোয়া পেলাম,তারে পেলাম না! চোখ দুটো কাঁদতে লাগলো- সবই অন্ধকার হয়ে গেল।
৩.
ঘুৃমটা ভেঙ্গে গেল,চোখেরা ব্যাথা পেল।কে যেন নির্মিষে ছুয়ে দিলো! বুঝলুম এখনো বেঁচে আছি।রুমি খালা ডাকছে, “এই সাফিন উঠ বাপ। ” খালাকে দেখে মনে হলো, মৃত্যু অত সোজা না! আমি খালার ডাকে সাড়া দিলাম।খালা বলল, খাবার টেবিলে আয়,সবাই অপেক্ষা করছে।
আশ্চর্য! খালা এখানে? খালা কখন আসলো?আমি বিছানা ছেড়ে উঠলাম। আয়নার সামনে গিয়ে দাড়ালাম,একি কান্ড! কপালে ব্রন,সাদা টসটসে, আঙুল দিয়ে ছুয়ে দেখলাম- আহ কি ব্যাথা! সেফটিক হওয়ার ভয়ে আর ছুঁলাম না।মানহার কথা মনে পড়লো,তাকে
কল্পনায় ছুঁয়েছি,সেটা এখনো অনুভব করতে পাচ্ছি! আমি চোখ বন্ধ করলাম- মানহা মিটমিটে হাসছে…সব স্বপ্নই মিথ্যে হয় না! খাবার টেবিলে আমার বিয়ের আলোচনা হচ্ছে। রুমি খালার চেনা জানা একজন মেয়ে আছে,আব্বু আম্মু ঠিক করেছে মেয়েটাকে দেখতে যাবে।মানহার মুখ টা ভেসে উঠলো,কি মায়াবী মুখ! আমি খুশি হলাম এটা ভেবে যে,মেয়েটা যদি স্বপ্নের মানহা হয়।কিন্তু পরক্ষণেই স্বপ্নের শেষ মুহুর্তের কথা মনে পড়ল।আমি আব্বু কে মানা করলাম,মেয়ে দেখতে যাব না আমি,তোমরা যাও।আব্বুর চোখ রাঙানো দেখে ভয় পেলাম।আব্বু কর্কষ গলায় বলল, “বিয়েটা তুমি করবে তাই মেয়েটা তোমাকেই পছন্দ করতে হবে।” আমি আর কথা বাড়ালাম না-
আশাহত হলাম! মেয়েটা মানহা না,অন্য একজন। আমি মেয়েটাকে দেখেই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলাম। সাদা ধবধবে গায়ের রঙ, নীল শাড়ি পড়া,দোহারা উনিশ।আমার দিকে আড়চোখে তাকাচ্ছে বারবার। বস্তুত মেয়েটা ব্রণ এর জন্য তাকাচ্ছে বারবার; হয়তো খুব বাজে লাগছে আমাকে। আমি টেবিল থেকে শরবতের গ্লাসটা তুলে নিলাম।মেয়েটার এতো সৌন্দর্য তবুও আমাকে আকর্ষিত করছে না,মুহুর্তটা খুব বিরক্তিকর লাগছে।যদি জ্ঞান হারিয়ে লুটে যেতে পারতাম! এমন সময়ে এই চাওয়া পাওয়া গুলো পূরণ হয় না।
ব্যস্ত নগরী! সবাই নিজের জন্য ছুটছে,আমি কার জন্য ছুটছি? আমিও নিজের জন্য ছুটছি।ধূলাবালি উড়ছে,নাকের ভিতরে ডুকছে কণায় কণায়।আম্মুকে কানে কানে বলে এসেছি,বিয়েটা আমি করব না!আমি চললেম,বাসায় গিয়ে আব্বুর মাথায় তেল মালিশ করে দিও! তাহলে আর আমার উপর রেগে থাকবেন না। আম্মু মাথা নাড়ালেন।আমি বের হয়ে পড়লাম।
জনশূন্য একটা রাস্তার দেখা মিললো এতক্ষণে। চুপ চাপ, ছিমছাম পরিবেশ,পাখির কিচিরমিচির শোনা যাচ্ছে,আকাশের মেঘ এখান থেকে ওখান ছুটাছুটি করছে, এই দিনে বৃষ্টি হয় না তেমন! মেঘদের লুকোচুরি খেলা দেখতে বেশ লাগছে। উপরে তাকিয়ে হাঁটার একটা শাস্তি পেলাম! ল্যাম্পপোস্টে আমার কপাল আঘাত করলো,আহা কি ব্যথা! চোখে অন্ধকার নেমে আসলো,এরকম শারীরিক যন্ত্রণা আমি এর আগে পাইনি- ব্রণ টা একদম থ্যাৎলে গেছে,ব্রণগুলোও অভিমানী,অসময়ে ফেটে গেলে রক্তস্রোত বন্ধ হয় না।আমি কপালে রুমাল চেপে ধরে হাঁটা শুরু করলুম।
কিছুদূর যেতেই থমকে দাঁড়ালাম। ছাঁদে একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে,কে মেয়েটা? মানহা? যদিও একতলা বাসার ছাদ তবুও কিছু বুঝা যাচ্ছে না।কপাল থেকে এখনো রক্ত পড়ছে,ব্যথায় ঠিক মতো তাকাতে পারছিনা। টিপ টিপ বৃষ্টির ফোটা গায়ের উপর পড়ছে,কিছুক্ষণ আগে যে লুকোচুরি খেলা হলো- সেই খেলার ফলাফল এই বৃষ্টি।বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে কপাল থেকে রুমাল সরালাম।কপালে সচ্ছল জলবর্ষন হলো,ব্রুণে থ্যাৎলানো জায়গাটা জ্বালা করে উঠলো।মেয়েটা আমার দিকে নির্ণিমেষ ভঙ্গিতে চেয়ে রইলো, তারপর কি যেন মনে হলো! ছুটে চলে গেল ভেতরে।
বৃষ্টি বেশ কেঁপে এসেছে।আমি ঠায় দাঁড়িয়ে আছি।বাসার লোহার গেট পেড়িয়ে ছাতা হাতে একটা মেয়ে আসলো! বাসন্তি রঙের শাড়ি,খোলা চুল,কানে গুজা রক্তকাঞ্চন ফুল- মেয়েটা চেয়ে রইলো আমার চোখে,দুজনের চোখে কি যেন একটা নেশা আছে! চোখ ফেরানো যাচ্ছে না।
(সমাপ্ত)
গল্প– সন্ধ্যাভ্রমণ
লেখকে–আশিকুর রহমান।
8 Comments
Friends
Apon Imran
@apon-imran
Al BapPy
@al-mahmud-bappy
Farabi Kowsar Lamia
@lamia
Kotha Sarker
@kothasarker
ফজলে রাব্বী পূ র্ণ
@purnorabby
Jamal Zamil
@jamal-zamil
Shamima Shammi
@shamima-nasrin-shammi
Apurba Saha
@apurba-saha
Al-Shahriar Ahamed
@anik21


ভালো লিখেছেন।