Profile Photo

Shakhawat NayonOffline

  • Shakhawatnayon
  • Profile picture of Shakhawat Nayon

    Shakhawat Nayon

    4 years, 5 months ago

    একজন হৃদয়বতী
    ————
    শেষ রাতে এক দু:স্বপ্নে ঘুম ভেঙ্গেছে। হাই তুলতে তুলতে টিভিটা ছাড়লাম। ব্রেকিং নিউজে একটি বৃদ্ধাশ্রমে ভয়াবহ অগ্নিকান্ডের খবর। হতাহত অনেক। ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ, হাসপাতালের দৃশ্য দেখাচ্ছে। হঠাৎ দেখি সারা শরীর ব্যান্ডেজে ঢাকা এক মহিলা। নাম- ভিকি উইলিয়াম। নিভু নিভু চোখ, অস্পষ্ট স্বরে রন… রন… বলে কাতরাচ্ছে। তক্ষুনি হাসপাতালের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলাম। গত এপ্রিলে ‘ডিমেনশিয়া’ বিষয়ক এক গবেষনার কাজে ঐ বৃদ্ধাশ্রমেই গিয়েছিলাম। সেখানেই ভিকি’র সাথে পরিচয়। বৃদ্ধাশ্রমের পরিচালক এ্যান্ড্রু বলেছিল-

    ‘ভিকি’র কিছুই মনে থাকে না।’
    ‘কি রকম?’
    ‘নিজের নাম, ঠিকানা, বয়স… কিছুই ঠিকমত বলতে পারে না।’
    ‘কত দিন ধরে এই সমস্যায় ভুগছে?’
    ‘বছর দশেক তো হবেই। ২০০১ সালে একদিন গাড়ি নিয়ে অফিসে যাবার পথে হারিয়ে গিয়েছিল। তার বাসা, অফিস সিডনিতে অথচ দু’দিন পরে পুলিশ তাকে খুঁজে পেয়েছে মেলবোর্নে।’
    ‘তারপর?’
    ‘মাঝে মাঝেই অফিসে না গিয়ে শপিং সেন্টারে চলে যেত। অফিস থেকে ফোন করলে, অবাক হয়ে বলত- ‘আজ তো ছুটির দিন, বিরক্ত করছ কেন?’ আবার ছুটির দিনে অফিসে গিয়ে বসে থাকত। অফিসের ফাইলপত্র কোনটা কোথায় রাখত কিছুই মনে করতে পারত না। এক পর্যায়ে চাকুরিটাই হারাল।’
    ‘আচ্ছা।’
    ‘ক্রেডিটকার্ডের লিমিট ভুলে গিয়ে ইচ্ছামত খরচ করত। বিদ্যুৎ, গ্যাস, ফোন বিল এমনকি ব্যাংকের কিস্তি দিতেও মনে থাকত না। এক পর্যায়ে…যা হয় আর কি…একে একে বাড়িটাও গেল।’
    ‘আমি কি তার সাথে একটু কথা বলতে পারি?’
    ‘হু।’
    একটু পরে ভিকি আসলো। এসব দেশের বৃদ্ধাদের সাজগোছ যতটা উৎকট হয়, ভিকি সেরকম না। নীল চোখের স্বর্ণকেশী এক ভদ্র মহিলা। জিজ্ঞেস করলাম-
    ‘কেমন আছ?’
    ‘ভাল না।’
    ‘কেন?’
    ‘রন আমাকে সিনেমায় নিতে চেয়েছিল…ওরা যেতে দেয়নি।’
    ‘তাই? রন কি মাঝে মাঝেই আসে?’
    ‘মাঝে মাঝে আসবে কেন? প্রতিদিনই আসে। আমার জন্য গিফট নিয়ে আসে।’
    ‘রন কি করে? কোথায় থাকে?’
    ‘শুধু আমাকে চিঠি লিখে। কাছেই কোথাও থাকে। দূরে থাকবে কি করে, বল?’
    কথাগুলো বলেই শিশুদের মত ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদতে শুরু করল। এ্যান্ড্রু বলল-‘কোনোদিন কেউ আসেনি। যদিও সে মনে করে-
    ‘প্রত্যেক দিনই রন আসে। নিজেই লিখে সবাইকে বলে রন চিঠি দিয়েছে। আরো কত পাগলামী করে!’
    ‘রন কে?’
    ‘রোনাল্ড হ্যারিস (রন) তার প্রেমিক। ভীষণ ভালোবাসে।’
    আমাদের কথার মধ্যেই ভিকি বলল- ‘আমার বালিশটা একটু সরিয়ে দিবে? মাথাটা উচু-উচু লাগছে।’ ভিকি আমার সামনে একটা চেয়ারে বসে আছে। বালিশ পেল কোথায়? এ্যান্ড্রু’র দিকে তাকালাম। একটুপরেই ভিকি পানি চাইল। পানি না খেয়ে গ্লাস হাতে ‘পানি দাও’, ‘পানি দাও’ করতে লাগল। হাতেই পানির গ্লাস অথচ তার মনে নেই। এ্যান্ড্রু বলল-
    ‘ভিকি প্রায়ই খেতে চায় না; ঘুমাতে চায় না, গোসল করতে চায় না, ঔষুধ খায় না। সারাক্ষণ শুধু রন…রন…করতে থাকে। প্রায়ই বলে- ‘…রন আসবে, আমাকে একটু সাজিয়ে দাও তো।’ একটুপরেই আবার বলবে, ‘রন অপেক্ষা করছে…এখনই বেরুতে হবে।’ মাঝে মাঝে গভীর রাতে রন… রন… বলে কাঁদে।’
    ‘রন কোথায় থাকে? তার সম্পর্কে আর কিছু জানো? ’
    ‘কোথায় থাকে জানি না। ওদের সম্পর্কটা ভেঙ্গে যাওয়ার পর ভিকি আর সংসার করেনি। সারাটা জীবন একা একা থেকে মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছে।’

    হাসপাতালে চলে এসেছি। ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে ভিকিসহ অন্যান্য মুমূর্ষু রোগীদের রাখা হয়েছে। অনেকের অবস্থা যখন তখন। ঘটনাস্থলেই মারা গেছে ৪জন, হাসপাতালে ৩জন। অনেকেরই আত্মীয়-স্বজন এসেছে। ভিকি’র কেউ আসেনি। তার কাছে গিয়ে বসলাম। একটু পর পর শুধু রন…রন বলে কাতরাচ্ছে। চোখের পাতা কাঁপছে। চোখের পানি গড়িয়ে পড়ছে। আস্তে করে জিজ্ঞেস করলাম-
    ‘কেমন আছ, ভিকি?’
    কাতর স্বরে সে জিজ্ঞেস করলো- ‘রন এসেছো? রন…’
    কী উত্তর দিব? বুঝতে পারলাম না। তার হাতখানি শক্ত করে ধরলাম। মনে হলো- হৃদয়টা তো এতদিন পুড়েছেই, এবার দেহটাও পুড়ল। কেমন জানি একটা চাপা কষ্টে চোখের পানি আর চোখে রাখতে পারলাম না। ভাবছি, যে দেশের মানুষ সকালে ভালোবাসি বলে বিকেলে ভুলে যায়; সে দেশে এরকম হৃদয়বতী মানুষও থাকতে পারে? যে জীবনের সব কিছু ভুলে গেছে, শুধু ভালবাসা ভোলেনি।

    3
    2 Comments
    • মানুষ মানুষের জন্য–এই চেতনা যেনোয়ামরা ধারণ করি।

    • অসাধারণ গল্প। বেশ লাগল পড়ে। শুভেচ্ছা ও স্বাগতম গল্পকার। নতুন নতুন আরো গল্প চাই।

Skip to toolbar